মাজার পবিত্র স্থান। কারণ ইহা কবর নয়। কবর এবং মাজারের মধ্যে আকাশ পাতাল প্রভেদ। অবশ্য ধর্মীয় পরিভাষায়। কেননা, মৃত মানুষের জন্য কবর। জীবিতের জন্য নয়। অথচ সর্বশক্তিমান আল্লাহতে যিনি ফানা তথা নির্বাণপ্রাপ্ত হয়েছেন ইসলাম তাঁকে সর্বসময়ে জীবিত বলে দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছে। সুতরাং যিনি সর্বসময়ে জীবিত তাঁর আস্তানাকে কবর না বলে মাজার বলা হয়। ইসলামে কবর-পূজা নিষেধ।
কারণ, কবরে মৃত ব্যক্তি থাকেন। যদিও আজকাল আমরা মাজার এবং কবরের সূক্ষ্ম প্রভেদ না বুঝে সমাজের অনেক গন্যমান্য ব্যক্তি ও নেতাদের কবরকেও মাজার বলি। ইহা আমাদের একান্ত অনিচ্ছাকৃত ভুল।
তাছাড়া পবিত্র এক ইসলাম ইতোমধ্যেই ৭৩ (তেহাত্তর) টি ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। এই ৭৩ (তেহাত্তরটি) ভাগের মধ্যে প্রত্যেক ভাগের আবার নিজস্ব দর্শন আছে এবং প্রত্যেক ভাগের অনুসারীরা তাদের দর্শনই কোরআন এবং সুন্নাহ ভিত্তিক বলে দাবি করেন এবং অনেক সময় এই দাবির যুক্তিযুক্ততা নিয়ে ঝগড়া এমনকি খুনাখুনি পর্যন্ত হয়ে গেছে এবং এখনও হয়। কখনো সুন্নি ও কাদিয়ানিদের মধ্যে, আবার কখনো সুন্নি এবং শিয়াদের মধ্যে, আবার কখনো সুন্নি এবং ওহাবিদের মধ্যে।
হজরত মোহাম্মদ (আ.)-এর নামে যদি সৌদি আরবে মিলাদুন্নবি পাঠ করেন তবে সঙ্গে সঙ্গে চাবুকের আঘাত খেতে হবে। কারণ সৌদি আরবের শ্রদ্ধেয় ভাইয়েরা প্রায় সবাই ওহাবি এবং ওহাবিরা নবির নামে মিলাদ পাঠ করাকে শেরেক, বেদাত এবং নাজায়েজ মনে করেন। একমাত্র সুন্নি মুসলমানেরাই মাজারকে সম্মান করেন। মুসলমানদের মধ্যে এমন দলও আছেন যারা মাজার বলে কোনো কিছু মানতে একদম নারাজ। এই রকম একটি দলের নাম ওহাবি। শ্রদ্ধেয় ওহাবি ভাইয়েরা সংখ্যায় অনেক কম হলেও সুন্নিদের মধ্যে প্রবেশ করে সুন্নিদের ধর্মদর্শনের ভারসাম্য নষ্ট করে দিচ্ছেন।
যেমন সমগ্র কোরআন শরিফের কোথাও গান-বাদ্যের বিরুদ্ধে একটি শব্দও উচ্চারিত হয় নি। কেবলমাত্র দুইটি শব্দের শাব্দিক ব্যাখ্যা নিয়ে অনুবাদকারীর বিভিন্ন মতামত প্রতিফলিত হয়েছে। সমগ্র কোরআন শরিফে যে দুইটি শব্দকে ভিত্তি করে অনেক শ্রদ্ধেয় ভাইয়েরা গানবাদ্য না- জায়েজ করেছেন, সেই শব্দ দুটো হলো লাহওয়াল হাদিস। উহা সূরা লোকমানের ছয় নম্বর আয়াতে আছে। আরবি ভাষায় লাহওয়াল শব্দের অর্থ হল বাজে তথা অসাড় এবং হাদিস শব্দের অর্থ হলো কথা।
