সুফি মাজহারুল ইসলাম মাসুম, লেখক ও গবেষক :
আধ্যাত্মিক
ধ্যান ও জ্ঞানের মাধ্যমে সৃষ্টি ও স্রষ্টার সম্পর্ক নিরূপণ করে আত্মার পরিশুদ্ধিই
সুফিবাদের মূলকথা। মানসিক ও নৈতিক উন্নতি সাধনে তাদের কৃতিত্ব ছিল অসীম। খাজা
মঈনউদ্দীন চিশতি (র.)-এর চিশতিয়া, আব্দুল কাদের জিলানী (র.)-এর কাদেরিয়া, সৈয়দ আহমদ
উল্লাহ (ক:) মাইজভান্ডারীয়া, শেখ বাহাউদ্দীন জাকারিয়া (র.)-এর সোহরাবর্দীয়া, খাজা
বাহাউদ্দীন নকশ (র.)-এর নকশ বন্দিয়া, শরফুদ্দিন আলী কলন্দিয়া (র.)-এর কলন্দিয়া
তরিকাসহ সুফিবাদে অসংখ্য তরিকা রয়েছে।
মুসলিম
অধ্যুষিত পশ্চিম এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে এর যাত্রা শুরু হলেও পৃথিবীর
আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ে সুফিবাদ। যেখানেই অশান্তি বিরাজমান, অত্যাচারী শাসক কর্তৃক
প্রজা নির্যাতিত ও নিপীড়িত, সেখানেই ইসলামের শান্তি ও উদারতার বাণী নিয়ে সুফিদের
আগমন ছিল অলৌকিক ঘটনা। তাদের জ্ঞানের উৎস ছিল কুরআন ও হাদিস। এ দেশের শহর-বন্দর ও
গ্রাম-গঞ্জে তাদের খানকা পাওয়া যায়। এসব খানকা ছিল শিক্ষা ও জ্ঞানের কেন্দ্র।
দূরদূরান্ত থেকে অসংখ্য শিষ্যরা ছুটে আসত দীক্ষা নেওয়ার জন্য। নিজ ধর্মের শ্রী
বৃদ্ধির জন্য সুফিরা কখনো অন্য ধর্মের প্রতি বিরোধিতা করেননি।
সুফিদের
মধ্যে অনেকে বড় আলেম ছিলেন, তারা প্রত্যক্ষভাবে প্রশাসনিক কাজের সঙ্গে জড়িত না
থাকলেও ইসলামের প্রয়োজনে শাসকশ্রেণিকে সহযোগিতা করেছেন। বাংলায় ইলিয়াস শাহী আমলে
হিন্দু আধিপত্য বেড়ে গেলে সুফিদের মাধ্যমেই ইসলামের রাস্তা প্রশস্ত হয়। কখনো বা
যুদ্ধে উপস্থিত থেকে হাতে অস্ত্র না নিয়ে নৈতিক ও মানসিকভাবে শিষ্যদের শক্তি
জুগিয়েছেন। আদর্শ অনুসন্ধানকারীদের কাছে ইসলামের সৌন্দর্য ও উদারতা তুলে ধরেছেন আর
শান্তির ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে অমুসলমান, বৌদ্ধ, হিন্দু ও সমাজের নিপীড়িত মানুষ
ইসলামের ছত্রছায়ায় নিজেকে আবৃত করেছিল। সুফিবাদে সুফিরা সন্ন্যাসীদের মতো ঘুরে
বেড়ালেও সুফিবাদ আর সন্ন্যাসবাদ ভিন্ন বিষয়। সত্তা ত্যাগ বা সংসার ত্যাগ করে
স্রষ্টার চিন্তায় মগ্ন থাকা সন্ন্যাসবাদ।
সুফিবাদে সংসার ত্যাগের কথা উল্লেখ থাকে না,
সুফিরা আল্লাহর জন্য ইসলামের দ্বীনকে প্রতিষ্ঠায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে সত্তা বিলিন
করে নয়। পারস্য সুফিবাদের উর্বর ভূমি হলেও কালক্রমে ভারতবর্ষ পরিশেষে বাংলায়
দূরদূরান্ত থেকে সুফিরা আগমন করেছিল। রুম থেকে শাহ সুলতান কমরুদ্দিন (র.), ইয়েমেন
থেকে হজরত শাহজালাল (র), তুর্কিস্তানের বাহাউদ্দীন জাকারিয়া প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
তাদের খানকার পাশে গরিব, অসহায় আর দুস্থ মানুষের জন্য বিনামূল্যে খাবারের ব্যবস্থা
করা হতো। সব ধর্মের মানুষের জন্য এ ব্যবস্থা ছিল উন্মুক্ত। সুফিদের উৎকর্ষ নীতি আর
নৈতিকতা দেখে নানা স্তরের মানুষ মুগ্ধ হতো, অনেকে তাদের দ্বারা সংঘটিত
ক্রিয়াকলাপকে (শাহজালালের আজানের ধ্বনিতে গৌর গোবিন্দের প্রাসাদ ধ্বংস) অলৌকিক
মোজেজা বলে আখ্যা দিত
।তাদের
আত্মশুদ্ধি ছিল সর্বোচ্চ স্তরের, ফলে আল্লাহর কাছে চাওয়ামাত্র তাদের প্রয়োজন
মিটিয়ে দিতেন। আর বর্তমানে কিছু ভণ্ডদের দেখা যায় গাঁজা, ফেনসিডিল, মদ সব কিছুতেই
আসক্ত। তারা আবার ছড়িয়ে বেড়ায় নেশার মাধ্যমেই আল্লাহর সঙ্গে ধ্যানে মগ্ন থাকেন।
মাথায় চুলের জট, কয়েক মাসে একবার গোসল করে, শরীর থেকে দুর্গন্ধ বের হয় বেশির ভাগই
মাজারে পড়ে থাকে। বর্তমানে এসব ভণ্ডরাই সুফিদের খানকাগুলো দখল করে নিয়েছে, নিজের
মতো গাঁজার আসর বসাচ্ছে, হিন্দু কায়দায় মাথা ঝুঁকে প্রণাম করছে।
দেশের
কোনো মাজার বা সুফিদের খানকায় সুস্থ ধারায় ইসলামের রীতিনীতি বা সংস্কৃতি এখন আর
চালু নেই। খানকা পূজারি বেড়ে গেছে, খানকাগুলোকে আয়ের উৎস হিসাবে ব্যবহার করছে,
প্রতি বছর ধর্মকে পুঁজি করে কোটি কোটি টাকা ইনকাম করছে একটা গোষ্ঠী। প্রতিনিয়ত এর
মাত্রা বেড়ে চলছে। আবার বর্তমানে একদল দেশব্যাপী কাওয়ালি গানের রেওয়াজ শুরু করেছে।
অনেকে মরমিবাদের সঙ্গে এটাকে গুলিয়ে ফেলছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্র এর
সয়লাব। এসব পুরোপুরিভাবে ইসলাম-সাংঘর্ষিক। ইসলাম প্রচারে সুফিরা অকাতরে নিজেকে
আল্লাহর কাছে সঁপে দিয়ে আল্লাহর জমিনে কাজ করে গেছেন। সমসাময়িক সামাজিক অবস্থার
সঙ্গে সম্পর্ক রেখে অনেক জনহিতকর প্রতিষ্ঠান (চিকিৎসালয়, আশ্রয়স্থল, লঙ্গরখানা,
শিক্ষালয়) স্থাপন করেছেন। বিশেষ করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝোঁক ছিল বেশি।
সুফিদের সমসাময়িক প্রায় সব শাসকদের বিরুদ্ধে অবস্থান থাকা সত্ত্বেও ভিন্ন দেশ থেকে
এসে আবাস্থল স্থাপন করে এসব জনহিতকর কার্যাবলি করেছেন। এর অন্যতম প্রধান কারণ
তাদের মাহাত্ম্য চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে শিষ্যদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া। ইসলাম প্রচারে
তাদের বাণী, কর্ম, ত্যাগ-তিতিক্ষা কখনো ভোলার নয়।
দ্বীন প্রচারে সুফিদের অবদান
দ্বীন প্রচারে সুফিদের অবদান
সুফি মাজহারুল ইসলাম মাসুম, লেখক ও গবেষক :আধ্যাত্মিক ধ্যান ও জ্ঞানের মাধ্যমে সৃষ্টি ও স্রষ্টার সম্পর্ক নিরূপণ করে আত্মার পরিশুদ্ধিই সুফিবাদের মূলকথা। মানসিক ও নৈতিক উন্নতি সাধনে তাদের কৃতিত্ব ছিল অসীম। খাজা মঈনউদ্দীন চিশতি (র.)-এর চিশতিয়া, আব্দুল কাদের জিলানী (র.)-এর কাদেরিয়া, সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (ক:) মাইজভান্ডারীয়া, শেখ বাহাউদ্দীন জাকারিয়া (র.)-এর সোহরাবর্দীয়া, খাজা বাহাউদ্দীন নকশ (র.)-এর নকশ বন্দিয়া, শরফুদ্দিন আলী কলন্দিয়া (র.)-এর কলন্দিয়া তরিকাসহ সুফিবাদে অসংখ্য তরিকা রয়েছে।মুসলিম অধ্যুষিত পশ্চিম এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে এর যাত্রা শুরু হলেও পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ে সুফিবাদ। যেখানেই অশান্তি বিরাজমান, অত্যাচারী শাসক কর্তৃক প্রজা নির্যাতিত ও নিপীড়িত, সেখানেই ইসলামের শান্তি ও উদারতার বাণী নিয়ে সুফিদের আগমন ছিল অলৌকিক ঘটনা। তাদের জ্ঞানের উৎস ছিল কুরআন ও হাদিস। এ দেশের শহর-বন্দর ও গ্রাম-গঞ্জে তাদের খানকা পাওয়া যায়। এসব খানকা ছিল শিক্ষা ও জ্ঞানের কেন্দ্র। দূরদূরান্ত থেকে অসংখ্য শিষ্যরা ছুটে আসত দীক্ষা নেওয়ার জন্য। নিজ ধর্মের শ্রী বৃদ্ধির জন্য সুফিরা কখনো অন্য ধর্মের প্রতি বিরোধিতা করেননি।সুফিদের মধ্যে অনেকে বড় আলেম ছিলেন, তারা প্রত্যক্ষভাবে প্রশাসনিক কাজের সঙ্গে জড়িত না থাকলেও ইসলামের প্রয়োজনে শাসকশ্রেণিকে সহযোগিতা করেছেন। বাংলায় ইলিয়াস শাহী আমলে হিন্দু আধিপত্য বেড়ে গেলে সুফিদের মাধ্যমেই ইসলামের রাস্তা প্রশস্ত হয়। কখনো বা যুদ্ধে উপস্থিত থেকে হাতে অস্ত্র না নিয়ে নৈতিক
ও মানসিকভাবে শিষ্যদের শক্তি জুগিয়েছেন। আদর্শ অনুসন্ধানকারীদের কাছে ইসলামের সৌন্দর্য ও উদারতা তুলে ধরেছেন আর শান্তির ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে অমুসলমান, বৌদ্ধ, হিন্দু ও সমাজের নিপীড়িত মানুষ ইসলামের ছত্রছায়ায় নিজেকে আবৃত করেছিল। সুফিবাদে সুফিরা সন্ন্যাসীদের মতো ঘুরে বেড়ালেও সুফিবাদ আর সন্ন্যাসবাদ ভিন্ন বিষয়। সত্তা ত্যাগ বা সংসার ত্যাগ করে স্রষ্টার চিন্তায় মগ্ন থাকা সন্ন্যাসবাদ।সুফিবাদে সংসার ত্যাগের কথা উল্লেখ থাকে না, সুফিরা আল্লাহর জন্য ইসলামের দ্বীনকে প্রতিষ্ঠায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে সত্তা বিলিন করে নয়। পারস্য সুফিবাদের উর্বর ভূমি হলেও কালক্রমে ভারতবর্ষ পরিশেষে বাংলায় দূরদূরান্ত থেকে সুফিরা আগমন করেছিল। রুম থেকে শাহ সুলতান কমরুদ্দিন (র.), ইয়েমেন থেকে হজরত শাহজালাল (র), তুর্কিস্তানের বাহাউদ্দীন জাকারিয়া প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। তাদের খানকার পাশে গরিব, অসহায় আর দুস্থ মানুষের জন্য বিনামূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করা হতো। সব ধর্মের মানুষের জন্য এ ব্যবস্থা ছিল উন্মুক্ত। সুফিদের উৎকর্ষ নীতি আর নৈতিকতা দেখে নানা স্তরের মানুষ মুগ্ধ হতো, অনেকে তাদের দ্বারা সংঘটিত ক্রিয়াকলাপকে (শাহজালালের আজানের ধ্বনিতে গৌর গোবিন্দের প্রাসাদ ধ্বংস) অলৌকিক মোজেজা বলে আখ্যা দিত।তাদের আত্মশুদ্ধি ছিল সর্বোচ্চ স্তরের, ফলে আল্লাহর কাছে চাওয়ামাত্র তাদের প্রয়োজন মিটিয়ে দিতেন। আর বর্তমানে কিছু ভণ্ডদের দেখা যায় গাঁজা, ফেনসিডিল, মদ সব কিছুতেই আসক্ত। তারা আবার ছড়িয়ে বেড়ায় নেশার মাধ্যমেই আল্লাহর সঙ্গে ধ্যানে মগ্ন থাকেন। মাথায় চুলের
জট, কয়েক মাসে একবার গোসল করে, শরীর থেকে দুর্গন্ধ বের হয় বেশির ভাগই মাজারে পড়ে থাকে। বর্তমানে এসব ভণ্ডরাই সুফিদের খানকাগুলো দখল করে নিয়েছে, নিজের মতো গাঁজার আসর বসাচ্ছে, হিন্দু কায়দায় মাথা ঝুঁকে প্রণাম করছে। দেশের কোনো মাজার বা সুফিদের খানকায় সুস্থ ধারায় ইসলামের রীতিনীতি বা সংস্কৃতি এখন আর চালু নেই। খানকা পূজারি বেড়ে গেছে, খানকাগুলোকে আয়ের উৎস হিসাবে ব্যবহার করছে, প্রতি বছর ধর্মকে পুঁজি করে কোটি কোটি টাকা ইনকাম করছে একটা গোষ্ঠী। প্রতিনিয়ত এর মাত্রা বেড়ে চলছে। আবার বর্তমানে একদল দেশব্যাপী কাওয়ালি গানের রেওয়াজ শুরু করেছে। অনেকে মরমিবাদের সঙ্গে এটাকে গুলিয়ে ফেলছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্র এর সয়লাব। এসব পুরোপুরিভাবে ইসলাম-সাংঘর্ষিক। ইসলাম প্রচারে সুফিরা অকাতরে নিজেকে আল্লাহর কাছে সঁপে দিয়ে আল্লাহর জমিনে কাজ করে গেছেন। সমসাময়িক সামাজিক অবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে অনেক জনহিতকর প্রতিষ্ঠান (চিকিৎসালয়, আশ্রয়স্থল, লঙ্গরখানা, শিক্ষালয়) স্থাপন করেছেন। বিশেষ করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝোঁক ছিল বেশি। সুফিদের সমসাময়িক প্রায় সব শাসকদের বিরুদ্ধে অবস্থান থাকা সত্ত্বেও ভিন্ন দেশ থেকে এসে আবাস্থল স্থাপন করে এসব জনহিতকর কার্যাবলি করেছেন। এর অন্যতম প্রধান কারণ তাদের মাহাত্ম্য চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে শিষ্যদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া। ইসলাম প্রচারে তাদের বাণী, কর্ম, ত্যাগ-তিতিক্ষা কখনো ভোলার নয়।
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
১৫২/২, এ-২ গ্রীন রোড, রওশন টাওয়ার (লিফটের-৫),
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ । মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত