শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনবক্সে অশালীন বার্তা দিলে শাস্তি

ইনবক্সে অশালীন বার্তা দিলে শাস্তি

ডিজিটাল যুগে যোগাযোগের দরজা যেমন উন্মুক্ত হয়েছে, তেমনি সেই দরজায় হানা দিয়েছে নতুন ধরনের এক ঝুঁকি- অশালীন বার্তা, অশোভন ছবি, ভয় দেখানো বা বিরক্ত করার মতো আচরণ। বিশেষ করে নারীরা প্রায়ই সামাজিক মাধ্যম বা মোবাইল ইনবক্সে এসব বার্তার শিকার হচ্ছেন। এতদিন এই অপব্যবহারের বিরুদ্ধে আইনি সুযোগ সীমিত ছিল। কিন্তু এবার বিষয়টি নতুনভাবে আলোচনায় এনেছে ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া, যেখানে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার অপব্যবহার রোধে কঠোর শাস্তির বিধান যোগ করা হয়েছে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ যে খসড়াটি প্রকাশ করেছে, তাতে সাধারণ নাগরিকদের মতামত নেওয়ার জন্য ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। খসড়ায় উল্লেখিত শাস্তিগুলো শুধু কঠোরই নয়, বরং সরাসরি নাগরিক নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। অধ্যাদেশের ধারা ৭০ অনুযায়ী, যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া কাউকে বারবার ফোন করে বিরক্ত করাকে এখন অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। এই অপরাধের জন্য এক লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা, আর জরিমানা আদায় করতে ব্যর্থ হলে ছয় মাসের কারাদণ্ড হতে পারে। আরও কঠোর শাস্তি রাখা হয়েছে অশ্লীল বা অশোভন বার্তার ক্ষেত্রে। খসড়ার ধারা ৬৯-এ বলা হয়েছে- যদি কেউ টেলিযোগাযোগ বা বেতারযন্ত্রের মাধ্যমে অশ্লীল, ভীতিকর, অপমানজনক বা অশোভন কোনো বার্তা, ছবি বা ভিডিও পাঠায়, তাহলে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ দেড় কোটি টাকা অর্থদণ্ড, কিংবা উভয় দণ্ড দেওয়া যেতে পারে। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তি আরও বাড়িয়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

এই আইনি কাঠামো স্পষ্ট করে দিচ্ছে- ফোন বা ইনবক্স আর ব্যক্তিগত মজা বা দুষ্টুমি করার জায়গা নয়; এটি আইনের আওতায় কঠোরভাবে নজরদারিতে থাকবে। সাইবার ক্রাইম ইউনিটের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিদিনই শত শত নারী অশ্লীল ইনবক্স ম্যাসেজ, ভয়েস নোট, ছবি বা ভিডিও পাঠানোর অভিযোগ করছেন। কেউ কর্মক্ষেত্রে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে, আবার কেউ মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্রী- সবার অভিজ্ঞতাই ভীতিকর। অনেকেই লজ্জায় অভিযোগ করতে চান না। কেউ ব্লক করে দেন, কিন্তু মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। 

একজন ভুক্তভোগী সাবেক ফিচার লেখিকা বলেন, ‘আমি ভাবতাম, রিপোর্ট করলে কেউ বিশ্বাস করবে না। তাই চুপ ছিলাম। এখন জেনে স্বস্তি লাগছে যে, এমন বার্তা পাঠালেই জেল বা জরিমানা হতে পারে। আইনের পরিপূরক হিসেবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন।‘ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার মিতি সানজানা এ বিষয়ে বলেন, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও এর সংশোধিত বিধানগুলো অনলাইনে যৌন হয়রানি রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নতুন টেলিযোগাযোগ অধ্যাদেশ যুক্ত হলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।’ তিনি বলেন, মোবাইল ও ইন্টারনেট এখন জীবনের অংশ। তাই অপব্যবহার ঠেকাতে কঠোর শাস্তির বিধান অত্যন্ত জরুরি।

আইনটির লক্ষ্য শুধু দণ্ড দেওয়া নয়; বরং এমন পরিবেশ তৈরি করা যেখানে নারীরা ও সাধারণ নাগরিকরা নিরাপদে ফোন বা সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করতে পারেন। অশ্লীল বার্তা পাঠানো এখন আর ‘হালকা অপরাধ’ নয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও অশ্লীল ছবি বা বার্তা পাঠানোর জন্য তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা রয়েছে। নতুন টেলিযোগাযোগ অধ্যাদেশ এই আইনকে আরও শক্তিশালী করছে, বিশেষ করে ফোন ও ম্যাসেজের মতো সরাসরি যোগাযোগের ক্ষেত্রে। অভিযোগ করা এখন সহজ হয়েছে। ভুক্তভোগীরা চাইলে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন ৯৯৯, ৩৩৩, নিকটস্থ থানার সাইবার হেল্প ডেস্ক, পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনে।

 তবে অভিযোগ জানানোর প্রথম ধাপ হলো- অশ্লীল বার্তা, ছবি বা কলের স্ক্রিনশট বা রেকর্ড সংরক্ষণ করা। ডিজিটাল দায়িত্বশীলতা সমাজেরও দায়িত্ব। আইনের কঠোরতা সত্ত্বেও সমাজ বিশেষজ্ঞরা বলছেন- শুধু শাস্তি দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হবে না। দরকার ডিজিটাল নৈতিকতা শিক্ষা, পরিবার ও সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি। ইন্টারনেটের স্বাধীনতা মানে ইচ্ছামতো আচরণ নয়, বরং দায়িত্বশীল ব্যবহার। পরিশেষে বলা যায়, ডিজিটাল স্বাধীনতা মানে দায়িত্বশীলতা। একটি অশালীন ম্যাসেজ হয়তো কারও পুরো দিনের মানসিক শান্তি নষ্ট করতে পারে, কিন্তু একটি সচেতন আচরণ পুরো সমাজকে নিরাপদ রাখতে পারে।

খুঁজুন