সহকর্মী মানে সহকর্মীই, বন্ধু নয়, আপনজন নয়”, এই বাক্যটি যেন অফিস-আদালতের দেওয়ালে লেখা একটা অলিখিত আইন। আর সেই আইনের ছত্রচ্ছায়ায় আমাদের প্রতিদিনের সম্পর্ক গড়ে ওঠে, ভাঙে, আবার জোড়া লাগে।
আপনি যখন কোনো অধিকার থেকে বঞ্চিত, অপমানিত, লাঞ্ছিত হন, আপনার সহকর্মীরা সেটাকে দেখে আমোদের সামগ্রী বানিয়ে নেয়। হয়তো সেদিন লাঞ্চ টেবিলে হাসির আসর বসে, কফি ব্রেকের ফাঁকে কটাক্ষের ঝাঁপি ছুটে। “উচিত শিক্ষা হয়েছে”, এই ভাবনা জানিয়ে দিতে তারা কুণ্ঠাবোধ করে না। কেউ এগিয়ে আসে না, কেউ বলে না, “এটা অন্যায়।” সবাই নীরব দর্শকে পরিণত হয়, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে তারা উপভোগ করে আপনার অসহায়ত্বের দৃশ্য।
আপনার বঞ্চনার আঘাত তাদের কাছে স্বাভাবিক। তারা ভাবে, “এ তো ওর ব্যাপার, আমার সঙ্গে কী? যেমন কর্ম তেমন ফল” অথচ ঠিক একই ধরনের ঘটনা যখন তাদের নিজেদের জীবনে ঘটে, তখন সেই ‘স্বাভাবিক’ ব্যাপারটাই তাদের কাছে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। তখন তারা প্রত্যাশা করে, আপনি এগিয়ে আসবেন, পাশে দাঁড়াবেন। তখন তারা বুঝতে চায় না যে, যে নীরব দর্শকের ভূমিকা তারা একদিন অভিনয় করেছিল, আজ সেই দর্শক তাদের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে। এই চিত্রই যেন বারবার ফিরে আসে, হয়তো বদলে শুধু মানুষ আর সময় | ভুল অভিজ্ঞতটা থেকে মানুষ শিক্ষা নেয়না, বরং মানুষ নিজেকে ভুলের গহবরে পতিত করে |
এটা শুধু কর্মক্ষেত্রের গল্প নয়; এটা আমাদের সামাজিক চরিত্রের এক করুণ প্রতিচ্ছবি। পরের দুঃখকে আমরা দূর থেকে দেখতে অভ্যস্ত, কিন্তু নিজের আঙুলে যখন কাঁটা ফোটে, তখন সারাটা বিশ্ব যেন বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। এই দ্বিচারিতা আমাদের সম্পর্কগুলোকে কতটা নির্জলা করে তোলে, তা আমরা উপলব্ধি করি না।
তাই লিখতে ইচ্ছে করে, যদি আমরা একটু সহমর্মিতা শিখতাম। যদি আমরা দেখতাম, সহকর্মী মানে শুধুই ফাইল-ফোল্ডারের ভাগীদার নয়, বরং একই ছাদের নিচে বসা দীর্ঘদিনের চেনা একটা ভাঙাচোরা মানুষ, তখনই হয়তো জন্ম নিত নতুন এক গল্প, যে গল্পে মানুষ নয়, মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা ঘুণেধরা ব্যবস্থা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারত । হয়তো কোনো সহকর্মীকে আমার পছন্দ নয়, সেটা ব্যক্তিগত রুচির বিষয়, হয়তোবা তার চেয়েও আরও বড় কিছু । কিন্তু কিছু সামগ্রিক বিষয় থাকে, যা যে কারও ক্ষেত্রে ঘটতে পারে, অথচ তার পক্ষে কেউ দাঁড়াতে চায় না।
অনেক মানুষকে দেখেছি যারা জীবনের অনেকটা সময় তার প্রতিষ্ঠানকে দিয়েছেন, তিলে তিলে নিজের রক্ত পানি করে প্রতিষ্ঠানকে গড়ে তুলেছেন, অথচ যেদিন চাকুরী থেকে অবসর নেন, সেদিন থেকে অন্য সহকর্মীদের কাছে তিনি মূল্যহীন একটা বস্তুতে পরিণত হন | কখনো যদি পুরোনো ভালোবাসার টানে প্রতিষ্ঠানে আসেন, বসার মতো একটা জায়গাও খুঁজে পাননা, কারণ সবাই যে ব্যস্ত, খুব ব্যস্ত, নিজেকে নিয়ে, নিজের কর্ম ব্যস্ততার অভিনয় নিয়ে, অথচ এমন একটা দিন তার জীবনেও যে আসবে সেটা হয়তো তখন মনেই হয়না করোও |
আসলে কর্ম জীবনের বাস্তবতা অন্য। এখানে আপনজন বলতে কেউ নেই, বন্ধু বলতে কেউ নেই। আছে শুধুই স্বার্থের সমীকরণ। আর সেই সমীকরণে যার ভাগে বঞ্চনা পড়ে, তাকে নীরবে সইতে হয়, অন্তত যতক্ষণ না সেই একই সমীকরণ ফিরে এসে অন্যদের ঘরে ধাক্কা মারে।
হয়তো একটা সময় সবাই সেটা বোঝে। কিন্তু ততক্ষণে যে অনেক দেরি হয়ে যায় ।
আসলে জীবন আমাদের শেখায়, জীবনকে ক্ষয়ে ক্ষয়ে; জীবনেরই আয়নায় দেখায় আমাদের সেই মুখটা, যা মনে হয় আমার, কিন্তু কি অদ্ভুত সেখানে আমি নেই, আমার মতো অন্য কেও। এই উপলব্ধি যখন আসে, তখন দেখা যায়, অলিখিত আইনের দেয়ালটা আসলে আমরা নিজেরাই গেঁথেছিলাম, একা নয়, মিলে। আর সেই দেয়াল ভাঙতে গেলে প্রথম উদ্যোগটা নিতে হয় নিজেকেই, অন্যের জন্য নয়, বরং নিজের মতো আরেকজন মানুষের অস্তিত্বকে চিনে নেওয়ার জন্য।
কিন্তু সেই উদারতা কি এই বাণিজ্যিক পৃথিবীতে এখন আর আছে, সবাই তো দৌড়াচ্ছে, রুদ্ধশ্বাসে, দৌড়াচ্ছে আর দৌড়াচ্ছে, পিছনে কি ফেলে যাচ্ছে সেটা দেখারও তো সময় নেই |
হয়তো এটাই বাস্তবতা, এটাই জীবন, যে জীবনের বোঝা নিজের কাঁধে তুলে নিজেকেই টানতে হয় আমৃত্যু |
আসলে জীবন আমাদের শেখায়
আসলে জীবন আমাদের শেখায়
সহকর্মী মানে সহকর্মীই, বন্ধু নয়, আপনজন নয়”, এই বাক্যটি যেন অফিস-আদালতের দেওয়ালে লেখা একটা অলিখিত আইন। আর সেই আইনের ছত্রচ্ছায়ায় আমাদের প্রতিদিনের সম্পর্ক গড়ে ওঠে, ভাঙে, আবার জোড়া লাগে।আপনি যখন কোনো অধিকার থেকে বঞ্চিত, অপমানিত, লাঞ্ছিত হন, আপনার সহকর্মীরা সেটাকে দেখে আমোদের সামগ্রী বানিয়ে নেয়। হয়তো সেদিন লাঞ্চ টেবিলে হাসির আসর বসে, কফি ব্রেকের ফাঁকে কটাক্ষের ঝাঁপি ছুটে। “উচিত শিক্ষা হয়েছে”, এই ভাবনা জানিয়ে দিতে তারা কুণ্ঠাবোধ করে না। কেউ এগিয়ে আসে না, কেউ বলে না, “এটা অন্যায়।” সবাই নীরব দর্শকে পরিণত হয়, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে তারা উপভোগ করে আপনার অসহায়ত্বের দৃশ্য।আপনার বঞ্চনার আঘাত তাদের কাছে স্বাভাবিক। তারা ভাবে, “এ তো ওর ব্যাপার, আমার সঙ্গে কী? যেমন কর্ম তেমন ফল” অথচ ঠিক একই ধরনের ঘটনা যখন তাদের নিজেদের জীবনে ঘটে, তখন সেই ‘স্বাভাবিক’ ব্যাপারটাই তাদের কাছে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। তখন তারা প্রত্যাশা করে, আপনি এগিয়ে আসবেন, পাশে দাঁড়াবেন। তখন তারা বুঝতে চায় না যে, যে নীরব দর্শকের ভূমিকা তারা একদিন অভিনয় করেছিল, আজ সেই দর্শক তাদের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে। এই চিত্রই যেন বারবার ফিরে আসে, হয়তো বদলে শুধু মানুষ আর সময় | ভুল অভিজ্ঞতটা থেকে মানুষ শিক্ষা নেয়না, বরং মানুষ নিজেকে ভুলের গহবরে পতিত করে | এটা
