(প্রথম অংশ)
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার ‘পথের দাবি’ উপন্যাসে লিখেছেন, ‘আমরা আকাশের দিকে তাকাইয়া আকাশের মতো হা করিয়া চাহিয়া থাকি।’ কথাটাকে আমাদের ভাষায় বললে বলতে হয়, ইসলামে কোন কোন জায়গায় সংকট, কোথায় কোথায় সমস্যা তা হয়তো দেখার মতো আমাদের চোখ নেই অথবা সমস্যাগুলোকে আমরা অস্বীকার করছি। উট পাখির মতো মরম্নভূমিতে মাথা গুঁজে রেখে আমরা আর কতকাল পথ চলবো? আমাদেরকে জানতে হবে কোরআনে ইসলামী রাষ্ট্রের উত্তরাধিকার নির্ধারণে কোনো রূপরেখা দেয়া আছে কিনা, আলস্নাহর রসূলের (সা.) ওফাতের পরপর উত্তরাধিকার নিয়ে সংকট দেখা দিলো কেন, তার অতি আদরের নাতি ইমাম হোসেনকে কোন কারণে শহীদ করা হলো, শাšিত্মর ধর্ম ইসলামে কেন গৃহযুদ্ধের দাবানল জ্বলে উঠলো, কেন মুসলিম উম্মাহকে রক্তগঙ্গায় ভাসতে হলো, কেন একই ধর্মের অনুসারীরা দুটি ধারায় বিভক্ত হয়ে গেলো এবং এ দুর্ভাগ্যের জন্য কে বা কারা দায়ী আমাদেরকে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে হবে। অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে বিচার করলে দেখা যাবে যে, রসূলের মনোনীত উত্তরাধিকারী খিলাফত পেলে কারবালার মর্মাšিত্মক ঘটনা ঘটতো না এবং হযরত আলীর উত্তরসূরিরা উমাইয়া ও আব্বাসীয়দের প্রতিহিংসার শিকার হতেন না। রাসূলুলস্নাহ জানতেন যে, তার বংশের বাইরের কেউ খিলাফত পেলে তার পরিবারের রক্ত ঝরবে। এজন্য তিনি তার জামাতা ও চাচাতো ভাই হযরত আলীকে তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করেছিলেন।
মুহাম্মদ (সা:) শুধু মসজিদে নববীর ইমাম ছিলেন তা নয়, তিনি ছিলেন একজন রাষ্ট্রনায়ক, মিলিটারি কমান্ডার, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও যুগের বিপস্নবী মহানায়ক। এক কথায়, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। উম্মত তার সব সত্ত্বা অক্ষুণ্ণ রেখেছে৷ কিন্তু রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তার সত্ত্বাকে ভূলুন্ঠিত করেছে। দুনিয়ার চুনোপুটি রাষ্ট্রনায়কের উত্তরাধিকারী খুঁজে পাওয়া যায়। আর বায়োগ্রাফিতে এই মহামানবের উত্তরাধিকারীর জায়গাটি ফাঁকা।
কয়েক হাজার বছরের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে যে, ড়্গমতাসীন পরিবারের বাইরের ব্যক্তি উত্তরাধিকার লাভ করতে পারে না। উত্তরাধিকার লাভ করেন শাসকের পুত্র। পুত্র সšত্মান না থাকলে মেয়েও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার লাভ করেন। এ নিয়মে ১৯৫৩ সালের ২ জুন রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ব্রিটিশ রাজ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। তিনি ছিলেন রাজা ষষ্ঠ জর্জের কন্যা। রাজা ষষ্ঠ জর্জের পুত্র সšত্মান না থাকায় জ্যেষ্ঠ কন্যা হিসেবে তিনি সিংহাসন লাভ করেন। পিতামহ রাজা পঞ্চম জর্জের রাজত্বকালে এলিজাবেথ ছিলেন ব্রিটিশ সিংহাসনের উত্তরাধিকার লাইনে চাচা এডওয়ার্ড ও পিতার পেছনে তৃতীয় অবস্থানে। তার জন্ম জনগণের মধ্যে আগ্রহের সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু তিনি রানী হবেন এমন প্রত্যাশা কেউ করেনি। কেননা তার চাচা এডওয়ার্ড তখনো ছিলেন তরম্নণ। তিনি বিয়ে করলে এবং পুত্র সšত্মানের পিতা হলে তার পুত্র হবেন ব্রিটিশ রাজা। ১৯৩৬ সালে পঞ্চম জর্জের মৃত্যু হলে এলিজাবেথের চাচা এডওয়ার্ড ‘অষ্টম এডওয়ার্ড’ নাম গ্রহণ করে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তখন এলিজাবেথ উত্তরাধিকার লাইনে তার পিতার পেছনে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে আসেন। একই বছরের শেষদিকে এডওয়ার্ড তালাকপ্রাপ্ত ওয়ালিস সিম্পসনের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের প্র¯ত্মাব দিলে তাকে সিংহাসন ত্যাগ করতে হয়। এডওয়ার্ডের সিংহাসন ত্যাগ একটি সাংবিধানিক সংকটের জন্ম দেয়। এ পরিস্থিতিতে এলিজাবেথের পিতা ‘ষষ্ঠ জর্জ’ নাম গ্রহণ করে রাজা হন। ভাই না থাকায় এলিজাবেথ পিতার উত্তরাধিকারীর সারিতে বহাল থাকেন। সে সময় অগ্রজ পুরম্নষ সšত্মান হতেন উত্তরাধিকারী। পরবর্তীতে তার পিতামাতার পুত্র সšত্মান হলে তিনি বাদ পড়ে যেতেন। কিন্তু কোনো ভাই জন্ম না নেয়ায় এলিজাবেথ রানী হন।
শুধু পুত্র বা মেয়ে নয়, নাতিও উত্তরাধিকার লাভ করতে পারে। বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব আলীবর্দী খানের পুত্র সšত্মান না থাকায় নাতি সিরাজউদ্দৌলাকে উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করা হয়। সিরাজউদ্দৌলার উত্তরাধিকার প্রশ্নবিদ্ধ। কেননা আলীবর্দী খান ছিলেন দিলিস্নর মোগল সম্রাট মোহাম্মদ শাহর একজন সুবাদার। উত্তরাধিকার নিয়োগের অধিকার ছিল দিলিস্নর মোগল সম্রাটের, আলীবর্দী খানের নয়। একইভাবে আলীবর্দী খানের উত্তরাধিকারও প্রশ্নবিদ্ধ। নাতিদের উপযুক্ত বিবেচনা করা না হলে উত্তরাধিকার লাভ করেন মেয়ে জামাতা। রাজ্য শাসনের দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে প্রত্যেক শাসক তার পরবর্তী উত্তরাধিকারী নিয়োগে মনোযোগ দেন। পুত্রকে অবিশ্বাস করলে মেয়েকে এমন পাত্র দেখে বিয়ে দেয়া হয় যার কাছে ড়্গমতা হ¯ত্মাšত্মর করা যায়।
বন্ধু-বান্ধব অথবা দূরবর্তী আত¥ীয়কে উত্তরাধিকারী নিয়োগের দৃষ্টাšত্ম নেই বললে চলে। উত্তরাধিকারী নির্বাচন হুবহু পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভ করার মতো। পিতার সম্পত্তিতে সšত্মান ছাড়া বাইরের লোক অংশীদারিত্ব লাভ করতে পারে না। স্ত্রী আইনসঙ্গতভাবে মৃত স্বামীর পরিত্যক্ত সম্পত্তির অংশীদারিত্ব পেয়ে থাকেন। যে কেউ ইচ্ছা করলে গদিতে বসতে পারে না। পৃথিবীর প্রত্যেক জাতি এবং প্রত্যেক সভ্যতা নির্দিষ্ট আইন বা রীতিনীতি অনুসরণ করে। আইনানুগভাবে প্রত্যেক উত্তরাধিকারী ড়্গমতা লাভ করেন। উত্তরাধিকার লাভে আইন বা শৃঙ্খলা না থাকলে রাষ্ট্রে গোলযোগ দেখা দিতে বাধ্য। আলোচনা করলে দেখা যাবে যে, তিনটি উপায়ে রাজনৈতিক ড়্গমতা লাভ করা যায়। প্রথমত: ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে রাজনৈতিক ড়্গমতা দখল করা যায়। দ্বিতীয়ত: নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গদিতে বসা যায় এবং তৃতীয়ত: উত্তরাধিকারসূত্রে রাজনৈতিক ড়্গমতা হাসিল করা যায়। বিশ্বনবীর (সা.) যুগে ষড়যন্ত্র বা অবৈধ পন্থায় এবং উত্তরাধিকারসূত্রে রাজত্ব লাভ করা যেতো। রোমান সাম্রাজ্য ছাড়া অন্য কোথাও নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজত্ব পাওয়ার নজির নেই। বিশ্বনবী (সা.) রাষ্ট্রড়্গমতা লাভে গণতান্ত্রিক পন্থা তো নয়ই, কোনো ধরনের রাজনৈতিক দর্শনও উপস্থাপন করেননি।
গতানুগতিক ঐতিহাসিক বিবরণীতে বলা হয়, বিশ্বনবীর (সা.) ওফাতের পর পর রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয়। মদিনার আনসাররা নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে খলিফা নির্বাচনের উদ্যোগ নিয়েছিল। মোহাজিররাও একই উদ্যোগ নেয়। এ সন্ধিড়্গণে ইসলামী খিলাফত দ্বিখ-িত হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। আনসাররা মোহাজিরদের নেতৃত্ব মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। হযরত উমর তার বিশ্বাসে অবিচল ছিলেন যে, অবশ্যই খিলাফতকে মক্কার মোহাজিরদের নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। প্রাক-ইসলাম যুগে মদিনার আউস ও খাজরাজ গোত্রের মধ্যে তুমুল গোত্রগত বিরোধ ছিল। হযরত উমর (রা.) এক কিংবা দুদিন দীর্ঘ আলোচনা চালিয়ে দক্ষতার সঙ্গে আনসারদের মধ্যে তাদের পুরনো গোত্রীয় বিরোধ উস্কে দেন। হযরত উমর (রা.) খিলাফতের ঐকমত্যের প্রার্থী হিসেবে আবু বকরের (রা.) হাতে হাত রেখে সাকিফা বৈঠকে উপস্থিত সবার মতবিরোধের অবসান ঘটান।
জুবায়ের ছিলেন ইসলামের একজন বীর যোদ্ধা এবং সাহসী পুরম্নষ। তলোয়ার চালনায় তিনি ছিলেন সুদড়্গ। তার তলোয়ারের আঘাত অন্যান্য আঘাতের মধ্যেও চেনা যেতো। এ কারণে খলিফা আবু বকরের লোকজন বিপদ দেখে দলবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার হাত থেকে তলোয়ার কেড়ে নেয় এবং একটি রক্তপাতের ঘটনা প্রতিরোধ করে। হযরত উমরের এত পীড়াপীড়ি করার কিংবা তথাকথিত আত¥ত্যাগের কারণ কি ছিল? তিনি কি সত্যিকার সৎ নিয়তে ময়দানে নেমেছিলেন নাকি তার ও হযরত আবু বকরের মধ্যে কোনো ধরনের চুক্তি বা সমঝোতা হয়েছিল?
