একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে দেওয়া বক্তব্যকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে উত্তেজনা ও হট্টগোল সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপির সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের এক বক্তব্যে উত্তেজনা ছড়ালে সংসদের কার্যক্রম প্রায় ১০ মিনিট অচল ছিল। এ সময় রুলিং দিয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। সংসদ সদস্যদের সতর্ক করে তিনি বলেন, সামান্য কারণে উত্তেজনা সৃষ্টি করা ঠিক নয়, এতে জাতীয় সংসদের প্রতি মানুষের সম্মান থাকবে না। পরবর্তী সময়ে জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা সংসদ সদস্য ফজলুর রহমানের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান। এরপর সরকারি দল, বিরোধী দল ও বিজেপির সংসদ সদস্য এ প্রসঙ্গে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য রাখেন।
গতকাল মঙ্গলবার বিকালে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। রাষ্ট্রপতির ভাষণে ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখেন সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, কোনো মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ জামায়াতে ইসলামী করতে পারে না, কোনো শহীদ পরিবারের কেউ জামায়াত করতেই পারে না, করলে এটা ডাবল অপরাধ। ফজলুর রহমানের এই বক্তব্য ঘিরে দেখা দেয় উত্তেজনা। বিরোধী দলের সদস্যরা হইচই শুরু করলে সরকারি দলের সদস্যরাও প্রতিবাদ জানান।
মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জুলাই অভ্যুত্থানের তুলনার বিরোধিতা করে ফজলুর রহমান বলেন, আমি বলব, এই কথাটা বলাই অন্যায়। কারণ মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ৫ আগস্টের তুলনা করা
মানে প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে কুয়ার তুলনা করা। তিনি বিরোধী দলের উদ্দেশে বলেন, তারা বলেছিল, কোনো মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। সেইদিন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি বলেছিলাম, এই আল বদরের বাচ্চারা, এখনও কিন্তু ফজলুর রহমান জীবিত আছে। মুক্তিযুদ্ধ হইছে, মুক্তিযুদ্ধই সত্য। ৩০ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছে, এটাও সত্য। আমরা সেদিন তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলাম।
ফজলুর রহমান বলেন, অনেক চক্রান্তের মধ্য দিয়ে ইলেকশন হইছে। সেই ইলেকশনে তারা কী করেছে? আজকে যারা আমার ডান দিকে (বিরোধী দল) বসে আছে, তারা কী করেছে? তারা যা করেছে, সেটা কল্পনা করার মতো না। সেই চক্রান্তের ভেতর দিয়ে যখন তারা প্রচার করতে শুরু করল, দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পেয়ে তারা পাস করবে। আমি ফজলুর রহমান বলেছিলাম, জামায়াত জোট যদি দুই-তৃতীয়াংশ পায়, তাহলে আমি বিষ খাব। তারা কখনও যুদ্ধে জয়লাভ করতে পারে না, রাজনৈতিক যুদ্ধে। তাদের পূর্বপুরুষ বাংলাদেশ চায়নি। যতদিন রয়েল বেঙ্গল টাইগার বেঁচে থাকবে, ততদিন রাজাকার এদেশে কখনও জয়লাভ করতে পারবে না।
এ সময় বিরোধী দলের সদস্যরা হইচই শুরু করলে ফজলুর রহমান স্পিকারের কাছে আরও পাঁচ মিনিট সময় চান। স্পিকার ৩ মিনিট সময় বাড়িয়ে দেন। ফজলুর রহমান বলেন, আমার বক্তব্যের পরে বলবে, আমরা কি মুক্তিযুদ্ধ করি নাই? যেমন বিরোধী দলের নেতা বলেন, উনাকে আমি অসম্মান করি না, সব সময় মাননীয় বলে কথা বলি। কিন্তু উনার দলের লোকজন এখানে বসে আছে, তারা আমাকে ‘ফজা পাগলা’ বলে কথা বলে। তারা নাকি সভ্য, তারা ইসলাম... ।’
এ সময় অধিবেশন কক্ষের সবাই হেসে ওঠেন। এক পর্যায়ে স্পিকার বলেন, আপনাকে কেউ ‘ফজা পাগলা’ এই ধরনের উক্তি করেছে? এ রকম সংসদে কেউ বলে নাই তো। আপনি কেন নিজের...।
সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান বলেন, আমি যে কথাটা বলতে চেয়েছিলাম, বিরোধী দলের নেতা বলেছেন, উনি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক এবং উনি শহীদ পরিবারের লোক এবং উনি জামায়াতে ইসলাম করেন। এটা ডাবল অপরাধ। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক কেউ জামায়াত করতে পারে না।
