শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
রাজনীতি ত্রিশ দলের ত্রিশ মত, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন কীভাবে

ত্রিশ দলের ত্রিশ মত, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন কীভাবে

জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়নের পথ নির্ধারণ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনো সুস্পষ্ট ঐকমত্য তৈরি হয়নি। সনদের বিভিন্ন বিষয়ের বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে চলছে নানা আলোচনা, প্রস্তাব ও মতবিনিময়। কেউ নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে দ্রুত বাস্তবায়নের পক্ষে, কেউ অধ্যাদেশ বা বিশেষ সাংবিধানিক আদেশের পক্ষে, আবার কেউ গণভোট বা উচ্চ আদালতের মতামত চাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে। ফলে সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনো অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।

রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন আয়োজিত বৈঠকে এসব মতপ্রকাশ ঘটে। বৈঠকে কমিশনের সদস্য ছাড়াও বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি, সিপিবিসহ প্রায় ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি অংশ নেন।

বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ। তিনি জানান, কমিশনের কাজ হচ্ছে রাজনৈতিক দল ও বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে সরকারকে সুপারিশ প্রদান। বাস্তবায়নের ক্ষমতা কমিশনের হাতে নেই। তবে বাস্তবায়নের পথ কী হবে, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ছয়টি ভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, গণভোট, রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশ, বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ, সংসদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন, গণপরিষদ গঠন এবং সুপ্রিম কোর্টের মতামত গ্রহণ (১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী)।

তিনি জানান, কমিশনের ছয় সদস্যের বিশেষজ্ঞ প্যানেল একাধিক বৈঠক করে চারটি সম্ভাব্য পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছেন: নির্বাহী আদেশ, অধ্যাদেশ, গণভোট এবং বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ। তবে বাস্তবায়নের আগে রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া কোনো পথই গ্রহণযোগ্য নয়।

বৈঠকে বিএনপির পক্ষ থেকে অংশ নেন স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, জুলাই সনদের যেসব বিষয় সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন পড়ে না, সেগুলো নির্বাহী আদেশ বা অধ্যাদেশ জারি করেই তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব। তিনি জানান, ২৯টি রাজনৈতিক দল ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে মত দিয়েছে। সংবিধান সংশ্লিষ্ট যেসব বিষয় রয়েছে, সেগুলো পরবর্তী সংসদে আলোচনার মাধ্যমে দুই বছরের মধ্যে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি রাখতে হবে। প্রয়োজনে ‘প্রবিশনাল কনস্টিটিউশনাল অর্ডার’ জারি করে তা কার্যকর করার প্রস্তাবও এসেছে।

সালাহউদ্দিন আহমেদ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় সংবিধান প্রোক্লেমেশন ব্যবহারের উদাহরণ টেনে বলেন, যখন সংবিধানের আংশিক বা পূর্ণাঙ্গ কার্যকারিতা স্থগিত থাকে, তখন রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য এ ধরনের আদেশ জারি করা হয়ে থাকে। পরে সংসদে তা সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বৈধতা পায়।

বৈঠকে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির। তিনি বলেন, যেসব বিষয়ের সঙ্গে সংবিধান সাংঘর্ষিক হতে পারে, সেগুলোকে বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ জারি করে প্রাধান্য দেওয়া যেতে পারে। তিনি দাবি করেন, ৫ থেকে ৭ আগস্ট সরকারের অনুপস্থিতিতে ‘জনগণের ইচ্ছাই কার্যকর ছিল’, যা সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে বলা ‘সলোমন এক্সপ্রেশন অব দ্য উইল অব দ্য পিপল’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। তিনি বলেন, এই ইচ্ছা বিশেষ সাংবিধানিক আদেশের মাধ্যমে প্রতিফলিত হলে, আগামী নির্বাচন জুলাই সনদের ভিত্তিতেই আয়োজনে আর কোনো আইনগত জটিলতা থাকবে না।

শিশির মনির আরও দাবি করেন, সংবিধানের ১৫৩ অনুচ্ছেদের মধ্যে বর্তমানে ৫৭টি অনুচ্ছেদ অকার্যকর হয়ে গেছে। তার মতে, দেশে কার্যত একটি অভ্যুত্থান ঘটে গেছে, এবং এই প্রেক্ষাপটে একটি নতুন সাংবিধানিক আদেশের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ না হলে, জনগণের মতামতের ভিত্তিতে একটি গণভোটের আয়োজন হতে পারে। তবে এটি বিকল্প প্রস্তাব হিসেবে বিবেচিত।

এদিকে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, দীর্ঘদিন পর এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও, এখনো সনদের চূড়ান্ত কপি রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে উপস্থাপন করা হয়নি। তিনি বলেন, সংবিধান সংশ্লিষ্ট যেসব বিষয় রয়েছে, তা নিয়ে এখনো মতৈক্য তৈরি হয়নি। গণভোটের মতো পদ্ধতি গ্রহণ সম্ভব নয়, কারণ সনদের অনেক বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে। এ অবস্থায়, সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের মতামত গ্রহণ করাকে তিনি তুলনামূলক নিরাপদ পথ হিসেবে দেখছেন।

জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, সনদের যেসব বিষয় সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়, সেগুলো দ্রুত অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন সম্ভব। অন্তর্বর্তী সরকার ইতিমধ্যে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে সংবিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত ২০টি বিষয়ের মধ্যে ১৯টি নিয়েই এখনো বিতর্ক রয়ে গেছে বলে উল্লেখ করেন।

বৈঠকে ঐকমত্য কমিশনের সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. মো. আইয়ুব মিয়া এবং প্রধান উপদেষ্টার সহকারী মনির হায়দার। বৈঠকে অংশ নেয়া রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৩০টির মতো, যার মধ্যে ছিল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, গণসংহতি আন্দোলন, সিপিবি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) প্রভৃতি।

এদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে জুলাই সনদের চূড়ান্ত খসড়া পাঠানো হয়েছে এবং আগামী ১৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রত্যেক দলকে দুইজন করে প্রতিনিধি মনোনয়ন দিতে বলা হয়েছে, যারা চূড়ান্ত সনদে স্বাক্ষর করবেন।

খুঁজুন