শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
সুফিবাদ হযরত বাবা ভান্ডারী (কঃ)-এর তিরোধান

হযরত বাবা ভান্ডারী (কঃ)-এর তিরোধান

মাজহারুল ইসলাম মাসুম, সিনিয়র সাংবাদিক, লেখক, গবেষক :

এ মহান ওলী সুদীর্ঘ একত্তর বৎসর ছয় মাস ইহধামে আধ্যাত্মিক লীলা সম্পাদন করে ১৩৪৩ বাংলার ২২শে চৈত্র [মোতাবেক ১৯৩৭ খৃষ্টাব্দের ৫ই এপ্রিল, ১৩৪৬ হিজরীর ২২শে মহররম] রোজ সোমবার ভোর ৭টা ৫৫ মিনিটের সময় সকল ভক্ত অনুরক্তকে শোক সাগরে ভাসিয়ে মহান প্রভুর সাথে মিলনার্থে পরপারে আত্মগোপন করেন। (ইন্না………….রাজিউন)
আরেফ সুফি কবি আল্লামা ছৈয়দ আব্দুল হাদী রহঃ এর লেখা বাবাজন কেবলার শানে লেখা শায়ের... পায়ে পড়ি মিনতি করি
যে প্রিয় তোমায়
গাউছে ধনে তোমায় নিতে পাঠায়াছেন রায়। ঐ
পায়ে না ঠেলিয়ও মোরে
প্রিয় এখন চল ঘরে
সিংহাস ছেড়ে কেন আসিলেন হেথায়। ঐ
আখিরো পুতুল করে
নিবে প্রিয় প্রেম আদরে
মাইজ ভান্ডারে সিংহাসনে বসাব তোমায়। ঐ
পুষ্প বিনে অলিকুল
কেন্দে হল ব্যয়কুল
তুমি বিনে দাস হাদীর প্রাণ চলে যায়।
আওলাদঃ
হযরত বাবা ভান্ডারী কেবলার ইনেত্মকালের সময় তাহার চারি পুত্র ও দুই কন্যা উত্তরাধিকারী রাখিয়া যান। প্রথমপুত্র- শাহজাদা সৈয়দ খায়রুল বশর, দ্বিতীয়পুত্র- শাহজাদা সৈয়দ আবুল বশর, তৃতীয়পুত্র-শাহজাদা সৈয়দ মাহবুবুল বশর, চতুর্থপুত্র-শাহজাদা সৈয়দ শফিউল বশর, প্রথমকন্যা-শাহজাদী সৈয়দা মায়মুনা খাতুন, দ্বিতীয় কন্যা-শাহজাদী সৈয়দা সাজেদা খাতুন। ইহা ছাড়া অসংখ্য আধ্যাত্মিক ওয়ারেশ অলীয়ে কামেল তাহার উত্তারাধিকারী খলিফা বিদ্যমান আছে।
 
হযরত বাবা ভান্ডারীল বেচালের পর ফয়েজ ও রহমত দানঃ হযরত বাবা ভান্ডারী কেবলা ইহধাম ত্যাগ করিয়া পরলোক গমন করিয়াছেন বটে কিন’ তাহার আধ্যাত্মিক প্রভাব, প্রেম প্রীতি ও আকর্ষণ পূর্বের মতই অপরিবর্তীত ভাবেই বিদ্যমান রহিয়াছে। সশরীরে তাহার দৈহিক দর্শন ও তাহার পবিত্র দেহের মিলনই মানব চোখের ানত্মরালে বিরাজ করিতেছে। তাহার অনুরক্ত ভক্ত ও আশেকান সকল সময় তাহার চোখের সামনে রহিয়াছে। তাহার ধ্যানের ঘোরে অথবা মোরাকবার আসরে তাহার বেলায় তের জ্যোতি প্রত্যক্ষ অবলোকন করিয়া যথারীতি তাহার অনুগ্রহ লাভ করিতেছে। তাহার স্বপ্নযোগে দৈববাণী যোগে তাহার নিকট হইতে াঅদেশ নির্দেশ লাভ করিয়া নিরাপদে জীবন যাপন করিতেছে। বলা বাহুল্য, আল্লাহর পথে যাহারা জীবন উৎসর্গ করিয়া মৃত্যু বরণ করিয়াছেন, তাহারা মরিয়অও অমর হইয়া আছেন। সেই অলি আল্লাহগন তাহাদের অনুরক্ত ভক্তদের সহিত কিরূপ সম্পর্ক রাখিবেন তাহা মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি (রঃ) তাহার মসনবী গ্রনে’ বর্ণনা করিয়াছেন। গোফত জানম  মুহিবুবাদুর নিসত্ম লেকেবেরু আমদন দস’র নিসত্ম সেই অলিমগণের প্রাণ তা’হাদের শিষ্য ও বন্ধুবর্গের নিকট হইতে দুরে থাকিবে না। কিন’ তাহা (স’ল দৃষ্টিতে) দেখা যাওয়অর রীতি প্রচলন নাই, তাহা অনুভূতির বিষয়। এই প্রসংগে হযরত বাবাভান্ডারী কেবলার অনত্মর্ধামের পরের কিছু অলৌকিক কেরামত লিপিবদ্ধ করিলাম।
 
(১) চট্টগ্রাম জিলার পটিয়া থানার অনত্মর্গত নলআন্ধা নিবাসী হাফেজ আবু সৈয়দ শাহের বর্ণনাঃ
পটিয়া থানার ছনহারা মৌজা নিবাসী এজাহার মিঞা নামক এক ছেলে পাগল হওয়ার পর বোবায় পরিণত হয়। সে অমাার সাথে বাবাভান্ডারীর দরবারে যায়। সে দরবারে কেধমতে থাকিয়া রহমত লাভ করার অীভলাষে শাহজাদা সৈয়দ মাহবুবুল বশর সাহেবের কামরায় থাকে। সে তথায় থাকিয়া কিছু কিছু কেধমত কাজ নির্বাহ করিত। একদা কাজের ত্রুটির জন্য সে প্রহৃত হয় এবং কান্নার সাথে সাথে তাহার জবান খুরিয়া যায়। এখন সে নিয়মিত পরিস্কার ভাবে কথা বলিতৈ সক্ষাম। বাবাভান্ডারীল মহিমা বলে এই বোবা ছেলে জবান ফিরিয়া পাইল।
 
(২) শাহজাদা সৈয়দ আবুল বশর সাহেবের নিকট ডি এস পি ইউছুপ সাহেবের চিঠিঃ
 
তিনি লিখিয়াছেন, “আমি এখন আজমীর শরীফে আছি। একদিন দেখিলাম সদর রাসত্মার এক পার্শ্বে বাবাভান্ডারী কেবলা উপবিশষ্ট। তিনি আমাকে দেখিয়া বলিলেন “অমনাইয়া তামাক খাওয়াবি”। অর্থাৎ ওহে বৎস আমাকে তামাক পরিবেশন কর। তাহাকে অপ্রত্যাশিত ভাবে সদর রাসত্মার পাশ্বে দেখিতে পাইয়া বুঝিলাম তিনি আজমীর শরীফে াাসিয়াছেন। আমি এক দোকানদারকে একটি টাকা জমা দিয়া তাহার নিকট হইতে একটি হুক্কা সাজাইয়া আনি। ততক্ষনে বাবাভান্ডারী কেবলা ঐ স’ানে হইতে প্রস’ান করিয়াছেন। তারপর বেশ অনুসন্ধানের পর তাহার কোন সন্ধান পাওয়া গেল না। অতত্রব, আপনার নিকট জানিতে চাই যে, তিনি আজমীর শরীফ আসিয়া কোথায় আছেন? এই ঘটনার পূর্বে বাবাভান্ডারী কেবলা ইনেত্মকাল ফরমাইয়াছেন। অতত্রব, তাহার ইনেত্মকাল হওয়ার পর তাহাকে আজমীর শরীফে দেখিতে পাওয়া তাহার কেরামতে পরিগণিত হয়।
 
(৩) গুজরাটের অনত্মর্গত কাটিয়ার জিলা নিবাসী মসত্মান আহমদ সাহেবের বর্ণনাঃ
 
আমি মনোহরী মালের সওদাগর ছিলাম। ভারতবর্ষ বিভক্ত হওয়ার কিছুকাল পূর্বে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে সামপ্রদায়িক দাংগা (জরড়ঃ) আরম্ভ হয়। হিন্দু মহল্লায় ছিল আমার দোকান। একদা হিন্দু গুন্ডার দল একত্রিত হইয়া ঐ মহল্লা নিবাসী মুসলমানগরের হাত পা বাধিয়া তাহাদিগকে ট্রাকে উঠাইতেছিল। সকলের সংগে াঅমিও তাহাদের হাতে বন্দী হইলাম। ট্রাকখানা ভর্তি হওয়ার পর রওয়ানা হইল। অল্পক্ষণের মধ্যে ট্রাকখানা হিন্দুদের শ্মাশানে আসিয়া পৌছিাল। তারপর ট্রাক হইতে মুসলমান বন্দীদিগকে নামাইয়অ হত্যা করার পূর্ব আরম্ভ হইল। তখন আমার মনের অবস’া কেমন হইয়াছিল তাহা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এমতাবস’ায় আমি বাবা ভান্ডারীর দরবারে আমার জীবন ভিক্ষা চাইতেছিলাম। অন্য সকল বন্দী গিদকে হত্যা করার পর আমার পালা আসিলেই তাহার। তাড়াতাড়ি করিয়া আমাকে নিহতদের মদ্যে ফেলিয়া ট্রাক লইয়া ছুটিয়া পালাইল। তারপর আমি হাতের বাধন দাতে কাটিয়া বহু কষ্টে গুজরাট শহর হইতে চট্টগ্রাম শহরে চলিয়া আসিলাম। এরপর বাবা ভান্ডারীর দরবারের হাজির হইয়অ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিলাম।
 
(৪) চট্টগ্রামের অনত্মগর্ত পূর্ব ষোলশহর নিবাসী হাফেজ কালাম আহমদের বর্ণনাঃ
 
আমি একজন সওদাগর। আমার গাছের ব্যবসায়ে যতেষ্ট উপার্জন আছে। আমার ঔরসে চারিটি মেয়ে সনত্মান জন্মগ্রহণ করে। আমার ধন-সম্পত্তি সামলাইয়াবার জন্য কোন পুরুষ আওলাদ না থাকায় আমি বিশেষ চিনিত্মত হইলাম। একদা চান্দগাও নিবাসী মাওলানা মোহাম্মদ আলীকে আমার এই দুঃখের কথা বলিলাম। তিনি আমার কথা শুনিয়া অনুতপ্ত হইলেন। তাহার উপদেশ অনুসারে হযরত বাবা ভান্ডারীর দরবারে আমার এই ফরিয়াদ পেশ করার জন্য যথারীতি সব কিছু করিলাম। তারপর আমার একটি পুত্র সনত্মান জন্মগ্রহণ করে।
 
(৫) চট্টগ্রামের অনর্ত্মগত চান্দগাও নিবাসী জনাব ওবেদুর রহমান চৌধুরী সাহেবের বর্ণনাঃ
১৯৪৭ খ্রষ্টাব্দের কথা। তখন আমি কলিকাতা ও মাদ্রাজে কাপড়েরর ব্যবসায়ী ছিলাম। একদা বাবাবভান্ডারী কেবলা আমাকে স্বপ্নযোগে অঅদেশ করিলেন “তুমি চট্টগ্রাম চলিয়া যাও।” তখন মাদ্রাজে প্রায় চারি লক্ষ টাকা পাওনা আছি। এতগুলি টাকা আদয় না করিয়া কিভাবে চলিয়া আসি, তাহাই চিনত্মার বিষয় হইল। তার পরদিন পুনরায় বাবাভান্ডারী কেবলা আদেশ করিলেন, “তুমি চট্টগ্রাম চলিয়া যাও।” আমি তোমার রিজিকের মালিক। অতত্রব বিনাদ্বিধায় সপ্তাহের মধ্যে সমসত্ম মালপত্র গুছাইয়া ষ্টীমার যোগে চট্টগ্রাম পাঠাইয়া দিলাম। আমি টাকা পয়সা সংগেকরিয়া ট্রেনযোগে কলিকাতা হইতে চট্টগ্রাম আসিয়া পৌছিলাম। তখন হিন্দুস’ান ও পাকিসআনের মধ্যে কোন বিবাদ আরম্ভ হয় নাই এবং যাতায়াতের ব্যাপারেও কোন কড়াকড়ি নাই। আমি চট্টগ্রাম পৌছিবার পরদিনই ঘোষিত হয় যে, সরকারী অনুমোদন ছাড়া এক এলাকা হইতেঅন্য এলাকায় মালপত্র আনা নেওয়া নিষিদ্ধ। তখনই বুঝিতে পারিলাম বাবাভান্ডারী কেবলার হুকুমের মহিমা।
 
(৬) চট্টগ্রামের অনত্মর্গত সীতাকুন্ড নিবাসী মাইজভান্ডারী গানের সর্বপ্রথম বেতার শিল্পী মলকুতুর রহমানের বর্ণনাঃ
আমার প্রতিবেশী এক মাইজভান্ডারী ভক্ত নতুন দায়রা ঘর নিমার্ণ করিয়াছে। আমরা বারজন আশেকানে ভান্ডারী সেই দায়রার মিলাদ পাঠের পর ছেমা, হাল্কা ও অজদের মাহফিল আরম্ভ করিয়াছি। তখন রাত ১১টা গ্রামের তথাকথিত মৌলভীদের প্ররোচনায় প্রায় ৬০ জন লোক আমাদিগকে আক্রমন করিতে আসে তাহারা ঘরে প্রবেশ করিয়া সর্বপ্রথম আমার মাথার উপর লাঠির আঘাত করে। ফলে আমার মাথা ফাটিয়া রক্তধারা প্রবাহিত হইতে থাকে। আমি ঘর হইতে পিছন দরজা দিয়া পালাইতে ছিলাম। এমন সময় বাবাভান্ডারী গায়েবী আওয়াজে আমাকে নির্দেশ করিণে, “বাচ্চা মাত হটো”। সুতরাং আমি আর পালাইতে পারিলাম না। লাঠিয়ালগন শোর করিয়া বলিতেছিল, মার মলকুতকে, জোরে মার। তাহার কেবল মলকুতকে মারিতেছে অতছ একটি লাঠিও আর আমাকে আঘাত করিতেছে না। তাহাদের দলের কয়েকজন লোক মাথা ফাটিয়া মৃত প্রায় হইয়া পড়িল। অতঃপর তাহারা তাহাদের আহত লোকগিদকে লইয়া পলায়ন করিল। বাবাভান্ডারীল মহিমা বলে তাহারা মারিতে আসিয়া মার খাইল।
 
(৭) চট্টগ্রামের অনত্মর্গত চান্দগাও নিবাসী জহির আহমদ চৌধুরীর বর্ণনাঃ
 
১৯৬২ খৃষ্টাব্দের রমজানের রোজার দিনে চট্টগ্রামে শহরের লয়েল রোডের পার্শ্বের রিফিউজী ক্যাম্পে আগুন ধরিয়া যায়। রমজানের ঈদ উপলক্ষে প্রায় ত্রিশ হাজার টাকার কাপড় আমার দোকানে মওজুদ ছিল। আগুন ক্রমঃসমপ্রসারিত হইতে থাকে। আমার দোকানের সামনে পরছাতি আগুনে পুড়িয়া যাওয়ার পর মূল দোকান গৃহে আগুন লাগার উপক্রম হইল। আমি অনন্যোপায় হইয়া বাবাভান্ডরীর সাহায্য প্রার্থণা করিতছিলা। তখন আগুন লাফ দিয়া অন্য দিকে চলিয়া গেল। বাবাভান্ডারীর মহিমা বলে আমার সম্পূর্ণ মাল ও দোকান এই প্রচন্ড অগ্নিকান্ড হইতে রক্ষা পাইল।
 
(৮) চট্টগ্রাম জিলার বোয়ালখালী থানার অনত্মর্গত গোমদণ্ডী গ্রাম নিবাসী কবিয়াল রমেশ চন্দ্রের পুত্র শ্রী জজ্ঞেশ্বরের বর্ণনাঃ
আমার বাড়ীর স্বাবিত্রী বালা শীল দুই তিন মাস ধরিয়া রক্ত স্রাবে বিশেষ কষ্টভোগ করিতেছিল। গ্রাম্য ডাক্তার কবিরাজ তাহার চিকিৎসা করিয়া ব্যর্থ হয়। অতিরিক্ত রক্তস্রাসের ফলে তাহার মুখ মন্ডলের রং বিবর্ণ হইয়া যায়। এইরুপে রোগীনি জীবন আশা পরিত্যাগ করিয়া হতাশ হইয়অ পড়ে। আমি ইহা শুনিয়া তাহাকে বাবাভান্ডালীর রওজা শরীফের কিছুজল পান করাইয়া দিলাম। অতঃপর বাবাভান্ডারী কেবলার করুনা বলে তাহার রক্তস্রাব বন্ধ হইয়া গেল এবং সে সুস’ হইয়া পড়ে।
 
(৯) চট্টগ্রাম জিলার পাচলাইশ থানার অনত্মর্গত বহদ্দার বাড়ী নিবাসী মৌলভী ছেয়দুর রহান চৌধুরী সাহেবের বর্ণনাঃ
১৯৬৬ খৃষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসের প্রথম সপ্তাহের কথা। একদা আমি চকবাজারে পাক নর্দমায় পতিত হইয়া অজ্ঞান হইয়া পড়ি তারপর প্রায় তিন মাস ধরিয়া চিকিৎসা করার পর কোন প্রকার আরোগ্য রঅভ না করিয়া বিশেষ চিহ্নিত হইয়া পড়ি। এমতাবস’অয় এক রাতে বাবাভান্ডারী কেবলা স্বপ্নযোাগে আমাকে দেখা দেন এবং আমার মাথা ও ডান হাতের উপর তাহার পবিত্র হাত বুলাইয়া দেন। পরদিন হইতে আমি আরোগ্য লাভ করি।

খুঁজুন