দুটো মিলে শাব্দিক অর্থ দাঁড়ালো বাজে কথা। এই 'অসাড় অথবা বাজে কথা' কেই মূলধন করে কেউ গানবাদ্যকে বুঝিয়েছেন, আবার কেউ কবিতাকে বুঝিয়েছেন, আবার কেউ গানবাদ্য এবং কবিতা দুটোর একটিও বোঝায় নি বলে মন্তব্য করেছেন। আবার অনেকে বলেছেন যেহেতু হজরত দাউদ নবী (আ.) গানবাদ্য করতেন এবং তাঁর মধুর সুরে এমনকি পশু পাখি পর্যন্ত আসতো সেই হেতু 'লাহওয়াল হাদিস' বলতে গানবাদ্যকে বুঝানো হয় নি, যেহেতু তিনিও একজন অতি সম্মানীয় নবী ছিলেন।
অনেকে আবার এই বলেও মন্তব্য করেছেন যে, যেহেতু গানবাদ্যের আরবি ভাষায় প্রতিশব্দ "গেনা' সেহেতু গেনা শব্দটি কোরআন-এর কোথাও একটি বারের জন্যও বলা হয় নি এবং যেহেতু বলা হয় নি সেহেতু লাহওয়াল শব্দটি যার অর্থ অনর্থক-বাজে অসারের দ্বারা গানবাদ্যকে বোঝানো হয় নি। অনেকটা নানা মুনির নানা মতের মতো শোনায়।
হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি এবং হজরত নিজামউদ্দিন আউলিয়া চিশতির মাজারে সব সময় কাওয়ালি, গজল, নাত ইত্যাদি হয়ে আসছে এবং মাজার শরিফের পাশেই নামাজ পড়ার জন্য মসজিদও আছে। এশার নামাজ শেষে দিল্লিতে অবস্থিত হজরত নিজামউদ্দিন আউলিয়া চিশতির মাজারে গানবাদ্য শুরু হয় কিন্তু আজমিরে অবস্থিত খাজা বাবার মাজারে এইসব টাইম টেবিলের খুব কমই খেয়াল রাখা হয়। কারণ, সেখানে শত শত কাওয়াল একই সময়ে গান গেয়ে চলেছে।
শত শত বাদ্য-বাজনার দল একই সময়ে বাজিয়ে চলেছে। হাজার হাজার লোক একই সময় জিকির করছে। হাজার হাজার লোক একই সময়ে কোরান পড়ছে, মিলাদ পড়ছে, দাঁড়িয়ে নেচে নেচে জিকির করছে, চিৎকার করে কাঁদছে ইত্যাদি। এ যেন এক আজব দরবার। এখানে যেন সব নদীর মিলনস্থল মহাসমুদ্র এবং মহাসার্বজনীন।
এত বড় সার্বজনীনতার বিশাল প্রকাশ পৃথিবীর আর কোনো নবি- ওলির মাজারে আছে কি না আমার জানা নেই। কারণ, এখানে পৃথিবীর এমন কোনো সম্প্রদায়ের লোক নেই আসা-যাওয়া না করেন। সুতরাং খাজা বাবারই আপন ভাগিনা বলে কথিত হাইকোর্টের মাজারে যিনি আছেন সেই হজরত খাজা শরফুদ্দিন চিশতির মাজারে কাওয়ালি, গজল, নাত, মারফতি এবং মুরশিদি গান বহু পূর্ব হতেই শুরু হয়েছে।
