সৈয়দ হোসেন মোহাম্মদ নূর আলী :
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে কৃতি সন্তানদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, অলি আহাদ তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না; বরং ছিলেন ভাষা আন্দোলনের বীর সেনানী, মুক্তিযুদ্ধের দক্ষ সংগঠক এবং আজীবন গণতন্ত্রকামী এক নির্ভীক কণ্ঠস্বর। নীতির প্রশ্নে আপসহীন এই নেতার জীবনসংগ্রাম ও আদর্শ আজও জাতির হৃদয়ে অম্লান।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে কৃতি সন্তানদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, অলি আহাদ তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না; বরং ছিলেন ভাষা আন্দোলনের বীর সেনানী, মুক্তিযুদ্ধের দক্ষ সংগঠক এবং আজীবন গণতন্ত্রকামী এক নির্ভীক কণ্ঠস্বর। নীতির প্রশ্নে আপসহীন এই নেতার জীবনসংগ্রাম ও আদর্শ আজও জাতির হৃদয়ে অম্লান।
অলি আহাদ ১৯২৮ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আবদুল ওহাব ছিলেন একজন শিক্ষিত ও বিদগ্ধ ব্যক্তিত্ব। শৈশব থেকেই অলি আহাদের মেধা ও রাজনৈতিক সচেতনতা ছিল প্রখর। ঢাকা কলেজে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তবে ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার অপরাধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে বহিষ্কার করে। দীর্ঘ ৫৮ বছর পর, ২০০৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের সেই ঐতিহাসিক ভুল সংশোধন করে তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেয়।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত 'পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ'-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি যখন ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন তিনি ছিলেন সামনের সারিতে। এই আন্দোলনের অপরাধে তাকে কারাবরণ করতে হয়। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় তার সেই ত্যাগ আজও চিরস্মরণীয়।
অলি আহাদের রাজনৈতিক জীবন ছিল বর্ণাঢ্য ও বৈচিত্র্যময়। তিনি শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো কিংবদন্তি নেতাদের সান্নিধ্যে রাজনীতি করেছেন। ১৯৫৭ সালের ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে তিনি মাওলানা ভাসানীর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থানের পক্ষ নেন। তিনি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তবে আদর্শিক কারণে পরবর্তীতে নিজস্ব রাজনৈতিক পথ বেছে নেন। তিনি 'ডেমোক্রেটিক লীগ' প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের অন্তর্ভুক্ত হয়।
সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে অলি আহাদের লড়াই ছিল আপসহীন। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তিনি একাধিকবার কারাবরণ করেন এবং তার সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকাটি নিষিদ্ধ করা হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের জন্য তার রচিত ‘জাতীয় রাজনীতি: ১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫’ গ্রন্থটি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তাকে সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ প্রদান করা হয়।
তার সুযোগ্য কন্যা ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বর্তমানে বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করছেন। রুমিন ফারহানা তার বাবার সংগ্রাম প্রসঙ্গে একবার বলেছিলেন, “আমি বাবার একমাত্র সন্তান। যেদিন তাকে হারিয়েছি, মনে হয়েছে পুরো পৃথিবীটাই হারিয়ে ফেলেছি।” বাবার সেই অটল শক্তি ও আদর্শকেই তিনি নিজের রাজনৈতিক জীবনের পাথেয় করেছেন।
২০১২ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার শমরিতা হাসপাতালে এই মহান নেতা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার স্ত্রী প্রফেসর রশিদা বেগম এবং কন্যা রুমিন ফারহানাকে রেখে গেলেও, তার রেখে যাওয়া আদর্শ আজও বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের অনুপ্রেরণা।