হযরত আবু বকরকে খলিফা নির্বাচনে হযরত উমর অশেষ চেষ্টা চালান। তার উদ্দেশ্য ছিল হযরত আবু বকর তার ইšেত্মকালের সময় তাকে যেন খলিফা মনোনীত করে যান। খিলাফতের প্রাথমিক দিনগুলোতে হযরত আলী তাই হযরত উমরকে বলেছিলেন, ‘হে উমর! ভালোমতো দোহন করম্নন। কারণ তার অর্ধেক তো আপনারই। খিলাফতের গাধাটিকে আবু বকরের জন্য শক্ত করে বাঁধুন যাতে কাল আপনার কাছেই ফিরে আসে।’ হযরত আবু বকর অকৃতজ্ঞতা দেখাননি। মৃত্যুশয্যায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগে হযরত উসমানকে ডেকে পাঠান এবং তাকে এভাবে লেখার নির্দেশ দেন:
‘এটা হলো আবদুলস্নাহ ইবনে উসমানের (আবু বকরের নাম) পার্থিব জীবনের শেষ মুহূর্তে এবং পারলৌকিক জীবনের সূচনালগ্নে মুসলমানদের প্রতি অঙ্গীকারনামা যে লগ্নে মু’মিন ব্যক্তি কমর্, চিšত্মা ও সদাচারের মধ্যে আর কাফের আত¥সমর্পণের মধ্যে থাকে।’ খলিফার কথা এ পর্যšত্ম লেখা হলে তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়েন। খলিফা তার অসিয়তনামা সম্পূর্ণ করার আগেই ইšেত্মকাল করেন। (সূত্র: বেলায়াতের দ্যুতি, আয়াতুলস্নাহ জাফর সুবহানী, পৃষ্ঠা-২৪৯-২৫০)
হযরত উমর জনগণের আবেদনের জবাবে বলেছিলেন যে, ‘আবু উবায়দা বেঁচে থাকলে তাকেই তিনি তার উত্তরাধিকারী নির্বাচিত করতেন। কারণ রাসূলুলস্নাহর (সা.) কাছ থেকে তিনি শুনেছিলেন যে, আবু উবায়দা হলেন উম্মতের আমিন (আমানতদার)। আবু হুজায়ফার মনিব সালেম সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, আজ যদি আবু হুজায়ফার মনিব সালেম বেঁচে থাকতো তাহলে তিনি তাকে তার উত্তরাধিকারী নির্বাচিত করতেন। কারণ আমি রাসূলুলস্নাহর (সা.) কাছ থেকে শুনেছিলেন সালেম হলো আলস্নাহর বন্ধু। হযরত উমর সে সময় জীবিতদের নিয়ে চিšত্মা করার পরিবর্তে মৃতদের নিয়ে চিšত্মা করছিলেন যা ছিল তার সময় জীবিতদের প্রতি অবহেলার নামাšত্মর। আবু উবায়দা ও সালেমকে নির্বাচিত করার মাপকাঠি যদি হয় তাদের একজনকে আমিন এবং আরেকজনকে আলস্নাহর বন্ধু হিসেবে রাসূলুলস্নাহর (সা.) প্রশংসা তাহলে হযরত উমর কেন আলী ইবনে আবি তালিবের কথা একবারও স্মরণ করেননি? হযরত আলী তো ছিলেন সেই ব্যক্তি যার সম্পর্কে রাসূলুলস্নাহ (সা.) বলেছিলেন, আলী সত্যের সঙ্গে আর সত্য আলীর সঙ্গে? হযরত উমর তো জানতেন যে, হযরত আলী মর্যাদা, গুণ, পবিত্র মানসিকতা, অতুলনীয় বিচারকার্য, বীরত্ব, আলস্নাহর কিতাব ও রাসূলুলস্নাহর সুন্নাতের জ্ঞানে অন্যদের চেয়ে অগ্রগণ্য। তাহলে কেন তিনি আলীর নামটি মুখে আনেননি? শূরার মাধমে খলিফা নির্বাচন ঐশী ঘোষণার অনুসরণ নয়। যদি পরবর্তী খলিফাকে পূর্ববর্তী খলিফাই নির্ধারণ করে যাবেন তাহলে হযরত উমর কেন এ দায়িত্বভার শূরার ওপর ন্য¯ত্ম করেছিলেন?
এ সংকট এজন্য দেখা দিয়েছিল যে, হয়তো বিশ্বনবী (সা.) কাউকে তার উত্তরাধিকারী মনোনীত করেননি অথবা তার মনোনীত উত্তরাধিকারীকে অবজ্ঞা করা হয়েছিল। এখান থেকেই ইসলামের ইতিহাসে সংকট শুরম্ন হয়। এ সত্য সাধারণ মানুষের কাছে ধরা না পড়লেও ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে পারেনি। ইসলামে উত্তরাধিকারের সংকট নিয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জার্মান ইতিহাসবিদ উইলফ্রেড ম্যাডেলাং ‘দ্য সাকশেসন টু মুহাম্মদ: এ স্টাডি অব দ্য আর্লি ক্যালিফেট’ শিরোনামে গ্রন্থের প্রথম পৃষ্ঠায় লিখেছেন: No event in history has devided Islam profoundly and durably than the succession to Muhammad. The right to occupy the Prophet’s place as the head of the Muslim community after his death became a question of great religious weight which has separated the Sunnites and Shi’its until the present. The issue of right and wrong in the matter has long since been settled in their minds. For Sunnites, the first caliph Abu Bakr was the only rightful successor since he was the most excellent men after the Prophet. Although Muhammad had not explicitly appointed him as his successor, his preference for him was indicated by his order for Abu Bakr to lead Muslims in prayer during his final illness. For Shi’its it was Muhammad’s cousin and son-in-law Ali, who on account of his early merits in Islam as well as his close kinship, had been appointed by the Prophet as his successor. His rightful position was then userped by Abu Bakr with the backing of the majority of Muhammad’s companions.