এ সময় ব্যাপক হইচই শুরু করেন বিরোধী দলের সদস্যরা। স্পিকার তখন সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষা করতে সবাইর প্রতি আহ্বান জানান।
এ বক্তব্যের পর বিরোধী দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে একযোগে হইচই ও প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। এ পর্যায়ে ফজলুর রহমান বক্তব্য চালিয়ে যেতে চাইলে বিরোধী দলের সদস্যরা তাদের কণ্ঠ আরও চড়া করে হট্টগোল সৃষ্টি করেন। এ সময় ফজলুর রহমান বলেন, আমি ওনাদের কিন্তু খারাপ কিছু বলিনি। তখন স্পিকার ফজলুর রহমানকে বসার এবং একটু অপেক্ষা করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি বিরোধী দলের সদস্যদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। ফজলুর রহমানের বক্তব্যের সময় জামায়াত এবং তাদের মোর্চার শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিসের এমপিদের দাঁড়িয়ে হইচই করতে দেখা যায়। সরকারি দলের সদস্যরাও পাল্টা হইচই করেন।
এ সময় এনসিপির সংসদ সদস্য আবুল হাসনাত (হাসনাত আবদুল্লাহ), আব্দুল্লাহ আল আমিন, আতিকুর রহমান মোজাহিদ নিজ আসনে বসে ছিলেন। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ নিজ আসন থেকে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রণ আনার চেষ্টা করেন। পরে তিনিও বসে পড়েন। এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা, জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান দাঁড়িয়ে কিছু বলতে চাইলে স্পিকার তাকে বলেন, মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা বসুন। আমি বললে তারপর আপনি বলুন। পরে স্পিকার ফজলুর রহমানকে তিন মিনিট সময়ের মধ্যে বক্তব্য শেষ করার অনুরোধ করেন। তবে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা হইচই করতে থাকে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ কাউকে নিবৃত্ত করতে পারছিলেন না। এক পর্যায়ে তিনি দাঁড়িয়ে যান। পরিস্থিতি শান্ত হলে স্পিকার বলেন, ‘মাননীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ, সারা জাতি দেখছে। লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে। সবাই আপনারা নির্বাচিত সদস্য, এখানে সবাই জনগণের ভোটে নির্বাচিত। আমি প্রতিদিনই বলি যে রুলস অব প্রসিডিউর বইটা একটু পড়েন। সংসদ যদি বিধি মোতাবেক না চলে, তাহলে এই সংসদ আর থাকবে না। সদস্যদের কর্মকাণ্ডে শিশুরাও লজ্জা পাবে। স্পিকার বলেন, যারা অলরেডি দাদা হয়ে গিয়েছেন, তাদের নাতিরা হয়তো এখানে গ্যালারিতে বসে দেখছে। তারা কী ভাববে এটা সম্পর্কে? সরকারি দলের কোনো সদস্যের বক্তব্যে আপত্তি থাকলে পরবর্তী সময়ে বক্তব্যের মাধ্যমে যুক্তি খণ্ডনের পরামর্শ দেন তিনি। স্পিকার বলেন, সংসদের স্পিকার যখন দাঁড়ায়, তখন এটি অবশ্যই কর্তব্য, সবাই এখানে বসে পড়বেন। আমাকে তো আপনারাই স্পিকার বানিয়েছেন। সংসদের অভিভাবকের প্রতি যদি সম্মান আপনাদের না থাকে, তাহলে জাতীয় সংসদের প্রতি মানুষের কোনো রেসপেক্ট থাকবে না।
ফজলুর রহমানের বক্তব্যের পর বিরোধী দলের সদস্যদের সুযোগ দেবেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রয়োজন হলে টাইম বাড়িয়ে দেব। তার যুক্তি খণ্ডন করুন। তিনি যদি অসংসদীয় কোনো কথা বলে থাকেন, সেটা আমরা পরীক্ষা করে এক্সপাঞ্জ করে দেব। কিন্তু বক্তব্যের সময় তাকে ডিস্টার্ব করবেন না।
এরপর আবার বক্তব্য দেন ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পালন করা হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। সেই মুনীর চৌধুরী, আব্দুল আলীম চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সার থেকে ধরে শত শত বুদ্ধিজীবীকে যারা হত্যা করেছিল, তাদের বলা হয় আল বদর। সেই আল বদর বাহিনী কারা ছিল আপনারা জানেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, প্রথম দিন কিন্তু এইখানে (সংসদে) কোনো বাতি ছিল না, আমি কিছু শুনতে পারিনি। এই হাউসে প্রস্তাব হইছে তাদের ব্যাপারেও। তাদের ব্যাপারেও শোকপ্রস্তাব হইছে, আমি একা হইলেও এর প্রতিবাদ করতাম। কিন্তু যেহেতু আমার দল এটা করছে, আমি চুপ কইরা ছিলাম। কথাটা খুব ক্লিয়ার। কিন্তু এই সংসদ সম্পর্কে আজকে না হলেও কালকে, কালকে না হলে পরশু, না হলে ইতিহাসে ভুল বার্তা যাবে, যদি আমরা যুদ্ধাপরাধের ব্যাপারে শোক প্রস্তাব করি।’
