শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
শিক্ষা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কারিকুলাম উন্নয়নে বাড়াতে হবে অর্থায়ন

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কারিকুলাম উন্নয়নে বাড়াতে হবে অর্থায়ন

দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে নতুন জ্ঞান, দক্ষতা ও প্রযুক্তির সাথে নিজেকে ক্রমাগত অভিযোজিত করতে হয়। একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ-এর জন্য এটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে জ্ঞানচর্চা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সামাজিক অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে আসছে। তবে একটি বড় সমস্যা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে—নতুন বিষয় চালুর জন্য কারিকুলাম উন্নয়নে পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব।

বাংলাদেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও ঐতিহ্যবাহী বিষয় যেমন চিকিৎসা, প্রকৌশল, ব্যবসা শিক্ষা ও মানবিক শাখার উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। যদিও এসব বিষয়ের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডাটা সায়েন্স, ডিজিটাল স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, জনস্বাস্থ্য প্রযুক্তি এবং আন্তঃবিভাগীয় বিজ্ঞানভিত্তিক বিষয়ের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব নতুন বিষয় চালু করতে হলে শুধু পাঠ্যসূচি তৈরি করলেই হয় না; প্রয়োজন আধুনিক ল্যাব, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শিল্পখাতের সাথে সমন্বয়—যা সবই অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল।

কারিকুলাম উন্নয়ন একটি জটিল ও বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া। এটি শুধু সিলেবাস তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর মধ্যে রয়েছে চাহিদা নিরূপণ, বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নিয়মিত মূল্যায়ন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাজেটের বড় অংশ প্রশাসনিক খরচ ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হয়, ফলে একাডেমিক উদ্ভাবনের জন্য বরাদ্দ খুবই সীমিত থাকে। এর ফলে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এখনও পুরনো ও অপ্রাসঙ্গিক পাঠ্যক্রমের ওপর নির্ভর করছে।

বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট আন্তঃবিভাগীয় বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও প্রকট। বাংলাদেশে এখনও বিপুলসংখ্যক মানুষ অদৃষ্টিজনিত চক্ষু সমস্যায় ভুগছে, যা সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা করলে প্রতিরোধ করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে অপটোমেট্রি, জনস্বাস্থ্য এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির সমন্বয়ে নতুন শিক্ষাক্রম চালু করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু এ ধরনের প্রোগ্রাম চালু করতে প্রয়োজন উন্নত কারিকুলাম, ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ সুবিধা, সিমুলেশন ল্যাব এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা—যা পর্যাপ্ত অর্থায়ন ছাড়া সম্ভব নয়।

শিক্ষক উন্নয়নও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন বিষয় পড়াতে হলে শিক্ষকদের সেই বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে হয় এবং আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষিত হতে হয়। কিন্তু অর্থের অভাবে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় তাদের শিক্ষকদের বিদেশে প্রশিক্ষণ বা গবেষণার সুযোগ দিতে পারে না। এর ফলে শিক্ষার মান প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে না।

এছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও একটি বড় সমস্যা। উন্নত দেশগুলোতে কারিকুলাম প্রণয়নে শিল্পখাতের চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, ফলে শিক্ষার্থীরা বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জন করতে পারে। বাংলাদেশে এই সংযোগ এখনও দুর্বল। পর্যাপ্ত অর্থায়ন থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিল্পপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সাথে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে পারত, যা কারিকুলাম উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।

কারিকুলাম উন্নয়নে বিনিয়োগ না করার ফলাফল সুদূরপ্রসারী। শিক্ষার্থীরা চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে বেকারত্ব বা আংশিক কর্মসংস্থানের মুখোমুখি হয়। অন্যদিকে, নিয়োগদাতারা দক্ষ কর্মী খুঁজে পেতে হিমশিম খায়। ফলে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে একটি বড় ফাঁক তৈরি হয়, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে।

এই সমস্যার সমাধানে সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চশিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করার পাশাপাশি কারিকুলাম উন্নয়নের জন্য আলাদা তহবিল গঠন করা জরুরি। প্রতিযোগিতামূলক গ্রান্টের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নতুন ও যুগোপযোগী বিষয় চালুর জন্য উৎসাহিত করা যেতে পারে। একইসাথে অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে কারিকুলাম উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং গবেষণার সুযোগ বাড়ানো সম্ভব। তবে এই সহযোগিতা গড়ে তুলতেও প্রাথমিক বিনিয়োগ প্রয়োজন।

ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করেও তুলনামূলক কম খরচে কারিকুলাম উন্নয়ন করা যেতে পারে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ওপেন এডুকেশনাল রিসোর্স এবং ভার্চুয়াল ল্যাব ব্যবহার করে শিক্ষার মান উন্নত করা সম্ভব। তবে এসব প্রযুক্তি কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হলেও প্রাথমিক অর্থায়ন ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।

এছাড়া, রাজধানীর বাইরে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আরও বেশি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। তাই আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করতে বিশেষ তহবিল গঠন করা উচিত, যাতে সব শিক্ষার্থী সমানভাবে আধুনিক শিক্ষার সুযোগ পায়।

সর্বোপরি, কারিকুলাম উন্নয়নে বিনিয়োগ কোনো ব্যয় নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগ। একটি দক্ষ, উদ্ভাবনী এবং প্রতিযোগিতামূলক জনশক্তি গড়ে তুলতে হলে আজই এই খাতে গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তার শিক্ষাব্যবস্থার উপর, আর সেই শিক্ষাব্যবস্থার মান নির্ভর করছে সময়োপযোগী ও উন্নত কারিকুলামের উপর।

এখনই সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার—কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে তার শ্রেণিকক্ষেই।

খুঁজুন