মুহাম্মদের উত্তরাধিকার নিয়ে গোলযোগের চেয়ে ইতিহাসের অন্য কোনো ঘটনা ইসলামকে এত গভীর ও স্থায়ীভাবে বিভক্ত করেনি। মুহাম্মদের ইšেত্মকালের পর মুসলিম উম্মাহর প্রধান হিসেবে তার স্থান দখল করার অধিকার একটি বিরাট ধর্মীয় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। এখনো এ বিষয় মুসলিম উম্মাহকে সুন্নি ও শিয়া সম্প্রদায়ে বিভক্ত করে রেখেছে। তাদের অšত্মরে ন্যায়-অন্যায়ের বিষয়টি অনেক আগেই স্থির হয়ে গেছে। সুন্নিদের মতে, বিশ্বনবীর (সা.) পর প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা.) যোগ্যতম ব্যক্তি হওয়ায় তিনি ছিলেন একমাত্র সঠিক উত্তরাধিকারী। মুহাম্মদ (সা.) হযরত আবু বকরকে স্পষ্টভাবে তার উত্তরাধিকারী মনোনীত করেননি। তবে তার অšিত্মম অসুস্থতার সময় আবু বকরকে মুসলমানদের নামাজে ইমামতি করার নির্দেশ দিয়ে তিনি তার প্রতি অগ্রাধিকারের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। হযরত আবু বকরের অনুকূলে মুসলমানদের ঐকমত্য চূড়াšত্মভাবে আলস্নাহ অনুমোদন করেন। শিয়াদের মতে, মুহাম্মদ (সা.) তার চাচাতো ভাই ও মেয়ে জামাতা হযরত আলীকে তার উত্তরাধিকারী মনোনীত করেছিলেন। ইসলামের প্রাথমিক দিনগুলোতে বীরত্ব প্রদর্শন করায় এবং ঘনিষ্ঠ আত¥ীয় হওয়ায় মুহাম্মদ (সা.) তাকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেছিলেন। পরবর্তীতে হযরত আবু বকর মুহাম্মদের (সা.) অধিকাংশ সাহাবীর সমর্থনে তার বৈধ অধিকার কেড়ে নেন।
হযরত আবু বকরকে নামাজে ইমামতি করার অনুমতি দান যদি তার খিলাফত লাভের ইঙ্গিত বহন করে তাহলে হযরত উমরের পরবর্তী খলিফা হওয়ার কথা আবদুর রহমান বিন আউফের। কেননা ইমামতি করা অবস্থায় ছুরিকাঘাত করা হলে হযরত উমর হযরত আবদুর রহমান বিন আউফের হাত ধরে ফেলেন এবং তাকে বাদবাকি নামাজে ইমামতি করার জন্য ইশারা করেন। কিন্তু আবদুর রহমান বিন আউফ খলিফা হননি। খলিফা হয়েছিলেন হযরত উসমান।
নবী (সা.) গাদিরে খুমে তার মেয়ে জামাতা হযরত আলীকে তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী নিয়োগ করেছিলেন। রসূলের (সা.) ইšেত্মকালের পর শাসনতান্ত্রিক ধারাবাহিকতায় খিলাফতের দায়িত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে হযরত আলীর উপর বর্তায়। কিন্তু আমাদের নবীর মৃত্যুর সুযোগে এ ধারাবাহিকতা লংঘন করা হয়। হযরত আলী তার বিভিন্ন ভাষণে তার অধিকারের কথা স্মরণ করেছেন এবং বলেছেন, যেদিন রাসূলুলস্নাহ দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন সেদিন থেকে তাকে সে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
আলস্নাহর শপথ, যেদিন আলস্নাহ তার নবীর (সা.) রূহ পরিগ্রহণ করেন সেদিন থেকে অদ্যাবধি আমি আমার অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলাম। (সূত্র: নাহজুল বালাগা, আবদুহ, খুৎবা নম্বর-৫)
আমরা একটি মহাসত্যকে ধামাচাপা দিয়েছি। আলস্নাহর রসূলের ওফাতের পর হযরত আবু বকর, হযরত উমর ও হযরত আবু উবায়দা বনু সাইদার সাকিফা হাউজে নয়া খলিফা নির্বাচনের বৈঠকে যোগদান করেন। তখনো আলস্নাহর রসূলের লাশ দাফন করা হয়নি। সাকিফা হাউজের বৈঠকে নবী পরিবারের কাউকে উপস্থিত রাখা হয়নি। হযরত আলী অথবা হযরত ফাতিমাকে উপস্থিত রাখা হলে আবু বকর খলিফা হতে পারতেন কিনা সন্দেহ। গাদিরে খুমে হযরত আলীকে আলস্নাহর রসূলের প্রতিনিধি নির্বাচনের কথা তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হলে তারা পিছিয়ে যেতে বাধ্য হতেন। ইতিহাসবিদ উইলফ্রেড ম্যাডেলাং বৈরম্নতভিত্তিক আল-বশীরের সম্পাদক এইচ. লামেন্সের একটি নিবন্ধের উদ্ধৃতি দিয়ে ‘দ্য সাকশেসন টু মুহাম্মদ: এ স্টাডি অব দ্য আর্লি ক্যালিফেট’ গ্রন্থের তিন নম্বর পৃষ্ঠায় লিখেছেন: Although Lammens did not speak of a conspiracy to seize the succession, his presentation of the activity of the triumvirate suggests this term. In particular through Abu Bakr’s and Umar’s daughters Aisha and Hafsa, who kept their fathers informed about every move and secret thought of their husband Mohammad, these two men came to exert great influence on the Prophet’s actions and thus prepared the stage for their seizure of power.
(লামেন্স উত্তরাধিকার দখলের কোনো ষড়যন্ত্রের কথা উলেস্নখ করেননি। তবে ত্রয়ীদের কার্যকলাপ সম্পর্কে তার উপস্থাপনায় এ শব্দটি প্রকাশ পেয়েছে।বিশেষ করে আবু বকর ও উমরের কন্যা আয়েশা ও হাফসা নিজ নিজ পিতাকে তাদের স্বামী বিশ্বনবীর (সা.) প্রতিটি পদড়্গপে ও গোপন চিšত্মাভাবনা সম্পর্কে অবহিত রাখতেন। কন্যাদের মাধ্যমে এ দুই ব্যক্তি নবীর কাজকর্মে বিরাট প্রভাব বি¯ত্মার করেন এবং তাদের ড়্গমতা দখলের মঞ্চ প্রস্তুত করেন।)
তবে পাশ্চাত্যের আধুনিক গবেষকরা লামেন্সের এ তত্ত্বকে অনির্ভরযোগ্য হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। এইচ. লামেন্স আরো বলেছেন, বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকার আরবদের স্বভাব বিরম্নদ্ধ ছিল। অন্যদিকে, ই. টায়ান ‘ইসলামিক পলিটিক্যাল থট’-এ তাকে চ্যালেঞ্জ করে বলেন, বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকার আরব গোত্রগুলোর মধ্যে অজ্ঞাত ছিল না। কোরায়েশদের মধ্যে বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারের রীতি চালু ছিল। ডবিস্নউ এম. ওয়াট একইভাবে বলেন যে, কোনো বিশেষ পরিবারের ব্যক্তিকে গোত্র প্রধান হিসেবে নির্বাচন করা ছিল আরবদের স্বভাব। তিনি একথাও বলেন যে, মুহাম্মদের (সা.) পালিত পুত্র জায়েদ ইবনে হারিস জীবিত থাকলে অনায়াসে তিনি তার উত্তরাধিকার লাভ করতেন।
১৯১০ সালে প্রকাশিত ‘ট্রায়াম্ভিরেট অব আবু বকর, উমর এন্ড আবু উবায়দা’ শিরোনামে লামেন্সের নিবন্ধে আরো বলা হয়, বিশ্বনবীর (সা.) জীবদ্দশায় তার উত্তরাধিকার লাভে হযরত আবু বকর, উমর ও আবু উবায়দার মধ্যে ত্রয়ী ঐক্যের সূচনা হয়। এ ঐকমত্য হযরত আবু বকর ও হযরত উমরকে পরপর খলিফা হতে সহায়তা করে। আবু উবায়দার মৃত্যু না হলে তিনি হযরত উমরের পর খিলাফত লাভ করতেন।
‘সাকিফায় সরকার গঠন করা হয়। হযরত আবু বকর ‘খলিফা’ হলেন। আবু উবায়দাকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের দায়িত্ব দেয়া হয়। নয়া ‘খলিফা’ উমরকে হাকিমের দায়িত্ব অর্পণ করেন। বর্তমান যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বললে বলতে হয়, প্রথমজন উচ্চ রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অধিকারী ছিলেন। দ্বিতীয়জন অর্থনৈতিক কর্তৃত্বের অধিকারী ছিলেন এবং তৃতীয়জন আইন বিভাগের কর্তৃত্বের অধিকারী ছিলেন। ইসলামী সরকারের গুরম্নত্বপূর্ণ পদ এই তিনজনের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয় যারা সাকিফার দিনে গুরম্নত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং তারা এটা হঠাৎ করে করেনি। বরং তা আগে থেকেই রচিত হয়েছিল।’ (সূত্র: ফাদাক: হযরত ফাতিার স্মৃতিবিজড়িত ইতিহাস: সৈয়দ মুহাম্মদ বাকের আস সদর: পৃষ্ঠা-৬৪)
ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, এ বিভেদের কারণ একটি বিশ্বাসগত মৌল বিষয়ের মধ্যে নিহিত। আর তা হলো ইমামত। কারণ ইসলামের অন্য কোনো মৌল বিষয়ের জন্য কেউ অস্ত্র ধারণ করেনি। সুতরাং ইমামত এ অনৈক্যের সর্ববৃহৎ কারণ। যুগ যুগ ধরে ইমামতের বিষয়টি গভীরভাবে চিšত্মা করা হয়নি। বরং দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টিকে দেখা হয়েছে। যদি উভয়পড়্গ বিশেস্নষণের দৃষ্টিতে (শত্রম্নতার দৃষ্টিতে নয়) পরস্পরের উপস্থাপিত দলিল-প্রমাণগুলো দেখতেন তাহলে সত্য প্রকাশিত হতো এবং সত্যাকাঙ্খীদের সামনে সত্যের সূর্য উদিত হতো। (সূত্র: আল মুরাজায়াত, আলস্নামা সাইয়েদ আবদুল হুসাইন শারফুদ্দিন আল মুসাভি, পৃষ্ঠা-৬)
