শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
ধর্ম শুরু হোক আত্মশুদ্ধির যাত্রা

শুরু হোক আত্মশুদ্ধির যাত্রা

শৃঙ্খলাই জীবন। নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন ও পরিশীলিত আচার-আচরণই একজন মুমিনের প্রকৃত ভূষণ। মানুষের বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নিয়ন্ত্রণের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ তার মন, চিন্তা, কামনা-বাসনা ও প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণ। আর এই আত্মসংযম ও পরিশুদ্ধির শ্রেষ্ঠ প্রশিক্ষণ হলো রোজা।

রোজা কেবল উপবাস থাকার নাম নয়; এটি আত্মার সংস্কার, চরিত্রের শুদ্ধি ও নৈতিকতার জামানতদার। রাসুলুল্লাহ (সা.) রোজাকে পাপ থেকে বাঁচার ঢাল বলে আখ্যায়িত করেছেন। অর্থাৎ রোজা মানুষকে শুধু ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করতে শেখায় না, বরং দেহের প্রতিটি অঙ্গকে গুনাহ থেকে বিরত রাখার শিক্ষা দেয়। প্রকৃত রোজা হলো চোখ, কান, জিহ্বা, হাত-পাÑ সবকিছুর রোজা; সব ধরনের পাপকর্ম থেকে বিরত থাকাই রোজার মূল শিক্ষা।

রমজানে মুখকে অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ কথা থেকে সংযত রাখতে হবে। চোখকে গুনাহ থেকে হেফাজত করতে হবে। গানবাজনা, পরনিন্দা, গীবত, চোগলখোরি, খারাপ মন্তব্য ও অসৎ কাজ থেকে দূরে থাকতে হবে। অবৈধ পথে পদক্ষেপ কিংবা অন্যায় কাজে হাত বাড়ানো থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হবে। লোভ-লালসা, কামনা-বাসনা, জুলুম-নির্যাতন, অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ ও অসামাজিক আচরণ পরিহার করে ধার্মিকতার পথে চলাই রমজানের প্রকৃত শিক্ষা।

শুধু বাহ্যিক আমল নয়, অন্তরকেও শুদ্ধ করতে হবে। হিংসা, বিদ্বেষ, কুধারণা, অহংকার ও লোকদেখানো মনোভাব থেকে হৃদয়কে মুক্ত রাখতে হবে। ইবাদতে থাকতে হবে একনিষ্ঠতা ও আন্তরিকতা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই সে সফলকাম, যে নিজেকে পবিত্র করেছে।’ (সুরা আলা : ১৪)

রমজান মানুষকে একটি সুশৃঙ্খল জীবনের অভ্যাস গড়ে দেয়। এ মাসের সূচনা থেকেই শয়তানকে শিকলে বন্দি করা হয়, যেন মানুষ সহজে তাকওয়ার পথে চলতে পারে। রোজা ধৈর্য, সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অনন্য প্রশিক্ষণ দেয়। পাপাচার, হিংসা, গীবত ও চোগলখোরি থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারলেই অর্জিত হয় তাকওয়া।

রোজা মানুষকে অন্যায় ও অপরাধ থেকে বিরত রাখে। কিন্তু রোজা রেখে যদি কেউ মিথ্যা, গীবত বা অন্যায় কাজ করে, তবে তার রোজার সওয়াব কমে যায়। রাসুল (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রোজা অবস্থায় মিথ্যা কথা ও মন্দ কাজ ত্যাগ করেনি, তার পানাহার ত্যাগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ (বুখারি : ১৯০৩) আরও বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন রোজা অবস্থায় অশ্লীল কথা বা হট্টগোল না করে। কেউ ঝগড়া করতে এলে সে যেন বলে আমি রোজাদার।’ (বুখারি : ১৮৯৪)

এ শিক্ষাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñ রোজা শুধু ক্ষুধা সহ্য করার নাম নয়, বরং চরিত্র গঠনের এক মহান সাধনা।

মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। নফস ও শয়তানের প্ররোচনায় আমরা গুনাহ করে ফেলি। কিন্তু মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। তাই রমজান হলো তওবা ও ইস্তেগফারের সেরা সুযোগ। বেশি বেশি জিকির-আজকার, নামাজ, তিলাওয়াত ও ইবাদতের মাধ্যমে অন্তরকে পবিত্র করতে হবে। কুরআনে এসেছে, ‘স্মরণ রেখ, আল্লাহর জিকিরেই অন্তরে প্রশান্তি আসে।’ (সুরা রাদ : ২৮)

রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি পাপ থেকে তওবা করে, সে যেন এমন নিষ্পাপ হয়ে যায়, যেন সে কখনও পাপ করেনি।’ (ইবনে মাজাহ : ৪২৫০)

তাই সাহরি-ইফতারের দোয়া কবুলের মুহূর্তে, নির্জন রাতের তাহাজ্জুদের সময়, অশ্রুসিক্ত নয়নে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুনভাবে জীবন গড়ার অঙ্গীকার করতে হবে।

রমজান আমাদের জন্য আত্মশুদ্ধির সুবর্ণ সুযোগ নিজেকে বদলে ফেলার মহামুহূর্ত। আসুন, এ মাসকে শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে অন্তরের বিপ্লবে পরিণত করি। গুনাহমুক্ত, সংযমী ও তাকওয়াভিত্তিক জীবন গড়ে তুলি।

মুফতি মুহাম্মাদ ইয়াসীন : মুহাদ্দিস, দিলু রোড মাদ্রাসা, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা

খুঁজুন