শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
রাজনীতি সংস্কার পরিষদ নিয়ে বিএনপি-জামায়াত মতভেদ

সংস্কার পরিষদ নিয়ে বিএনপি-জামায়াত মতভেদ

বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসের এক মাহেন্দ্রক্ষণে  মঙ্গলবার শেরেবাংলা নগরের জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় উৎসবের আমেজের পাশাপাশি রাজনৈতিক নাটকীয়তাও তুঙ্গে উঠেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী জনপ্রতিনিধিদের শপথ গ্রহণের এই দিনে মূল আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে সংবিধান সংস্কার পরিষদ। সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও এই পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে স্পষ্ট বিভক্তি দেখা দিয়েছে।

 সংসদীয় দলের সভাকক্ষে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। এই বৈঠকেই সর্বসম্মতিক্রমে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত করা হয়। শপথ নিতে তারেক রহমানের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী জুবাইদা রহমান এবং মেয়ে জাইমা রহমানও সংসদে উপস্থিত ছিলেন। তবে শপথের আগেই বিএনপি তাদের একটি কঠোর অবস্থান পরিষ্কার করে দিয়েছে।

দলের অন্যতম শীর্ষ নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, বিএনপি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে কোনোভাবেই শপথ নেবে না। তাঁর যুক্তি হলো, আমরা কেউ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হইনি এবং এটি যদি সংসদে সাংবিধানিকভাবে গৃহীত হয়, তবেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। পাশাপাশি বিএনপি সংসদীয় দল থেকে এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছে যে, দলের কোনো সংসদ সদস্য এবার শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট গ্রহণ করবেন না।

জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ঘোষণা করেছিলেন যে, বিএনপি সংস্কার পরিষদে শপথ না নিলে জামায়াতও কোনো শপথ নেবে না। তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন, সংস্কারবিহীন সংসদ অর্থহীন। কিন্তু দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে চিত্র বদলে যায়। জামায়াতের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শেষ পর্যন্ত সংসদ সদস্য হিসেবে এবং পরবর্তীতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ গ্রহণ করেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন তাঁদের শপথ পাঠ করান।

এই ঘটনার প্রতিবাদস্বরূপ সংসদীয় শপথ কক্ষ ত্যাগ করেন স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। সংস্কার পরিষদের শপথের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সাথে সাথেই তিনি সেখান থেকে বের হয়ে যান, যা উপস্থিত সাংবাদিকদের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। জাতীয় নাগরিক পার্টির ছয়জন নির্বাচিত সংসদ সদস্যের শপথ গ্রহণ নিয়ে আজ সকাল থেকেই ধোঁয়াশা ছিল। দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন এবং নবনির্বাচিত এমপি আব্দুল্লাহ আল আমিন জানান, বিএনপি সংস্কার পরিষদে না যাওয়ায় তাঁরাও শপথ না নেওয়ার কথা ভাবছেন। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁরা কী সিদ্ধান্ত নেবেন, তা নিয়ে এখনো দলীয় ফোরামে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।

শপথ গ্রহণ ঘিরে সংসদ এলাকায় প্রায় ১,২০০ দেশি-বিদেশি অতিথির সমাগম ঘটেছে। মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু আজ সকালে বিশেষ বিমানে ঢাকা পৌঁছেছেন। ভারত ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরাও এই অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন। ভিভিআইপিদের চলাচলের সুবিধার্থে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও লেক রোডে যান চলাচল সীমিত করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ।

সাধারণত স্পিকার নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ান, কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বিশেষ পরিস্থিতিতে এবং বর্তমানে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের পদ শূন্য থাকায় সংবিধানের সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও আদালতের নিষেধাজ্ঞা এবং প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে তিনটি আসনের ফলাফল ঝুলে আছে।

 নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠিত হবে। মন্ত্রিসভার সদস্যদের জন্য সরকারি যানবাহন অধিদপ্তর থেকে মোট ৬৮টি গাড়ি প্রস্তুত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৪৫টি গাড়ি ইতোমধ্যে সচিবালয়ের আঙিনায় সারি বেঁধে রাখা হয়েছে। শপথ নেওয়ার পরপরই নতুন মন্ত্রীরা এই গাড়িযোগে নিজ নিজ দপ্তরে যাবেন।

সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের এই বিপরীতমুখী অবস্থান আগামীর সরকার ও বিরোধী দলের সম্পর্কের রসায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। জামায়াত যেখানে সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, বিএনপি সেখানে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ও সংসদের সার্বভৌমত্বকে বড় করে দেখছে। এই আদর্শিক লড়াই আগামী দিনের সংসদীয় কার্যক্রমে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।



খুঁজুন