শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
পর্যটন যে যার মতো লুটে নিচ্ছে ‘সাদা পাথর’

যে যার মতো লুটে নিচ্ছে ‘সাদা পাথর’

সিলেটের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র সাদা পাথর ।কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর একসময় ছিল অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। স্বচ্ছ জল, সাদা পাথরের স্তূপ আর সবুজ পাহাড় ঘেরা এই এলাকা ছিল দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র। কিন্তু এখন দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। নদীর তলদেশে বড় বড় গর্ত, ঘোলা পানি আর পাথরশূন্য মরুভূমি যেন এখানে নতুন বাস্তবতা।
 
এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলছে অবাধে পাথর লুটপাট। সর্বশেষ গত ১৫ দিনে লুটপাটের মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এতে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে পরিবেশ। এ অবস্থা চলতে থাকলে দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র সাথা পাথর বিলীন হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
 
গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর থেকে সাদাপাথরে লুটপাট শুরু হয়। ১৫ দিন ধরে লুটপাটের মাত্রা বেড়েছে বহুগুণে। সাদাপাথর জিরো পয়েন্ট থেকে দিনে-দুপুরে প্রকাশ্যে বারকি নৌকা দিয়ে পাথর লুট করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বাদ যাচ্ছে না  ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে বাঙ্কার এলাকাও। লুটপাটে বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও স্থানীয় প্রভাবশালী সবাই মিলেমিশে একাকার। একই সঙ্গে পাল্টেছে চাঁদাবাজির কৌশলও।
 
গত দুই-তিন মাসে দিন ও রাতে অন্তত হাজারের বেশি বারকি নৌকা ব্যবহার করে পাথর লুট হয়েছে। এই তাণ্ডবে পুলিশ প্রশাসন ছিল সাক্ষী-গোপালের ভূমিকায়।
 
পরিবেশবিদরা বলছেন, এভাবে লুটপাট চলতে থাকলে সাদা পাথরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যেতে পারে। সরকারও হারাতে পারে কোটি টাকার রাজস্ব।
 
স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, আগে নৌকাপ্রতি ১৫০০-২০০০ হাজার টাকা চাঁদা তোলা হতো। আর পুলিশকে ‘ম্যানেজ’করা হতো আরও ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকায়। পরে পাথর উত্তোলনকারীরা প্রতি নৌকা পাথর বিক্রি করতো ৫ থেকে ৬ হাজার টাকায়। কিন্তু সম্প্রতি চাঁদাবাজির কৌশলেও এনেছে স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতারা।
 
আগে যে কেউ পাথর তুলতে পারতেন না। সম্প্রতি সাদা পাথর ও বাঙ্কার এলাকা থেকে যে কেউ পাথর তুলতে পারে। এজন্য নৌকা প্রতি কোনো চাঁদা দিতে হয় না। তবে উত্তোলন করা পাথর নির্ধারিত সিন্ডিকেটের সদস্যদের কাছেই বিক্রি করতে হবে এবং প্রতিনৌকা পাথর সর্বোচ্চ ১৫০০ টাকা দরে বিক্রি করা যাবে। এর চেয়ে বেশি দামে কোনো সিন্ডিকেট সদস্য পাথর কিনবে না।
 
পাথর লুটপাটের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রন করছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কতিপয় নেতা। গত বছরের ৫ আগস্টের পর তেকে পুরো পাথর রাজ্য তাদের নিয়ন্ত্রণে। দিন-রাত সমানতালে হাজার হাজার শ্রমিক কোদাল, বেলচা, শাবল আর টুকরি নিয়ে কোয়ারি ও এর আশপাশের এলাকায় গিয়ে মাটি খুঁড়ে পাথর বের করেন। হাজার হাজার বারকি নৌকায় সেসব পাথর বহন করে এনে তাঁরা মিলমালিকদের কাছে বিক্রি করেন। পরে সেসব পাথর মেশিনে ভেঙে ছোট করে ব্যবসায়ীদের কাছে সরবরাহ করা হয়। ওই ব্যবসায়ীরা ট্রাক ও পিকআপে পাথর দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠান।
 
গত এক বছরে কী পরিমাণ পাথর লুট হয়েছে, এর কোনো পরিসংখ্যান প্রশাসনের কাছে নেই। স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা, সিলেটের পাথর কোয়ারি ও কোয়ারিভুক্ত এলাকা ছাড়া অন্যান্য স্থান থেকে অন্তত দুই থেকে তিন হাজার কোটি টাকার পাথর লুট হয়েছে। এভাবে লুটপাট অব্যাহত থাকলে সিলেট পাথরশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
 
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম চৌধুরী বলেন, বিগত দেড় দশকে সিলেটে যে পরিমাণ পাথর লুট হয়েছে, এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি লুটপাট হয়েছে গত এক বছরে। বিগত সময়ে এক পক্ষ লুটপাট করেছে, আর এখন লুটপাটে নেই এমন কেউ নেই। সবাই সংঘবদ্ধভাবে লুটপাট করছে।
 
তিনি বলেন, এই লুটপাটের নেপথ্যে প্রশাসনের ব্যর্থতা। প্রশাসন কোনোভাবে কঠোর অবস্থান নিতে পারেনি, তাই এই অবস্থা। খোঁদ পরিবেশ উপদেষ্টা ও তার তার দপ্তর পাথর লুটপাট নিয়ে সবজেনেও যেখানে ব্যর্থ হয়েছেন, সেখানে স্থানীয় পরিবেশ কর্মীরা অসহায়।
 
কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উজায়ের মাহমুদ আদনান জানান, পাথর উত্তোলনের খবর পেলে ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে স্পেশাল টাস্কফোর্স অভিযান চালানো হয়। পুলিশ তাতে সহযোগিতা করে থাকে। পুলিশের পক্ষে একা এটি ঠেকানো সম্ভব নয়।

খুঁজুন