শুধু কর্মক্ষেত্রের গল্প নয়; এটা আমাদের সামাজিক চরিত্রের এক করুণ প্রতিচ্ছবি। পরের দুঃখকে আমরা দূর থেকে দেখতে অভ্যস্ত, কিন্তু নিজের আঙুলে যখন কাঁটা ফোটে, তখন সারাটা বিশ্ব যেন বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। এই দ্বিচারিতা আমাদের সম্পর্কগুলোকে কতটা নির্জলা করে তোলে, তা আমরা উপলব্ধি করি না।তাই লিখতে ইচ্ছে করে, যদি আমরা একটু সহমর্মিতা শিখতাম। যদি আমরা দেখতাম, সহকর্মী মানে শুধুই ফাইল-ফোল্ডারের ভাগীদার নয়, বরং একই ছাদের নিচে বসা দীর্ঘদিনের চেনা একটা ভাঙাচোরা মানুষ, তখনই হয়তো জন্ম নিত নতুন এক গল্প, যে গল্পে মানুষ নয়, মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা ঘুণেধরা ব্যবস্থা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারত । হয়তো কোনো সহকর্মীকে আমার পছন্দ নয়, সেটা ব্যক্তিগত রুচির বিষয়, হয়তোবা তার চেয়েও আরও বড় কিছু । কিন্তু কিছু সামগ্রিক বিষয় থাকে, যা যে কারও ক্ষেত্রে ঘটতে পারে, অথচ তার পক্ষে কেউ দাঁড়াতে চায় না। অনেক মানুষকে দেখেছি যারা জীবনের অনেকটা সময় তার প্রতিষ্ঠানকে দিয়েছেন, তিলে তিলে নিজের রক্ত পানি করে প্রতিষ্ঠানকে গড়ে তুলেছেন, অথচ যেদিন চাকুরী থেকে অবসর নেন, সেদিন থেকে অন্য সহকর্মীদের কাছে তিনি মূল্যহীন একটা বস্তুতে পরিণত হন | কখনো যদি পুরোনো ভালোবাসার টানে প্রতিষ্ঠানে আসেন, বসার মতো একটা জায়গাও খুঁজে পাননা, কারণ সবাই যে ব্যস্ত, খুব ব্যস্ত, নিজেকে নিয়ে, নিজের কর্ম ব্যস্ততার
অভিনয় নিয়ে, অথচ এমন একটা দিন তার জীবনেও যে আসবে সেটা হয়তো তখন মনেই হয়না করোও | আসলে কর্ম জীবনের বাস্তবতা অন্য। এখানে আপনজন বলতে কেউ নেই, বন্ধু বলতে কেউ নেই। আছে শুধুই স্বার্থের সমীকরণ। আর সেই সমীকরণে যার ভাগে বঞ্চনা পড়ে, তাকে নীরবে সইতে হয়, অন্তত যতক্ষণ না সেই একই সমীকরণ ফিরে এসে অন্যদের ঘরে ধাক্কা মারে।হয়তো একটা সময় সবাই সেটা বোঝে। কিন্তু ততক্ষণে যে অনেক দেরি হয়ে যায় ।আসলে জীবন আমাদের শেখায়, জীবনকে ক্ষয়ে ক্ষয়ে; জীবনেরই আয়নায় দেখায় আমাদের সেই মুখটা, যা মনে হয় আমার, কিন্তু কি অদ্ভুত সেখানে আমি নেই, আমার মতো অন্য কেও। এই উপলব্ধি যখন আসে, তখন দেখা যায়, অলিখিত আইনের দেয়ালটা আসলে আমরা নিজেরাই গেঁথেছিলাম, একা নয়, মিলে। আর সেই দেয়াল ভাঙতে গেলে প্রথম উদ্যোগটা নিতে হয় নিজেকেই, অন্যের জন্য নয়, বরং নিজের মতো আরেকজন মানুষের অস্তিত্বকে চিনে নেওয়ার জন্য।কিন্তু সেই উদারতা কি এই বাণিজ্যিক পৃথিবীতে এখন আর আছে, সবাই তো দৌড়াচ্ছে, রুদ্ধশ্বাসে, দৌড়াচ্ছে আর দৌড়াচ্ছে, পিছনে কি ফেলে যাচ্ছে সেটা দেখারও তো সময় নেই | হয়তো এটাই বাস্তবতা, এটাই জীবন, যে জীবনের বোঝা নিজের কাঁধে তুলে নিজেকেই টানতে হয় আমৃত্যু |
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
১৫২/২, এ-২ গ্রীন রোড, রওশন টাওয়ার (লিফটের-৫),
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ । মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত