শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
পর্যটন প্রকৃতির অপার রহস্য নায়াগ্রা জলপ্রপাত

প্রকৃতির অপার রহস্য নায়াগ্রা জলপ্রপাত

আমেরিকায় থাকি আজ ষোলো বছর ধরে। এই দীর্ঘ সময়ে এ দেশের বিভিন্ন মনোরম ও আকর্ষণীয় স্থানে আমাদের বেড়ানো হয়েছে। তবুও মনের মধ্যে কোথাও যেন একটু খচখচ করত দূরে, অনেক দূরে কোথাও থেকে বেড়িয়ে আসার জন্য। আমাদের বাসস্থান পড়েছে মিশিগান স্টেটে, যেটা একেবারে প্রতিবেশী দেশ কানাডার বর্ডারের কাছাকাছি। আর শুনেছি কানাডায় নাকি অনেক সুন্দর পর্যটনস্থলসহ পৃথিবীর বিশ্ববিখ্যাত জলপ্রপাত ‘নায়াগ্রা’ অবস্থিত! যেটা দেখার জন্য প্রতিবছরই দেশ ও বিদেশের অগণিত লোক সেখানে ছুটে যায় এই নয়নাভিরাম নায়াগ্রা ফলসের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য। আর সেজন্যই একদিন আমি ও বড় আপু মিলে আমাদের ভাই সাদীকে বললাম যে, আমরাও কানাডার সেই বিখ্যাত নায়াগ্রা জলপ্রপাতে বেড়াতে যাব। এতে একদিকে যেমন বিখ্যাত এই জলপ্রপাত দেখা হবে, অপরদিকে নতুন আরেকটি দেশও ভ্রমণ করা হবে। যেমন ভাবা তেমনই কাজ। আমেরিকায় শনি ও রবি এ দুই দিন সরকারি অফ ডে। তাই সাদী শুধু শুক্রবারের জন্য কাজ থেকে অফ চেয়ে নিল।

যাওয়ার দিন

যখনই দিন ঠিকঠাক হয়ে গেল যে, শুক্রবার কানাডায় যাওয়া হচ্ছে। আমরা সবাই রওনা হলাম প্রতিবেশী দেশ কানাডার উদ্দেশে। সকাল দশটার দিকে আমরা বাড়ি থেকে রওনা দিয়ে দিই। গাড়িতে উঠেই সবাই প্রথমে যানবাহনে চড়ার দোয়াটা পড়ে নিলাম। আমেরিকা থেকে কিন্তু কানাডা আবার অতটা দূরেও নয়। দুই ঘণ্টা ড্রাইভ করেই পৌঁছে যাওয়া যায়। মিশিগান অঙ্গরাজ্য কানাডার বর্ডারের কাছাকাছি হওয়ার এই এক সুবিধা। প্লেন ছাড়া শুধু ড্রাইভ করেই অন্য দেশে যাওয়া যায়। নতুন অভিজ্ঞতা হবে, আনন্দ হবে আরও অনেক কিছু বলাবলি করে আমরা আমাদের রোমাঞ্চকর ভ্রমণ উপভোগ করতে লাগলাম। আমরা কানাডার অতি কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম। আর তখনই জোহরের নামাজের সময় হয়ে এলো। পুরুষরা কাছের একটি মসজিদে গিয়ে জুমার নামাজ আদায় করে এলেন। আর আমরা মহিলারা গাড়ির পাশে গাছের ছায়ায় চাদর বিছিয়ে নামাজটা আদায় করে নিলাম। এরপরই আবার গাড়ি স্টার্ট করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে গাড়ি আমেরিকা ও কানাডার মধ্যখানে যে বড় নদীটি অবস্থিত তার ওপরের বিশাল কংক্রিটের ব্রিজের ওপর উঠে পড়ল। এই ব্রিজের অর্ধেক পড়েছে আমেরিকায় ও বাকি অর্ধেক পড়েছে অপর দেশ কানাডায়। এবার এই ব্রিজটা পাড়ি দিলেই আমরা চলে যাব প্রতিবেশী দেশ, আরেক স্বপ্নরাজ্য কানাডায়! সাদী ব্রিজের মাঝপথে গাড়ি থামিয়ে তার টিকিট-পাসপোর্ট সব দেখিয়ে সবার জন্য একটি করে টোকন নিয়ে নিল। আর তারপরই আমরা প্রবেশ করলাম আমাদের কাক্সিক্ষত গন্তব্যের দেশ কানাডায়।

