শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
রাজনীতি তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ও উই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান

তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ও উই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান

দেশ এখন পুরোদমে নির্বাচনমুখী। চলছে মনোনয়ন সংগ্রহ। তবে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক সূচনার আগেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন। দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফেরা এই নেতা কেবল দলীয় আবেগ নয়, রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও নতুন সমীকরণ তৈরি করেছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাকে স্বাগত জানাতে গড়ে ওঠা জনসমাগম বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি ও মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তার বার্তা দিচ্ছে। একই সঙ্গে তার ঘোষিত ‘উই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’ বক্তব্য ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রত্যাশাও সামনে এনেছে। তারা বলেন, দেশে এক ধরনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের দেশে ফেরা ও তার দলের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরবে বলেও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ এ প্রসঙ্গে আমাদের সময়কে বলেন, দীর্ঘদিন তিনি দেশের বাইরে ছিলেন। তিনি দেশে ফেরায় দলে নেতাকর্মীদের মধ্যে উজ্জীবন তৈরি হয়েছে। এটা বিএনপিকে পথ চলতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

তার প্রত্যাবর্তন দলের প্রচারে ভূমিকা রাখছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যদিও নির্বাচনী প্রচারণার জন্য নির্দিষ্ট সময় আছে। উনি তো তার আগে প্রচার করতে পারবেন না, কারণ তিনি নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘন করতে পারেন না। তবে তার আগমন দলকে এগিয়ে নেবে।

তারেক রহমান ঘোষিত প্ল্যান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মানুষের প্রত্যাশা, তিনি একটি প্রমিজিং মেনুফেস্ট দিবেন, যেখানে বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতির ক্ষেত্রে একটা দিক নির্দেশনামূলক হবে; তিনি হয়তো সেটাই বোঝাতে চেয়েছেন। ড. সাব্বির আহমেদ আরও বলেন, মূল বিষয়

হলো তিনি এগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করবেন, এটাই দেখার বিষয়। এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় যে জায়গা সেটা হলো দলের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ রাখা। দলকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা। কারণ দলই তার ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’ ঘোষণাটি, সেই প্ল্যান বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এদিকে দেশে প্রত্যাবর্তনের দিন গণসংবর্ধনায় দেওয়া বক্তব্যে

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান পশ্চিমা অহিংস আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের বিখ্যাত উক্তি ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’ উদ্ধৃত করে বলেন, ‘উই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’। যদিও তিনি তার পরিকল্পনা সম্পর্কে কোনো ব্যাখ্যা দেননি। তবে বিএনপি ইতোমধ্যে ক্ষমতায় গেলে কৃষকদের কৃষিকার্ড, প্রত্যেক পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তারেক রহমানের এই প্ল্যান বিএনপির স্বনির্ভর বাংলাদেশকে ইঙ্গিত করছে কিনা জানতে চাইলে শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মাহ্বুব উল্লাহ্ বলেন, এই প্ল্যান বলতে তিনি কোথায় কি কিরবেন স্পষ্ট নয়, তাই এটি না জেনে মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।’ এর মাধ্যমে তিনি জনগণকে কি বার্তা দিতে চেয়েছেন বলে আপনি মনে করেন প্রশ্নে বলেন ‘উনি মাত্র দেশে আসলেন, সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা দিয়েছেন। এটা বোঝার জন্য বিস্তারিত রাজনৈতিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন, তখন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা যাবে। যে কোনো নেতার দেশ সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা থাকা, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা উচিত। সেই পরিকল্পনা আবার জনগণ কীভাবে নিচ্ছে সেটিও যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন।

বিএনপি নেতারা মনে করেন, তারেক রহমানের বীরোচিত প্রত্যাবর্তনে দৃঢ় ঐক্য ও মনোবল চাঙ্গা করেছে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের। তার দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যে বিএনপির মধ্যে এক ধরনের গতির সঞ্চার হয়েছে। কারণ তিনি সবাইকে নিয়ে ঐক্য করার পাশাপাশি একটা ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিকনির্দেশনাও দিয়েছেন।

১৭ বছরের বেশি সময় বাইরে থাকলেও তারেক রহমান সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের মনোজগৎ বুঝতে পেরেছেন। সেই অনুযায়ী বক্তব্য দিয়েছেন তারেক রহমান। তবে এখন থেকে দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থি কর্মকাণ্ডের বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে বলে মনে করেন নেতারা। বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ বলেন, আমিত্ববিহীন এক অনন্য বক্তব্যের কারণে রাজনীতির ইতিহাসে তারেক রহমান একটি নজির হয়ে থাকবেন। বক্তব্যজুড়ে কোথাও কারও সমালোচনা ও বিষোদগার ছিল না। নিজের কিংবা বাবা-মায়ের বা পরিবারের গুণকীর্তন ছিল না। তাঁর বক্তব্যে সবচেয়ে প্রশংসনীয় দিক হলো কোনো দল বা ব্যক্তির প্রতি বিষোদগার না করে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়ার বার্তা।

বিএনপি নেতারা মনে করে, বাংলাদেশ এক কঠিন সময় পার করছে। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে, কৃষকরা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না, তরুণরা বেকার হয়ে ঘুরছেন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় মানসম্মত সেবা পাওয়া কঠিন। গত দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে রাজনীতি শুধু প্রতিশ্রুতি আর স্লোগানে ভরা ছিল, কিন্তু মানুষের জীবনে তা তেমন কোনো সুখবর বয়ে আনেনি। এখন সময় এসেছে এমন রাজনীতির, যা কথার চেয়ে কাজে বিশ্বাস করবে।

বিএনপি সেই প্রস্তুতি নিয়েই এগোচ্ছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি স্পষ্টভাবে বলছেÑ নীতিনির্ভর ও জ্ঞানভিত্তিক রাজনীতিই দেশের ভবিষ্যৎ বদলাতে পারে। তাই বিএনপি এখনই জনগণের জীবনোদ্ধারমূলক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে, যেন ক্ষমতায় গেলে সঙ্গে সঙ্গে কাজ শুরু করা যায়। এজন্য বিএনপি ৮টি খাতে সবচেয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে, সেগুলো হলোÑ ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, পরিবেশ, কর্মসংস্থান এবং ধর্মীয় নেতাদের জন্য উন্নয়ন সেবা। ক্ষমতায় গিয়ে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে চান তারেক রহমান। তবে সবার আগে দেশে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করতে চান তিনি। যার মধ্য দিয়ে দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে এবং আইনের শাসন ও গণতন্ত্র সুসংহত হবে।

বিএনপি নেতারা বলেন, পরিবারের নারী সদস্যদের মধ্যে যিনি সিনিয়র তার জন্য ফ্যামিলি কার্ডের ব্যবস্থা করা হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবার মাসে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও জরুরি পণ্য পাবেন, যা নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক সুরক্ষার একটি স্থায়ী পথ তৈরি করে দেবে।

বিএনপি নেতারা জানান, কৃষক কার্ড চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে তারেক রহমানের। এটা করা গেলে কৃষকরা স্বল্পমূল্যে সার, উন্নত বীজ ও কৃষি প্রযুক্তি সহায়তা পাবেন। পাশাপাশি সহজে ঋণ এবং বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হবে। এতে করে কৃষক বাঁচবে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।

চিকিৎসা ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য এখন বোঝা বলে মনে করেন তারেক রহমান। এ স্বাস্থ্য কার্ড করতে চান তিনি। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং সারা দেশে শক্তিশালী প্রাইমারি হেলথ কেয়ার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে চান। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ধরনের অন্তত ১ লাখ দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশই নারীদের নিয়োগ দিতে চান তারেক রহমান, যেন সেবা পেতে নারী ও শিশুদের সহজ হয়।

শিক্ষা নিয়েও তারেক রহমানের রয়েছে বড় ধরনের পরিকল্পনা। মুখস্থ বিদ্যায় নয়, চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা এবং দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার মাধ্যমে তরুণদের ভবিষ্যৎ উন্নত করা হবে। প্রাথমিক শিক্ষায় বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে চান তারেক রহমান। শুধু সার্টিফিকেট নয়Ñ কাজের দক্ষতা বাড়ানোই হবে বিএনপির মূল লক্ষ্য।

ক্রীড়ায় বিশেষ গুরুত্ব দিতে চান তারেক রহমান। তরুণদের শক্তিকে ইতিবাচক পথে ব্যবহার করতে সারা দেশে খেলাধুলার সুযোগ বাড়াতে চান তিনি। ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে গ্রহণযোগ্য করতে সব স্তরে খেলাধুলার উন্নয়নে অগ্রাধিকার দিতে চান।

পরিবেশের ওপরও জোর দিতে চান তারেক রহমান। নবায়নযোগ্য শক্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিং বাড়িয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা তাঁর পরিকল্পনায় রয়েছে। পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন বাড়াতে এবং মৌসুমি বন্যা থেকে মানুষকে রক্ষা করতে সারা দেশে খাল ও নদী খনন ও পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও ব্যাপক পরিকল্পনা রয়েছে তারেক রহমানের। এসএমই ব্লু ইকোনমি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আইসিটি খাতে বড় ধরনের নতুন চাকরির সুযোগ তৈরির মধ্যদিয়ে পরিবারের আয় বৃদ্ধি ও অর্থনীতি আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, ই-কমার্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, গেমিং ও স্টার্টআপ খাতকে কর্মসংস্থানের প্রধান উৎসে পরিণত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।। একই সঙ্গে বিদেশি শ্রমবাজারে নতুন সুযোগ খুঁজে বের করে এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে আরও বেশি তরুণকে ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্টে পাঠানোরও উদ্যোগ নেওয়া হবে। নারী, প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক তরুণদের জন্য বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ ধর্মীয় নেতাদের মাসিক সম্মানী দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যেন তাদের জীবনমান উন্নত হয়।

তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ডা. জিয়া উদ্দিন হায়দার বলেন, এবারের নির্বাচন হবে পরিবর্তনের। এই পরিবর্তন হতে পারেÑ দায়িত্বশীল রাজনীতি, জনগণের অধিকার এবং একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের পথে যাত্রা। সময় এসেছে নীতিনির্ভর রাজনীতির। সময় এসেছে জনগণের জীবনে সত্যিকারের পরিবর্তনের।

খুঁজুন