মহানবী (সা.) যেদিন তার রিসালাতের কথা ঘোষণা করেন সেদিনই হযরত আলীকে খিলাফত প্রদান করেন এবং তাকে তার উত্তরাধিকারী হিসেবে ঘোষণা করেন। মহানবী (সা.) তার রিসালাতের সুদীর্ঘ ২৩ বছরে বিভিন্ন সময় উপমা ও ইশারায় নেতৃত্বের জন্য হযরত আলীর যোগ্যতা ও উপযুক্ততার কথা বারবার লোকদের স্মরণ করিয়ে দেন এবং তার মৃত্যুর পর আলীর সম্ভাব্য বিরোধিতাকারীদের নসিহত ও উপদেশ দেন। কখনো কখনো আলস্নাহর শা¯িত্মর ভয় দেখান। শুধু কি হযরত আলী? আলস্নাহর রসূল ইমাম হাসান ও হোসেনকেও তার উত্তরাধিকারী হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। সাইয়েদ ইবনে তাউসের ‘কারবালা ও হযরত ইমাম হোসেনের শাহাদাত’ শিরোনামে গ্রন্থের ১৫ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়:
রসূলে খোদা এক সফর থেকে চিšিত্মত অবস্থায় ফিরে আসেন এবং মসজিদে নববীর মিম্বরে দাঁড়িয়ে খুৎবা প্রদান করেন। লোকদেরকে উপদেশ দেন। আর তার পাশে অবস্থানকারী ইমাম হাসানের মাথায় ডান হাত এবং ইমাম হোসেনের মাথায় বাম হাত রেখে আসমানের দিকে মাথা তুলে বললেন, ‘ইয়া আলস্নাহ, মুহাম্মদ তোমার বান্দা ও তোমার রসূল। এ দুজন আমার বংশের পবিত্র ও সম্মানিত ব্যক্তি। তাদেরকে আমার উম্মতের মাঝে আমার উত্তরাধিকারী হিসেবে রেখে যাচ্ছি।
কারবালায় ইমাম হোসেনের পুরম্নষ সাথীদের মধ্যে ইমাম জয়নুল আবেদীন ছাড়া সবাই নিহত হন। অসুস্থ না থাকলে জয়নুল আবেদীনও নিহত হতেন। তার বেঁচে যাওয়ার মধ্যে কি কোনো ঐশী বার্তা নেই? মহান আলস্নাহ জানতেন যে, নেতৃত্ব দেয়ার মতো কেউ না থাকলে ইসলাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তাই তিনি জয়নুল আবেদীনকে বাঁচিয়ে রাখেন।
বনু আমের গোত্রের প্রধান মহানবীর (সা.) কাছে প্র¯ত্মাব দেয় যে, তারা কঠোরভাবে তার দ্বীনকে রড়্গা করতে প্রস্তুত, তবে শর্ত হলো যে, তার পরে তাদের হাতে নেতৃত্ব ছেড়ে দিতে হবে। তখন মহানবী (সা.) জবাবে বলেন, ‘এ বিষয়টি আলস্নাহর হাতে এবং তিনি যাকে ইচ্ছা এ দায়িত্ব প্রদান করবেন।’ ইয়ামামার শাসক বনি আমের গোত্রের প্রধানের মতো একই প্র¯ত্মাব দিলে মহানবী (সা.) খুবই অসন্তুষ্ট হন এবং তার বুকে হাত দিয়ে তাকে সরিয়ে দেন। মহানবী (সা.) বিভিন্ন প্রসঙ্গে পরোড়্গ ও প্রত্যড়্গভাবে হযরত আলীকে তার উত্তরাধিকারী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন এবং এ ব্যাপারে তিনি উম্মতকে সাবধান করে দেন যে, স্বয়ং আলস্নাহতায়ালা হযরত আলীকে ওয়াছিয়াত ও খিলাফতের জন্য নির্বাচন করেছেন এবং এ ব্যাপারে মহানবীর (সা.) কোনো হাত নেই। উদাহরণস্বরূপ এখানে কয়েকটি ঘটনা উলেস্নখ করা হলো:
(১) বে’ছাতের (নবুওয়াত প্রাপ্তির ঘোষণা) পর মহানবী (সা.) যখন আলস্নাহর পড়্গ থেকে নিজের আত¥ীয়দেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান করার জন্য আদিষ্ট হলেন তখন সে বৈঠকেই তিনি হযরত আলীকে তার ওয়াজির, ওয়াছি ও তার পরবর্তী খলিফা হিসেবে ঘোষণা করেন।
(২) হযরত মূসা তার ভাই হারম্ননকে নিজের সহযোগী ও উজির হিসেবে নির্বাচিত করার জন্য আলস্নাহর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তারপর আলস্নাহ তার অনুরোধ কবুল করেন। সূরা ত্বাহার ৩৬ নম্বর আয়াতে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে: আলস্নাহ বললেন: ‘হে মূসা! তুমি যা চেয়েছো তা তোমাকে দেয়া হলো।’
মহানবী (সা.) যখন তাবুকের পথে রওনা হন তখন তার কাছে হযরত আলীর অবস্থান হযরত মূসার কাছে হযরত হারম্ননের অবস্থানের মতো বলে উলেস্নখ করেন। একথা পরিষ্কার যে, হযরত হারম্ননের যেসব গুণ ছিল হযরত আলীর মধ্যে নবুওয়াত ছাড়া বাকি সব গুণ ছিল। আলস্নাহর রাসূল (সা.) হযরত আলীকে বলেছিলেন, ‘হে আলী! আমার কাছে তোমার অবস্থান হচ্ছে মূসার কাছে হারম্ননের অবস্থানের অনুরূপ। তবে পার্থক্য হচ্ছে যে, আমার পরে আর কোনো নবী আসবেন না।’
আল্লাহতায়ালা স্মরণ করিয়ে দেন যে, তিনিই মানব জাতির নেতা ও ইমাম নির্ধারণ করেন। ইসলাম ধর্মে নেতৃত্ব ও ইমামত কেবল মানুষের দৈনন্দিন ও প্রচলিত জীবন ব্যবস্থার জন্য নয়। ইসলাম ধর্মে একজন ইমাম বা নেতা বৈষয়িক ও আধ্যাতি¥ক উভয় ক্ষেত্রের নেতা।
(৩) মহানবী (সা.) বুরাইদা ও অন্যান্য ইসলামী ব্যক্তিত্বকে বলেন যে, আমার পর আলী জনগণের নেতৃত্ব দানের জন্য সর্বাধিক উপযুক্ত।
(৪) গাদিরে খুমে মহানবী (সা.) ৮০ হাজার কিংবা তারও বেশি লোকের উপস্থিতিতে হযরত আলীর হাত উঁচু করে ধরেন এবং তাকে জনগণের মাওলা (শাসক) বলে পরিচয় করিয়ে দেন।
এসব বলিষ্ঠ প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও হাশেমীয় বংশ বিশেষ করে হযরত আলীকে মহানবীর উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। ইতালীয় গবেষক এল. কিটানির ‘আনালি দেল ইসলাম’ শিরোনামে একটি গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে উইলফ্রেড ম্যাডেলাং লিখেছেন, বিশ্বনবীর (সা.) ইšেত্মকালের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বনু সাইদা গোত্রের সাকিফা হাউসে আনসারদের বৈঠকে আকস্মিকভাবে হযরত আবু বকর মুহাম্মদের (সা.) উত্তরাধিকার দাবি করলে বনু হাশিম ও তার মধ্যে সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। এল. কিটানির উদ্ধৃতি দিয়ে এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে উইলফ্রেড ম্যাডেলাং আরো লিখেন, বনু হাশিম আবু বকরকে স্বীকৃতি দানে অস্বীকৃতি জানায় এবং নয়া খলিফা ও আয়েশাকে জানাজায় যোগদানের সুযোগ না দিয়ে তাদের বিখ্যাত আত¥ীয়কে (রাসূল সা.) গোপনে দাফন করে। অধিকাংশ বিবরণে বলা হয়, সাকিফা হাউসে হযরত আবু বকর তার উত্তরাধিকার লাভে মুহাম্মদের (সা.) নিজের বংশ কোরায়েশদের দাবিকে অগ্রগণ্য হিসেবে উলেস্নখ করেন। এল. কিটানি এসব বিবরণ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এ যুক্তি দেয়া হলে উত্তরাধিকারের উপর হযরত আলীর দাবি জোরালো হতো। তার মতে, হযরত আবু বকর বরং মুহাম্মদের (সা.) একজন নয়া উত্তরাধিকারী নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন যিনি তার পদাঙ্ক অনুসরণ করবেন, তার আদর্শ প্রচার করবেন এবং উম্মাহর ঐক্য বজায় রাখবেন। রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে উচ্চতর গুণাবলী এবং ব্যক্তিগত যোগ্যতার ভিত্তিতে আবু বকরকে নয়া নেতা হিসেবে বেছে নেয়া হয়। এল. কিটানি ‘আনালি দেল’-এর পরবর্তী সংস্করণে এইচ. লামেন্সের ‘ট্রায়াম্ভিরেট’ তত্ত্বকে ইসলামী খিলাফতের উৎপত্তির ব্যাখ্যা হিসেবে মেনে নিয়ে বলেন, হযরত উমর হলেন ইসলামী খিলাফতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা।
মুসলিম ইতিহাসবিদ সাইফ বিন উমর বলেন, আবু বকরের খলিফা নির্বাচিত হওয়ার সংবাদ পেয়ে হযরত আলী শুধুমাত্র গায়ের জামা পরে দ্রম্নত তার কাছে গিয়ে আনুগত্য প্রকাশ করেন। কিন্তু তার ভাষ্যের সঙ্গে অনেকে একমত নন। এখানে ইতিহাসবিদ উইলফ্রেড ম্যাডেলাংয়ের একটি উক্তি উলেস্নখের দাবি রাখে। তিনি ‘দ্য সাকশেসন টু মুহাম্মদ: এ স্টাডি অব দ্য আর্লি ক্যালিফেট’ শিরোনামে গ্রন্থের ১০ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, It is true that in modern life the choice of a chief lieutenant and adviser to succeed. But the succession to a ruler or king in a traditional society was normally based on dznastic kinship and the succession of a lieutenant and adviser, however close to the ruler, would have been considered highly irregular.