কানাডার প্রকৃতি

কানাডায় প্রবেশ করে প্রথমে আমরা প্রায় একনাগাড়ে ঘণ্টাখানিক পিচঢালা পথে এগিয়ে চললাম সোজা নায়াগ্রা ফলসের দিকে। যেতে যেতে পথের দুপাশে আমরা প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য ও কানাডার পরিচ্ছন্ন পরিপাটি পরিবেশ উপভোগ করতে থাকলাম। দুপাশে বেশির ভাগই ছিল ভুট্টাক্ষেত। তারপর আছে ধানক্ষেত, আপেল বাগান, তেঁতুল বাগান, ক্রিসমাস ট্রির সারি ইত্যাদি। প্রকৃতির মাঝে এত নিখুঁত কারুকার্য দেখে আমাদের দুচোখ জুড়িয়ে গেল। কানাডায় আমেরিকার মতো এত যানজট নেই। বরং এখানে আছে বিশুদ্ধ নির্মল পরিবেশ, দখিনা বাতাস আর একটু পরপর বিশাল ভুট্টা বা ধানের ক্ষেত। এই ভুট্টাই কিন্তু কানাডার প্রধান খাদ্যশষ্য।

মাঝপথে আমরা গাড়ি থামিয়ে হালকা নাস্তা সেরে নিলাম। এবার টানা আরও দেড় ঘণ্টার মতো ড্রাইভ শেষে আমরা পৌঁছে গেলাম কাক্সিক্ষত গন্তব্য নায়াগ্রায়। নায়াগ্রার সেই স্রোতস্বিনী রিভারের স্বচ্ছ নীল পানি তীব্রবেগে ছুটে চলেছে কোন অজানার উদ্দেশ্যে। পানির গভীরতা কিন্তু অনেক কম। বড়জোর দুই কী তিন ফুট হবে হয়তো, কিন্তু এমন তীব্র স্রোত যে একবার যদি কেউ এতে পায়ের পাতাটুকু অবধি ডুবিয়ে দেয় তাতেই সে ওই খরস্রোতা নায়াগ্রার তীব্র প্রাণঘাতী স্রোতে অনায়াসে ভেসে যাবে। যেমন সুন্দর এটি, তেমনই ভয়ানক। একেই বুঝি বলে ভয়ংকর সুন্দর! আর সেই সুন্দরের টানে প্রতিবছর হাজার হাজার ভ্রমণপিপাসু মানুষ ছুটে যান কানাডার সেই দৈত্যাকৃতির ঝরনা ‘নায়াগ্রা ফলস’-এ।

যাওয়ার পর

সেখানে পৌঁছানোর পর আমরা ভালো একটি জায়গা দেখে আমাদের গাড়ি দুটি পার্কিং করে রাখি। নামার পর আমরা সবাই সেখানে কিছু ছবি তুলে নিলাম। সাদী কিছু ভিডিও করল সে স্থানটির। এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে নায়াগ্রা রিভারের তীব্রবেগে ছুটে চলা আর শোনা যাচ্ছে তার শোঁ শোঁ গর্জন। পাশে কিছু উঁচু উঁচু দালান রয়েছে। দুলাভাই বললেন, ওগুলোতে এই নায়াগ্রা ফলসে কর্মরত সরকারি লোকজন থাকে। সামনে পার্কের মতো সুন্দর খোলামেলা জায়গা। স্থানে স্থানে ফুলের টবে বিভিন্ন রঙবেরঙের ফুলগাছ সাজানো। আসরের নামাজের পর সবাই ঝাঁপিয়ে পড়লাম নায়াগ্রা ফলস কাছ থেকে দেখার জন্য। কিন্তু কাছ থেকে দেখার সুযোগ নেই। কারণ সেখানে মানুষ আর মানুষ। কেউ বাঙালি, কেউ ইন্ডিয়ান, কেউ আমেরিকান আবার কেউ বা স্বয়ং কানাডারই অধিবাসী। কিন্তু সবাই পর্যটক। সবাই এই বিশ্ববিখ্যাত জলপ্রপাতের সৌন্দর্য অবলোকন করছে। কী সুন্দর সুন্দর নীল জলরাশি, পানির কলকল ধ্বনি যেন সারাদিনের জার্নির ক্লান্তিটা দূর করে দিল। পানিটা খুবই স্বচ্ছ, পানির নিচে চিকচিক করছে সাদা বালি। তেমন গভীরতাও নেই, তবে স্রোত আছে প্রচণ্ড। সামান্য পা ডুবালেই যে কেউ ভেসে তলিয়ে যাবে অতল গহ্বরে। যেন তরল জোছনা বেয়ে বেয়ে পড়ছে। সঙ্গে আরও দেখলাম পানি কীভাবে ধোঁয়ার মতো বাষ্প হয়ে ওপরের দিকে উঠতে থাকে। উপরিভাগ দেখলে মনে হবে যেন নিচে কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে আর সেখান থেকে ধোঁয়া উড়ছে। অথচ নিচে তাকালেই শুধু বেশুমার জলরাশির আস্ফালন ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়বে না। আসলে তীব্র স্রোতের ঘর্ষণের ফলে কিছু পানি বাষ্প হয়ে ওপরের দিকে উঠে যায় আর সেটাই ধোঁয়ার আকারে আমাদের চোখে পড়ে। আবার ফলসের ওপারে মানে নিউইয়র্কের মধ্যে দেখলাম একটি ইয়া বড় প্যারাসুট বা বেলুন একই জায়গায় ওঠানামা করছে। এখান থেকেই যখন এত বড় দেখাচ্ছে জানি না কাছ থেকে সেটা কত বড় হবে।

রাতের শেষ আকর্ষণ

রাতে আনন্দ আর হৈ-হুল্লোড়ের পর আমরা সবাই যখন ক্লান্ত হয়ে ঘাসের ওপর পাতানো চাদরে বসে বিশ্রাম নিচ্ছি তখন দুলাভাই বললেন, রাত এগারোটার পর দেখবে রাতের আসল সৌন্দর্য। তা আবার কী? আমরা জিজ্ঞেস করলাম। ভাই বললেন, এগারোটার পরে ওরা বিরাট বিরাট আতশবাজি জ্বালায়। ওগুলো দূর আকাশে উঠে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সেটা দেখতে খুবই সুন্দর লাগে। যদিও আমরা সবাই ক্লান্ত কিন্তু শেষবেলা উস্তাদের মারটা দেখেই রওনা দেব। আমরা সবাই তাতে সম্মতি জানালাম। ওপরে আকাশে হাজার হাজার তারা জ্বলজ্বল করছে। আমি চাদরের এক কোণে শুয়ে শুয়ে তারাগুলো দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল হাজারো ছোট ছোট জুঁইফুল ফুটে রয়েছে ওই দূর আকাশপানে। এ অবস্থায় হঠাৎ বিকট আওয়াজে আমরা কিছুটা কেঁপে উঠলাম! তাকিয়ে দেখি নিউইয়র্কের দিক থেকে সারি সারি আতশবাজি আকাশে উঠে চারদিকে ফেটে পড়ছে। সেখান থেকেই সেই শব্দটা ভেসে আসছে। প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো সেগুলো নিউইয়র্কের থেকেই আসছে। পরে দেখলাম না! ওগুলো কানাডার এক অংশ থেকে একদল কর্মী ফোটাচ্ছে যাদের কাজই হলো নায়াগ্রা ফলসে আসা পর্যটকদের বিনোদন দেওয়া। একটির পর একটি বাজি ফুটছে আর অনেক উঁচুতে উঠে চতুর্দিকে সেটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে। একদিকে নিচে ছড়িয়ে পড়া বিশাল ঝরনার জলরাশি, আরেকদিকে আকাশে ছড়িয়ে পড়া আতশবাজি, এ দুটির সংমিশ্রণে মনে হলো কোনো স্বপ্নপুরীতে চলে এসেছি। প্রায় পাঁচ থেকে দশ মিনিট ধরে চলল এই আলোর খেলা। মন ভরে উপভোগ করলাম সবাই।

ফেরার পথে

অবশেষে যখন আতশবাজি পোড়ানো শেষ হলো তখন আমরা ও বাকি সবাই ধীরে ধীরে নিজেদের জিনিসপত্র গোছানো শুরু করলেন। এখন যে বাড়ি ফিরতে হবে! নদী, পাহাড় বা ঝরনা যাই ঘুরে আসি না কেন, গৃহের কোণে এসেই মনটা সুখ পায়, প্রশান্তি পায়। সেই প্রশান্তির আশায় আবারও আমরা রওনা দিলাম ঘরমুখে। অবশ্য সে ঘর বলতে মিশিগানে নয়, কেননা তখনও আমাদের ভ্রমণ শেষ হয়নি। আমরা তখন ফিরছি হোটেলে। পরের দিন অন্য কোনো দর্শনীয় স্থানে বেড়াতে যাব বলে। তারপরই শুরু করব আমাদের গৃহকোণে যাত্রা। এই দিনটির কথা আমার মনে থাকবে চিরদিন। প্রথম দেখা সেই নয়নাভিরাম ‘নায়াগ্রা ফলস’!

শাকেরা বেগম শিমু, মিশিগান, আমেরিকা থেকে

খুঁজুন