শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
সুফিবাদ আউলিয়াগণের মাজার জিয়ারত করার দলিল

আউলিয়াগণের মাজার জিয়ারত করার দলিল

(২য় পর্ব ) বর্তমানে একদল লোক বিশেষ করে ইবনে তাইমিয়া ও তার সমর্থকরা নিয়ত করে মাজার জিয়ারতের জন্য সফর করার ব্যাপারে হাদিস শরীফের ভুল বা মনগড়া ব্যাখ্যা করে থাকে।এমনকি ইবনে তাইমিয়া তার ফতওয়ায়ে কোররাতে হুজুর পাক (ﷺ)-এঁর রওজা শরীফও নিয়ত করে জিয়ারতের জন্য সফর করা নিষেধ করেছে।তারা এ ব্যাপারে নিম্নোক্ত হাদিস শরীফ বর্ণনা করে থাকে:
★২. হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ফরমান: তিনটি মসজিদ ছাড়া আর কোথাও (উটের) হাওদা বেঁধো না; যথা- মসজিদুল হারাম, মসজিদুল আকসা ও আঁমার মসজিদ
[মেশকাত: ৬৪২, বুখারী ও মুসলিম]
অর্থাৎ,হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা:) বলেন,হুজুর পাক (ﷺ)-বলেছেন তিন মসজিদ ছাড়া সফর করো না,মসজিদুল হারাম, মসজিদুল আক্বছা ও আঁমার এই মসজিদ।
ব্যাখ্যা বিশ্লেষন ও অভিমত
*(ক.) এ হাদিস শরীফে রওজা শরীফ, মাজার শরীফ ও মুসলমানদের কবর জিয়ারতের কোনো কথাই নেই। আর তাই, এটিকে কবর জিয়ারতের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলাটা চরম অজ্ঞতা ও হাস্যকর তথা গোমরাহী।ঐ নিষেধাজ্ঞা শুধু অন্যান্য মসজিদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।তা না হলে, ঐ ৩টি মসজিদ ছাড়া আর কোথাও যাওয়ার উদ্দেশ্যে তো বাড়ী থেকেই বের হওয়াই যাবে না বা হারাম বলে সাব্যস্ত হবে (নাউযুবিল্লাহ)! যেমন- বাজার, অফিস-আদালত, ব্যবসা কেন্দ্র, স্কুল-কলেজ-মাদরাসা-বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল,শ্বশুর বাড়ী,বিয়াইয়ের বাড়ী তথা আর কোথাও যাওয়া যাবে না!!
একটি হাদিস শরীফ দিয়ে আরেকটি হাদিস শরীফকে ব্যাখ্যা করাই উত্তম ব্যাখ্যা:
মুসনাদে আহমাদে উল্লিখিত হাদিস শরীফটি আরেকটু বিস্তারিতভাবেই রয়েছে – যা অনায়াসে আলোচ্য হাদিস শরীফটির ব্যাখ্যা হতে পারে: যেমন- হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা:) বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ফরমান: “মসজিদুল হারাম, মসজিদুল আকসা ও মসজিদে নববী– এ ৩টি মসজিদ ছাড়া অন্য কোনো মসজিদে নামাজ আদায়ের উদ্দেশে সফর করা মুসাফিরের জন্যে সঙ্গত নয়।”
[মুসনাদে আহমাদ: ১১৬০৯]
অথচ: উপরোক্ত হাদিস শরীফ কবর বা মাজার শরীফ জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা সংক্রান্ত নয়, ইহা মসজিদে সফর করা সম্পর্কিত।
*(খ.) হাফিজে হাদীস শায়েখ আল্লামা ইবনে হাযার আসকালানী (রহ:) বলেন: এ হুকুমের উদ্দেশ্য হলো শুধু মসজিদের সাথে সস্পৃক্ত।এ মসজিদ তিনটি ব্যতীত অন্যান্য মসজিদে নামাজের জন্য সফর করা নিষিদ্ধ। তবে যদি মসজিদ ব্যতীত সালেহগণের (কবর) জিয়ারত, জীবিত-গণের সাথে সাক্ষাৎ, ইলম অর্জন,ব্যবসায় ও ভ্রমনের জন্য সফর করে তা এহাদীসের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হবে না।
[ফতহুলবারী,৩য় খন্ড, ৬৫ পৃষ্ঠা]
*(গ.) শায়েখ আব্দুল হক মোহাদ্দেস দেহলবী (রহ:) বলেন: কতক আলেমের মতে, এখানে মসজিদের কথা বলা হয়েছে অর্থাৎ তিন মসজিদ ব্যতীত অন্য কোন মসজিদের দিকে ভ্রমন করা জায়েজ নহে, মসজিদ ব্যতীত অন্যত্র ভ্রমন এ হুকুমের অন্তর্ভূক্ত নহে।
[আশআতুল লোমআত,১ম খন্ড ৩২৪পৃঃ]
*(ঘ.) ওহাবীদের গুরু আশরাফ আলী থানবী বলেন, এই হাদিস শরীফ হুজুর পাক (ﷺ)-এঁর রওজা শরীফ জিয়ারত নিষিদ্ধ হওয়ার দলিল হতে পারে না।কেননা অন্যান্য হাদীস শরীফ এটা পরিস্কার করে দিয়েছে যে, কোন মসজিদে নামাজ পড়ার নিয়তে সফর করা যাবেনা তিন মসজিদ ছাড়া। কেননা (এ তিন মসজিদ ব্যতীত) অন্যান্য মসজিদের ক্ষেত্রে অধিক সওয়াবের কোন অঙ্গীকার নাই। আবার কেউ কেউ এ জন্য নিষেধ করে থাকেন যে, সেখানে লোক জমায়েত হয়।তোমরা আমার রওজা শরীফকে উৎস বের বা ঈদের স্থান বানাইওনা) এ হাদীসকে দলিল হিসেবে পেশ করে থাকেন।
কিন্তু ওখানে না কোন নির্দিষ্ট সময় আছে না কোন গুরুত্ব আছে। আর ঈদের মধ্যে এ দুই বিষয়ই পাওয়া যায়। আবার কেউ কেউ বলেন যে, খাইরুল কুরুনের মধ্যে এ সফর ছিল না কিন্তু এ দলিল ও গ্রহনযোগ্য নয়।
কেননা সাইয়্যিদেনা হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ:) যিনি উচ্চ মর্যাদার তাবেয়ী ছিলেন,তিনি হুজুর পাক (ﷺ)-এঁর রওজা শরীফে সালাম পৌঁছানোর জন্য শাম দেশ হইতে নিয়ত করে দূত প্রেরণ করতেন, কিন্তু এতে কেউ কোন প্রকার আপত্তি করেন নাই।তাই এটা এক ধরনের এজমা হিসেবে পরিগণিত। যখন অন্য জনের তরফ হতে সালাম পৌঁছানো জায়েজ হয় তা হলে নিজের তরফ হতে সালাম পেশ করার জন্য সফর করা উত্তম জায়েজ।
[বাওয়াদে উন্ নাওয়াদের পৃঃ ৪৬০]
*(ঙ.) আল্লামা মুহাম্মদ হাসান শাহ্ মোহাজেরে মক্কি বলেন,: এর মর্ম হলো জীবিতদের জন্য ফায়দাদায়ক। বরকত হাসিলের জন্য এ তিন মসজিদ ব্যতীত অন্যত্র সফর করা বিধেয় নয়।কেননা বাকী মসজিদ গুলো বরকতের দিক দিয়ে সমান। এ ছাড়া অপরাপর স্থানে সফর করা নিষেধ নয়।যেমন: আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপনের জন্য, ইলম অর্জনের জন্য, বুজুর্গগণের জিয়ারতের জন্য,হুজুর পাক (ﷺ)-এঁর রওজা মোবারক,হযরত ইব্রাহীম (আ:)-এঁর মাজার জিয়ারত ও সমস্ত ইমামগণের মাজারসমূহ জিয়ারত করা নিষিদ্ধ নয়।
*(চ.) ইমাম ইবনে হাযম রহমতুল্লাহি আলাইহি এর মতে জীবনে একবার কবর জিয়ারত করা ওয়াজিব।
[আইনী-৪/৭৬, ফতহুল মুলহীম ২/৫১, বজলুল মজহুদ ৪/২১৪]
তবে কেউ কেউ এ হাদীসের উল্লেখ করে কবর জিয়ারতকে নিষেধ করে থাকে, মূলতঃ কবর জিয়ারতের সাথে এ হাদীসের কোন সম্পর্কই নাই।
*(ছ.) ইমামুল মোহাদ্দেসীন শায়েখ আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতী (রহ:) শরহে সূয়ুতী কিতাবে এ সম্বন্ধে বলেছেন যে,এটা শুধু মসজিদের জন্যই খাছ।
*(জ.) বিখ্যাত ফক্বিহ ও মুহাদ্দিস মোল্লা আলী ক্বারী (রহ:) স্বীয় কিতাবে উল্লেখ করেন: ইমাম নববী (রহ:) এর শরহে মুসলিম কিতাবে বর্ণিত আছে,আবু মুহম্মদ বলেছেন তিন মসজিদ ব্যতীত সফর করা হারাম এটা ঠিক নয়।এহ্ইয়াউল উলুম কিতাবে উল্লেখ আছে, কিছু সংখ্যক আলেম বরকতময় স্থানসমূহ আলেম ও বুজুর্গগণের কবর জিয়ারত করার উদ্দেশ্যে সফর করাকে নিষেধ করে থাকেন।
কিন্তু আমার বিশ্লেষনাত্বক মত হলো এর নির্দেশ অনুরূপ নয়; বরং জিয়ারতের হুকুম রয়েছে। হাদীসে আছে।ঐ তিন মসজিদ ব্যতীত অন্য সব মসজিদে শুধু নামাজ পড়ার জন্য নিষেধ করার কারণ হলো বাকী মসজিদগুলো সওয়াবের দিক দিয়ে সমান।কিন্তু বরকতময় স্থানসমূহ এক সমান নয়; বরং মর্তবা ও মর্যাদা অনুসারে আল্লাহ্ পাকের নিকট ঐ গুলোর বরকত বিভিন্ন।এসব নিষেধকারীরা কি আম্বিয়া আলাইহিস সালাম গণের মাজার যেমন হযরত ইব্রাহীম (আ:), হযরত মুসা (আ:), হযরত ইয়াহ্ইয়া (আ:) এঁর রওজামোবারক এবং অনুরূপ যত প্রকার সফর আছে তা হতেও নিষেধ করতে সমর্থ হবে না।
[মেরকাত শরীফ-শরহে মেশকাত]
*(ঝ.) ‘ফাজায়েলে হজ্বে’ মাওলানা যাকারিয়া বলেন,কতক আলেম এ হাদীস দ্বারা প্রমান করেছেন যে, রওজায়ে পাকের নিয়তে সফর করাও নিষিদ্ধ; যেতে হবে মসজিদে নববীর নিয়তে।অবশ্য সেখানে পৌঁছলে রওজা শরীফের জিয়ারত করাতে কোন অসুবিধা নেই। তবে অধিকাংশ ওলামায়ে কিরামগণের অভিমত হচ্ছে শুধু নিয়ত করে কোন মসজিদে সফর করতে হলে এ তিন মসজিদ ব্যতীত অন্য মসজিদের নিয়ত করে যাওয়া নাজায়েজ।
হ্যাঁ এর অর্থ এ নয় যে, এ তিন মসজিদ ব্যতীত অন্য যে কোন সফর নাজায়েজ। বরং হাদীসে বর্ণিত আছে আমি তোমাদেরকে কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, এখন আবার অনুমতি দিচ্ছি, জিয়ারত করতে পারো।এ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আম্বিয়া আলাইহিস সালাম ও আওলিয়ায়ে কিরামগণের মাজারে জিয়ারতের জন্য সফর, করা সম্পূর্ণরূপে জায়েজ।তাছাড়া বিভিন্ন সূত্রে জিহাদের সফর, ইলম অর্জনের জন্য সফর, হিজরতের জন্য সফর ব্যবসায়ের জন্য সফর, তাবলিগী সফর ইত্যাদির জন্য উৎসাহ দেয়া হয়েছে।
[ফাজায়েলে হজ্ব]
মাওলানা জাকারিয়া কান্দুলুতী এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন: খাস খাস শহরের বিশেষ বিশেষ মসজিদে নামাজ পড়ার জন্য নিয়ত করে সফর করা হাদীস শরীফে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন আজকাল একটা প্রথা হয়েছে লোকেরা কলকাতা ও বোম্বে হতে দিল্লী জামে মসজিদে রমজানের আখেরী জুমআ পড়ার নিয়ত করে চলে আসে।
[ফাজায়েলে হজ্ব পৃঃ১৪১]
*(ঞ.) বিখ্যাত মুহাদ্দিস জয়নুদ্দীন ইরাকী (রহ:) বলেন: তিন মসজিদ ব্যতীত অন্য কোথাও ভ্রমন করো না এ হাদীসের ব্যবহারের উত্তম যথোপযুক্ত স্থান হল শুধু মসজিদ। তবে যদি মসজিদ ব্যতীত অন্যত্র ভ্রমনের ইচ্ছা করে যেমন- ইলম অন্বেষণ, বুজুর্গগণের সহিত (মৃতও যদি হয়), আত্বীয়॥স্বজনদের সহিত সাক্ষাৎ, ব্যবসায়ের জন্য বা প্রমোদ ভ্রমনের জন্য বা অনুরূপ যত ভ্রমন আছে তা এ হাদীসের অন্তর্ভুক্ত নয়।
এখন প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে নিয়ত করে অর্থাৎ অন্য কোন উদ্দেশ্য ব্যতীত শুধু কবর জিয়ারত করার নিয়তে ভ্রমন করা জায়েজ কিনা? আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, আমাদের সর্বাঙ্গীন আমলের ক্ষেত্রেই হুজুর পাক (ﷺ)-এঁর সুন্নতের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। এস্থলে যদি কোন প্রকার অসাবধানতা অবলম্বন করা হয় তাহলে পদস্খলন নিশ্চিত।
*(ট.) হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী (রা:) লিখেছেন: “আল্লাহর ইবাদতের জন্যে দ্বিতীয় প্রকার সফর করা হয়। যেমন- হজ্জ্ব ও জিহাদের জন্যে সফর ইত্যাদি।এসব বিষয়ের ফাযাইল ও নিয়ম-কানুন আগে বর্ণনা করেছি। এতে (আরো) রয়েছে, নবীগণের (’আলাইহিমুস সালাম) কবর জিয়ারত করা। সাহাবী, তাবেঈন ও অন্যান্য আলেম ও ওলীর কবর জিয়ারতও এর অন্তর্গত। যে মহাপুরুষের সঙ্গে তাঁর দুনিয়ার হায়াতে সাক্ষাৎ করলে বরকত পাওয়া যায় – তাঁর ওফাতের পরে, তাঁর কবর জিয়ারত করলেও সেই বরকত পাওয়া যায়! এ উদ্দেশ্যে সফর করা জায়েজ।
রাসূলে করীম(ﷺ)-এঁর ঐ হাদীস শরীফ কোনোভাবেই এর প্রতিবন্ধক নয় – যেখানে তিনি ফরমান: তিনটি মসজিদ ছাড়া আর কোথাও (উটের) হাওদা বেঁধো না; যথা- মসজিদুল হারাম, মসজিদুল আকসা ও আমার মসজিদ (মসজিদে নববী)।”
[ইহইয়াউ ’উলূমিদ্দীন, সফর অধ্যায়]
হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গায্যালী (রহ:) সফরকে পাঁচ ভাগে ভাগ করেছেন, তার মধ্যে একটি হলো ইবাদত সম্পাদনের উদ্দেশ্যে সফর।যেমন হজ্ব এবং জ্বিহাদে যোগদানের জন্য নবী আলাইহিস সালাম, সাহাবী রাদিআল্লাহু আনহু, তাবেঈনগণ এবং অলি আল্লাহ্গণের মাজার জিয়ারতের জন্য, এবং ধার্মিক আলেম ও বুজুর্গগণের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য দেশ বিদেশ সফর করা।
কেননা তাঁদের চেহারা মোবারক দর্শণ করা ইবাদতের মধ্যে গন্য হয় এবং তাঁদের নেক দোয়ার মধ্যে যথেষ্ট বরকত নিহিত রয়েছে।তাঁদের দর্শন লাভের উপকারিতা সমূহের মধ্যে একটি উপকারিতা এই॥ তাঁদের দরবারে গমন করলে তাঁদের আচার ব্যবহার ও কার্য কলাপের অনুসরণ করতে স্বভাবতঃ ইচ্ছা হয়। এ কারণে বুজুর্গ লোকদের দর্শন লাভ করাকে ইবাদতের মধ্যে গন্য করা হয়।
আবার এটা ইবাদতের বীজ স্বরূপও বটে। তদুপরি জীবিত অলি আল্লাহ্গণের মহামূল্য বাণী যখন তার ধর্ম পথের সহায়ক হয়, তখন অলী আল্লাহ্গণকে দর্শনের সার্থকতা ও উপকারিতা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।সুতরাং ইচ্ছাপূর্বক নিয়ত করে বুজুর্গানে দ্বীনের মজলিসে এবং কবরস্থানে গমন করা জায়েজ আছে।
কোন কোন শাফেয়ী আলেম এ ব্যাপারে ভিন্ন মত পোষণ করেন। শায়েখ আল্লামা ইবনে আবেদীন হানাফী তাঁর রচিত শামী কিতাবে এ প্রসংগে লিখেন: কোন কোন শাফেয়ী ইমাম হুজুর পাক (ﷺ)-এঁর জিয়ারত ব্যতীত তিন মসজিদ এর উপর কিয়াস করে অন্যান্য কবর জিয়ারতে নিষেধ করেন, ইমাম গায্যালী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাদের এই বক্তব্যকে প্রতিহত করে বলেন:
এ তিনটি মসজিদ ব্যতীত অন্য সব মসজিদ মর্যাদার দিক দিয়া বরাবর বিধায় অন্যান্য মসজিদ সমূহে ভ্রমন করা প্রয়োজন নাই।
*(ঠ.) শায়খ আব্দুল হক দেহলভী (রহ:) লিখেছেন: “হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম মুহাম্মাদ গাজ্জালী (রহ:) বলেছেন যে, যেসব বুযুর্গ পার্থিব জীবনে বরকত দান করতেন–তাঁরা ইন্তেকালের পরেও উসীলা হওয়ার ও বরকত দান করার (সাহায্য করার) যোগ্যতা রাখেন।কেননা, ইন্তেকালের পরে আত্মার অবশিষ্ট থাকাটা হাদীস শরীফ ও উম্মতের ইজমার আলোকে প্রমাণিত ও সাব্যস্ত। জীবদ্দশায় ও ওফাতের পরে – উভয় অবস্থায়ই আত্মা কাজ করে। শরীরের সঙ্গে কাজের কোনো সম্পর্ক নেই। আর আসল কাজতো করেন আল্লাহু তা’লাই।”
[সূত্র: তাকমীলুল ঈমান, ১২২ পৃষ্ঠা]
তিনি আরো লিখেছেন: “সূফীগণ বলেন যে, কোনো কোনো ওলীর কাজ করার ক্ষমতা আলমে বারঝাখেও (কবরে) রয়েছে। তাঁদের পবিত্র আত্মা থেকে সাহায্য-সহযোগিতা লাভ করা যায়।বেলায়েত অর্থ ফানাফীল্লাহ তথা আল্লাহতে বিলীন হয়ে যাওয়া এবং বাকাবিল্লাহ তথা আল্লাহতে অবশিষ্ট থাকা। এটা ওফাতের পরে, আরো পূর্ণতা পায় এবং শক্তিশালী হয়। হৃদয়বান ও সূক্ষ্মদর্শী বিশ্লেষকদের মতে, এটা প্রমাণিত যে, জিয়ারতকারীদের আত্মা কবরবাসীদের আত্মা থেকে আলো ও রহস্যের প্রতিচ্ছবি লাভ করে।
একটি আয়নার সামনে আরেকটি আয়না রাখলে যা হয় আরকি! এতে প্রতিচ্ছবি পড়ে। আল্লাহর ওলীগণের (ওফাতের পরে) মেছালী (প্রতীকী) শরীর থাকে – যার মাধ্যমে তাঁরা প্রকাশিত হয়ে সাহায্যপ্রার্থীকে সাহায্য করেন। যে এ কথা অস্বীকার করে – তার কাছে কোনো দলিল-প্রমাণ নেই।”
[সূত্র: প্রাগুক্ত, ১২২-১২৩ পৃষ্ঠা]
তিনি আরো লিখেছেন, জনৈক বুযুর্গ বলেন, আমি এমন চারজন বুযুর্গ দেখেছি – যাঁরা তাঁদের পার্থিব জীবনের চেয়ে কবরে গিয়ে আরো বেশি ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন। তাদের মাঝে খাজা মারূফ কারখী ও শেখ আব্দুল কাদির জিলানী (রাদ্বিআল্লাহুতা’লা ’আনহুমা) রয়েছেন। … সায়্যিদ আহমাদ মারঝুক বলেন, জীবিতদের চেয়ে ওফাতপ্রাপ্ত বুযুর্গের সাহায্য বেশি শক্তিশালী।ওলীগণের নিয়ন্ত্রণ সব জগতেই রয়েছে। এ ক্ষমতা হচ্ছে, তাঁদের রূহগুলোর। আর রূহগুলো অবিনশ্বর ও স্থায়ী।”
[আশিয়াতুল লুমুয়াত,কবর জিয়ারত অধ্যায়]
*(ড.) রাসুল(ﷺ)-বলেছেন: মক্কা মুআয্যমা, মদীনা মুনাওয়ারাহ্ এবং বায়তুল মুকাদ্দাস ব্যতীত অন্য কোন স্থানের উদ্দেশ্যে সফর করোনা। এ হাদীসের দ্বারা পরিস্কারভাবে এটাই প্রমানিত হয় যে, এ তিন মসজিদ ছাড়া অন্য কোন মসজিদ এবং মজলিসকে বরকত তথা কল্যানের উপলক্ষ মনে করবে না।এ তিন মসজিদ ভিন্ন আর সমস্ত মসজিদের মর্যাদাই সমান। কিন্তু জীবিত আলেম ও বুজুর্গ লোকদের মজলিসে গমনপূর্বক তাঁদের সাহচর্য অবলম্বন যেমন এ হাদীসের অন্তর্ভূক্ত নয়, তদ্রুপ পরলোকগত ওলামায়ে কিরাম এবং বুজুর্গানে দ্বীনের কবরস্থান জিয়ারত করাও এ হাদিসের অন্তর্ভুক্ত নয়।
অর্থাৎ এ নিষেধ হাদীস দ্বারা জীবিত ওলামায়ে কিরামের সভায় গমন করা যেমন নিষিদ্ধ হয় নাই তদ্রুপ মৃত বুজুর্গানে দ্বীনের কবর জিয়ারত করাও নিষিদ্ধ হয় নাই। সুতরাং এ উদ্দেশ্যে সফর করা আম্বিয়ায়ে কিরাম এবং অলি আল্লাহ্গণের কবরস্থানে গমন করা জায়েজ আছে।
[কিমিয়ায়ে সাআ’দাত]
*(ঢ.) শায়েখ আবুল হাসান নূরুদ্দীন সিন্ধি বলেন: এর অর্থ হলো তিন মসজিদ ব্যতীত অন্য কোন মসজিদে (অপ্রয়োজনে নামাজ পড়ার জন্য) সফর করা যাবেনা।কিন্তু যদি ইলম অর্জনের জন্য, আলেম ও ছালেহ-গণের (কবর) জিয়ারতের জন্য ও ব্যবসা বানিজ্যের জন্য সফর করা হয় তাহলে এ হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হবে না। অনুরূপ মদীনাবাসীদের জন্য মসজিদে কুবাতে গেলে এ নিষিদ্ধতা প্রযোজ্য হবে না।
[হাশিয়ায়ে সিন্ধি ২য় খন্ড ৩৮ পৃঃ]

খুঁজুন