কিন্তু এখন মাজার কমিটিতে অন্য গোত্রের কয়েকজন শ্রদ্ধেয় খাদেম প্রবেশ করে যে স্থানটিতে সব সময় কাওয়ালি হতো সেই স্থানটিকে মসজিদের ভিতর ফেলে দিয়েছেন এবং এখানেই ইহার শেষ না করে সমস্ত স্থানটিকে বেড়িবাঁধের মতো আটক করে সেই স্থান হতে কাওয়ালির নাম-গন্ধ পর্যন্ত উঠিয়ে দিয়েছেন। যদিও মাজার কমিটির ভেতর কয়েকজন শ্রদ্ধেয় খাদেম ইহাতে আপত্তি তোলা সত্ত্বেও কোনো ফল হয় নি।
মাজার আল্লাহর পাগলদের ঘর। এখানে বিচিত্র ধরনের আল্লাহর আশেক আসবে এবং বিচিত্রভাবে তাদের মনের ভাব প্রকাশ করবে। এখানে গোলাপই একমাত্র ফুল তাই অন্য ফুলের স্থান নেই, গন্ধ নেই, বলার মতো বোকামি থাকতে পারে না। বিচিত্র ধরনের ফুল এবং একেক ফুলের একেক রকম রূপ ও সুগন্ধীর বৈচিত্রতার বিকাশের নাম হয় ফুলের বাগান। এই বহু ফুলের বিভিন্ন রূপ এবং বিভিন্ন গন্ধ একেরই আদর্শ প্রচার করে।
বৈচিত্র্যের মধ্যে একত্বের তথা তৌহিদের সৌন্দর্য যে বুঝতে পারে নি তারই বা দোষ কিসের? পৃথিবীর আনুমানিক চারশো কোটি মানুষ, প্রত্যেকের 'আমি' বলার মাঝে এক মহা-আমির দর্শন লুকিয়ে আছে। প্রতিটি মানুষের "আমি" বলার মাঝে যে মহা-আমির শরীর তাতে তুমি, তোমরা, সে, তাহারা শব্দগুলো ডাক দেবার তথা আহ্বান জানাবার কেবলমাত্র স্টাইল তথা শৈলী।
আসলে এ শব্দগুলোর কোনোই অস্তিত্ব নেই। চারশো কোটির মহা-আমি, পৃথিবীটাতে বিভিন্ন ভূখণ্ডে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন দেশ নাম ধারণ করে বিভিন্ন ভাষায়, বিভিন্ন আকৃতির আঙ্গিক বিকাশের বিভিন্ন রূপের কান্তি দিয়ে কী এক অপরূপ ডানা মেলে রেখেছে।
এই চারশো কোটি মানুষের মহা-আমির মধ্য হতেই আমাদের মতো মানুষের মুখের শব্দেই আমরা তথ্য মানবজাতি পেয়েছি আল্লাহর কথা। মানুষ মোহাম্মদ (আ.), মানুষ ইসা (আ.), মানুষ মুসা (আ.), মানুষ দাউদ (আ.), মানুষ ইব্রাহিম (আ.) এ রকমভাবে কয়েক লক্ষ আমাদের মানুষের মুখে কেন আল্লাহর কথা পেলাম? কেন মানুষের ঠোঁট-কেই আল্লাহ একমাত্র কথা বলার মাধ্যম অথবা অবলম্বন করে নিলেন?
কেন মানুষের চেহারা (ইমেইজ)-কেই আল্লাহ চেহারা বলে ঘোষণা করা হলো? মানুষই আল্লাহর রহস্য এবং আল্লাহ মানুষের রহস্য বলে কেন আমাদেরকে জানিয়ে দেওয়া হলো? আল্লাহকে যারা দেখেন তারা মানবের আকারেই দেখে থাকেন বলে কেন বলা হলো? মানুষের মধ্যে যিনি আল্লাহতে ফানা হয়ে যান তথা আপন আমিত্ব তথা অহংবোধ (ইগো) সম্পূর্ণ বর্জন করে তাঁর হয়ে যান তাকে আল্লাহর চেহারা তথা ওয়াজহুল্লাহ তথা বান্দা নেওয়াজ তথা নর নারায়ণ বলে কেন ঘোষণা করা হলো?
