মাজার বা দরগাহ হলো আধ্যাত্মিক সাধক, পীর বা ওলিদের জিয়ারতের স্থান, যা মুসলিম সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে সুফি ঐতিহ্য, সামাজিক মেলবন্ধন এবং শান্তির প্রতীক [৩, ৪]। এটি শুধু কবর নয়, বরং মানুষের আধ্যাত্মিক তৃষ্ণা মেটানোর, ঐক্যের এবং সংস্কৃতির মিলনমেলা হিসেবে কাজ করে, যেখানে সব ধর্মের মানুষ সমবেত হতে পারে
পাঁচই আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক-ধর্মীয় বাস্তবতা ভিন্ন মাত্রায় হাজির হওয়ার কারণে (মববাজ, তথাকথিত ইসলামপন্থী, তৌহিদী জনতা, ওহাবী সালাফী— নানান র্যাডিকাল গ্রুপের কারণে) আমরা কিছু চ্যালেঞ্জ এর মুখোমুখি হয়েছিলাম। তার মধ্যে ‘মাজার রক্ষা’ও একটা চ্যালেঞ্জ ছিল। এর পক্ষে কণ্ঠ উঁচু করার হিম্মত বেশ ভালোই শক্তি খরচ করেছে। কারণ, ইসলাম ও তৌহিদের নাম দিয়েই একদল মানুষ মাজার দরগাহ দরবার ভাঙচুর চালায়। তবে তথাকথিত ইসলামপন্থীদের বাইরে মাজার রক্ষার একশনটা মুসলিম মনে অন্তর্লীন এক ঐতিহাসিক চেতনার হঠাৎ বহির্প্রকাশ মাত্র হিশেবেও পাঠ করার সুযোগ আছে।
পাঁচই আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক-ধর্মীয় বাস্তবতা ভিন্ন মাত্রায় হাজির হওয়ার কারণে (মববাজ, তথাকথিত ইসলামপন্থী, তৌহিদী জনতা, ওহাবী সালাফী— নানান র্যাডিকাল গ্রুপের কারণে) আমরা কিছু চ্যালেঞ্জ এর মুখোমুখি হয়েছিলাম। তার মধ্যে ‘মাজার রক্ষা’ও একটা চ্যালেঞ্জ ছিল। এর পক্ষে কণ্ঠ উঁচু করার হিম্মত বেশ ভালোই শক্তি খরচ করেছে। কারণ, ইসলাম ও তৌহিদের নাম দিয়েই একদল মানুষ মাজার দরগাহ দরবার ভাঙচুর চালায়। তবে তথাকথিত ইসলামপন্থীদের বাইরে মাজার রক্ষার একশনটা মুসলিম মনে অন্তর্লীন এক ঐতিহাসিক চেতনার হঠাৎ বহির্প্রকাশ মাত্র হিশেবেও পাঠ করার সুযোগ আছে।
লক্ষণীয়, যাঁরা সাধারণত মাজারে যায় না, মাজারের ভাষা থেকে আসা মুরশিদী, কালাম ও সামা শোনে না, এবং কোনো সুফী তরীকার সাথে প্রত্যক্ষভাবেও সম্পৃক্ত নয়— তাঁরাও মাজার আক্রান্ত হওয়ার মুহূর্তে এক অদ্ভুত ঐক্যবোধে সংহত হয়ে মাজারের পক্ষে কণ্ঠ দিয়েছেন। এই সংহতি মাজারপন্থীদের জন্য একটা ইতিবাচক বুদ্ধিবৃত্তিক আবহ তৈরি করেছিল, যেখানে মাজার রক্ষার দাবিটা কেবল ধর্মীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে একটা বৃহত্তর নাগরিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রশ্ন হয়ে উঠেছিল। (এই পক্ষ নেওয়ার পর তারা সুফীদের সাথে যোগাযোগও বৃদ্ধি করেছেন।)
আমরা যারা কথা বলেছি, মসজিদ ও মাহফিল মজলিশে বক্তব্য দিয়েছি, ফেসবুকে লিখেছি, ভাষা তৈরী করেছি, তারা —মাজারপন্থীরা— তাদের কাছে ঋণী এই দিক থেকে। কারণ, মাজারপন্থীদের নিজস্ব ভাষার বাইরে ভিন্ন ভাষায় মাজারপক্ষ উচ্চারিত হওয়াটা জরুরী ছিল।
সোজা করে বললে, বামরাজনীতি-সংলগ্ন মানুষদেরও মাজার রক্ষার পক্ষে কথা বলা, মানববন্ধনে উপস্থিত হওয়া ও হতে পারা, মাজারী সাংস্কৃতিকে গুরুত্বের সাথেই আলোচনায় নিয়ে এসেছে। এটা আশাজাগানিয়া।
তবে আজকের আলাপে একটা প্রশ্ন তীব্র করে তোলতে চাই — পীর, ওলী, আউলিয়া, সাইয়্যিদ ও উলামাদের কবরকে ‘মাজার’ বলার এই রেওয়াজ বাঙালী মুসলমানের মনে কীভাবে গড়ে উঠল? কোত্থেকে তারা কবরকে মাজার বলার সবক পেল?
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, পীর-আউলিয়াদের কবরকে 'মাজার' ডাকার এই দীর্ঘ রেওয়াজের পেছনে যে গভীর ঐতিহাসিক ও দার্শনিক ভিত্তি রয়েছে, তার কোনো সুসংহত বিশ্লেষণ মাজারপন্থীরা আজ পর্যন্ত সেভাবে তুলে ধরতে পারেননি। এবং এর দায় অবশ্যই মাজারপন্থীদেরই নিতে হবে। কারণ, তারা গাফেল। ফেসবুকে লেখালেখি হয়েছে, ইভেন্ট খোলা হয়েছে, প্রতিরোধ করার চেষ্টা করা হয়েছে, লেখালেখি হয়েছে, ভিডিয়ো হয়েছে, পত্রিকায় কলাম হয়েছে, মানববন্ধন হয়েছে— এমনকি বইও রচিত হয়েছে; তা পাঁচই আগস্টের পরে কিন্তু দুই হাজার ছাব্বিশ সালে । (এর আগে যে মাজার নিয়ে বইপত্র হয় নাই, তা নয়। কিন্তু তা আমাদের মাজারী আকাঙ্খাকে ততটকু গুরুত্ব দিয়ে হয়নি কিংবা পূর্ণধারণ করে হয়নি। শুধু লেখার জায়গা থেকে বা ইতিহাস রক্ষার দায় থেকে লেখা হয়েছে। মাজার যে আমাদের বিপ্লবী করে তোলে, আমাদের সাংস্কৃতিক আকাঙ্খা ও ভাব প্রকাশের স্পেস দেয়, কথা বলার সুযোগ দেয়, আওয়াজ দেওয়ার বোধ তৈরী করে— সেই জায়গা থেকে নয়। তারপরও আলহামদুলিল্লাহ )
(পাঁচই আগস্ট পরবর্তী) যেমন, হাসনাত শোয়েবের( Hasnat Soyeb) মাজার যে ভাষায় কথা বলে —যা নিঃসন্দেহে একটা গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এটা পাঠ করা যেতে পারে। এবং পাঁচই আগস্টের পরে নানান গ্রুপ তৈরী হয়েছে, যারা আলাদাভাবেই মাজার নিয়ে কাজ করছে। লিখছে। তবে এই আলোচনা এখনো পূর্ণাঙ্গ বৌদ্ধিক ধারায় রূপ নেয়নি। তা অনেকটাই মাজার কেন্দ্রিক ইতিহাস মন্থনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আর আমরা হাসনাত শোয়েবের লেখাকে মাজার ভাঙচুরের প্রতিবাদ হিশেবে নিতে পারি। কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। আরো প্রয়োজন ও দরকার।
মাজার যেভাবে আমাদের ও এই দেশের জনজীবনে প্রভাব রাখছে, আর্থসামাজিক জীবনে অংশগ্রহণ করছে, সে হিশেবে তা পূর্ণাঙ্গ রূপসহই আলাপের দাবী রাখে বৈকি। এখন আলাপ হলো কি হলো না তা দিয়ে মাজারের গুরুত্ব বিচার করলেও ভুল হবে। অধিকন্তু মাজার যারা দখল করে রেখেছে, তারা আর্থিক লাভের বাইরে মাজারকে এর বেশি কিছু হিশেবে দেখতে চাচ্ছে না। মাজার নিয়ে মাজারের লোকদের যে একশন থাকার কথা ছিল, তা নেই। আগলা থেকে পিরিতি আমরা দেখিয়েও হয়তো তেমন বেশি কিছু করে ফেলতে পারব না। এর জন্য মাজারের খাদেম খোদ্দাম ও গদ্দিনীশিন পীরদের এগিয়ে আসা দরকার।
পীর-আউলিয়াদের কবরকে আমরা বিভিন্ন নামে চিনতে পারি— মরক্বদ (مرقد), মশহাদ (مشهد), মকবরাহ (مقبرة), রওজা (روضة) এবং মাজার (مزار)। প্রতিটা শব্দই একটা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি বহন করে। মকবরাহ কেবল সমাধিক্ষেত্রই বুঝায়। এই জন্য সুফী তরীকার সাথে সম্পৃক্ত নয়, অন্য ঘরানার লোকেরা তাদের ইমামদের কবরকে মকবরাহ বলতে শোনা যায়।(যেমন ওহাবী) মরক্বদ হলো, নিদ্রাস্থল, বিশ্রামাগার, বিছানা, শয্যা— যেখানে কেউ আরামের সাথে শুয়ে থাকে; রওজা জান্নাতী বাগানের ইঙ্গিতবাহী; মশহাদ পবিত্র স্থান— যেখানে কোনো ঐতিহাসিক বা আধ্যাত্মিক উপস্থিতি নিজেকে প্রকাশ করে। আর ‘মাজার’— এর শাব্দিক মূল “زيارة”—যেখানে যাওয়া হয়, জেয়ারত করা হয় এবং পুনরাগমন ঘটে, বারবার যাওয়া হয়, সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়। একবার গেলাম, দেখে চলে আসলাম, এমন নয়। বরং মানুষ সেখানে বারবার যেতে চায়। যাওয়ার তাগাদা তার থাকে। স্রেফ দেখার জন্যই নয়, নিজের সত্তার সাথে ঐশী যোগাযোগের জন্যও। এই আধ্যাত্মিক ব্যাপারটাই অন্যান্য দর্শনীয় স্থান থেকে পীর ওলী আউলিয়াদের করবকে ( মাজারকে) আলাদা করে তোলেছে। জেয়ারত করার অর্থে যেকোনো দর্শনীয়স্থানকে মাজার বলা যায়৷ কিন্তু আমরা তো তা বলি না।
মাজারের সাথে ‘সহবত’ শব্দের বেশ যোগাযোগ আছে। একজন পীর— যিনি জিন্দা, তার সহবতে যাওয়া মুরীদদের জন্য আবশ্যক। এই ব্যাপারে প্রচলিত আছে, একটু সময় আউলিয়াদের সহবত শত বছর বেরিয়া এবাদতের চেয়ে উত্তম। এই দৃষ্টিতে একজন পীর ও মুরশিদ জিন্দা মাজার। অর্থাৎ যার সহবতে বারবার যাওয়া হচ্ছে, আধ্যাত্মিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য বারবার আসা হচ্ছে। এবং যে আসছে, সে মনে করছে এই আসাটা তার দরকারই, আসার তাগাদা ,টান, আকাঙ্খা তার আছে। ঠিক এই কারণটাই বোঝা উচিৎ।
মাজারে মানুষ ক্যান যায়? দেখার জন্যই শুধু? না। বরং মানুষ মাজারে যায় শায়িত সেই আল্লাহর ওলীর ফায়েজ লাভের জন্য।
এই আকাঙ্খাসহ বারবার জেয়ারতের কারণেই তা মাজার। সুতরাং মাজার কেবলই জেয়ারতগাহ অর্থে না। বরং এর সাথে মানুষের যাতায়াতের একটা তাআল্লুক নিসবত থাকার কারণেই। এবং মানুষ আসলে গেলেই তা মাজার হয়ে উঠে না। বরং যখন এই আসা যাওয়ার কারণে একটা আধ্যাত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করতে চায়, তখনই তা মাজার। মাজার এমন এক সত্তা যা মানুষকে সেটার দিকে আহ্বান করে। মানুষকে টেনে আনে। কেবলই দেখার জন্য না। আধ্যাত্মিক সম্পর্কের জন্যও।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়— বাংলাদেশে কেন এই বহুবিধ শব্দের মধ্যে “মাজার” শব্দটিই এককভাবে প্রাধান্য পেল?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ভাষাতত্ত্ব নয়, বরং সাহিত্য-ইতিহাসের গভীরে প্রবেশ করতে হবে— বিশেষত বাংলা সুফী সাহিত্যের। কারণ, লিখিত সাহিত্যের জন্ম ও তার চর্চা থেকে কোনো রেওয়াজ গড়ে উঠার প্রাথমিক আলামত পাওয়া যায়।
বাংলার সুফী সাহিত্য সম্পর্কে যাঁরা অবগত, তাঁরা জানেন— তা কেবল তাসাউফের বিমূর্ত তত্ত্বে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটা গভীরভাবে আহলে বাইত-কেন্দ্রিক। এখানে পীর-আউলিয়াদের কেবলই আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক হিশেবে দেখা হয় না। এর সাথে সাথে তাদের এক বৃহত্তর নববংশীয় ও আহলে বাইতীয় উত্তরাধিকার সিলসিলার অংশ হিশেবেও বিচার করা হয়। এই সাহিত্যে নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং উনার আহলে বাইত—বিশেষত হযরত আলী ও হযরত হুসাইন আলাইহিমুস সালাম উনারা এক জীবন্ত নৈতিক-আধ্যাত্মিক আদর্শিক সত্তারূপে বিরাজমান, যাঁদের এশক (عشق) ও মাওয়াদ্দাহ (مودّة) বাংলা মুসলিম মনে গভীরভাবে প্রোথিত।