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় পুলিশ হত্যার বিচারের পক্ষেও মত দিয়ে বিএনপির এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘আমি মুক্তিযোদ্ধা কামান্ডার ছিলাম, ১৬ ডিসেম্বরের পরে শত শত রাজাকার আমার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। আমি কাউকে হত্যা করিনি, সবাইকে জেলে পাঠিয়ে দিয়েছি। ৫ আগস্টের পরে এত থানা লুট হয়েছে, পুলিশকে হত্যা করা হয়েছে, তখন তো পুলিশ যুদ্ধ করেনি, তারা তো নিরাপরাধ। এত অস্ত্র গেল কোথায়? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমার নেতা। ৫ আগস্টের পরে এত ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো কোনো আইনে দায়মুক্তি হওয়ার কথা না। পাঁচ আগস্টের পরে পুলিশ হত্যা হয়ে থাকে, থানা লুট হয়ে থাকে, সেটার জন্য তদন্ত হওয়া উচিত, দোষীদের বিচার হওয়া উচিত।’
বক্তব্যের শেষ দিকে এসে জ্বালানি সংকট নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে বিশেষ কমিটি গঠন প্রসঙ্গে ফজলুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী মহান কাজ করেছেন। ৭৮ জনকে ২২২ জনের সমান সমান ভাগ দিয়ে কমিটি করেছেন। সিরাজউদৌলা ও মোহাম্মদী বেগ কিন্তু এক না। মোহাম্মদী বেগ কিন্তু সিরাজউদৌলাকে হত্যা করেছে।
ফজলুর রহমানের বক্তব্যের পর বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, তিনি মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান সবকিছু বলেছেন। কিন্তু নিজের অবদান বলতে গিয়ে আরেকজনের অবদানের ওপরে হাতুড়ি পেটানোর অধিকার কাউকে দেওয়া হয়নি। তিনি পার্সোনালি আমাকে হার্ট করেছেন। তিনি বলেছেন যে, আমি বলে থাকি আমি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য। বলেই তিনি এটাকে চ্যালেঞ্জ করছেন। দুই নম্বর উনি বলেছেন, কোনো মুক্তিযোদ্ধা কিংবা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ জামায়াতে ইসলামী করতে পারে না। তাহলে উনাকে জিজ্ঞেস করা লাগবে? আমি এটার তীব্র নিন্দা জানাই।
জামায়াত আমির বলেন, আমার আইডেন্টিটি নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে, এটা গুরুতর অপরাধ। আবার আমার আদর্শ সিলেকশনের ব্যাপারে উনি কথা বলেছেন, এটা বাড়তি অপরাধ করেছেন। ফজলুর রহমানের বক্তব্যের অসংসদীয় অংশ এক্সপাঞ্জ বা সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানান বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, এই সংসদকে ফাংশনাল করার জন্য বর্তমান জ্বালানি অব্যবস্থাপনা সংকট যেটাই বলি, সেই ক্ষেত্রে আমরা এগিয়ে এসেছিলাম, কথা বলেছি, আলোচনা হয়েছে এবং পরের দিন এসে প্রধানমন্ত্রী একটা প্রস্তাব দিয়েছেন। আমরা সঙ্গে সঙ্গে এটা গ্রহণ করেছি। তিনি (ফজলুর রহমান) এইটাকে শেষ পর্যন্ত কনক্লুশন রাখলেন কী দিয়ে? যার মগজ যেরকম, তার কনক্লুশন সেরকম। তার মতো একজন প্রবীণ ব্যক্তির কাছ থেকে, রাজনীতিবিদের কাছ থেকে আমি এ ধরনের আচরণ আশা করি না। পরে ফজলুর রহমান আবার বক্তব্য দিতে চাইলে স্পিকার তাকে ফ্লোর না দিয়ে বলেন, এখন আর তো না বললেও চলে। আমরা সংসদ উত্তপ্ত হোক এরকম চাই না। স্পিকার আরও বলেন, ফজলুর রহমানের বক্তব্যে যদি অসংসদীয় কোনো কিছু থাকে, সেটা এক্সপাঞ্জ করা হবে। বিরোধী দলের নেতার বক্তব্যেও যদি অসংসদীয় কিছু থাকে, সেটিও এক্সপাঞ্জ করা হবে।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ভিত্তিতে জাতিকে আর বিভক্ত না করি
