শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
সুফিবাদ বায়েজিদ বোস্তামীর প্রেমের দরজা

বায়েজিদ বোস্তামীর প্রেমের দরজা

প্রাচীন ইরানের এক গ্রামে ছিলেন মহান সুফী সাধক হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.)। তাঁর জীবন ছিল কঠোর তপস্যা ও প্রার্থনায় ভরা। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল—আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা।
বায়েজিদ দিনের পর দিন, মাসের পর মাস দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করতেন, "হে আল্লাহ! আমাকে আপনার কাছে আসার অনুমতি দিন, আপনার সান্নিধ্য লাভের সুযোগ দিন!"
বহু বছর কেটে গেল এই প্রার্থনায়। একদিন, এক গভীর রাতে, প্রার্থনার শেষে তাঁর কানে এক ঐশী কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, যা তাঁর হৃদয়কে কাঁপিয়ে দিল।
কণ্ঠস্বরটি বলল, "হে বায়েজিদ! তুমি যে দরজায় দাঁড়িয়ে আছো, সে দরজাটি কোনো সাধারণ দরজা নয়। এই দরজাটি প্রেমের। আর প্রেমের দরজায় প্রবেশ করার জন্য তোমার হাতে যে চাবিটি আছে, সেটির সঠিক ব্যবহার তুমি জানো না।"
বায়েজিদ বিস্মিত হয়ে উত্তর দিলেন, "প্রভু! আমি তো সব সময় আপনার নামই জপ করেছি, কঠোর সাধনা করেছি। আমি তো আমার হাত থেকে কোনো চাবি দেখতে পাচ্ছি না! অনুগ্রহ করে বলুন, সেই চাবিটি কী?"
ঐশী কণ্ঠস্বরটি গভীর শান্তিতে উত্তর দিল:
"চাবিটি হলো এই দুটি শব্দ— 'আমি' (আমি) এবং 'তুমি' (আল্লাহ)। যখন তুমি তোমার হৃদয়ের দরজায় এসে দাঁড়াও এবং তোমার অস্তিত্বে কেবলই 'আমি' শব্দটি প্রতিধ্বনিত হতে থাকে, তখন 'তুমি' প্রবেশ করতে পারো না। কারণ এই দরজা এতোই সংকীর্ণ যে সেখানে দু'জনের জায়গা হয় না।"
"তোমার 'আমি'-কে বিসর্জন দাও, বায়েজিদ। তোমার অহং, তোমার স্বত্বা, তোমার সমস্ত অর্জন—সব কিছুকে বিলীন করে দাও। যখন তুমি কেবলই 'তুমি' (আল্লাহ) হয়ে উঠবে, তখন আর দরজার দরকার হবে না। কারণ যেখানে তুমি নেই, সেখানে শুধু আমিই আছি। তখন দরজা আপনাতেই খুলে যাবে।"
বায়েজিদ স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, বছরের পর বছর ধরে তিনি বাইরের জগত থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন বটে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি তার নিজের অস্তিত্বের শক্ত বাঁধনে জড়িয়ে ছিলেন। তাঁর 'আমি' (অহংকার, স্বকীয়তা) ছিল আল্লাহ্ এবং তাঁর মাঝে থাকা সবচেয়ে বড় পর্দা।
সেই দিন থেকে বায়েজিদ তাঁর প্রার্থনা বদলে দিলেন। তিনি নিজের 'আমি'-কে শূন্য করে কেবলই আল্লাহর ইচ্ছায় নিজেকে সঁপে দিলেন। তাঁর জীবন হয়ে উঠলো নিখাদ প্রেম ও সেবার প্রতীক, যেখানে তাঁর নিজের কোনো ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষা অবশিষ্ট ছিল না।

খুঁজুন