শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
সুফিবাদ দরুদ শরীফের ফযীলত

দরুদ শরীফের ফযীলত

মোতালিব শেখ আল মাইজভান্ডারি :

শাহজাদায়ে গাউছুল আ'যম আল্হাজ্ব শাহসূফী মাওলানা সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল্-হাসানী ওয়াল হোসাইনী মাইজভাণ্ডারী মাদ্দাজিল্লুহুল আলীর নির্দেশে দরুদ শরীফের ফজিলত সম্পর্কে লিখার প্রয়োজিনীয়তা বহুদিন থেকে অনুভব করছিলাম। ইসলামের এ ক্রান্তিলগ্নে দরুদ শরীফের ফজিলত, মর্তবা ও মাহ্য সম্পর্কে ব্যাপক ও বিস্তারিত লিখে উম্মতে মুহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম এর ঈমানকে তরুতাজা রাখতে সহায়তা করা প্রতিটি সুন্নী আলেমের ঈমানী দায়িত্ব। আমি আমার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টায় অতি সংক্ষিপ্ত আকারে "শাজরায়ে গাউছিয়া মাইজভাণ্ডারীয়া" কিতাবে এ বিষয়ে আলোকপাত করছি।
মহান রাব্বুল আ'লামীন পবিত্র কুরআন মজীদে ইরশাদ ফরমান:
إِنَّ اللَّهَ وَمَلْئِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ ؛ يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلَّمُوا تَسْلِيمًا.
অর্থাৎ : নিশ্চয়ই আল্লাহ্ ও তাঁর ফেরেস্তাগণ দরুদ প্রেরণ করেন নবীজি সাল্লাল্লাহু তা'য়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লামার প্রতি। হে ঈমানদারগণ! (তোমরা) তাঁর প্রতি দরুদ ও অসংখ্য ছালাম প্রেরণ কর। (সূরা আহযাব-৫৭) প্রিয়তম নবী সরকারে দো-আলম হযরত মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা'য়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লামার নাম শ্রবণ করা মাত্র প্রত্যেকের জন্য কমপক্ষে একবার দরূদ শরীফ পাঠ করা ওয়াজিব। নামাজের মধ্যে নবী পাক সাল্লাল্লাহু তা'য়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লামার সাথে নবীজি সাল্লাল্লাহু তা'য়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লামার আওলাদগণের উপর দরূদ শরীফ পাঠ করতে হবে। 

সাধারণভাবে দরুদ শরীফ পাঠ করার সময় নবীজি সাল্লাল্লাহু তা'য়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লামার পরপরই তাঁর আহল ও সাহাবায়ে কেরাম আজমাঈনের প্রতি দরূদ পাঠ করা অতি উত্তম ও বরকতের কাজ। দরূদ শরীফের মধ্যে হুজুর আকরাম সাল্লাল্লাহু তা'য়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লামার বংশধর ও সাহাবায়ে কেরাম আজমাঈনের কথা উল্লেখ করার নিয়ম যুগ-যুগ ধরে চলে আসছে। এমনকি একথাও বলা আছে যে কমপক্ষে তাঁর পবিত্র নামের সাথে বংশধরের বা আওলাদগণের নামে দরুদ পাঠ না করলে তা গ্রহণযোগ্য নয়। নবীজি সাল্লাল্লাহু তা'য়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লামার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করাই হচ্ছে প্রকৃত পক্ষে দরুদের মাহাত্ম্য। দরূদ শরীফ পাঠের বদৌলতে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু তা'য়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লামার সাথে রূহানী সম্পর্ক দৃঢ়তর হয় এবং তাঁর নেক নজর লাভ করা যায়। নবীয়ে দোজাহা সাল্লাল্লাহু তা'য়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লাম দরূদ পাঠকারীর প্রতি বড়ই খুশী থাকেন এবং তাঁর প্রতি করুণা প্রদর্শন করেন।
দরূদ শরীফ প্রার্থনা কবুল হওয়ার জন্য সবচেয়ে বড় উপায়। 

দরূদ শরীফ বিহীন ইবাদত ও দোয়া আল্লাহর নিকট খুবই অপছন্দনীয়। হযরত ওমর রাদ্বিআল্লাহু তা'আলা আনহু বলেন, "যে দোয়া বা প্রার্থনা দরূদবিহীন হয়, তা আসমান ও জমিনের মধ্যে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে; আল্লাহ্ পাকের দরবারে পৌঁছেনা"। দরূদ শরীফ এমন এক ফজিলতপূর্ণ আমল, যার মর্তবা বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। কুরআন শরীফে শব্দ প্রয়োগ করে আল্লাহ্পাক প্রিয়তম নবীজি সাল্লাল্লাহু তা'য়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লামার প্রতি এমন শ্রদ্ধা ও আকর্ষণের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন, যা সত্যি তাঁর উম্মতের জন্য চরম গর্বের বিষয়। শব্দে যে রহস্য বহন করে তা হচ্ছে এই যে, অতীতেও স্বয়ং আল্লাহ্ এবং তাঁর ফেরেশতাগণ (এমনকি সমস্ত মাখলুক) হুজুরের প্রতি দরূদ শরীফ পাঠ করেছেন, এখনও করছেন এবং ভবিষ্যতেও করতেই থাকবেন। অর্থাৎ দরূদ প্রেরণের কাজ কোনদিন বন্ধ হবার নয়-এর গতিধারা অনাদি ও অনন্ত এমনকি কিয়ামতের পরে তা অব্যাহতভাবে চালু থাকবে। কেননা, আল্লাহ তা'য়ালা অনাদি কাল থেকে নবীর উপর দরূদ পাঠ আরম্ভকরেছেন তা কোনদিন শেষ হবেনা, এমন কি কিয়ামতের পরেও চলবে। আল্লাহপাক দরূদ পাঠে সদারত আছেন। তিনি অবিনশ্বর তাই দরূদ অবিনশ্বর।

উপরোক্ত আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ্পাক মোমিনদেরকে তাঁর প্রিয়তম হাবীব সাল্লাল্লাহু তা'য়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লামার প্রতি শুধু দরূদ শরীফই নয়; সাথে সাথে অসংখ্য তা'জিমী সালাম প্রেরণের জন্য আদেশ করেছেন। মুসলমান দাবী করে যারা হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু তা'য়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লামার প্রতি সশ্রদ্ধ দরূদ ও সালাম প্রেরণ করতে অনীহা প্রদর্শন করে, তাদের অন্তরে ঈমান বিদ্যমান আছে কিনা প্রিয় পাঠকই তা বিবেচনা করবেন।
প্রবন্ধের কলেবর বৃদ্ধির ভয়ে নিম্নে হাদিস শরীফ থেকে অতি সংক্ষেপে এ বিষয়ে আলোকপাত করব। নবীজি সাল্লাল্লাহু তা'য়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লাম বলেন:
مَنْ صَلَّى عَلَى وَاحِدَةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ عَشَرَ صَلَوَاتٍ وَ حَطَّ عَنْهُ خَطِيَّاتٍ وَ رُفِعَتْ لَهُ دَرَجَاتٍ
অর্থাৎঃ যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরূদ শরীফ পাঠ করবে, আল্লাহ্ তা'য়ালা তাঁর উপর দশটি রহমত নাযিল করবেন, তার দশটি গুনাহ মাফ করে দিবেন এবং তার জন্য দশটি দরজা (স্তর) বুলন্দ করে দেবেন। (মিশকাত শরীফ, কানজুল উম্মাল)। প্রিয়তম নবী সাল্লাল্লাহু তা'য়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লাম বলেন:
مَا مِنْ عَبْدِ صَلَّى عَلَى إِلَّا خَرَجَتِ الصَّلُوةُ مَنْ فِيْهِ مُسْرِعَةٌ
فَلَا يَبقَى بَر وَ لَا شَرْق وَلَا غَرْبٌ إِلَّا تَمُرَّ بِهِ وَ تَقُولُ أَنَا صَلوةٌ
فَلَانِ ابْنِ فَلَانٍ صَلَّى عَلَى مُحَمَّدِنِ الْمُخْتَارِ خَلَقَ اللَّهُ فَلَا
يبقَى شَيْءٌ إِلَّا صَلَّى عَلَيْهِ.
অর্থাৎঃ কোন ব্যক্তি আমার নামে দরূদ শরীফ পাঠ করলে তার মুখ হতে দরূদের বাক্যগুলো বের হওয়া মাত্রই অবিলম্বে আকাশে বাতাসে অন্তরীক্ষে দুনিয়ার একপ্রান্ত হতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত ছুটে বেড়ায় আর বলেন আমি অমুকের পুত্র অমুকের দরূদ শরীফ, যা সে আল্লাহর সৃষ্টির সেরা হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু তা'য়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লামার নামে পড়েছে'। এ কথা শুনে চারপাশের সমস্ত জিনিস ঐ দরুদ পাঠকারী ব্যক্তির জন্য রহমতের দোয়া করতে থাকে।
হুজুর আকরাম সাল্লাল্লাহু তা'য়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লাম ইরশাদ ফরমান:
إِنَّ أَوْلَى النَّاسِ بِي أَكْثَرُهُمْ عَلَى صَلوةٌ.
অর্থাৎ: যে ব্যক্তি আমার নামে সবচেয়ে বেশী দরূদ শরীফ পড়ে আমার শাফায়াত পাওয়ার ব্যাপারে সে ব্যক্তিই সবচেয়ে বেশী হকদার আমার উপর তার দাবী সবচেয়ে বেশী। নবীজি সাল্লাল্লাহু তা'য়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লাম ফরমান:
যা মিশকাত শরীফ ও কাজুল উম্মালে রয়েছে:
مَنْ صَلَّى عَلَى عَشَرًا فِي أَوَّلِ النَّهَارِ وَ عَشَرًا
فِي آخِرِ النَّهَارِ نَالَتُهُ شَفَاعَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ.
অর্থাৎ: যে ব্যক্তি প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় আমার উদ্দেশ্যে দশবার করে দরূদ শরীফ পাঠ করবে আমার শাফয়াত কেয়ামতের দিন তার নিকট পৌছবে অর্থাৎ আমি অবশ্যই তার জন্য শাফায়াত করব। তিরমিজী শরীফে রয়েছে হযরত ফোজায়লা রাদ্বিআল্লাহু তা'আলা আন্‌হু বর্ণনা করেন: একদা প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা'য়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লাম উপবিষ্ট ছিলেন, এমন সময় এক ব্যক্তি এসে নামাজ আদায় করল এবং এরপর বলল, "হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা কর এবং আমার প্রতি দয়া কর।" তখন হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম এরশাদ করলেন, "হে নামাজী! তুমি তাড়াহুড়া করে ফেলেছ।" যখন তুমি নামাজ শেষ করে বসবে তখন আল্লাহ্ পাকের এমন হাম্দ ও সানা বর্ণনা করবে যার অধিকারী তিনি। অতঃপর আমার উপর দরূদ শরীফ পাঠ করবে। এরপর তুমি আল্লাহ্ রাব্বুল আ'লামীনের নিকট দোয়া করবে।

 বর্ণনাকারী বলেন, এরপর আরো এক ব্যক্তি আসল। যে নামাজ আদায় করার পর আল্লাহ্ পাকের প্রতি হামদ ও সানা বর্ণনা করতঃ নবী পাক সাল্লাল্লাহু তা'য়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লামার প্রতি দরূদ শরীফ প্রেরণ করলেন। তখন হুজুর সাল্লাল্লাহু তা'য়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লাম তাকে বললেন, "এখন তুমি দোয়া কর, তোমার দোয়া কবুল হবে।" আবু মাসউদ আনসারী রাদ্বিআল্লাহু তা'আলা আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে পাকে রয়েছে নবীজি সাল্লাল্লাহু তা'য়ালা আলাইহি ওয়াছাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি নামাজ পড়ল কিন্তু আমার প্রতি ও আমার আহলে বায়েতের প্রতি দরূদ শরীফ পাঠ করল না তার নামাজ কবুল করা হয় না। দরূদ শরীফ হলো সকল গুনাহ মোচন এবং সকল দুঃখ কষ্ট থেকে পরিত্রাণ লাভের একটি মাধ্যম। এর ফলে মনে স্থিরতা, আসে ও হৃদয় প্রশান্ত হয়। (বিস্তারিত জানার জন্য পাঠ করুন দলীলুল মুহিব্বীন)

কিতাব - শাজরায়ে গাউসিয়া মাইজভান্ডারী

খুঁজুন