পরে ফ্লোর নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মুক্তিযুদ্ধ ইস্যু নিয়ে বিভক্তি সৃষ্টি না করার অনুরোধ জানান। সংসদ সদস্য ফজলুর রহমানের বক্তব্যের জের ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমাদের সংসদ সদস্য অত্যন্ত বয়স্ক এবং ইতিহাসে সমৃদ্ধ কিন্তু আমরা এখন ভূগোলে আছি, আমরা বেশি ইতিহাস চর্চা করতে গেলে মাঝেমধ্যে কিছু ব্যত্যয় হবে। আর আপনি স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন বটবৃক্ষ তিনিও একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার মাঝেমধ্যে শুনতে ভালো লাগে যখন বিরোধী নেতা বলেন যে, তিনি শহীদ পরিবারের সন্তান। আমরা এটাকে ধারণ করি। কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা বিরোধী দলে আছে আপনি নিজেই স্বীকৃতি দিয়েছেন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা আছে। নতুন করে আমার মনে হয় যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ভিত্তিতে জাতিকে আর বিভক্ত না করি।
এরপর রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে জামায়াতের সংসদ সদস্য শাজাহান চৌধুরী বলেন, আজকে কথা উঠেছে মুক্তিযোদ্ধা সম্পর্কে, স্বাধীনতার ইতিহাস সম্পর্কে। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে স্পষ্ট বক্তব্য দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই এই মহান সংসদে মেহেরবানি করে, দয়া করে অতীতের ইতিহাস নিয়ে বর্তমান এই জামায়াত ইসলামীকে বিশ্লেষণ করে দোষারোপ করার চেষ্টা করা আমার মনে হয় মোটেই ঠিক হবে না।
মুক্তিযুদ্ধকে রিপ্লেস করা যায় না
এরপর রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শ্যামা ওবায়েদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধ একদিকে আর সবকিছু আরেকদিকে। মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধই। মুক্তিযুদ্ধকে রিপ্লেস করা যায় না। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, শুধু বট বাহিনী দিয়ে স্ট্যাটাস দিয়ে মানুষকে ছোট করে আজেবাজে কথা বলে ভাইরাল হয়ে রাজনীতি হয় না। যদি ৭১ সালে ফেসবুক থাকত, সোশ্যাল মিডিয়া থাকত তাহলে হয়তো দেশ স্বাধীন হতো নাকি আমরা জানি না।
এরপর বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান ও তার জোটের রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করেন ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। তিনি একে ‘দ্বিমুখী আচরণ’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, জিয়া পরিবারকে নিয়ে কটূক্তি করা কিংবা রাজপথে আন্দোলনের ডাক দিয়ে আবার সংসদে ভিন্ন সুরে কথা বলা রাজনৈতিক ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছু নয়। ব্যারিস্টার পার্থের এমন তীব্র আক্রমণের মুখে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান প্রতিবাদ জানান। তিনি পার্থের বক্তব্যের তথ্যের উৎস এবং রেফারেন্স নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। শফিকুর রহমান স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, এই ফ্লোরে দাঁড়িয়ে যখন কোনো ডকুমেন্ট হাতে নিয়ে আমরা কোনো রেফারেন্স দেব, তা শুড বি ক্লিয়ার অ্যান্ড এপ্রোপ্রিয়েট। কনফিউজিং ওয়েতে রেফারেন্স প্রেজেন্ট করলে প্রবলেম ক্রিয়েট হয়। তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, আমি এই ধরনের রেকলেস কথা কারও নামেই বলি না। ব্যারিস্টার পার্থ সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য এবং সংসদকে উত্তপ্ত করার উদ্দেশ্যেই তার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ আনছেন বলে দাবি জানান। সংসদ অধিবেশনের এই উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের সময় স্পিকার উভয় পক্ষকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানান। পরে ব্যারিস্টার পার্থ নিজের অবস্থানে অনড় থেকে বলেন, আমি ডকুমেন্ট নিয়েই কথা বলছি। জামায়াতের ইসলামী নিয়ে বললে সারাদিন বলা যাবে। এরপর সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক তার বক্তব্যে অতীত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং বিভিন্ন সরকারের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা করেন।
মুক্তিযুদ্ধ-জামায়াত নিয়ে বক্তব্যে সংসদে উত্তেজনা
মুক্তিযুদ্ধ-জামায়াত নিয়ে বক্তব্যে সংসদে উত্তেজনা
