সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মতামত বাংলাদেশ জাতিসংঘের সভাপতি নির্বাচিত

বাংলাদেশ জাতিসংঘের সভাপতি নির্বাচিত

দীর্ঘ ৪০ বছর পর বাংলাদেশ এবার দ্বিতীয় বারের মতো জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হলো। এটা জাতির জন্য গর্বের এবং বিশেষ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলের জন্য সম্মানজনক।  

সর্বপ্রথম ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী সমজোতার মাধ‍্যমে জাতিসংঘের সভাপতি নির্বাচিত হন। সভাপতির দায়িত্ব মূলতঃ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করা যা আমাদের দেশে স্পীকার সাহেব করে থাকেন । 

জাতিসংঘে নির্বাচনের পদ্ধতি 

জাতিসংঘের নির্বাচনে যে সমস্ত সদস্য রাষ্ট্র এধরনের নেতৃত্বে প্রতিযোগিতা করতে চান তারা অনেক বছর আগে থেকেই তাদের প্রার্থিতা ঘোষণা করেন যাতে অন‍্যসব দেশ প্রতিযোগিতা থেকে বিরত থাকে। সাধারণত কোনো একটা দেশ প্রার্থিতা ঘোষণা করলে অন্য দেশ তখন আর প্রার্থীতা ঘোষণা করে না। এমন একটি ট্রেডিশনটা প্রচলিত আছে। 

শেখ হাসিনা সরকার ২০১৯ সালে জাতিসংঘের সভাপতি পদে নির্বাচন করার অনুমতি দেন

২০১৯ সালে শেখ হাসিনা সরকার ৫ম বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হবার পর পরই নতুন সরকার জাতিসংঘের তিনটি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে বলে ঘোষণা দেয়। (১) রিজিওনাল ডাইরেক্টর ফর দক্ষিণ এশিয়া, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-  যাতে প্রথম বারের মতো বাংলাদেশ জয়লাভ করে। বিশিষ্ট প্রতিবন্ধী বিষয়ক গবেষক সায়মা হোসেন পুতুল তাতে নির্বাচিত হন । (২) জাতিসংঘের ৮১তম (অর্থাৎ ২০২৬ সালে নির্বাচন) অধিবেশনে সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে যা সম্প্রতি অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান নির্বাচিত হয়েছেন। (৩) ২০৩১-৩২ সালে জাতিসংঘের সিকিউরিটি কাউন্সিলে প্রার্থীতা ঘোষণা। 

প্রার্থীতা ঘোষণা করলে অনেক সুবিধা আছে

জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করার সময় তা অমি হাড়ে হাঁড়ে ঠের পাই। যেমন শেখ হাসিনা সরকার ২০০০ সালে ঘোষণা দেন যে, বাংলাদেশ ২০১৫ সালে জাতিসংঘের সিকিউরিটি কাউন্সিলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। পরবর্তীতে ২০১০-১১ সালে জাপান ঐপদে  প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে বলে জানায়। 

জাপানী সরকারের ছয় বিলিয়ন ডলার ঋণ যেভাবেই পাওয়া গেল

২০১২ সালে যখন হঠাৎ করে বিশ্বব্যাংক পদ্মাসেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং ঘোষণা দেয় যে তারা এতে অর্থ সহায়তা দিবে না, তখন আমি জাপানী রাষ্ট্রদূত ও স্থায়ী প্রতিনিধিকে তাতে অর্থ সাহায্য দিতে অনুরোধ করি। ওরা বল্লো যে তারা পদ্মাসেতু প্রকল্পে সাহায্য করতে পারবে না, কারণ জাইকা তাতে সম্পৃক্ত ছিল।  তবে দেশের অন‍্যবিধ প্রকল্পে তারা সাহায্য দিতে পারবে একটি শর্তে এবং তা হচ্ছে যদি আমরা তাদেরকে সিকিউরিটি কাউন্সিলের পদটি ছেড়ে দেই। তখন দুটো মাত্র দেশ বাংলাদেশ ও জাপান ঐ বছরে (নির্বাচন ২০১৫ সালে) এশিয়া থেকে সিকিউরিটি কাউন্সিলের সদস্য হওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করছিল।  