কারবালা, শাহাদাতের বয়ান, মকতলে হুসাইন এমন সব বাংলা সুফী কাব্য, পুঁথি, মরসিয়া—সবকিছুতেই এই কারবালামুখী চেতনা প্রবাহিত হয়ে আছে। অপরদিকে, উমাইয়াদের জুলুম-নির্যাতনের বর্ণনা, আশুরা পালনের সংস্কৃতি, এসব যেমন আহলে বাইতের প্রতি এক গভীর আনুগত্যের ভাষা হয়ে উঠেছে, তেমন তা জুলুমের নিন্দা ও প্রতিবাদের ভাষাও।
অর্থাৎ বাংলার সুফী সাহিত্যে পীর ওলী আউলিয়া সূফীতত্ত্বের বাইরে ব্যক্তিসত্তা হিশেবে নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও উনার আহলে বাইত— আলী ও হুসাইন আলাইহিমুস সালাম উনারা বেশ মর্যাদার সাথেই উপস্থিত আছেন।
এটা ছোটখাটো কোনো বিষয় নয়। এই আহলে বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের এশক ও মহব্বতের সাথে পীর ওলী আউলিয়া উলামাদের কবরকে মাজার বলার একটা গভীর তাআল্লুক আছে। হাদীস শরীফে সরাসরি বলা আছে — যে বা যাঁরা আহলে বাইতে রসূল উনাদের মহব্বতের উপর ইন্তেকাল করেন, উনাদের কবরকে আল্লাহ পাক মাজার ( আরবীতে মাজার শব্দটা উল্লেখ আছে) বানায়া দেন। একদিকে বাঙালী সুফীদের আহলে বাইত চর্চা, অন্যদিকে সুফী পীর ওলী আউলিয়াদের কবরকে মাজার বলা— দুটোর সম্পর্ক অভিন্ন নয়।
এই সম্পর্কে ইমাম জারুল্লাহ জামাখশারী রহ. তিনি ‘তাফসীরে কাশশাফ’ এ উল্লেখ করেন। তা উনার বরাতে জগৎ খ্যাত আশআরী তরীকার ইমাম ফখরুদ্দীন রাজী রহ. তিনি স্বীয় কেতাবে উল্লেখ করেন। তিনি লিখেন—
نَقَلَ صَاحِبُ(الْكَشَّافِ)
عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: مَنْ مَاتَ عَلَى حُبِّ آلِ مُحَمَّدٍ صلي الله عليه وسلم مَاتَ شَهِيدًا أَلَا وَمَنْ مَاتَ عَلَى حُبِّ آلِ مُحَمَّدٍ صلي الله عليه وسلم مَاتَ مَغْفُورًا لَهُ، أَلَا وَمَنْ مَاتَ عَلَى حُبِّ آلِ مُحَمَّدٍ صلي الله عليه وسلم مَاتَ تَاَا وَمَنْ مَاتَ عَلَى حُبِّ آلِ مُحَمَّدٍ صلي الله عليه وسلم مَاتَ مُؤْمِنًا مُسْتَكْمِلَ الْإِيمَانِ، أَلَا وَمَنْ مَاتَ عَلَى حُبِّ آلِ مُحَمَّدٍ صلي الله عليه وسلم بَشَّرَهُ مَلَكُ الْمَوْتِ بِالْجَنَّةِ ثُمَّ مُنْكَرٌ وَنَكِيرٌ، أَلَا وَمَنْ مَاتَ عَلَى حُبِّ آلِ مُحَمَّدٍ صلي الله عليه وسلم يُزَفُّ إِلَى الْجَنَّةِ كَمَا تُزَفُّ الْعَرُوسُ إِلَى بَيْتِ زَوْجِهَا، أَلَا وَمَنْ مَاتَ عَلَى حُبِّ آلِ مُحَمَّدٍ صلي الله عليه فُتِحَ لَهُ فِي قَبْرِهِ بَابَانِ إِلَى الْجَنَّةِ، أَلَا وَمَنْ مَاتَ عَلَى حُبِّ آلِ مُحَمَّدٍ صلي الله عليه وسلم جَعَلَ اللَّهُ قَبْرَهُ مَزَارَ مَلَائِكَةِ الرَّحْمَةِ، أَلَا وَمَنْ مَاتَ عَلَى حُبِّ آلِ مُحَمَّدٍ صلي الله عليه وسلم مَاتَ عَلَى السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ، أَلَا وَمَنْ مَاتَ عَلَى بُغْضِ آلِ مُحَمَّدٍ صلي الله عليه جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَكْتُوبًا بَيْنَ عَيْنَيْهِ آيِسٌ مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ، أَلَا