দেহ যদি রুহ তথা আত্মা না হয় তবে রুহ তথা আত্মার আকার আছে কি? আত্মা দেহ হতে বিদায় গ্রহণ করলে দেহের নাম লাশ দেওয়া হয় কেন? দেহের আকার ধরে নিলাম সাড়ে তিন হাত, কিন্তু আত্মার আকার কী? আত্মার যদি কোনো আকার না থাকে তবে আত্মা কি নিরাকার? তবে কি মানুষও নিরাকার? আল্লাহ যে নিরাকার এটা অতি সাধারণ মানুষও জানে, কিন্তু মানুষেরও যে কোনো আকারই নেই এ কথা কয়জন বুঝতে পারে? ঠেলা গাড়ি চালায় যে-মানুষটি আর বস্তুর বৈজ্ঞানিক আইনস্টাইন মানুষটির জৈবিক চাহিদা এক হলেও বিদ্যা-বুদ্ধিতে কি আকাশ-পাতাল ব্যবধান পাই না?
দেহ যদি আত্মার পোশাক হয় তবে পোশাকটাই কি আত্মা বলবো? কাপড় যেমন দেহের পোশাক তাই বলে কি কাপড়ের পোশাককে দেহ বলে চালিয়ে দেব? আত্মার বিজ্ঞানী হজরত মঈনুদ্দিন চিশতি আল-হোসাইনি আল হাসানি তাঁর পবিত্র মকতুবাতে খাজা নামক পুস্তকে ঘোষণা করলেন, চুঁজুমলা ফানা গাশতে বতু হে চুনামুন্দা খাহে কে আনাল্লাহে বগু খাহেকে হু আল্লাহ অর্থাৎ 'যদি তুমি সম্পূর্ণ আল্লাহতে ফানা হয়ে যেতে পার তখন ইচ্ছা হয় বলো তুমি আল্লাহ না হয় আমি আল্লাহ।
একই কথা আত্মার বিজ্ঞানী হজরত বু আলি শাহ কলন্দর তাঁর দিওয়ান-এ ঘোষণা করলেন, "বা শাকলে শায়খে দিদাম মোস্তফারা, না দিদাম মোস্তফারা বালকে খোদারা" অর্থাৎ আপন পীরের আকৃতিতে নবি মোস্তফাকে দেখলাম এবং উহা নবি মোস্ত ফা নন বরং স্বয়ং আল্লাহকে দেখলাম' বলে কেন ঘোষণা করলেন?
এ রকম হাজার হাজার আত্মার বিজ্ঞানীদের আত্মাকে জানবার বিজ্ঞানময় ফর্মুলা আমরা পেয়ে আসছি। এত কিছু পাবার পরও আমরা বিভিন্ন গোত্রের বিভিন্ন প্রকার ধর্মের সাইনবোর্ড কাঁধে নিয়ে আত্মতৃপ্তি লাভ করছি, কিন্তু সাইনবোর্ড ফেলে দিয়ে সত্য সন্ধানের দৃঢ় মনোবল নিয়ে কয়জন এগিয়ে এসেছি? কুসংস্কার, সংকীর্ণতা, গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকা, নিজ নিজ বাপ-দাদার ধারা প্রকাশে গর্ববোধ করি, কিন্তু নিরপেক্ষ মনোবল নিয়ে সত্যের সন্ধান কি করতে পেরেছি?
আল্লাহ তো সর্ববিষয়েই ক্ষমতাবান বলে অনেকবার ঘোষণা করেছেন। তবে আল্লাহর কথা কেন আকাশে মেঘের গর্জন করার মতো শব্দ করে আমাদেরকে জানিয়ে দিলেন না? না হয় বিজলি চমকানোর মতো আলোর বিচিত্র রেখা দিয়ে আল্লাহর কথা কেন লিখে দিলেন না?
না হয় বরফের টুকরো শিলার পতনের মতো তাঁর লিখিত বাণী কেন পৃথিবীতে নিক্ষেপ করে আমাদেরকে জানালেন না? হেলিকপ্টার আকাশে উড়ে বিজ্ঞাপন ফেলার মতো ফেরেস্তাদের দিয়ে কেন ফেলে দিলেন না? মানুষের ঠোঁটেই যদি আল্লাহর কথা পেয়ে থাকি, এবং তাই আমরা পেয়ে আসছি, তা হলে নিঃসন্দেহে কি বলতে পারি না যে, মানুষই আল্লাহর রহস্য।
কারণ, কবরে মৃত ব্যক্তি থাকেন। যদিও আজকাল আমরা মাজার এবং কবরের সূক্ষ্ম প্রভেদ না বুঝে সমাজের অনেক গন্যমান্য ব্যক্তি ও নেতাদের কবরকেও মাজার বলি। ইহা আমাদের একান্ত অনিচ্ছাকৃত ভুল।
তাছাড়া পবিত্র এক ইসলাম ইতোমধ্যেই ৭৩ (তেহাত্তর) টি ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। এই ৭৩ (তেহাত্তরটি) ভাগের মধ্যে প্রত্যেক ভাগের আবার নিজস্ব দর্শন আছে এবং প্রত্যেক ভাগের অনুসারীরা তাদের দর্শনই কোরআন এবং সুন্নাহ ভিত্তিক বলে দাবি করেন এবং অনেক সময় এই দাবির যুক্তিযুক্ততা নিয়ে ঝগড়া এমনকি খুনাখুনি পর্যন্ত হয়ে গেছে এবং এখনও হয়। কখনো সুন্নি ও কাদিয়ানিদের মধ্যে, আবার কখনো সুন্নি এবং শিয়াদের মধ্যে, আবার কখনো সুন্নি এবং ওহাবিদের মধ্যে।
হজরত মোহাম্মদ (আ.)-এর নামে যদি সৌদি আরবে মিলাদুন্নবি পাঠ করেন তবে সঙ্গে সঙ্গে চাবুকের আঘাত খেতে হবে। কারণ সৌদি আরবের শ্রদ্ধেয় ভাইয়েরা প্রায় সবাই ওহাবি এবং ওহাবিরা নবির নামে মিলাদ পাঠ করাকে শেরেক, বেদাত এবং নাজায়েজ মনে করেন। একমাত্র সুন্নি মুসলমানেরাই মাজারকে সম্মান করেন। মুসলমানদের মধ্যে এমন দলও আছেন যারা মাজার বলে কোনো কিছু মানতে একদম নারাজ। এই রকম একটি দলের নাম ওহাবি। শ্রদ্ধেয় ওহাবি ভাইয়েরা সংখ্যায় অনেক কম হলেও সুন্নিদের মধ্যে প্রবেশ করে সুন্নিদের ধর্মদর্শনের ভারসাম্য নষ্ট করে দিচ্ছেন।
যেমন সমগ্র কোরআন শরিফের কোথাও গান-বাদ্যের বিরুদ্ধে একটি শব্দও উচ্চারিত হয় নি। কেবলমাত্র দুইটি শব্দের শাব্দিক ব্যাখ্যা নিয়ে অনুবাদকারীর বিভিন্ন মতামত প্রতিফলিত হয়েছে। সমগ্র কোরআন শরিফে যে দুইটি শব্দকে ভিত্তি করে অনেক শ্রদ্ধেয় ভাইয়েরা গানবাদ্য না- জায়েজ করেছেন, সেই শব্দ দুটো হলো লাহওয়াল হাদিস। উহা সূরা লোকমানের ছয় নম্বর আয়াতে আছে। আরবি ভাষায় লাহওয়াল শব্দের অর্থ হল বাজে তথা অসাড় এবং হাদিস শব্দের অর্থ হলো কথা।