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে দেওয়া বক্তব্যকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে উত্তেজনা ও হট্টগোল সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপির সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের এক বক্তব্যে উত্তেজনা ছড়ালে সংসদের কার্যক্রম প্রায় ১০ মিনিট অচল ছিল। এ সময় রুলিং দিয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। সংসদ সদস্যদের সতর্ক করে তিনি বলেন, সামান্য কারণে উত্তেজনা সৃষ্টি করা ঠিক নয়, এতে জাতীয় সংসদের প্রতি মানুষের সম্মান থাকবে না। পরবর্তী সময়ে জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা সংসদ সদস্য ফজলুর রহমানের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান। এরপর সরকারি দল, বিরোধী দল ও বিজেপির সংসদ সদস্য এ প্রসঙ্গে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য রাখেন।গতকাল মঙ্গলবার বিকালে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। রাষ্ট্রপতির ভাষণে ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখেন সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, কোনো মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ জামায়াতে ইসলামী করতে পারে না, কোনো শহীদ পরিবারের কেউ জামায়াত করতেই পারে না, করলে এটা ডাবল অপরাধ। ফজলুর রহমানের এই বক্তব্য ঘিরে দেখা দেয় উত্তেজনা। বিরোধী দলের সদস্যরা হইচই শুরু করলে সরকারি দলের সদস্যরাও প্রতিবাদ জানান।মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জুলাই অভ্যুত্থানের তুলনার বিরোধিতা করে ফজলুর রহমান বলেন, আমি বলব, এই কথাটা বলাই অন্যায়। কারণ মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ৫ আগস্টের তুলনা করামানে প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে কুয়ার তুলনা করা। তিনি বিরোধী দলের উদ্দেশে বলেন, তারা বলেছিল, কোনো মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। সেইদিন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি বলেছিলাম, এই আল বদরের বাচ্চারা, এখনও কিন্তু ফজলুর রহমান জীবিত আছে। মুক্তিযুদ্ধ হইছে, মুক্তিযুদ্ধই সত্য। ৩০ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছে, এটাও সত্য। আমরা সেদিন তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলাম।ফজলুর রহমান বলেন, অনেক চক্রান্তের মধ্য দিয়ে ইলেকশন হইছে। সেই ইলেকশনে তারা কী করেছে? আজকে যারা আমার ডান দিকে (বিরোধী দল) বসে আছে, তারা কী করেছে? তারা যা করেছে, সেটা কল্পনা করার মতো না। সেই চক্রান্তের ভেতর দিয়ে যখন তারা প্রচার করতে শুরু করল, দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পেয়ে তারা পাস করবে। আমি ফজলুর রহমান বলেছিলাম, জামায়াত জোট যদি দুই-তৃতীয়াংশ পায়, তাহলে আমি বিষ খাব। তারা কখনও যুদ্ধে জয়লাভ করতে পারে না, রাজনৈতিক যুদ্ধে। তাদের পূর্বপুরুষ বাংলাদেশ চায়নি। যতদিন রয়েল বেঙ্গল টাইগার বেঁচে থাকবে, ততদিন রাজাকার এদেশে কখনও জয়লাভ করতে পারবে না।এ সময় বিরোধী দলের সদস্যরা হইচই শুরু করলে ফজলুর রহমান স্পিকারের কাছে আরও পাঁচ মিনিট সময় চান। স্পিকার ৩ মিনিট সময় বাড়িয়ে দেন। ফজলুর রহমান বলেন, আমার বক্তব্যের পরে বলবে, আমরা কি মুক্তিযুদ্ধ করি নাই? যেমন বিরোধী দলের নেতা বলেন, উনাকে আমি অসম্মান করি না, সব সময় মাননীয় বলে কথা বলি। কিন্তু উনার দলের লোকজন এখানে বসে আছে, তারা আমাকে ‘ফজা পাগলা’ বলে কথা বলে। তারা নাকি সভ্য, তারা ইসলাম... ।’এ সময় অধিবেশন কক্ষের সবাই হেসে ওঠেন। এক পর্যায়ে স্পিকার বলেন, আপনাকে কেউ ‘ফজা পাগলা’ এই ধরনের উক্তি করেছে? এ রকম সংসদে কেউ বলে নাই তো। আপনি কেন নিজের...।সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান বলেন, আমি যে কথাটা বলতে চেয়েছিলাম, বিরোধী দলের নেতা বলেছেন, উনি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক এবং উনি শহীদ পরিবারের লোক এবং উনি জামায়াতে ইসলাম করেন। এটা ডাবল অপরাধ। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক কেউ জামায়াত করতে পারে না।