একথা সত্য যে, আধুনিক যুগে একজন প্রধান সহকারী কিংবা উপদেষ্টা উত্তরাধিকার লাভ করতে পারেন। কিন্তু একটি প্রাচীন সমাজ ব্যবস্থায় একজন শাসক বা রাজার উত্তরাধিকার সাধারণত বংশানুক্রমিক আত¥ীয়তার ভিত্তিতে নির্ধারিত হতো এবং শাসকের যত ঘনিষ্ঠ হোক না কেন, প্রধান সহকারী কিংবা উপদেষ্টার উত্তরাধিকারকে চরম অনিয়ম বলে বিবেচনা করা হতো
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার ‘পথের দাবি’ উপন্যাসে লিখেছেন, ‘আমরা আকাশের দিকে তাকাইয়া আকাশের মতো হা করিয়া চাহিয়া থাকি।’ কথাটাকে আমাদের ভাষায় বললে বলতে হয়, ইসলামে কোন কোন জায়গায় সংকট, কোথায় কোথায় সমস্যা তা হয়তো দেখার মতো আমাদের চোখ নেই অথবা সমস্যাগুলোকে আমরা অস্বীকার করছি। উট পাখির মতো মরম্নভূমিতে মাথা গুঁজে রেখে আমরা আর কতকাল পথ চলবো? আমাদেরকে জানতে হবে কোরআনে ইসলামী রাষ্ট্রের উত্তরাধিকার নির্ধারণে কোনো রূপরেখা দেয়া আছে কিনা, আলস্নাহর রসূলের (সা.) ওফাতের পরপর উত্তরাধিকার নিয়ে সংকট দেখা দিলো কেন, তার অতি আদরের নাতি ইমাম হোসেনকে কোন কারণে শহীদ করা হলো, শাšিত্মর ধর্ম ইসলামে কেন গৃহযুদ্ধের দাবানল জ্বলে উঠলো, কেন মুসলিম উম্মাহকে রক্তগঙ্গায় ভাসতে হলো, কেন একই ধর্মের অনুসারীরা দুটি ধারায় বিভক্ত হয়ে গেলো এবং এ দুর্ভাগ্যের জন্য কে বা কারা দায়ী আমাদেরকে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে হবে। অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে বিচার করলে দেখা যাবে যে, রসূলের মনোনীত উত্তরাধিকারী খিলাফত পেলে কারবালার মর্মাšিত্মক ঘটনা ঘটতো না এবং হযরত আলীর উত্তরসূরিরা উমাইয়া ও আব্বাসীয়দের প্রতিহিংসার শিকার হতেন না। রাসূলুলস্নাহ জানতেন যে, তার বংশের বাইরের কেউ খিলাফত পেলে তার পরিবারের রক্ত ঝরবে। এজন্য তিনি তার জামাতা ও চাচাতো ভাই হযরত আলীকে তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করেছিলেন।
মুহাম্মদ (সা:) শুধু মসজিদে নববীর ইমাম ছিলেন তা নয়, তিনি ছিলেন একজন রাষ্ট্রনায়ক, মিলিটারি কমান্ডার, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও যুগের বিপস্নবী মহানায়ক। এক কথায়, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। উম্মত তার সব সত্ত্বা অক্ষুণ্ণ রেখেছে৷ কিন্তু রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তার সত্ত্বাকে ভূলুন্ঠিত করেছে। দুনিয়ার চুনোপুটি রাষ্ট্রনায়কের উত্তরাধিকারী খুঁজে পাওয়া যায়। আর বায়োগ্রাফিতে এই মহামানবের উত্তরাধিকারীর জায়গাটি ফাঁকা।
কয়েক হাজার বছরের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে যে, ড়্গমতাসীন পরিবারের বাইরের ব্যক্তি উত্তরাধিকার লাভ করতে পারে না। উত্তরাধিকার লাভ করেন শাসকের পুত্র। পুত্র সšত্মান না থাকলে মেয়েও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার লাভ করেন। এ নিয়মে ১৯৫৩ সালের ২ জুন রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ব্রিটিশ রাজ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। তিনি ছিলেন রাজা ষষ্ঠ জর্জের কন্যা। রাজা ষষ্ঠ জর্জের পুত্র সšত্মান না থাকায় জ্যেষ্ঠ কন্যা হিসেবে তিনি সিংহাসন লাভ করেন। পিতামহ রাজা পঞ্চম জর্জের রাজত্বকালে এলিজাবেথ ছিলেন ব্রিটিশ সিংহাসনের উত্তরাধিকার লাইনে চাচা এডওয়ার্ড ও পিতার পেছনে তৃতীয় অবস্থানে। তার জন্ম জনগণের মধ্যে আগ্রহের সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু তিনি রানী হবেন এমন প্রত্যাশা কেউ করেনি। কেননা তার চাচা এডওয়ার্ড তখনো ছিলেন তরম্নণ। তিনি বিয়ে করলে এবং পুত্র সšত্মানের পিতা হলে তার পুত্র হবেন ব্রিটিশ রাজা। ১৯৩৬ সালে পঞ্চম জর্জের মৃত্যু হলে এলিজাবেথের চাচা এডওয়ার্ড ‘অষ্টম এডওয়ার্ড’ নাম গ্রহণ করে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তখন এলিজাবেথ উত্তরাধিকার লাইনে তার পিতার পেছনে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে আসেন। একই বছরের শেষদিকে এডওয়ার্ড তালাকপ্রাপ্ত ওয়ালিস সিম্পসনের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের প্র¯ত্মাব দিলে তাকে সিংহাসন ত্যাগ করতে হয়। এডওয়ার্ডের সিংহাসন ত্যাগ একটি সাংবিধানিক সংকটের জন্ম দেয়। এ পরিস্থিতিতে এলিজাবেথের পিতা ‘ষষ্ঠ জর্জ’ নাম গ্রহণ করে রাজা হন। ভাই না থাকায় এলিজাবেথ পিতার উত্তরাধিকারীর সারিতে বহাল থাকেন। সে সময় অগ্রজ পুরম্নষ সšত্মান হতেন উত্তরাধিকারী। পরবর্তীতে তার পিতামাতার পুত্র সšত্মান হলে তিনি বাদ পড়ে যেতেন। কিন্তু কোনো ভাই জন্ম না নেয়ায় এলিজাবেথ রানী হন।
শুধু পুত্র বা মেয়ে নয়, নাতিও উত্তরাধিকার লাভ করতে পারে। বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব আলীবর্দী খানের পুত্র সšত্মান না থাকায় নাতি সিরাজউদ্দৌলাকে উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করা হয়। সিরাজউদ্দৌলার উত্তরাধিকার প্রশ্নবিদ্ধ। কেননা আলীবর্দী খান ছিলেন দিলিস্নর মোগল সম্রাট মোহাম্মদ শাহর একজন সুবাদার। উত্তরাধিকার নিয়োগের অধিকার ছিল দিলিস্নর মোগল সম্রাটের, আলীবর্দী খানের নয়। একইভাবে আলীবর্দী খানের উত্তরাধিকারও প্রশ্নবিদ্ধ। নাতিদের উপযুক্ত বিবেচনা করা না হলে উত্তরাধিকার লাভ করেন মেয়ে জামাতা। রাজ্য শাসনের দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে প্রত্যেক শাসক তার পরবর্তী উত্তরাধিকারী নিয়োগে মনোযোগ দেন। পুত্রকে অবিশ্বাস করলে মেয়েকে এমন পাত্র দেখে বিয়ে দেয়া হয় যার কাছে ড়্গমতা হ¯ত্মাšত্মর করা যায়।
বন্ধু-বান্ধব অথবা দূরবর্তী আত¥ীয়কে উত্তরাধিকারী নিয়োগের দৃষ্টাšত্ম নেই বললে চলে। উত্তরাধিকারী নির্বাচন হুবহু পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভ করার মতো। পিতার সম্পত্তিতে সšত্মান ছাড়া বাইরের লোক অংশীদারিত্ব লাভ করতে পারে না। স্ত্রী আইনসঙ্গতভাবে মৃত স্বামীর পরিত্যক্ত সম্পত্তির অংশীদারিত্ব পেয়ে থাকেন। যে কেউ ইচ্ছা করলে গদিতে বসতে পারে না। পৃথিবীর প্রত্যেক জাতি এবং প্রত্যেক সভ্যতা নির্দিষ্ট আইন বা রীতিনীতি অনুসরণ করে। আইনানুগভাবে প্রত্যেক উত্তরাধিকারী ড়্গমতা লাভ করেন। উত্তরাধিকার লাভে আইন বা শৃঙ্খলা না থাকলে রাষ্ট্রে গোলযোগ দেখা দিতে বাধ্য। আলোচনা করলে দেখা যাবে যে, তিনটি উপায়ে রাজনৈতিক ড়্গমতা লাভ করা যায়। প্রথমত: ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে রাজনৈতিক ড়্গমতা দখল করা যায়। দ্বিতীয়ত: নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গদিতে বসা যায় এবং তৃতীয়ত: উত্তরাধিকারসূত্রে রাজনৈতিক ড়্গমতা হাসিল করা যায়। বিশ্বনবীর (সা.) যুগে ষড়যন্ত্র বা অবৈধ পন্থায় এবং উত্তরাধিকারসূত্রে রাজত্ব লাভ করা যেতো। রোমান সাম্রাজ্য ছাড়া অন্য কোথাও নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজত্ব পাওয়ার নজির নেই। বিশ্বনবী (সা.) রাষ্ট্রড়্গমতা লাভে গণতান্ত্রিক পন্থা তো নয়ই, কোনো ধরনের রাজনৈতিক দর্শনও উপস্থাপন করেননি।
গতানুগতিক ঐতিহাসিক বিবরণীতে বলা হয়, বিশ্বনবীর (সা.) ওফাতের পর পর রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয়। মদিনার আনসাররা নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে খলিফা নির্বাচনের উদ্যোগ নিয়েছিল। মোহাজিররাও একই উদ্যোগ নেয়। এ সন্ধিড়্গণে ইসলামী খিলাফত দ্বিখ-িত হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। আনসাররা মোহাজিরদের নেতৃত্ব মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। হযরত উমর তার বিশ্বাসে অবিচল ছিলেন যে, অবশ্যই খিলাফতকে মক্কার মোহাজিরদের নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। প্রাক-ইসলাম যুগে মদিনার আউস ও খাজরাজ গোত্রের মধ্যে তুমুল গোত্রগত বিরোধ ছিল। হযরত উমর (রা.) এক কিংবা দুদিন দীর্ঘ আলোচনা চালিয়ে দক্ষতার সঙ্গে আনসারদের মধ্যে তাদের পুরনো গোত্রীয় বিরোধ উস্কে দেন। হযরত উমর (রা.) খিলাফতের ঐকমত্যের প্রার্থী হিসেবে আবু বকরের (রা.) হাতে হাত রেখে সাকিফা বৈঠকে উপস্থিত সবার মতবিরোধের অবসান ঘটান।
জুবায়ের ছিলেন ইসলামের একজন বীর যোদ্ধা এবং সাহসী পুরম্নষ। তলোয়ার চালনায় তিনি ছিলেন সুদড়্গ। তার তলোয়ারের আঘাত অন্যান্য আঘাতের মধ্যেও চেনা যেতো। এ কারণে খলিফা আবু বকরের লোকজন বিপদ দেখে দলবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার হাত থেকে তলোয়ার কেড়ে নেয় এবং একটি রক্তপাতের ঘটনা প্রতিরোধ করে। হযরত উমরের এত পীড়াপীড়ি করার কিংবা তথাকথিত আত¥ত্যাগের কারণ কি ছিল? তিনি কি সত্যিকার সৎ নিয়তে ময়দানে নেমেছিলেন নাকি তার ও হযরত আবু বকরের মধ্যে কোনো ধরনের চুক্তি বা সমঝোতা হয়েছিল?
হযরত আবু বকরকে খলিফা নির্বাচনে হযরত উমর অশেষ চেষ্টা চালান। তার উদ্দেশ্য ছিল হযরত আবু বকর তার ইšেত্মকালের সময় তাকে যেন খলিফা মনোনীত করে যান। খিলাফতের প্রাথমিক দিনগুলোতে হযরত আলী তাই হযরত উমরকে বলেছিলেন, ‘হে উমর! ভালোমতো দোহন করম্নন। কারণ তার অর্ধেক তো আপনারই। খিলাফতের গাধাটিকে আবু বকরের জন্য শক্ত করে বাঁধুন যাতে কাল আপনার কাছেই ফিরে আসে।’ হযরত আবু বকর অকৃতজ্ঞতা দেখাননি। মৃত্যুশয্যায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগে হযরত উসমানকে ডেকে পাঠান এবং তাকে এভাবে লেখার নির্দেশ দেন:
‘এটা হলো আবদুলস্নাহ ইবনে উসমানের (আবু বকরের নাম) পার্থিব জীবনের শেষ মুহূর্তে এবং পারলৌকিক জীবনের সূচনালগ্নে মুসলমানদের প্রতি অঙ্গীকারনামা যে লগ্নে মু’মিন ব্যক্তি কমর্, চিšত্মা ও সদাচারের মধ্যে আর কাফের আত¥সমর্পণের মধ্যে থাকে।’ খলিফার কথা এ পর্যšত্ম লেখা হলে তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়েন। খলিফা তার অসিয়তনামা সম্পূর্ণ করার আগেই ইšেত্মকাল করেন। (সূত্র: বেলায়াতের দ্যুতি, আয়াতুলস্নাহ জাফর সুবহানী, পৃষ্ঠা-২৪৯-২৫০)
হযরত উমর জনগণের আবেদনের জবাবে বলেছিলেন যে, ‘আবু উবায়দা বেঁচে থাকলে তাকেই তিনি তার উত্তরাধিকারী নির্বাচিত করতেন। কারণ রাসূলুলস্নাহর (সা.) কাছ থেকে তিনি শুনেছিলেন যে, আবু উবায়দা হলেন উম্মতের আমিন (আমানতদার)। আবু হুজায়ফার মনিব সালেম সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, আজ যদি আবু হুজায়ফার মনিব সালেম বেঁচে থাকতো তাহলে তিনি তাকে তার উত্তরাধিকারী নির্বাচিত করতেন। কারণ আমি রাসূলুলস্নাহর (সা.) কাছ থেকে শুনেছিলেন সালেম হলো আলস্নাহর বন্ধু। হযরত উমর সে সময় জীবিতদের নিয়ে চিšত্মা করার পরিবর্তে মৃতদের নিয়ে চিšত্মা করছিলেন যা ছিল তার সময় জীবিতদের প্রতি অবহেলার নামাšত্মর। আবু উবায়দা ও সালেমকে নির্বাচিত করার মাপকাঠি যদি হয় তাদের একজনকে আমিন এবং আরেকজনকে আলস্নাহর বন্ধু হিসেবে রাসূলুলস্নাহর (সা.) প্রশংসা তাহলে হযরত উমর কেন আলী ইবনে আবি তালিবের কথা একবারও স্মরণ করেননি? হযরত আলী তো ছিলেন সেই ব্যক্তি যার সম্পর্কে রাসূলুলস্নাহ (সা.) বলেছিলেন, আলী সত্যের সঙ্গে আর সত্য আলীর সঙ্গে? হযরত উমর তো জানতেন যে, হযরত আলী মর্যাদা, গুণ, পবিত্র মানসিকতা, অতুলনীয় বিচারকার্য, বীরত্ব, আলস্নাহর কিতাব ও রাসূলুলস্নাহর সুন্নাতের জ্ঞানে অন্যদের চেয়ে অগ্রগণ্য। তাহলে কেন তিনি আলীর নামটি মুখে আনেননি? শূরার মাধমে খলিফা নির্বাচন ঐশী ঘোষণার অনুসরণ নয়। যদি পরবর্তী খলিফাকে পূর্ববর্তী খলিফাই নির্ধারণ করে যাবেন তাহলে হযরত উমর কেন এ দায়িত্বভার শূরার ওপর ন্য¯ত্ম করেছিলেন?
এ সংকট এজন্য দেখা দিয়েছিল যে, হয়তো বিশ্বনবী (সা.) কাউকে তার উত্তরাধিকারী মনোনীত করেননি অথবা তার মনোনীত উত্তরাধিকারীকে অবজ্ঞা করা হয়েছিল। এখান থেকেই ইসলামের ইতিহাসে সংকট শুরম্ন হয়। এ সত্য সাধারণ মানুষের কাছে ধরা না পড়লেও ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে পারেনি। ইসলামে উত্তরাধিকারের সংকট নিয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জার্মান ইতিহাসবিদ উইলফ্রেড ম্যাডেলাং ‘দ্য সাকশেসন টু মুহাম্মদ: এ স্টাডি অব দ্য আর্লি ক্যালিফেট’ শিরোনামে গ্রন্থের প্রথম পৃষ্ঠায় লিখেছেন: No event in history has devided Islam profoundly and durably than the succession to Muhammad. The right to occupy the Prophet’s place as the head of the Muslim community after his death became a question of great religious weight which has separated the Sunnites and Shi’its until the present. The issue of right and wrong in the matter has long since been settled in their minds. For Sunnites, the first caliph Abu Bakr was the only rightful successor since he was the most excellent men after the Prophet. Although Muhammad had not explicitly appointed him as his successor, his preference for him was indicated by his order for Abu Bakr to lead Muslims in prayer during his final illness. For Shi’its it was Muhammad’s cousin and son-in-law Ali, who on account of his early merits in Islam as well as his close kinship, had been appointed by the Prophet as his successor. His rightful position was then userped by Abu Bakr with the backing of the majority of Muhammad’s companions.
