শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
রাজনীতি কর্মসূচি থেকে পিছু হটাই কাল হয়েছিল আওয়ামী লীগের

কর্মসূচি থেকে পিছু হটাই কাল হয়েছিল আওয়ামী লীগের

ছাত্র-জনতার তুমুল গণ-আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পতন ঘটে টানা ১৫ বছর
ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ৫ আগস্টের এই
চূড়ান্ত পরিণতির বীজ মূলত বোনা হয়েছিল জুলাইয়ের শেষ দিনেই। শোকের মাস আগস্টের
প্রথম দিনে ক্ষমতাসীন দলের পূর্বঘোষিত বিশাল রাজনৈতিক কর্মসূচি হঠাৎ স্থগিত
করার সিদ্ধান্তই আন্দোলনকারীদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং সরকারের
দুর্বলতা উন্মোচন করে।

কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ জুলাইয়ের শেষে এসে
কার্যত সরকার পতনের এক দফা দাবিতে রূপ নিয়েছিল। সেই চরম উত্তাল পরিস্থিতিতে
কীভাবে ১ আগস্টের কর্মসূচি থেকে তৎকালীন সরকারের পিছু হটার বিষয়টি তাদের
পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল, তা নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক 
পাভেল হায়দার চৌধুরী। তাঁর বিশ্লেষণ এবং সে সময়ের প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলির
ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের নেপথ্যের ৮টি মূল কারণ নিচে তুলে ধরা
হলো:

১. রাজপথের নিয়ন্ত্রণ নিতে ১ আগস্টের শোডাউনের পরিকল্পনা জুলাইয়ের শেষ দিকে কোটা
সংস্কার আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে চেয়েছিল
আওয়ামী লীগ। উদ্দেশ্য ছিল, শোকের মাস আগস্টের প্রথম দিনেই (১ আগস্ট) রাজধানী
ঢাকায় লাখ লাখ নেতা-কর্মীর সমাগম ঘটিয়ে একটি বিশাল রাজনৈতিক শোডাউন করা,
যাতে রাজপথ পুরোপুরি ক্ষমতাসীনদের দখলে চলে যায়।

২. আন্দোলনকারীদের মধ্যে প্রাথমিক ভীতি ও বিরতির চিন্তা আওয়ামী লীগের এই বিশাল
শোডাউনের ঘোষণার পর আন্দোলনকারীদের মধ্যে একধরনের ভীতির সঞ্চার হয়েছিল।
সরকারি দল লাখ লাখ মানুষ ঢাকায় আনলে আন্দোলন অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়বে—এমন
ভাবনা থেকে আন্দোলনকারী ও এর নেপথ্যের শক্তিগুলোর মধ্যে কর্মসূচি সাময়িক
বিরতি দেওয়ার আলোচনাও শুরু হয়েছিল।

৩. সরকারের আকস্মিক পিছু হটা ও কর্মসূচি স্থগিত আন্দোলনকারীরা যখন অনেকটাই
দুশ্চিন্তায়, ঠিক তখনই দৃশ্যপট পাল্টে যায়। জুলাইয়ের শেষ দিনে
এসে আওয়ামী লীগ হঠাৎ ঘোষণা দেয় যে ১ আগস্টের কর্মসূচি পিছিয়ে ৩ আগস্ট করা
হয়েছে। পরবর্তীতে সেই কর্মসূচিও পুরোপুরি স্থগিত করে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল।
এই সিদ্ধান্তটিই ছিল পতনের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট।

৪. আওয়ামী লীগের দুর্বলতা প্রকাশ ও আন্দোলনকারীদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি কর্মসূচি
পেছানোর এই সিদ্ধান্তে আন্দোলনকারীরা বুঝতে পারেন, "ডাল মে কুচ কালা
হ্যায়"। যে ভয় আন্দোলনকারীদের মধ্যে ছিল, সেই ভয় উল্টো সরকারের ভেতরে
ঢুকে পড়েছে বলে তাঁরা টের পান। আওয়ামী লীগের চরম সাংগঠনিক দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে
ওঠায় আন্দোলনকারীরা নতুন করে শক্তি ও সাহস সঞ্চয় করেন এবং মাঠে শক্ত অবস্থান
নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

৫. আমলা, পিএমও ও বিশেষ বাহিনীর নেপথ্য পরামর্শ আওয়ামী লীগের এই পিছু হটার পেছনে
তৎকালীন সরকারের নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা ছিল। জানা যায়, সরকারের প্রভাবশালী
আমলা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের (পিএমও) কর্মকর্তা এবং একটি বিশেষ বাহিনীর
পরামর্শেই রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে সরে আসে সরকার। তারা সাবেক প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনাকে বুঝিয়েছিলেন যে, এই মুহূর্তে রাজনৈতিক শোডাউন হিতে বিপরীত হতে পারে।

৬. দলের সাধারণ সম্পাদকের বিশেষ অনুরোধ প্রভাবশালী আমলা ও বিশেষ বাহিনীর পাশাপাশি
আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও রাজনৈতিক কর্মসূচি স্থগিত
করার পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি সংঘাত এড়াতে দলের সভাপতি শেখ হাসিনাকে বিশেষ অনুরোধ
করেছিলেন বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

৭. ভাবমূর্তি সংকট ও ব্যাপক রক্তপাতের শঙ্কা সরকারের ভেতরে তখন এই দুর্ভাবনা ঢুকে
পড়েছিল যে, ১ আগস্ট বা ৩ আগস্ট রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে গেলে
আন্দোলনকারীদের সাথে ভয়াবহ সংঘাত বেধে যেতে পারে। এতে
রক্তপাত ও প্রাণহানি আরও বাড়বে, যা আন্তর্জাতিক ও দেশীয় অঙ্গনে সরকারকে চরম
ভাবমূর্তি সংকটে ফেলবে। পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার এই ভীতি থেকেই
রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন থেকে বিরত থাকে সরকার।

৮. রাজপথ পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া এবং ৫ আগস্টের চূড়ান্ত পতন বিশ্লেষকের মতে, স্বচ্ছ
দৃষ্টিতে সংঘাত এড়ানোর সিদ্ধান্তটি হয়তো সঠিক ছিল, কিন্তু আন্দোলনকারীদের
কাছে এটি সরকারের চরম দুর্বলতা হিসেবেই প্রতিফলিত হয়। রাজনৈতিক শক্তি মাঠ
থেকে সরে যাওয়ায় আন্দোলনকারীরা নির্ভয়ে রাজপথ দখল করে নেয়। ওই দিনগুলোতে ব্যাপক
সংঘাত, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম বিটিভি ভবন ও মেট্রোরেলে অগ্নিসংযোগসহ নানা
সরকারি স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা
পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।

বিশ্লেষক পাভেল হায়দার চৌধুরী তাঁর বক্তব্যের শেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে
গেছেন। তাঁর মতে, ৫ আগস্টের আগে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে কারা
প্রকৃতপক্ষে সরকারকে ভয় দেখিয়েছিল এবং কারা পিছিয়ে আসার পরামর্শ
দিয়েছিল—সেই মহলের আসল উদ্দেশ্য কী ছিল, তা আজও একটি বড় প্রশ্ন।
এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে হয়তো সরকার পতনের নেপথ্যের আরও অনেক অজানা সমীকরণ
মেলানো সহজ হবে 

খুঁজুন