দুটো মিলে শাব্দিক অর্থ দাঁড়ালো বাজে কথা। এই 'অসাড় অথবা বাজে কথা' কেই মূলধন করে কেউ গানবাদ্যকে বুঝিয়েছেন, আবার কেউ কবিতাকে বুঝিয়েছেন, আবার কেউ গানবাদ্য এবং কবিতা দুটোর একটিও বোঝায় নি বলে মন্তব্য করেছেন। আবার অনেকে বলেছেন যেহেতু হজরত দাউদ নবী (আ.) গানবাদ্য করতেন এবং তাঁর মধুর সুরে এমনকি পশু পাখি পর্যন্ত আসতো সেই হেতু 'লাহওয়াল হাদিস' বলতে গানবাদ্যকে বুঝানো হয় নি, যেহেতু তিনিও একজন অতি সম্মানীয় নবী ছিলেন।
অনেকে আবার এই বলেও মন্তব্য করেছেন যে, যেহেতু গানবাদ্যের আরবি ভাষায় প্রতিশব্দ "গেনা' সেহেতু গেনা শব্দটি কোরআন-এর কোথাও একটি বারের জন্যও বলা হয় নি এবং যেহেতু বলা হয় নি সেহেতু লাহওয়াল শব্দটি যার অর্থ অনর্থক-বাজে অসারের দ্বারা গানবাদ্যকে বোঝানো হয় নি। অনেকটা নানা মুনির নানা মতের মতো শোনায়।
হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি এবং হজরত নিজামউদ্দিন আউলিয়া চিশতির মাজারে সব সময় কাওয়ালি, গজল, নাত ইত্যাদি হয়ে আসছে এবং মাজার শরিফের পাশেই নামাজ পড়ার জন্য মসজিদও আছে। এশার নামাজ শেষে দিল্লিতে অবস্থিত হজরত নিজামউদ্দিন আউলিয়া চিশতির মাজারে গানবাদ্য শুরু হয় কিন্তু আজমিরে অবস্থিত খাজা বাবার মাজারে এইসব টাইম টেবিলের খুব কমই খেয়াল রাখা হয়। কারণ, সেখানে শত শত কাওয়াল একই সময়ে গান গেয়ে চলেছে।
শত শত বাদ্য-বাজনার দল একই সময়ে বাজিয়ে চলেছে। হাজার হাজার লোক একই সময় জিকির করছে। হাজার হাজার লোক একই সময়ে কোরান পড়ছে, মিলাদ পড়ছে, দাঁড়িয়ে নেচে নেচে জিকির করছে, চিৎকার করে কাঁদছে ইত্যাদি। এ যেন এক আজব দরবার। এখানে যেন সব নদীর মিলনস্থল মহাসমুদ্র এবং মহাসার্বজনীন।
এত বড় সার্বজনীনতার বিশাল প্রকাশ পৃথিবীর আর কোনো নবি- ওলির মাজারে আছে কি না আমার জানা নেই। কারণ, এখানে পৃথিবীর এমন কোনো সম্প্রদায়ের লোক নেই আসা-যাওয়া না করেন। সুতরাং খাজা বাবারই আপন ভাগিনা বলে কথিত হাইকোর্টের মাজারে যিনি আছেন সেই হজরত খাজা শরফুদ্দিন চিশতির মাজারে কাওয়ালি, গজল, নাত, মারফতি এবং মুরশিদি গান বহু পূর্ব হতেই শুরু হয়েছে।
কিন্তু এখন মাজার কমিটিতে অন্য গোত্রের কয়েকজন শ্রদ্ধেয় খাদেম প্রবেশ করে যে স্থানটিতে সব সময় কাওয়ালি হতো সেই স্থানটিকে মসজিদের ভিতর ফেলে দিয়েছেন এবং এখানেই ইহার শেষ না করে সমস্ত স্থানটিকে বেড়িবাঁধের মতো আটক করে সেই স্থান হতে কাওয়ালির নাম-গন্ধ পর্যন্ত উঠিয়ে দিয়েছেন। যদিও মাজার কমিটির ভেতর কয়েকজন শ্রদ্ধেয় খাদেম ইহাতে আপত্তি তোলা সত্ত্বেও কোনো ফল হয় নি।
মাজার আল্লাহর পাগলদের ঘর। এখানে বিচিত্র ধরনের আল্লাহর আশেক আসবে এবং বিচিত্রভাবে তাদের মনের ভাব প্রকাশ করবে। এখানে গোলাপই একমাত্র ফুল তাই অন্য ফুলের স্থান নেই, গন্ধ নেই, বলার মতো বোকামি থাকতে পারে না। বিচিত্র ধরনের ফুল এবং একেক ফুলের একেক রকম রূপ ও সুগন্ধীর বৈচিত্রতার বিকাশের নাম হয় ফুলের বাগান। এই বহু ফুলের বিভিন্ন রূপ এবং বিভিন্ন গন্ধ একেরই আদর্শ প্রচার করে।
বৈচিত্র্যের মধ্যে একত্বের তথা তৌহিদের সৌন্দর্য যে বুঝতে পারে নি তারই বা দোষ কিসের? পৃথিবীর আনুমানিক চারশো কোটি মানুষ, প্রত্যেকের 'আমি' বলার মাঝে এক মহা-আমির দর্শন লুকিয়ে আছে। প্রতিটি মানুষের "আমি" বলার মাঝে যে মহা-আমির শরীর তাতে তুমি, তোমরা, সে, তাহারা শব্দগুলো ডাক দেবার তথা আহ্বান জানাবার কেবলমাত্র স্টাইল তথা শৈলী।
আসলে এ শব্দগুলোর কোনোই অস্তিত্ব নেই। চারশো কোটির মহা-আমি, পৃথিবীটাতে বিভিন্ন ভূখণ্ডে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন দেশ নাম ধারণ করে বিভিন্ন ভাষায়, বিভিন্ন আকৃতির আঙ্গিক বিকাশের বিভিন্ন রূপের কান্তি দিয়ে কী এক অপরূপ ডানা মেলে রেখেছে।
এই চারশো কোটি মানুষের মহা-আমির মধ্য হতেই আমাদের মতো মানুষের মুখের শব্দেই আমরা তথ্য মানবজাতি পেয়েছি আল্লাহর কথা। মানুষ মোহাম্মদ (আ.), মানুষ ইসা (আ.), মানুষ মুসা (আ.), মানুষ দাউদ (আ.), মানুষ ইব্রাহিম (আ.) এ রকমভাবে কয়েক লক্ষ আমাদের মানুষের মুখে কেন আল্লাহর কথা পেলাম? কেন মানুষের ঠোঁট-কেই আল্লাহ একমাত্র কথা বলার মাধ্যম অথবা অবলম্বন করে নিলেন?
কেন মানুষের চেহারা (ইমেইজ)-কেই আল্লাহ চেহারা বলে ঘোষণা করা হলো? মানুষই আল্লাহর রহস্য এবং আল্লাহ মানুষের রহস্য বলে কেন আমাদেরকে জানিয়ে দেওয়া হলো? আল্লাহকে যারা দেখেন তারা মানবের আকারেই দেখে থাকেন বলে কেন বলা হলো? মানুষের মধ্যে যিনি আল্লাহতে ফানা হয়ে যান তথা আপন আমিত্ব তথা অহংবোধ (ইগো) সম্পূর্ণ বর্জন করে তাঁর হয়ে যান তাকে আল্লাহর চেহারা তথা ওয়াজহুল্লাহ তথা বান্দা নেওয়াজ তথা নর নারায়ণ বলে কেন ঘোষণা করা হলো?
দেহ যদি রুহ তথা আত্মা না হয় তবে রুহ তথা আত্মার আকার আছে কি? আত্মা দেহ হতে বিদায় গ্রহণ করলে দেহের নাম লাশ দেওয়া হয় কেন? দেহের আকার ধরে নিলাম সাড়ে তিন হাত, কিন্তু আত্মার আকার কী? আত্মার যদি কোনো আকার না থাকে তবে আত্মা কি নিরাকার? তবে কি মানুষও নিরাকার? আল্লাহ যে নিরাকার এটা অতি সাধারণ মানুষও জানে, কিন্তু মানুষেরও যে কোনো আকারই নেই এ কথা কয়জন বুঝতে পারে? ঠেলা গাড়ি চালায় যে-মানুষটি আর বস্তুর বৈজ্ঞানিক আইনস্টাইন মানুষটির জৈবিক চাহিদা এক হলেও বিদ্যা-বুদ্ধিতে কি আকাশ-পাতাল ব্যবধান পাই না?
দেহ যদি আত্মার পোশাক হয় তবে পোশাকটাই কি আত্মা বলবো? কাপড় যেমন দেহের পোশাক তাই বলে কি কাপড়ের পোশাককে দেহ বলে চালিয়ে দেব? আত্মার বিজ্ঞানী হজরত মঈনুদ্দিন চিশতি আল-হোসাইনি আল হাসানি তাঁর পবিত্র মকতুবাতে খাজা নামক পুস্তকে ঘোষণা করলেন, চুঁজুমলা ফানা গাশতে বতু হে চুনামুন্দা খাহে কে আনাল্লাহে বগু খাহেকে হু আল্লাহ অর্থাৎ 'যদি তুমি সম্পূর্ণ আল্লাহতে ফানা হয়ে যেতে পার তখন ইচ্ছা হয় বলো তুমি আল্লাহ না হয় আমি আল্লাহ।
একই কথা আত্মার বিজ্ঞানী হজরত বু আলি শাহ কলন্দর তাঁর দিওয়ান-এ ঘোষণা করলেন, "বা শাকলে শায়খে দিদাম মোস্তফারা, না দিদাম মোস্তফারা বালকে খোদারা" অর্থাৎ আপন পীরের আকৃতিতে নবি মোস্তফাকে দেখলাম এবং উহা নবি মোস্ত ফা নন বরং স্বয়ং আল্লাহকে দেখলাম' বলে কেন ঘোষণা করলেন?
এ রকম হাজার হাজার আত্মার বিজ্ঞানীদের আত্মাকে জানবার বিজ্ঞানময় ফর্মুলা আমরা পেয়ে আসছি। এত কিছু পাবার পরও আমরা বিভিন্ন গোত্রের বিভিন্ন প্রকার ধর্মের সাইনবোর্ড কাঁধে নিয়ে আত্মতৃপ্তি লাভ করছি, কিন্তু সাইনবোর্ড ফেলে দিয়ে সত্য সন্ধানের দৃঢ় মনোবল নিয়ে কয়জন এগিয়ে এসেছি? কুসংস্কার, সংকীর্ণতা, গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকা, নিজ নিজ বাপ-দাদার ধারা প্রকাশে গর্ববোধ করি, কিন্তু নিরপেক্ষ মনোবল নিয়ে সত্যের সন্ধান কি করতে পেরেছি?
আল্লাহ তো সর্ববিষয়েই ক্ষমতাবান বলে অনেকবার ঘোষণা করেছেন। তবে আল্লাহর কথা কেন আকাশে মেঘের গর্জন করার মতো শব্দ করে আমাদেরকে জানিয়ে দিলেন না? না হয় বিজলি চমকানোর মতো আলোর বিচিত্র রেখা দিয়ে আল্লাহর কথা কেন লিখে দিলেন না?
না হয় বরফের টুকরো শিলার পতনের মতো তাঁর লিখিত বাণী কেন পৃথিবীতে নিক্ষেপ করে আমাদেরকে জানালেন না? হেলিকপ্টার আকাশে উড়ে বিজ্ঞাপন ফেলার মতো ফেরেস্তাদের দিয়ে কেন ফেলে দিলেন না? মানুষের ঠোঁটেই যদি আল্লাহর কথা পেয়ে থাকি, এবং তাই আমরা পেয়ে আসছি, তা হলে নিঃসন্দেহে কি বলতে পারি না যে, মানুষই আল্লাহর রহস্য।