وَمَنْ مَاتَ عَلَى بُغْضِ آلِ مُحَمَّدٍ صلي الله عليه مَاتَ كَافِرًا، أَلَا وَمَنْ مَاتَ عَلَى بُغْضِ آلِ مُحَمَّدٍ صلي الله عليه وسلم لَمْ يَشُمَّ رَائِحَةَ الْجَنَّةِالْجَنَّةِ. هَذَا هُوَ الَّذِي رَوَاهُ صَاحِبُ (الْكَشَّافِ)
وَمَنْ مَاتَ عَلَى بُغْضِ آلِ مُحَمَّدٍ صلي الله عليه مَاتَ كَافِرًا، أَلَا وَمَنْ مَاتَ عَلَى بُغْضِ آلِ مُحَمَّدٍ صلي الله عليه وسلم لَمْ يَشُمَّ رَائِحَةَ الْجَنَّةِالْجَنَّةِ. هَذَا هُوَ الَّذِي رَوَاهُ صَاحِبُ (الْكَشَّافِ)
অর্থ: ছহিবে কাশশাফ ইমাম জারুল্লাহ জামাখশারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তিনি নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার থেকে বর্ণনা করেন: নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন— ‘যাঁরা আহলে বাইত শরীফ উনাদের মহব্বতের উপর ইন্তেকাল করবেন, তাঁরা শহীদ হিশেবে ইন্তেকাল করবেন। আরো শোনে রাখো, যাঁরা আহলে বাইত উনাদের মহব্বতের উপর ইন্তেকাল করবেন, তাঁরা মাগফূর অর্থাৎ ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে ইন্তেকাল করবেন। যাঁরা আহলে বাইত উনাদের মহব্বতের উপর ইন্তেকাল করবেন, তরা তাওবাকারী হিশেবে ইন্তেকাল করবেন। যাঁরা আহলে বাইত শরীফ উনাদের মহব্বতের উপর ইন্তেকাল করবেন, তাঁরা পরিপূর্ণ ঈমানদার হিশেবে ইন্তেকাল করবেন। যাঁরা আহলে বাইত শরীফ উনাদের মহব্বতের উপর ইন্তেকাল করবেন, তাঁদেরকে আজরাঈল ফেরেশতা ও মুনকার নাকীর ফেরেশতা জান্নাতের সুসংবাদ দিবেন।
যাঁরা আহলে বাইত শরীফ উনাদের মহব্বতের উপর ইন্তেকাল করবেন,তাঁদেরকে এমনভাবে সাজিয়ে জান্নাতে নেওয়া হবে যেভাবে নববধূকে সাজিয়ে স্বামীর ঘরে নেওয়া হয়। যাঁরা আহলে বাইত শরীফ উনাদের মহব্বতের উপর ইন্তেকাল করবেন, তাঁদের কবরের দিকে জান্নাতের দুইটা দরজা খুলে দিবেন। যাঁরা আহলে বাইত শরীফ উনাদের মহব্বতের উপর ইন্তেকাল করবেন, তাঁদের কবরকে রহমতের ফেরেশতাদের মাজার বানাবেন।
যাঁরা আহলে বাইত শরীফ উনাদের মহব্বতের উপর ইন্তেকাল করবেন, তাঁরা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকীদার উপর ইন্তেকাল করবেন।
তবে সাবধান যারা আহলে বাইত শরীফ উনাদের প্রতি বিদ্বেষ রেখে মারা যাবে, কেয়ামতের দিন তাদের দুচোখের মাঝে লেখা থাকবে, তারা মহান আল্লাহ পাক উনার রহমত থেকে বঞ্চিত। আরো শোনো যে বা যারা আহলে বাইত শরীফ উনাদের প্রতি বিদ্বেষ রেখে মারা যাবে, সে বা তারা কাফের অবস্থায় মারা যাবে। যারা আহলে বাইত শরীফ উনাদের প্রতি বিদ্বেষ রেখে মারা গেল, তারা জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।
—তাফসীরে কাবীর, ফখরুদ্দীন রাজী রহ. ২৭/৫৯৫ পৃ.
অতএব, বিশেষ করে বাঙালী মুসলমানদের পীর-আউলিয়াদের কবরকে ‘মাজার’ বলা এটা একটা দৃষ্টিভঙ্গি, একটা বিশ্বাসতাত্ত্বিক অবস্থান। স্রেফ এমনি এমনি কবরকে মাজার বলার রেওয়াজ তৈরী হয়নি।
এবং এই চেতনার গভীরে নিহিত রয়েছে আহলে বাইতের প্রতি এশক— যে এশক বেছালের পরও একজন মানুষকে জিন্দা রাখে। তাঁকে একটা অব্যাহত হাজিরা(মশহদ) রূপে উপলব্ধি করায়। ইমাম ও বিশ্ববিখ্যাত ফকীহ আল্লামা ইসমাঈল হাক্কী হানাফী রহ. উনার কেতাবে বলেছেন:
فبناء القباب على قبور العلماء والأولياء والصلحاء ووضع الستور والعمائم والثياب على قبورهم امر جائز إذا كان القصد بذلك التعظيم فى أعين العامة حتى لا يحتقروا صاحب هذا القبر
তরজমা: উলামা, আউলিয়া ও বুজুর্গদের কবরের উপর ইমারত গম্বুজ তৈরী করা ও কাপড় দ্বারা কবরে গিলাফ দেওয়া জায়েয— যদি তা মানুষের মনে এই ধারণা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে হয় যে, তিনি মহান, নগন্য নন। যাতে লোকেরা কবরবাসীকে নগণ্য মনে না করে।
—তাফসীরে রুহুল বয়ান, ৩/৪৮২ পৃ. সূরা তাওবার ১৮ নং আয়াতের তাফসীর দেখুন
তাজীমান মাজার পাকা করা, উঁচু করা, গম্বুজ তৈরী করা জায়েজ। কথাটার দিকে খেয়াল করুন তাজীমান। তাজীম বা সম্মানের কারণেই মাজারে গম্বুজ করা হয়। সাধারণের কবরকে করা হয় না। আবার সাধারণের কবরও জেয়ারত করা হয়, কিন্তু তাকে মাজার বলার রেওয়াজ আমাদের নেই। স্রেফ জেয়ারতের কারণেই একখানা কবর মাজার হয়ে উঠে না। এখানে উভয় পক্ষের জেয়ারতের ব্যাপার আছে।
মশহাদ বা ইত্যাদি শব্দে পরিচিত না হয়ে , ওলীআউলিয়াদের কবর ‘মাজার’ শব্দে হাজির হওয়ার পিছনের যে বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান, যে দৃষ্টিভঙ্গি তার গুরুত্ব কী মাজার আসলেই এখনও সমানভাবে ধরে রাখতে পারছে? বা মাজারের ঐ খাদেম খোদ্দামরা? প্রশ্ন থেকে গেলে।
মাজারে নবীপ্রেম ওলী প্রেমের সাথে সাথে আহলে বাইতপ্রেমও সমান গুরুত্ব পেতে হবে। নয়তো মাজার শব্দের ইজ্জত থাকবে না। কবর থেকে উঠে মাজার হয়ে যাওয়া তো আহলে বাইতের এশক প্রেম মহব্বত এর কারণেই।