শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মতামত আল্লাহ তুমি কি দেখো না রামিসাদের আর্তনাদ

আল্লাহ তুমি কি দেখো না রামিসাদের আর্তনাদ

একটা শিশুর কান্না শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের ব্যর্থতার প্রতিধ্বনি। রামিসাদের হারিয়ে যাওয়ার গল্প আর শুনতে চাই না। নিরাপদ শৈশব কোনো বিলাসিতা নয়, এটা প্রতিটি শিশুর অধিকার। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর বিচার হোক, যেন আর কোনো নিষ্পাপ প্রাণ এমন নির্মমতার শিকার না হয়।

“মনে আছে? সিরিয়ার সেই তিন বছরের ছেলেটির কথা- বোমায় ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে মরে যাওয়ার আগে যে বলেছিল, ‘আমি ঈশ্বরকে সব বলে দেব।’”

কবি অভ্র ভট্টাচার্যের লেখা ‘আমি ঈশ্বরকে সব বলে দেবো’ কবিতায় সিরিয়ার তিন বছরের এক ছোট্ট শিশু মারা যাওয়ার আগে বলেছিল, সে ঈশ্বরকে আমাদের লোভ, পৈশাচিকতা, অসভ্যতা আর নির্যাতনের সব কথা বলে দেবে। গত ১৯ মে ২০২৬ রাজধানীর পল্লবীতে রামিসা আক্তার নামের আট বছর বয়সী এক শিশু নৃশংসভাবে খুন হওয়ার ঘটনাটি এই কবিতার মূলভাবকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে। সিরিয়ার সেই শিশুর মতো আমাদের রামিসাও হয়তো এতক্ষণে তার ঈশ্বরকে সব বলে দিয়েছে। বলে দিয়েছে আমাদের পৈশাচিকতার কথা, আমাদের লোভের কথা, আমাদের অসভ্যতার কথা। হয়তো সে এটাও বলে দিয়েছে- এ দেশে ধর্ষকদের শাস্তির চেয়ে অনেক সময় ধর্ষিতাকেই বেশি অপমান সহ্য করতে হয়। সে হয়তো ঈশ্বরকে বলে দিয়েছে সমাজের বিকৃত মস্তিষ্কের নরপিশাচদের কথা, যারা নারীদের কখনও শিশু, মা, বোন কিংবা স্ত্রী হিসেবে দেখে না; দেখে কেবল ভোগ্যবস্তু হিসেবে।

শিশু নির্যাতনের ঘটনা শুধু রামিসাকে দিয়েই শুরু হয়নি; ২০২৪ সালের নভেম্বরে সিলেটের কানাইঘাটের পাঁচ বছর বয়সী শিশু মুনতাহাকে অপহরণের পর হত্যা করে লাশ গুম করার জন্য ডোবায় পুঁতে রাখার ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন ফেলেছিল। সামাজিক মাধ্যমে নেমে এসেছিল প্রতিবাদের ঝড়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, শিশু মুনতাহা হত্যার কোনো ন্যায্য বিচার নিশ্চিত হয়নি এখনও।

শিশু মুনতাহা হত্যার ঠিক কয়েক মাস পরই ২০২৫ সালের মার্চ মাসে পত্রিকার প্রথম পাতায় উঠে আসে মাগুরার আট বছরের ছোট্ট শিশু আছিয়ার নির্মম ধর্ষণের খবর। বোনের শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে সে বোনের শ্বশুরের হাতেই নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়। ধর্ষণের আট দিন পর দেশবাসীকে কাঁদিয়ে না-ফেরার দেশে চলে যায় আছিয়া। শিশু আছিয়ার মৃত্যুর পর উত্তাল হয়ে ওঠে দেশ। তোপের মুখে পড়ে কর্তৃপক্ষ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সংশোধন এনে দ্রুত বিচার ও রায় কার্যকরের প্রতিশ্রুতি দিলেও এক বছর পর আজও আছিয়া হত্যার বিচার নিশ্চিত হয়নি।

শিশু নির্যাতনের ঘটনা কেবল রামিসা, মুনতাহা কিংবা আছিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; প্রায় প্রতিদিনই এ দেশে কোনো না কোনো শিশু সমাজের পিশাচদের হাতে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। কিন্তু ন্যায্য বিচারের অভাবে অনেকেই মুখ খুলে বলতে পারছে না। ইউনিসেফের তথ্য মতে, প্রতি আটজন নারীর মধ্যে একজন ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের শিকার হন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে গত আট বছরে তিন হাজারের বেশি শিশু ধর্ষণের মামলা দায়ের হয়েছে; প্রকৃত ভুক্তভোগীর সংখ্যা আরও বেশি।

গত কয়েক বছরের হত্যাকাণ্ডগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এসব অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর কিছুদিন আলোচনা চললেও অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন ইস্যুর আড়ালে পুরনো ঘটনাগুলো চাপা পড়ে যায়। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সঠিক বিচার আর নিশ্চিত হয় না। এর ফলে দেশের বিচারব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ক্রমশ কমে যাচ্ছে। বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা, ভুক্তভোগী পরিবারের মামলা চালানোর সামর্থ্যরে অভাব এবং আইনের ফাঁকফোকরে অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়া- এ সবই এর মূল কারণ। বছরজুড়ে এই চক্র চলতেই থাকে, আর কিছুদিন পর পর রামিসা, আছিয়া ও মুনতাহার মতো নিষ্পাপ প্রাণগুলো নৃশংসতার শিকার হয়। কিন্তু এসবের শেষ কোথায়? আর কত রামিসা, আছিয়া, মুনতাহার অকালে প্রাণ ঝরলে আমাদের টনক নড়বে?

শিশু ও নারী ধর্ষণের দ্রুত এবং কার্যকর বিচারব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি। এ ক্ষেত্রে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে, যেখানে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তদন্ত ও রায় কার্যকর বাধ্যতামূলক থাকবে। প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে যেন কেউ পার না পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সাক্ষী ও ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ছাড়াও এ ধরনের মামলায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহি বাড়াতে হবে। তদন্তে গাফিলতি বা বিলম্ব হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। থানায় শিশু ও নারী নির্যাতনসংক্রান্ত আলাদা ডেস্ক ও প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা রাখতে হবে।

শিশু ও নারী নির্যাতন রোধে সামাজিক ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা অত্যন্ত জরুরি। শিশু নির্যাতনের ঘটনাকে সাময়িক আলোচনার বিষয় না বানিয়ে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় সংকট হিসেবে দেখতে হবে। প্রতিটি আলোচিত ঘটনার বিচার কোথায় আটকে আছে, তা নিয়মিত জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। এ ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার সংগঠন এবং গণমাধ্যমকে ধারাবাহিকভাবে চাপ সৃষ্টি করতে হবে। দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত না হলে আমাদের নিষ্পাপ শিশুরাও হয়তো তাদের শেষ উক্তিতে বলে যাবে- ‘আমি ঈশ্বরকে সব বলে দেব।’ আমরা কি তার ঈশ্বরের কাছে সেই অভিযোগের জবাব দিতে পারব?

খুঁজুন