এ সময় ব্যাপক হইচই শুরু করেন বিরোধী দলের সদস্যরা। স্পিকার তখন সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষা করতে সবাইর প্রতি আহ্বান জানান।এ বক্তব্যের পর বিরোধী দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে একযোগে হইচই ও প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। এ পর্যায়ে ফজলুর রহমান বক্তব্য চালিয়ে যেতে চাইলে বিরোধী দলের সদস্যরা তাদের কণ্ঠ আরও চড়া করে হট্টগোল সৃষ্টি করেন। এ সময় ফজলুর রহমান বলেন, আমি ওনাদের কিন্তু খারাপ কিছু বলিনি। তখন স্পিকার ফজলুর রহমানকে বসার এবং একটু অপেক্ষা করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি বিরোধী দলের সদস্যদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। ফজলুর রহমানের বক্তব্যের সময় জামায়াত এবং তাদের মোর্চার শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিসের এমপিদের দাঁড়িয়ে হইচই করতে দেখা যায়। সরকারি দলের সদস্যরাও পাল্টা হইচই করেন।এ সময় এনসিপির সংসদ সদস্য আবুল হাসনাত (হাসনাত আবদুল্লাহ), আব্দুল্লাহ আল আমিন, আতিকুর রহমান মোজাহিদ নিজ আসনে বসে ছিলেন। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্পিকার
হাফিজ উদ্দিন আহমদ নিজ আসন থেকে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রণ আনার চেষ্টা করেন। পরে তিনিও বসে পড়েন। এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা, জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান দাঁড়িয়ে কিছু বলতে চাইলে স্পিকার তাকে বলেন, মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা বসুন। আমি বললে তারপর আপনি বলুন। পরে স্পিকার ফজলুর রহমানকে তিন মিনিট সময়ের মধ্যে বক্তব্য শেষ করার অনুরোধ করেন। তবে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা হইচই করতে থাকে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ কাউকে নিবৃত্ত করতে পারছিলেন না। এক পর্যায়ে তিনি দাঁড়িয়ে যান। পরিস্থিতি শান্ত হলে স্পিকার বলেন, ‘মাননীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ, সারা জাতি দেখছে। লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে। সবাই আপনারা নির্বাচিত সদস্য, এখানে সবাই জনগণের ভোটে নির্বাচিত। আমি প্রতিদিনই বলি যে রুলস অব প্রসিডিউর বইটা একটু পড়েন। সংসদ যদি বিধি মোতাবেক না চলে, তাহলে এই সংসদ আর থাকবে না। সদস্যদের কর্মকাণ্ডে শিশুরাও লজ্জা পাবে। স্পিকার বলেন, যারা অলরেডি দাদা হয়ে গিয়েছেন, তাদের নাতিরা হয়তো এখানে গ্যালারিতে বসে দেখছে। তারা কী ভাববে এটা সম্পর্কে? সরকারি দলের কোনো সদস্যের বক্তব্যে আপত্তি থাকলে পরবর্তী সময়ে বক্তব্যের মাধ্যমে যুক্তি খণ্ডনের পরামর্শ দেন তিনি। স্পিকার বলেন, সংসদের স্পিকার যখন দাঁড়ায়, তখন এটি অবশ্যই কর্তব্য, সবাই এখানে বসে পড়বেন। আমাকে তো আপনারাই স্পিকার বানিয়েছেন। সংসদের অভিভাবকের প্রতি যদি সম্মান আপনাদের না থাকে, তাহলে জাতীয় সংসদের প্রতি মানুষের কোনো রেসপেক্ট থাকবে না।ফজলুর রহমানের বক্তব্যের পর বিরোধী দলের সদস্যদের সুযোগ দেবেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রয়োজন হলে টাইম বাড়িয়ে দেব। তার যুক্তি খণ্ডন করুন। তিনি যদি অসংসদীয় কোনো কথা বলে থাকেন, সেটা আমরা পরীক্ষা করে এক্সপাঞ্জ করে দেব। কিন্তু বক্তব্যের সময় তাকে ডিস্টার্ব করবেন না।এরপর আবার বক্তব্য দেন ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পালন করা হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। সেই মুনীর চৌধুরী, আব্দুল আলীম চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সার থেকে ধরে শত শত বুদ্ধিজীবীকে যারা হত্যা করেছিল, তাদের বলা হয় আল বদর। সেই আল বদর বাহিনী কারা ছিল আপনারা জানেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, প্রথম দিন কিন্তু এইখানে (সংসদে) কোনো বাতি ছিল না, আমি কিছু শুনতে পারিনি। এই হাউসে প্রস্তাব হইছে তাদের ব্যাপারেও। তাদের ব্যাপারেও শোকপ্রস্তাব হইছে, আমি একা হইলেও এর প্রতিবাদ করতাম। কিন্তু যেহেতু আমার দল এটা করছে, আমি চুপ কইরা ছিলাম। কথাটা খুব ক্লিয়ার। কিন্তু এই সংসদ সম্পর্কে আজকে না হলেও কালকে, কালকে না হলে পরশু, না হলে ইতিহাসে ভুল বার্তা যাবে, যদি আমরা যুদ্ধাপরাধের ব্যাপারে শোক প্রস্তাব করি।’জুলাই অভ্যুত্থানের সময় পুলিশ হত্যার বিচারের পক্ষেও মত দিয়ে বিএনপির এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘আমি মুক্তিযোদ্ধা কামান্ডার ছিলাম, ১৬ ডিসেম্বরের পরে শত শত রাজাকার আমার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। আমি কাউকে হত্যা করিনি, সবাইকে জেলে পাঠিয়ে দিয়েছি। ৫ আগস্টের পরে এত থানা লুট হয়েছে, পুলিশকে হত্যা করা হয়েছে, তখন তো পুলিশ যুদ্ধ করেনি, তারা তো নিরাপরাধ। এত অস্ত্র গেল কোথায়? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমার নেতা। ৫ আগস্টের পরে এত ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো কোনো আইনে দায়মুক্তি হওয়ার কথা না। পাঁচ আগস্টের পরে পুলিশ হত্যা হয়ে থাকে, থানা লুট হয়ে থাকে, সেটার জন্য তদন্ত হওয়া উচিত, দোষীদের বিচার হওয়া উচিত।’বক্তব্যের শেষ দিকে এসে জ্বালানি সংকট নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে বিশেষ কমিটি গঠন প্রসঙ্গে ফজলুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী মহান কাজ করেছেন। ৭৮ জনকে ২২২ জনের সমান সমান ভাগ দিয়ে কমিটি করেছেন। সিরাজউদৌলা ও মোহাম্মদী বেগ কিন্তু এক না। মোহাম্মদী বেগ কিন্তু সিরাজউদৌলাকে হত্যা করেছে।ফজলুর রহমানের বক্তব্যের পর বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, তিনি মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান সবকিছু বলেছেন। কিন্তু নিজের অবদান বলতে গিয়ে আরেকজনের অবদানের ওপরে হাতুড়ি পেটানোর অধিকার কাউকে দেওয়া হয়নি। তিনি পার্সোনালি আমাকে হার্ট করেছেন। তিনি বলেছেন যে, আমি বলে থাকি আমি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য। বলেই তিনি এটাকে চ্যালেঞ্জ করছেন। দুই নম্বর উনি বলেছেন, কোনো মুক্তিযোদ্ধা কিংবা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ জামায়াতে ইসলামী করতে পারে না। তাহলে উনাকে জিজ্ঞেস করা লাগবে? আমি এটার তীব্র নিন্দা জানাই।জামায়াত আমির বলেন, আমার আইডেন্টিটি নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে, এটা গুরুতর অপরাধ। আবার আমার আদর্শ সিলেকশনের ব্যাপারে উনি কথা বলেছেন, এটা বাড়তি অপরাধ করেছেন। ফজলুর রহমানের বক্তব্যের
অসংসদীয় অংশ এক্সপাঞ্জ বা সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানান বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, এই সংসদকে ফাংশনাল করার জন্য বর্তমান জ্বালানি অব্যবস্থাপনা সংকট যেটাই বলি, সেই ক্ষেত্রে আমরা এগিয়ে এসেছিলাম, কথা বলেছি, আলোচনা হয়েছে এবং পরের দিন এসে প্রধানমন্ত্রী একটা প্রস্তাব দিয়েছেন। আমরা সঙ্গে সঙ্গে এটা গ্রহণ করেছি। তিনি (ফজলুর রহমান) এইটাকে শেষ পর্যন্ত কনক্লুশন রাখলেন কী দিয়ে? যার মগজ যেরকম, তার কনক্লুশন সেরকম। তার মতো একজন প্রবীণ ব্যক্তির কাছ থেকে, রাজনীতিবিদের কাছ থেকে আমি এ ধরনের আচরণ আশা করি না। পরে ফজলুর রহমান আবার বক্তব্য দিতে চাইলে স্পিকার তাকে ফ্লোর না দিয়ে বলেন, এখন আর তো না বললেও চলে। আমরা সংসদ উত্তপ্ত হোক এরকম চাই না। স্পিকার আরও বলেন, ফজলুর রহমানের বক্তব্যে যদি অসংসদীয় কোনো কিছু থাকে, সেটা এক্সপাঞ্জ করা হবে। বিরোধী দলের নেতার বক্তব্যেও যদি অসংসদীয় কিছু থাকে, সেটিও এক্সপাঞ্জ করা হবে।মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ভিত্তিতে জাতিকে আর বিভক্ত না করিপরে ফ্লোর নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মুক্তিযুদ্ধ ইস্যু নিয়ে বিভক্তি সৃষ্টি না করার অনুরোধ জানান। সংসদ সদস্য ফজলুর রহমানের বক্তব্যের জের ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমাদের সংসদ সদস্য অত্যন্ত বয়স্ক এবং ইতিহাসে সমৃদ্ধ কিন্তু আমরা এখন ভূগোলে আছি, আমরা বেশি ইতিহাস চর্চা করতে গেলে মাঝেমধ্যে কিছু ব্যত্যয় হবে। আর আপনি স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন বটবৃক্ষ তিনিও একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার মাঝেমধ্যে শুনতে ভালো লাগে যখন বিরোধী নেতা বলেন যে, তিনি শহীদ পরিবারের সন্তান। আমরা এটাকে ধারণ করি। কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা বিরোধী দলে আছে আপনি নিজেই স্বীকৃতি দিয়েছেন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা আছে। নতুন করে আমার মনে হয় যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ভিত্তিতে জাতিকে আর বিভক্ত না করি।এরপর রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে জামায়াতের সংসদ সদস্য শাজাহান চৌধুরী বলেন, আজকে কথা উঠেছে মুক্তিযোদ্ধা সম্পর্কে, স্বাধীনতার ইতিহাস সম্পর্কে। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে স্পষ্ট বক্তব্য দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই এই মহান সংসদে মেহেরবানি করে, দয়া করে অতীতের ইতিহাস নিয়ে বর্তমান এই জামায়াত ইসলামীকে বিশ্লেষণ করে দোষারোপ করার চেষ্টা করা আমার মনে হয় মোটেই ঠিক হবে না।মুক্তিযুদ্ধকে রিপ্লেস করা যায় নাএরপর রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শ্যামা ওবায়েদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধ একদিকে আর সবকিছু আরেকদিকে। মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধই। মুক্তিযুদ্ধকে রিপ্লেস করা যায় না। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, শুধু বট বাহিনী দিয়ে স্ট্যাটাস দিয়ে মানুষকে ছোট করে আজেবাজে কথা বলে ভাইরাল হয়ে রাজনীতি হয় না। যদি ৭১ সালে ফেসবুক থাকত, সোশ্যাল মিডিয়া থাকত তাহলে হয়তো দেশ স্বাধীন হতো নাকি আমরা জানি না।এরপর বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান ও তার জোটের রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করেন ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। তিনি একে ‘দ্বিমুখী আচরণ’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, জিয়া পরিবারকে নিয়ে কটূক্তি করা কিংবা রাজপথে আন্দোলনের ডাক দিয়ে আবার সংসদে ভিন্ন সুরে কথা বলা রাজনৈতিক ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছু নয়। ব্যারিস্টার পার্থের এমন তীব্র আক্রমণের মুখে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান প্রতিবাদ জানান। তিনি পার্থের বক্তব্যের তথ্যের উৎস এবং রেফারেন্স নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। শফিকুর রহমান স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, এই ফ্লোরে দাঁড়িয়ে যখন কোনো ডকুমেন্ট হাতে নিয়ে আমরা কোনো রেফারেন্স দেব, তা শুড বি ক্লিয়ার অ্যান্ড এপ্রোপ্রিয়েট। কনফিউজিং ওয়েতে রেফারেন্স প্রেজেন্ট করলে প্রবলেম ক্রিয়েট হয়। তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, আমি এই ধরনের রেকলেস কথা কারও নামেই বলি না। ব্যারিস্টার পার্থ সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য এবং সংসদকে উত্তপ্ত করার উদ্দেশ্যেই তার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ আনছেন বলে দাবি জানান। সংসদ অধিবেশনের এই উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের সময় স্পিকার উভয় পক্ষকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানান। পরে ব্যারিস্টার পার্থ নিজের অবস্থানে অনড় থেকে বলেন, আমি ডকুমেন্ট নিয়েই কথা বলছি। জামায়াতের ইসলামী নিয়ে বললে সারাদিন বলা যাবে। এরপর সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক তার বক্তব্যে অতীত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং বিভিন্ন সরকারের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা করেন।
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
১৫২/২, এ-২ গ্রীন রোড, রওশন টাওয়ার (লিফটের-৫),
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ । মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত