শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জ্বালানি সংকট ও মোবাইল নেটওয়ার্কের যোগসূত্র..

জ্বালানি সংকট ও মোবাইল নেটওয়ার্কের যোগসূত্র..

রাশেদ মেহেদী, সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক :

জ্বালানি সংকটের কারনে দেশে এখন পর্যন্ত সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে কোন ডাটা সেন্টার বন্ধ হয়নি। কারন ডাটা সেন্টারগুলোতে ন্যাশনাল গ্রিড থেকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিদ্যুত সরবরাহ রাখা হয় এবং বিদ্যুত বিতরণ কর্তৃপক্ষগুলো গুরুত্বপূর্ণ  ডাটা সেন্টার সংযোগকে বিশেষায়িত বা অতি জরুরি সার্ভিস বিবেচনা করে লোডশেডিং এর আওতামুক্ত রাখছে এবং এখনও আছে। তবে জ্বালানি সংকটের কারনে ন্যাশনাল গ্রিডে বিদ্যুত সরবরাহ আশংকাজনকহারে কমে গেলে মোবাইল অপারেটরদের ‘নেটওয়ার্কের মস্তিস্ক’ ডাটা সেন্টার নিয়ে বড় উদ্বেগের কারন আছে, কিন্তু এ মুহুর্তে আতংকিত হওয়ার কিছু নেই। 

তবে সংকট অন্য ক্ষেত্রে আছে। গ্রাহক সংখ্যায় দেশের শীর্ষ মোবাইল অপারেটরের টাওয়ার সার্ভিস এখনও তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়, টাওয়ার কোম্পানির সঙ্গে অংশীদারিত্বের সম্পর্কে তারা এখনও আস্থাশীল হতে পারেনি। সমস্যাটা এখানেই প্রকট। ২৭টি ডাটা সেন্টার (মোবাইল অপারেটরদের ডাটা সেন্টার এন্টারপ্রাইজ শ্রেণির, গড়ে ২ MW আইটি লোড ধরলে PUE ১.৭-এ প্রতিটির মোট চাহিদা ৩.৪ MW) পরিচালনায় বিদ্যুত বিভাগের হিসেব অনুযায়ী দৈনিক চাহিদা প্রায় প্রায় ২২ লক্ষ kWh, যা জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে। যদি ডাটা সেন্টারগুলো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য লোডশেডিং এর আওতায় আসে তাহলে এবং যদি দিনে গড়ে  ৬ঘন্টা জেনারেটর ব্যাকআপ ধরা হয় তাহলে দিনে প্রায় ২ লাখ লিটার জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হবে। 

অন্যদিকে  বিদ্যুত বিভাগের গড় হিসেবে অনুযায়ী গ্রামীণ ফোনের ১২,০০০ টাওয়ারে জন্য দৈনিক চাহিদা প্রায় প্রায় ৭.২ লক্ষ kWh । যদি প্রতিদিন লোডশেডিং এর কারনে দিনে গড়ে ৬ঘন্টা ব্যাপআপের প্রয়োজন হয় তাহলে ওই ১২ হাজার টাওয়ারের জন্য দিনে প্রায় ৬৬ হাজার লিটার তেলের প্রয়োজন হবে। আমরা যদি খুব সাদা চোখে গড় হিসেবে করি, তাহলে ডাটা সেন্টারের ক্ষেত্রে চার অপারেটর মিলে লোডশেডিং সময়ে প্রয়োজন হবে দিনে ২ লাখ লিটার তেল, অর্থাৎ প্রতি অপারেটর গড়ে ৫০ হাজার লিটার তেল। অন্যদিকে ১২ হাজার বিটিএস চালাতে গ্রামীণফোনের এককভাবেই দরকার হবে ৬৬ হাজার লিটার তেল। 

বিদ্যুত বিভাগ এন্টারপ্রাইজ ডাটা সেন্টারগুলোকে লোডশেডিং মুক্ত রাখতে পারলেও গ্রামে-গঞ্জে বিভিন্ন স্থানে বিটিএস টাওয়ারগুলো লোডশেডিং এর আওতামুক্ত নয়। পিডিবি’র হিসেব অনুযায়ী ঢাকায় ১ থেকে ৩ ঘন্টা এবং মফস্বল এলাকায় ৮ থেকে ১২ ঘন্টা লোডশেডিং হচ্ছে। ফলে গ্রামে গঞ্জে অনেক জায়গায় মোবাইল অপারেটরদের বিশেষ করে গ্রামীণফোনের নিজস্ব ব্যবস্থাপনার প্রায় ১২ হাজার টাওয়ার নিরবচ্ছিন্নভাবে সচল রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। টাওয়ার কোম্পানির উপর নির্ভরশীল বাকী অপারেটরগুলো সংশ্লিষ্ট টাওয়ার কোম্পারি উপর দায়িত্ব দিয়ে কিছুটা নির্ভার থাকতে পারলেও গ্রামীণফোনের জন্য জ্বালানী সংকটের সময়ে সেটা প্রতি সেকেন্ডে দুঃসহ দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে উঠেছে। এ কারনে ডাটা সেন্টার সামনে এনে নিজস্ব ব্যবস্থাপনার ১২ হাজার টাওয়ার বিষয়টিকে আড়ালে রাখার একটা চেষ্টা হতে পারে। কারন ১২ হাজার টাওয়ার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় রাখার জন্য বিটিআরসি’র কাছে সংশ্লিষ্ট অপারেটরের একটা জবাবদিহিতার প্রশ্ন সামনে চলে আসতে পারে। 

এখানে জানিয়ে রাখি মোবাইল অপারেটরদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ডাটা সেন্টার গ্রামীণফোনের। সিলেটে ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি এই "টায়ার III স্ট্যান্ডার্ড ডাটা সেন্টার" উদ্বোধন করা হয়, যেটা সুপার কোর ডেটা সেন্টার (SCDC) নামে পরিচিত। ডাটা সেন্টার স্থাপনে ইকুইপমেন্ট ভেন্ডর ছিল চীনের কোম্পানি জেডটিই। 

এই সুপার কোর ডেটা সেন্টারের IT লোড ক্যাপাসিটি ৪ MW, যা দেশের যেকোনো মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরের (MNO) মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং  এতে স্মার্ট এনার্জি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম রয়েছে। ফলে এটা সাশ্রয়ী বিদ্যুত খরচে চলতে পারে।  ২০২৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বিগত অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়ব ডেটা সেন্টারটি পরিদর্শনও  করেন। এই ডাটা সেন্টার কি গত এক মাসে কখনও বন্ধ ছিল? 

আমার বিবেচনার বিষয় হচ্ছে, অবশ্যই সাংবাদিকদের কাছে তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে মোবাইল অপারেটরদের পক্ষ থেকে এটাও জানাতে হবে, গত এক মাসে তাদের কতটি ডাটা সেন্টার লোডশেডিং এর জন্য কত ঘন্টা বন্ধ ছিল কিংবা লোডশেডিং এর সময় ডাটার সেন্টারগুলোর স্মল পাওয়ার প্লান্ট কিংবা জেনারেটর ব্যাপআপ চালাতে জ্বালানী সরবরাহে কত ঘাটতির মুখে পড়তে হয়েছে? একই সঙ্গে দেশের কতটি বিটিএস বর্তমানে লোডশেডিং এবং জ্বালানী সংকটের কারনে দিনে কত ঘন্টা বন্ধ থাকছে?

খুঁজুন