শেখ হাসিনা দূরদর্শী নেতা- দেশের কল‍্যাণে নিবেদিত

আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানালে তারা তাতে গররাজি হন এজন‍্য যে আমরা অনেকদিন আগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবো তা ঘোষণা দিয়েছি এবং দ্বিতীয়ত ১৯৭৯ সালে সিকিউরিটি কাউন্সিল নির্বাচনে আমরা জাপানকে পরাজিত করি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপুমনি এবং পররাষ্ট্র সচিব মিজারুল কায়েম তাতে মোটেই রাজি নন।  পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভীকে বিষয়টি জানালে উনি বল্লেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপুমনির কথা ফাইনাল। সুতরাং কোনোভাবেই এই লেনদেন করা যাবে না। উপায়ন্তর হয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিষয়টি জানালে পর তিনি জাপানের সাথে আলোচনা চালিয়ে যেতে বলেন। তাছাড়া উনাকে জানালাম যে সিকিউরিটি কাউন্সিলের সদস্য হলে নিউ ইয়র্ক মিশনে আরো অফিসার লাগবে এবং বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, যে সমস্ত বিষয়ের ওপর আমরা কোনো মতামত দিতে চাই না, সিকিউরিটি কাউন্সিলের সদস্য হলে তখন ওগুলোতে আমাদের পক্ষ নিতে হবে । 

প্রথমে আমি ২.৪ বিলিয়ন ডলারের কথা জাপানকে বলি। পরবর্তীতে তা ৪.০ বিলিয়নে উন্নীত করি। জাপান তা দিতে রাজি হলে জাপানকে বলি আপনারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে জাপান সফরে দাওয়াত দেন। তারা তা দিলে পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাপান সফর করেন এবং অংকের পরিমাণ ৬.০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেন। এখনে উল্লেখ্য যে মাননীয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ৮.০ বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা চাইতে সুপারিশ করেন, তবে জাপান সরকার বার বার বলছিল যে বাংলাদেশ কি এই বিপুল পরিমাণ ঋণ এবজর্ব (absorbed) করতে পারবে।  

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপানী প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবেকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। শিনজো আবে ঢাকায় এলে পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে জাপানকে সমর্থন করার জন্য আহ্বান জানান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে আমাকে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে জাপান সফরে আমন্ত্রণ জানান এবং তার সাথে সাক্ষাৎ হলে পর তিনি তাঁর জন‍্য এই নির্বাচন কেন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ তা সবিস্তারে জানান। তিনি বলেন যে, ১৯৭৯ সালে তাঁর বাবা জাপানের সবচেয়ে বড় মন্ত্রনালয়-Ministry of Economy, Trade and Industry— METI) ট্রেড এন্ড ইন্ডাস্ট্রির মন্ত্রী ছিলেন। তখন তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মন্ত্রী ছিলেন কেয়ালিশন দলের সদস্য। বাংলাদেশের কাছে তৎকালীন রাষ্ট্রদূত Asia’s Rising Star জাপান হারার ফলে সারা দেশে কালো মেঘ দেখা দেয় । জাপানের প্রধানমন্ত্রী তখন বাধ্য হয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করে তাঁর বাবাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন। তাঁর বাবা অনেক সিনিয়র অফিসারদের বরখাস্ত করেন যা জাপানী সমাজে অকল্পনীয় ছিল। তিনি তা কখনো ভুলতে পারেননি। আমি তাকে জানালাম যে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে পর আমি বানিজ‍্য প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব ছিলাম। পশ্চিমা দেশের পন্ডিতরা বিশেষ করে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিংজারের বরাদ দিয়ে যখন বদনাম ছড়ানো হলো যে “বাংলাদেশ তলাবিহীন জুড়ি, এর সারভাইবেল কঠিন”। তখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থার্ড পার্টি গ্যারান্টি ছাড়া বাংলাদেশে রপ্তানি করতে রাজি হয়নি, ঐসময়ে জাপানী কোম্পানিগুলো ডেফার্ড পেমেন্টে (টাকা পরে দিবেন) আমাদের বহুবিধ পণ্য সামগ্রী রফতানি করে। তাছাড়া জাপান সবসময়ই অহেতুক বাঁধ‍্যবাদকতা ছাড়া আমাদের ঋণ দিয়ে আসছে। তাদের বল্লাম যে তোমাদের মতো আমাদের কোনো প্রমাণিত খনিজ (proven mineral resources) সম্পদ নেই, তবে তোমাদের আছে উন্নত প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত জনশক্তি আর আমাদের আছে বিরাট জনগোষ্ঠী। এদের কাজে লাগাতে পারলে আমরাও একদিন তোমাদের মতো উন্নত দেশ হবো। তাতে তিনি খুব খুশী হন এবং বলেন, সেপ্টেম্বরের সাধারণ অধিবেশনে তিনি বাংলাদেশের "লিপস্টিক লেডি" নিয়ে কথা বলবেন। তোমাদের দেশের একজন সাধারণ গ্রামের মহিলা লিপস্টিক বিক্রি করে কিভাবে স্বাবলম্বী হয়েছে সে সম্পর্কে বলবেন। 

নির্বাচন করবার ঘোষণা দিয়েই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভোট সংগ্রহ শুরু করে 

এগুলো ঘোষণা দেবার পরদিন থেকেই অর্থাৎ ২০২০ সাল থেকেই বাংলাদেশ সরকার এবং তার মিশনগুলো বিভিন্ন দেশের সমর্থন আদায়ে তৎপর হয় এবং ভোট সংগ্রহ শুরু করে । 

RSA (reciprocal support aggregation) এর ঝকমারি

জাতিসংঘের এসব নির্বাচনে আমাদের মিশনগুলো অন‍্য সদস্য রাষ্ট্রকে আমাদের সমর্থন দেয়ার জন্য অনুরোধ করে এবং প্রায় দেশই তাদের সমর্থনের বিনিময়ে বাংলাদেশ তাদের কি দিবে, কোন কোন নির্বাচনে তাদের সমর্থন দিবে তা নিয়ে দেন দরবার হয়। তারা সমর্থন দিতে রাজি হলে RSA বা Reciprocal Support Agreement পাঠায়। ২০২০ সাল থেকে নির্বাচনের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত দূতাবাসগুলো RSA সংগ্রহে ব্যস্ত থাকে। কোনো কোনো দেশ RSA দেয়ার পরও বিশ্বাসঘাতকতা করে, ভোট দেয় না। তাই যতগুলো ভোট পেলে জয়লাভ করা যায় তার থেকে অনেক অনেক বেশি আরএসএ সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। 

আমি ৬ বছর জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ছিলাম এবং আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি যে আরএসএ দেয়ার পরও অনেক দেশ ভোট দেয় না।  তাই সব সময় আমি অনেক অধিক সংখ্যক সদস্য রাষ্ট্রের আরএসএ সংগ্রহ করি। আমি জাতিসংঘে যতগুলো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি সবগুলোতে জয়লাভ করেছি, কোনোটাতে পরাজিত হইনি। আমার সময় বাংলাদেশ জাতিসঙ্ঘের প্রায় ৫২ টি কমিটি, কমিশন, গ্রোপ ইত্যাদিতে নির্বাচিত হয়। 

ড. খলিলুর রহমান ভাগ্যবান মানুষ 

২০২৬ সালের সভাপতির নির্বাচনে যাতে আমরা জয়লাভ করি তারজন্য যা যা করার তা শেখ হাসিনার সরকার করে। তাছাড়া শেখ হাসিনার দুইজন তুখোর রাষ্ট্রদূত  যাদের তিনি জাতিসংঘে স্থায়ী প্রতিনিধি হিসাবে নিযুক্ত  করেছিলেন যেমন রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতেমা এবং মোহাম্মদ মুহিত উভয়েই অনেক খেটেছেন। হাসিনা সরকার রাবাব ফাতিমাকে জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি নিয়োগে সুপারিশ করলে মহাসচিব এন্টোনিও গোতারেজ তা গ্রহণ করেন।  তাছাড়া বর্তমান স্থায়ী প্রতিনিধি নোমান সাহেব অনেক খেটেছেন।  সুতরাং এবছরে বাংলাদেশ য়ে জয়লাভ করবে তাতে কারো সন্দেহ ছিল না। একজন কূটনীতিক আমায় জানান যে তোমাদের তিন তিন জন স্থায়ী প্রতিনিধি কেম্পেইন করছেন।ড. খলিল সাহেব ভাগ্যবান যে বাংলাদেশ সরকার তাকে মনোনয়ন দিয়েছে।  

হিংসার কারণে সুযোগ হাতছাড়া হবার উদাহরণ আছে? 

এখানে উল্লেখ‍্য যে ২০০১ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সবচেয়ে বড়  রাজনৈতিক সংগঠন “ন‍্যমের” সভাপতি হওয়ার সুযোগ শেখ হাসিনা সরকার তৈরি করে রেখেছিলেন, এবং ন‍্যাম কনফারেন্স ঢাকায় করার জন্য অনেক বাড়িঘর নির্মাণ করেন। এগুলো ন‍্যাম বিল্ডিং নামে পরিচিত।  কিন্তু খালেদা জিয়া সরকার ২০০১ সালে  নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠনের পর যেহেতু শেখ হাসিনা সে উদ্যোগ নিয়েছিলেন সেজন্য তা আয়োজন করতে তারা রাজি হয়নি। তাই বাংলাদেশ ন‍্যমের সভাপতি হবার সুযোগ হারায়। ড. খলিলুর রহমান ভাগ‍্যবান এজন্য যে তারেক রহমান সরকার শেখ হাসিনা সরকার জাতিসংঘের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার ব‍্যবস্থা করেছেন তার জন্য তা অবশ্যই বাতিল করতে হবে  তা তিনি করেননি।  মা ও ছেলের মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হলো যা দেশের জন্য মঙ্গলজনক। 

এখানে উল্লেখ‍্য যে শেখ হাসিনা সরকার সাধারণ জনগণের দেডগোডায় স্বাস্থ‍্যসেবা নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর ১৯৯৬-২০০১ সরকারে প্রায় ১৪,০০০ কমিউনিটি হেলথ ক্লিনিক চালু করেন। তবে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসেই ঐ সকল কমিউনিটি হেলথ ক্লিনিক বন্ধ করে দেন যারফলে হাজার হাজার গরিব মানুষ বিশেষ করে মহিলা অত‍্যবাঁশ‍্যকীয় স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। 

এ বিজয় শেখ হাসিনা সরকারের অভাবনী অর্জন ও ভারসাম্য নীতির প্রতিফলন 

বিগত ১৫ বছরে শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এবং ভারসাম্য বৈদেশিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের বন্ধুত্ব অর্জন করে। শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অভূতপূর্ব উন্নয়ন এবং বৈদেশিক নীতির কারণে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয় এবং তাই জাতিসংঘ বাংলাদেশকে “উন্নয়নের রোল মডেল“ এবং আমেরিকার প্রভাবশালী পত্রিকা “ওয়ার্ল্ড স্টিট জার্নাল (Wall Street Journal)” একে দক্ষিণের দেশগুলোর আদর্শ বলে অভিহিত করে।  সূতরাং বাংলাদেশের সেই গৌরব অর্জনের কারণে বাংলাদেশের প্রতিনিধি খলিল সাহেব সহজে জয়লাভ করেন। তবে দূঃখজনক যে ২০২১ সালে মালদ্বীপ যখন সভাপতির পদে নির্বাচন করে তখন তারা প্রায় ১৬৩ টি দেশের সমর্থন পেয়ে জয়লাভ করে।  সেদিক থেকে আমাদের জয়লাভটা হাড্ডাহাড্ডি। আমরা ৮ ভোটে জয়লাভ করেছি— ৫টি ভোট অন্য দিকে গেলে আমাদের ভরাডুবি হতো । বাংলাদেশ সর্বোমোট ১৯৩ দেশের মধ্যে ৯৯ টি ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়। সাইপ্রাস ৯১টি ভোট পেয়ে পরাজিত হয়। 

দুই দেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বাংলাদেশ ও সাইপ্রাস । 

এবারের সভাপতি নির্বাচনে দুই দেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে— বাংলাদেশ ও সাইপ্রাস। এবারে সভাপতি পদ শুধুমাত্র এশিয়ার সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ‍্যে সীমিত ছিল।  কিন্তু সাইপ্রাস না-এশিয়া, না-ইউরোপ। দুই মহাদেশে তার বিস্তৃতি। সে ইউরিপিয়ান ইউনিয়নের সদস্য।  তাছাড়া গ্রীক ও তুরস্কের মধ্যে তার সম্পর্ক নিয়ে যথেষ্ট ঠেলাঠেলি আছে। সে ২০১৬ সালেও সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দীতা করে সাইপ্রাস পরাজিত হয়। 

২০১৬ সালে জাতিসংগর সভাপতি হওয়ার সুযোগ বাংলাদেশের হাতছাডা হয়

২০১৬ সালে জাতিসংঘের সভাপতি পদে বাংলাদেশের নির্বাচিত হবার সম্ভাবনা ছিল (প্রতি পাঁচ বছর পর পর এশিয়ার দেশগুলো এসুযোগ পায়)। তৎকালীন বাংলাদেশের জাতিসংঘে স্থায়ী প্রতিনিধি বাংলাদেশ এপদে নির্বাচন করতে পারে বলে বেসরকারিভাবে  সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে জানালে তখন অন‍্য কোনো এশিয়ান দেশ প্রার্থীতা ঘোষণা করেনি। তবে তখনও সাইপ্রাস তার প্রার্থিতা ঘোষণা করেছিল।  তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব মাহমুদ আলী সাহেব জাতিসংঘের সভাপতি হলে তাকে অনেক দিন নিউ ইয়র্কে থাকতে হবে এবং বহুবিধ অহেতুক অনুষ্ঠানে থাকতে হবে তাই তিনি রাজি হননি। তাছাড়া তিনি কাউকে সভাপতি পদে মনোনয়ন দেননি। তারফলে বাংলাদেশ সে সুযোগ হারায়। তখন তৎকালীন বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফিজি দ্বীপের স্থায়ী প্রতিনিধিকে নির্বাচনে শেষ মূহুর্তে দাঁড় করান এবং তার জন্য কেম্পেইন করলে তিনি সাইপ্রাসের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেন। 

জাতিসংঘের সভাপতির দায়িত্ব অলংকারীক, সম্মানজনক। 

জাতিসংঘের একজিকিউটিব মূল দায়িত্ব মহাসচিবের। তিনিই জাতিসংঘের বাজেট বাস্তবায়ন করেন, এবং মোটামুটি ভাবে সিকিউরিটি কাউন্সিলের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকেন। সভাপতির দায়িত্ব উচ্চ পর্যায়ের (High level event) রাস্ট্র প্রধানদের সম্মেলনে সভাপতিত্ব করা এবং এর আয়োজন কর। তাকে প্রত‍্যক ৫টি বিভাগ থেকে এক একজন করে সহ-সভাপতি যারা নির্বাচিত হন তারা তাকে একাজে সহায়তা করেন। তবে সভাপতি নিজ উদ্যোগে কোনো বিশেষ বিষয়ের উপর উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলন আয়োজন করতে পারেন। 

প্রতি বছর সেপ্টেম্বর থেকে পরবর্তী বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সভাপতির মেয়াদকাল।  বর্তমানে সভাপতির দায়িত্ব অনেক বেড়েছে। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশর পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী সাহেব যখন জাতিসংঘের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তখন এপদের কাজকর্ম ছিল সীমিত। তাই হুমায়ূন রশীদ সাহেব সভাপতি হিসাবে সেপ্টেম্বর এবং মার্চ মাসে— মাত্র দুই বার নিউ ইয়র্কে আসেন। তবে বর্তমানে সভাপতির দায়িত্ব বাডায় বছরের অনেক সময় তাকে নিউ ইয়র্কে থাকতে হয়। 

২০১২ সালে সারবিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভুক জেরেমিক জাতিসংঘের সভাপতি নির্বাচিত হন। তবে স্বদেশে তার অনেক কাজ থাকায় তিনি নিউ ইয়র্কে সময় দিতে পারতেন না। তাই তিনি বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. এ কে আব্দুল মোমেন যিনি তখন জাতিসংঘের সহ-সভাপতি ছিলেন তাকে তিনি তিন তিন বার সভাপতির দায়িত্ব পালনের দায়িত্ব দেন। 

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সকল সিদ্ধান্তের দায়িত্বে রয়েছেন এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি একটি অলংকারী ও সম্মানজনক পদ। জাতিসংঘের সভাপতির পদ সম্মানজনক তবে ক্ষমতা সীমিত। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করা, বিভিন্ন দেশের সরকার প্রধানদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং অধিবেশনে বক্তব্য দেয়াই তার প্রধান কাজ। 

সভাপতি বিশেষ কোনো বিষয়ের উপর উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলন আয়োজন করতে পারেন

বাংলাদেশের কয়েকটি বিশেষ বিশেষ জরুরি সমস‍্যা রয়েছে যেমন (১) জলবায়ু বিষয়ক যা ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্যোগময় তা প্রতিরোধের উপায় এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করা, (২) রোহিঙ্গা বা নাগরিকত্ববিহীন জনগোষ্ঠী এবং এবিষয়ে জনমত সৃষ্টি, (৩) মাল্টিলেটারিজম বা বহুজাতিক উদ্যোগকে কিভাবে জোরালো ও কার্যকর করা যায়। বর্তমানে এক্ষেত্রে ভরাডুবি ঘটছে, (৪) গ্লোবাল মাইগ্রেশন কিভাবে সকলের জন্য নিরাপদ ও নিশ্চিত করা যায়, কিংবা বিশেষভাবে উল্লেখ্য (৫) ঠিকসই উন্নয়নের (SDGs) লক্ষ্যমাত্র অর্জনের জন্য means of implementation বা টাকা-পয়সা ও ফাইনানসিং এবং উপযুক্ত প্রযুক্তি কিভাবে সমগ্রহ করা যায় তা নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলন আয়োজন করতে পারেন।  এগুলোর একটা/দুইটা কার্যকরী ভাবে করতে পারলেই বিরাট অর্জন হবে বৈকি। 

জাতিসংগের সভাপতি হওয়ায় বাংলাদেশের খরচ বাড়বে ? 

জাতিসংঘ সভাপতিকে একটি অফিস দিবে তবে এর খরচ সাধারণত ঐ দেশ এবং একটি ট্রাস্ট ফান্ড আছে তা থেকে সংগ্রহ করতে হয।  সভাপতি জাতিসংঘের কর্মচারি নন। সুতরাং তার বেতন ভাতা, গাড়ি-বাড়ি বাংলাদেশকে বহন করতে হবে।  সভাপতি তাকে সহায়তা করার জন‍্য অতিরিক্ত ৪ জন অফিসার নিয়োগ দিলে তাদের খরচ জাতিসংঘ বহন করবে। তবে কোনো সভাপতি সেগুলো গ্রহণ করেন না। 

সুখের বিষয় যে বাংলাদেশ দ্বিতীয়বারের মতো জাতিসংগের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে দেশের জন‍্য সুনাম বয়ে নিয়ে এসেছে এবং এজন‍্য এর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সহ এর সাথে যারা সম্পৃক্ত  ছিলেন তাদের সাধুবাদ জানাই।

খুঁজুন