মুহাম্মদের উত্তরাধিকার নিয়ে গোলযোগের চেয়ে ইতিহাসের অন্য কোনো ঘটনা ইসলামকে এত গভীর ও স্থায়ীভাবে বিভক্ত করেনি। মুহাম্মদের ইšেত্মকালের পর মুসলিম উম্মাহর প্রধান হিসেবে তার স্থান দখল করার অধিকার একটি বিরাট ধর্মীয় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। এখনো এ বিষয় মুসলিম উম্মাহকে সুন্নি ও শিয়া সম্প্রদায়ে বিভক্ত করে রেখেছে। তাদের অšত্মরে ন্যায়-অন্যায়ের বিষয়টি অনেক আগেই স্থির হয়ে গেছে। সুন্নিদের মতে, বিশ্বনবীর (সা.) পর প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা.) যোগ্যতম ব্যক্তি হওয়ায় তিনি ছিলেন একমাত্র সঠিক উত্তরাধিকারী। মুহাম্মদ (সা.) হযরত আবু বকরকে স্পষ্টভাবে তার উত্তরাধিকারী মনোনীত করেননি। তবে তার অšিত্মম অসুস্থতার সময় আবু বকরকে মুসলমানদের নামাজে ইমামতি করার নির্দেশ দিয়ে তিনি তার প্রতি অগ্রাধিকারের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। হযরত আবু বকরের অনুকূলে মুসলমানদের ঐকমত্য চূড়াšত্মভাবে আলস্নাহ অনুমোদন করেন। শিয়াদের মতে, মুহাম্মদ (সা.) তার চাচাতো ভাই ও মেয়ে জামাতা হযরত আলীকে তার উত্তরাধিকারী মনোনীত করেছিলেন। ইসলামের প্রাথমিক দিনগুলোতে বীরত্ব প্রদর্শন করায় এবং ঘনিষ্ঠ আত¥ীয় হওয়ায় মুহাম্মদ (সা.) তাকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেছিলেন। পরবর্তীতে হযরত আবু বকর মুহাম্মদের (সা.) অধিকাংশ সাহাবীর সমর্থনে তার বৈধ অধিকার কেড়ে নেন।
হযরত আবু বকরকে নামাজে ইমামতি করার অনুমতি দান যদি তার খিলাফত লাভের ইঙ্গিত বহন করে তাহলে হযরত উমরের পরবর্তী খলিফা হওয়ার কথা আবদুর রহমান বিন আউফের। কেননা ইমামতি করা অবস্থায় ছুরিকাঘাত করা হলে হযরত উমর হযরত আবদুর রহমান বিন আউফের হাত ধরে ফেলেন এবং তাকে বাদবাকি নামাজে ইমামতি করার জন্য ইশারা করেন। কিন্তু আবদুর রহমান বিন আউফ খলিফা হননি। খলিফা হয়েছিলেন হযরত উসমান।
নবী (সা.) গাদিরে খুমে তার মেয়ে জামাতা হযরত আলীকে তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী নিয়োগ করেছিলেন। রসূলের (সা.) ইšেত্মকালের পর শাসনতান্ত্রিক ধারাবাহিকতায় খিলাফতের দায়িত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে হযরত আলীর উপর বর্তায়। কিন্তু আমাদের নবীর মৃত্যুর সুযোগে এ ধারাবাহিকতা লংঘন করা হয়। হযরত আলী তার বিভিন্ন ভাষণে তার অধিকারের কথা স্মরণ করেছেন এবং বলেছেন, যেদিন রাসূলুলস্নাহ দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন সেদিন থেকে তাকে সে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
আলস্নাহর শপথ, যেদিন আলস্নাহ তার নবীর (সা.) রূহ পরিগ্রহণ করেন সেদিন থেকে অদ্যাবধি আমি আমার অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলাম। (সূত্র: নাহজুল বালাগা, আবদুহ, খুৎবা নম্বর-৫)
আমরা একটি মহাসত্যকে ধামাচাপা দিয়েছি। আলস্নাহর রসূলের ওফাতের পর হযরত আবু বকর, হযরত উমর ও হযরত আবু উবায়দা বনু সাইদার সাকিফা হাউজে নয়া খলিফা নির্বাচনের বৈঠকে যোগদান করেন। তখনো আলস্নাহর রসূলের লাশ দাফন করা হয়নি। সাকিফা হাউজের বৈঠকে নবী পরিবারের কাউকে উপস্থিত রাখা হয়নি। হযরত আলী অথবা হযরত ফাতিমাকে উপস্থিত রাখা হলে আবু বকর খলিফা হতে পারতেন কিনা সন্দেহ। গাদিরে খুমে হযরত আলীকে আলস্নাহর রসূলের প্রতিনিধি নির্বাচনের কথা তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হলে তারা পিছিয়ে যেতে বাধ্য হতেন। ইতিহাসবিদ উইলফ্রেড ম্যাডেলাং বৈরম্নতভিত্তিক আল-বশীরের সম্পাদক এইচ. লামেন্সের একটি নিবন্ধের উদ্ধৃতি দিয়ে ‘দ্য সাকশেসন টু মুহাম্মদ: এ স্টাডি অব দ্য আর্লি ক্যালিফেট’ গ্রন্থের তিন নম্বর পৃষ্ঠায় লিখেছেন: Although Lammens did not speak of a conspiracy to seize the succession, his presentation of the activity of the triumvirate suggests this term. In particular through Abu Bakr’s and Umar’s daughters Aisha and Hafsa, who kept their fathers informed about every move and secret thought of their husband Mohammad, these two men came to exert great influence on the Prophet’s actions and thus prepared the stage for their seizure of power.
(লামেন্স উত্তরাধিকার দখলের কোনো ষড়যন্ত্রের কথা উলেস্নখ করেননি। তবে ত্রয়ীদের কার্যকলাপ সম্পর্কে তার উপস্থাপনায় এ শব্দটি প্রকাশ পেয়েছে।বিশেষ করে আবু বকর ও উমরের কন্যা আয়েশা ও হাফসা নিজ নিজ পিতাকে তাদের স্বামী বিশ্বনবীর (সা.) প্রতিটি পদড়্গপে ও গোপন চিšত্মাভাবনা সম্পর্কে অবহিত রাখতেন। কন্যাদের মাধ্যমে এ দুই ব্যক্তি নবীর কাজকর্মে বিরাট প্রভাব বি¯ত্মার করেন এবং তাদের ড়্গমতা দখলের মঞ্চ প্রস্তুত করেন।)
তবে পাশ্চাত্যের আধুনিক গবেষকরা লামেন্সের এ তত্ত্বকে অনির্ভরযোগ্য হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। এইচ. লামেন্স আরো বলেছেন, বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকার আরবদের স্বভাব বিরম্নদ্ধ ছিল। অন্যদিকে, ই. টায়ান ‘ইসলামিক পলিটিক্যাল থট’-এ তাকে চ্যালেঞ্জ করে বলেন, বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকার আরব গোত্রগুলোর মধ্যে অজ্ঞাত ছিল না। কোরায়েশদের মধ্যে বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারের রীতি চালু ছিল। ডবিস্নউ এম. ওয়াট একইভাবে বলেন যে, কোনো বিশেষ পরিবারের ব্যক্তিকে গোত্র প্রধান হিসেবে নির্বাচন করা ছিল আরবদের স্বভাব। তিনি একথাও বলেন যে, মুহাম্মদের (সা.) পালিত পুত্র জায়েদ ইবনে হারিস জীবিত থাকলে অনায়াসে তিনি তার উত্তরাধিকার লাভ করতেন।
১৯১০ সালে প্রকাশিত ‘ট্রায়াম্ভিরেট অব আবু বকর, উমর এন্ড আবু উবায়দা’ শিরোনামে লামেন্সের নিবন্ধে আরো বলা হয়, বিশ্বনবীর (সা.) জীবদ্দশায় তার উত্তরাধিকার লাভে হযরত আবু বকর, উমর ও আবু উবায়দার মধ্যে ত্রয়ী ঐক্যের সূচনা হয়। এ ঐকমত্য হযরত আবু বকর ও হযরত উমরকে পরপর খলিফা হতে সহায়তা করে। আবু উবায়দার মৃত্যু না হলে তিনি হযরত উমরের পর খিলাফত লাভ করতেন।
‘সাকিফায় সরকার গঠন করা হয়। হযরত আবু বকর ‘খলিফা’ হলেন। আবু উবায়দাকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের দায়িত্ব দেয়া হয়। নয়া ‘খলিফা’ উমরকে হাকিমের দায়িত্ব অর্পণ করেন। বর্তমান যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বললে বলতে হয়, প্রথমজন উচ্চ রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অধিকারী ছিলেন। দ্বিতীয়জন অর্থনৈতিক কর্তৃত্বের অধিকারী ছিলেন এবং তৃতীয়জন আইন বিভাগের কর্তৃত্বের অধিকারী ছিলেন। ইসলামী সরকারের গুরম্নত্বপূর্ণ পদ এই তিনজনের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয় যারা সাকিফার দিনে গুরম্নত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং তারা এটা হঠাৎ করে করেনি। বরং তা আগে থেকেই রচিত হয়েছিল।’ (সূত্র: ফাদাক: হযরত ফাতিার স্মৃতিবিজড়িত ইতিহাস: সৈয়দ মুহাম্মদ বাকের আস সদর: পৃষ্ঠা-৬৪)
ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, এ বিভেদের কারণ একটি বিশ্বাসগত মৌল বিষয়ের মধ্যে নিহিত। আর তা হলো ইমামত। কারণ ইসলামের অন্য কোনো মৌল বিষয়ের জন্য কেউ অস্ত্র ধারণ করেনি। সুতরাং ইমামত এ অনৈক্যের সর্ববৃহৎ কারণ। যুগ যুগ ধরে ইমামতের বিষয়টি গভীরভাবে চিšত্মা করা হয়নি। বরং দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টিকে দেখা হয়েছে। যদি উভয়পড়্গ বিশেস্নষণের দৃষ্টিতে (শত্রম্নতার দৃষ্টিতে নয়) পরস্পরের উপস্থাপিত দলিল-প্রমাণগুলো দেখতেন তাহলে সত্য প্রকাশিত হতো এবং সত্যাকাঙ্খীদের সামনে সত্যের সূর্য উদিত হতো। (সূত্র: আল মুরাজায়াত, আলস্নামা সাইয়েদ আবদুল হুসাইন শারফুদ্দিন আল মুসাভি, পৃষ্ঠা-৬)
মহানবী (সা.) যেদিন তার রিসালাতের কথা ঘোষণা করেন সেদিনই হযরত আলীকে খিলাফত প্রদান করেন এবং তাকে তার উত্তরাধিকারী হিসেবে ঘোষণা করেন। মহানবী (সা.) তার রিসালাতের সুদীর্ঘ ২৩ বছরে বিভিন্ন সময় উপমা ও ইশারায় নেতৃত্বের জন্য হযরত আলীর যোগ্যতা ও উপযুক্ততার কথা বারবার লোকদের স্মরণ করিয়ে দেন এবং তার মৃত্যুর পর আলীর সম্ভাব্য বিরোধিতাকারীদের নসিহত ও উপদেশ দেন। কখনো কখনো আলস্নাহর শা¯িত্মর ভয় দেখান। শুধু কি হযরত আলী? আলস্নাহর রসূল ইমাম হাসান ও হোসেনকেও তার উত্তরাধিকারী হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। সাইয়েদ ইবনে তাউসের ‘কারবালা ও হযরত ইমাম হোসেনের শাহাদাত’ শিরোনামে গ্রন্থের ১৫ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়:
রসূলে খোদা এক সফর থেকে চিšিত্মত অবস্থায় ফিরে আসেন এবং মসজিদে নববীর মিম্বরে দাঁড়িয়ে খুৎবা প্রদান করেন। লোকদেরকে উপদেশ দেন। আর তার পাশে অবস্থানকারী ইমাম হাসানের মাথায় ডান হাত এবং ইমাম হোসেনের মাথায় বাম হাত রেখে আসমানের দিকে মাথা তুলে বললেন, ‘ইয়া আলস্নাহ, মুহাম্মদ তোমার বান্দা ও তোমার রসূল। এ দুজন আমার বংশের পবিত্র ও সম্মানিত ব্যক্তি। তাদেরকে আমার উম্মতের মাঝে আমার উত্তরাধিকারী হিসেবে রেখে যাচ্ছি।
কারবালায় ইমাম হোসেনের পুরম্নষ সাথীদের মধ্যে ইমাম জয়নুল আবেদীন ছাড়া সবাই নিহত হন। অসুস্থ না থাকলে জয়নুল আবেদীনও নিহত হতেন। তার বেঁচে যাওয়ার মধ্যে কি কোনো ঐশী বার্তা নেই? মহান আলস্নাহ জানতেন যে, নেতৃত্ব দেয়ার মতো কেউ না থাকলে ইসলাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তাই তিনি জয়নুল আবেদীনকে বাঁচিয়ে রাখেন।
বনু আমের গোত্রের প্রধান মহানবীর (সা.) কাছে প্র¯ত্মাব দেয় যে, তারা কঠোরভাবে তার দ্বীনকে রড়্গা করতে প্রস্তুত, তবে শর্ত হলো যে, তার পরে তাদের হাতে নেতৃত্ব ছেড়ে দিতে হবে। তখন মহানবী (সা.) জবাবে বলেন, ‘এ বিষয়টি আলস্নাহর হাতে এবং তিনি যাকে ইচ্ছা এ দায়িত্ব প্রদান করবেন।’ ইয়ামামার শাসক বনি আমের গোত্রের প্রধানের মতো একই প্র¯ত্মাব দিলে মহানবী (সা.) খুবই অসন্তুষ্ট হন এবং তার বুকে হাত দিয়ে তাকে সরিয়ে দেন। মহানবী (সা.) বিভিন্ন প্রসঙ্গে পরোড়্গ ও প্রত্যড়্গভাবে হযরত আলীকে তার উত্তরাধিকারী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন এবং এ ব্যাপারে তিনি উম্মতকে সাবধান করে দেন যে, স্বয়ং আলস্নাহতায়ালা হযরত আলীকে ওয়াছিয়াত ও খিলাফতের জন্য নির্বাচন করেছেন এবং এ ব্যাপারে মহানবীর (সা.) কোনো হাত নেই। উদাহরণস্বরূপ এখানে কয়েকটি ঘটনা উলেস্নখ করা হলো:
(১) বে’ছাতের (নবুওয়াত প্রাপ্তির ঘোষণা) পর মহানবী (সা.) যখন আলস্নাহর পড়্গ থেকে নিজের আত¥ীয়দেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান করার জন্য আদিষ্ট হলেন তখন সে বৈঠকেই তিনি হযরত আলীকে তার ওয়াজির, ওয়াছি ও তার পরবর্তী খলিফা হিসেবে ঘোষণা করেন।
(২) হযরত মূসা তার ভাই হারম্ননকে নিজের সহযোগী ও উজির হিসেবে নির্বাচিত করার জন্য আলস্নাহর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তারপর আলস্নাহ তার অনুরোধ কবুল করেন। সূরা ত্বাহার ৩৬ নম্বর আয়াতে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে: আলস্নাহ বললেন: ‘হে মূসা! তুমি যা চেয়েছো তা তোমাকে দেয়া হলো।’
মহানবী (সা.) যখন তাবুকের পথে রওনা হন তখন তার কাছে হযরত আলীর অবস্থান হযরত মূসার কাছে হযরত হারম্ননের অবস্থানের মতো বলে উলেস্নখ করেন। একথা পরিষ্কার যে, হযরত হারম্ননের যেসব গুণ ছিল হযরত আলীর মধ্যে নবুওয়াত ছাড়া বাকি সব গুণ ছিল। আলস্নাহর রাসূল (সা.) হযরত আলীকে বলেছিলেন, ‘হে আলী! আমার কাছে তোমার অবস্থান হচ্ছে মূসার কাছে হারম্ননের অবস্থানের অনুরূপ। তবে পার্থক্য হচ্ছে যে, আমার পরে আর কোনো নবী আসবেন না।’
আল্লাহতায়ালা স্মরণ করিয়ে দেন যে, তিনিই মানব জাতির নেতা ও ইমাম নির্ধারণ করেন। ইসলাম ধর্মে নেতৃত্ব ও ইমামত কেবল মানুষের দৈনন্দিন ও প্রচলিত জীবন ব্যবস্থার জন্য নয়। ইসলাম ধর্মে একজন ইমাম বা নেতা বৈষয়িক ও আধ্যাতি¥ক উভয় ক্ষেত্রের নেতা।
(৩) মহানবী (সা.) বুরাইদা ও অন্যান্য ইসলামী ব্যক্তিত্বকে বলেন যে, আমার পর আলী জনগণের নেতৃত্ব দানের জন্য সর্বাধিক উপযুক্ত।
(৪) গাদিরে খুমে মহানবী (সা.) ৮০ হাজার কিংবা তারও বেশি লোকের উপস্থিতিতে হযরত আলীর হাত উঁচু করে ধরেন এবং তাকে জনগণের মাওলা (শাসক) বলে পরিচয় করিয়ে দেন।
এসব বলিষ্ঠ প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও হাশেমীয় বংশ বিশেষ করে হযরত আলীকে মহানবীর উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। ইতালীয় গবেষক এল. কিটানির ‘আনালি দেল ইসলাম’ শিরোনামে একটি গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে উইলফ্রেড ম্যাডেলাং লিখেছেন, বিশ্বনবীর (সা.) ইšেত্মকালের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বনু সাইদা গোত্রের সাকিফা হাউসে আনসারদের বৈঠকে আকস্মিকভাবে হযরত আবু বকর মুহাম্মদের (সা.) উত্তরাধিকার দাবি করলে বনু হাশিম ও তার মধ্যে সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। এল. কিটানির উদ্ধৃতি দিয়ে এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে উইলফ্রেড ম্যাডেলাং আরো লিখেন, বনু হাশিম আবু বকরকে স্বীকৃতি দানে অস্বীকৃতি জানায় এবং নয়া খলিফা ও আয়েশাকে জানাজায় যোগদানের সুযোগ না দিয়ে তাদের বিখ্যাত আত¥ীয়কে (রাসূল সা.) গোপনে দাফন করে। অধিকাংশ বিবরণে বলা হয়, সাকিফা হাউসে হযরত আবু বকর তার উত্তরাধিকার লাভে মুহাম্মদের (সা.) নিজের বংশ কোরায়েশদের দাবিকে অগ্রগণ্য হিসেবে উলেস্নখ করেন। এল. কিটানি এসব বিবরণ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এ যুক্তি দেয়া হলে উত্তরাধিকারের উপর হযরত আলীর দাবি জোরালো হতো। তার মতে, হযরত আবু বকর বরং মুহাম্মদের (সা.) একজন নয়া উত্তরাধিকারী নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন যিনি তার পদাঙ্ক অনুসরণ করবেন, তার আদর্শ প্রচার করবেন এবং উম্মাহর ঐক্য বজায় রাখবেন। রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে উচ্চতর গুণাবলী এবং ব্যক্তিগত যোগ্যতার ভিত্তিতে আবু বকরকে নয়া নেতা হিসেবে বেছে নেয়া হয়। এল. কিটানি ‘আনালি দেল’-এর পরবর্তী সংস্করণে এইচ. লামেন্সের ‘ট্রায়াম্ভিরেট’ তত্ত্বকে ইসলামী খিলাফতের উৎপত্তির ব্যাখ্যা হিসেবে মেনে নিয়ে বলেন, হযরত উমর হলেন ইসলামী খিলাফতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা।
মুসলিম ইতিহাসবিদ সাইফ বিন উমর বলেন, আবু বকরের খলিফা নির্বাচিত হওয়ার সংবাদ পেয়ে হযরত আলী শুধুমাত্র গায়ের জামা পরে দ্রম্নত তার কাছে গিয়ে আনুগত্য প্রকাশ করেন। কিন্তু তার ভাষ্যের সঙ্গে অনেকে একমত নন। এখানে ইতিহাসবিদ উইলফ্রেড ম্যাডেলাংয়ের একটি উক্তি উলেস্নখের দাবি রাখে। তিনি ‘দ্য সাকশেসন টু মুহাম্মদ: এ স্টাডি অব দ্য আর্লি ক্যালিফেট’ শিরোনামে গ্রন্থের ১০ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, It is true that in modern life the choice of a chief lieutenant and adviser to succeed. But the succession to a ruler or king in a traditional society was normally based on dznastic kinship and the succession of a lieutenant and adviser, however close to the ruler, would have been considered highly irregular.
একথা সত্য যে, আধুনিক যুগে একজন প্রধান সহকারী কিংবা উপদেষ্টা উত্তরাধিকার লাভ করতে পারেন। কিন্তু একটি প্রাচীন সমাজ ব্যবস্থায় একজন শাসক বা রাজার উত্তরাধিকার সাধারণত বংশানুক্রমিক আত¥ীয়তার ভিত্তিতে নির্ধারিত হতো এবং শাসকের যত ঘনিষ্ঠ হোক না কেন, প্রধান সহকারী কিংবা উপদেষ্টার উত্তরাধিকারকে চরম অনিয়ম বলে বিবেচনা করা হতো