শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
সুফিবাদ কুরআনের আলোকে ইলমে -গায়েব

কুরআনের আলোকে ইলমে -গায়েব

মোতালিব শেখ আল মাইজভান্ডারি :

আমরা এমন এক সময়ে বসবাস করছি যে সময় মৃত্যু ছাড়া প্রায় সকল বিষয়েই মতভেদ ও মতনৈক্য বিদ্যমান রয়েছে, ইলমে গায়েব টাও সেটারই অন্তর্ভুক্ত।আমরা আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের অনুসারী আমাদের আক্বীদা ও বিশ্বাস হলো যে ,আমাদের নবী আল্লাহ প্রদত্ত অদৃশ্যের সংবাদ জানতেন। কিন্তু বর্তমানে কিছু বাতিল ফিরকার উৎপত্তি ঘটেছে যারা কিছু আয়াত ও হাদীসকে উপস্থাপন করে এই আক্বীদা কে অস্বীকার করে এবং যুবসম্প্রদায়কে বিভ্রান্তির বেড়াজালে নিক্ষেপ করে দেয়। আসুন আমরা জেনে নিই যে ,এই আক্বীদাটি কুরআন ও হাদীস সমর্থিত আক্বীদা কি না?
কুরআনের আলোকে ইলমে -গায়েব

মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন
وَمَا كَانَ ٱللَّهُ لِیُطۡلِعَكُمۡ عَلَى ٱلۡغَیۡبِ وَلَـٰكِنَّ ٱللَّهَ یَجۡتَبِی مِن رُّسُلِهِۦ مَن یَشَاۤءُۖ
অনুবাদ : আল্লাহর শান এ নয় যে ,হে সর্বসাধারণ! তোমাদেরকে অদৃশ্যের জ্ঞান দিয়ে দেবেন। হ্যাঁ, আল্লাহ নির্বাচিত করে নেন তার রসূল গনের মধ্য  থেকে যাঁকে চান।(সূরা আল ইমরান আয়াত নম্বর ১৭৯)
এই আয়াত থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতিয়মান হয় যে, মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন রসূলগণের মধ্যে যাঁকে চান তাঁকে অদৃশ্যের জ্ঞান দিয়ে দেন।
মহান স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালা অপর এক জায়গায় বলেন
عَـٰلِمُ ٱلۡغَیۡبِ فَلَا یُظۡهِرُ عَلَىٰ غَیۡبِهِۦۤ أَحَدًا إِلَّا مَنِ ٱرۡتَضَىٰ مِن رَّسُولࣲ
অনুবাদ : অদৃশ্যের জ্ঞাতা, সুতরাং আপন অদৃশ্যের উপর কাউকে ক্ষমতাবান করেন না- আপন মনোনীত রসূলগণ ব্যতীত।(সূরা জিন আয়াত নম্বর ২৬ ও ২৭)
এই আয়াত থেকেও দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে আল্লাহ তাআলা রাসূলগণকে গায়েবের জ্ঞান দিয়েছেন।
মহান সৃষ্টিকর্তা অপর এক আয়াতে ঘোষণা করেন
وَمَا هُوَ عَلَى ٱلۡغَیۡبِ بِضَنِینࣲ
অনুবাদ : এবং এ নবী অদৃশ্য বিষয় বর্ণনা করার ব্যাপারে কৃপণ নন।
(সূরা তাকবীর আয়াত নম্বর ২৪)
এই আয়াত থেকে সূর্যের আলোর ন্যায় পরিষ্কারভাবে বুঝা যায় যে ,আমাদের প্রিয় নবী গায়েব জানেন।
* হাদীসের আলোকে ঈলমে গায়েব*
عَنْ قَتَادَةَ أَنَّ أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ حَدَّثَهُمْ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم صَعِدَ أُحُدًا وَأَبُوْ بَكْرٍ وَعُمَرُ وَعُثْمَانُ فَرَجَفَ بِهِمْ فَقَالَ اثْبُتْ أُحُدُ فَإِنَّمَا عَلَيْكَ نَبِيٌّ وَصِدِّيقٌ وَشَهِيْدَانِ
অনুবাদ : আনাস ইবনু মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত যে, (একবার) নবী স্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত আবূ বকর, হযরত উমর, ‘হযরত উসমান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম উহুদ পাহাড়ে আরোহণ করেন তো পাহাড়টি নড়ে উঠল। আল্লাহর রসূল স্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে উহুদ! থামো তোমার উপর একজন নবী, একজন সিদ্দীক ও দু’জন শহীদ রয়েছেন। (বুখারী শরীফ হাদিস নম্বর ৩৬৭৫)

 প্রিয় পাঠক চিন্তা করুন! নবী (দ:) আমার কেমন অদৃশ্যের সংবাদদাতা ছিলেন, হযরত উমর এবং হযরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুমা ভবিষ্যতে আল্লার রাস্তায় শহীদ হবেন সেটি আগে থেকেই জানিয়ে দিয়েছিলেন।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ إِذَا وَقَعَ الذُّبَابُ فِي إِنَاءِ أَحَدِكُمْ فَلْيَغْمِسْه“ كُلَّه“ ثُمَّ لِيَطْرَحْه“ فَإِنَّ فِي أَحَدِ جَنَاحَيْهِ شِفَاءً وَفِي الآخَرِ دَاءً
অনুবাদ: হযরত আবূ হুরাইরাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ স্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ যখন তোমাদের কারও কোন খাবার পাত্রে মাছি পড়ে, তখন তাকে পুরোপুরি ডুবিয়ে দিবে, তারপরে ফেলে দিবে। কারণ, তার এক ডানায় থাকে আরোগ্য, আর আরেক ডানায় থাকে রোগ।
সুবহানাল্লাহ! 
প্রিয় পাঠক চিন্তা করছেন নবী আমার কেমন অদৃশ্যের সংবাদদাতা ছিলেন মাছির এক ডানায় রোগ থাকে এবং অপর ডানায় সেটির আরোগ্য থাকে সেটিও বলে দিয়েছেন।
عَنْ حُذَيْفَةَ قَالَ لَقَدْ خَطَبَنَا النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم خُطْبَةً مَا تَرَكَ فِيهَا شَيْئًا إِلَى قِيَامِ السَّاعَةِ إِلاَّ ذَكَرَهُ عَلِمَهُ مَنْ عَلِمَهُ وَجَهِلَهُ مَنْ جَهِلَهُ
অনুবাদ : হযরত হুযাইফাহ রাদ্বিয়াল্লাহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী স্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার আমাদের প্রতি এমন একটি ভাষণ প্রদান করলেন যাতে ক্বিয়ামাত  পর্যন্ত যা সংঘটিত হবে এমন কোন কথাই বাদ দেননি। এগুলো মনে রাখা যার সৌভাগ্য হয়েছে সে স্মরণ রেখেছে আর যে ভুলে যাবার সে ভুলে গেছে।(মুসলিম শরীফ হাদিস নম্বর ৬৬০৪)
এই হাদীস থেকে নবী কারীম স্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যেমন ভাবে অদৃশ্যের জ্ঞান বোঝা যায় তেমন ভাবেই নবীর মোজেযাও বোঝা যায় কেননা সংক্ষিপ্ত সময়ে ক্বিয়ামত পর্যন্ত ঘটনা বলা আশ্চর্যজনক।
عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ مَرَّ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم عَلَى قَبْرَيْنِ فَقَالَ إِنَّهُمَا لَيُعَذَّبَانِ وَمَا يُعَذَّبَانِ مِنْ كَبِيرٍ ثُمَّ قَالَ بَلَى أَمَّا أَحَدُهُمَا فَكَانَ يَسْعَى بِالنَّمِيمَةِ وَأَمَّا أَحَدُهُمَا فَكَانَ لاَ يَسْتَتِرُ مِنْ بَوْلِهِ قَالَ ثُمَّ أَخَذَ عُودًا رَطْبًا فَكَسَرَهُ بِاثْنَتَيْنِ ثُمَّ غَرَزَ كُلَّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا عَلَى قَبْرٍ ثُمَّ قَالَ لَعَلَّهُ يُخَفَّفُ عَنْهُمَا مَا لَمْ يَيْبَسَا
অনুবাদ: হযরত ইবনু ‘আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (একবার) নবী স্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’টি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেন ঐ দু’জনকে আযাব দেয়া হচ্ছে আর কোন কঠিন কাজের কারণে তাদের আযাব দেয়া হচ্ছে না। অতঃপর তিনি স্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হাঁ (আযাব দেয়া হচ্ছে) তবে তাদের একজন পরনিন্দা করে বেড়াত, অন্যজন তার পেশাবের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করত না। (রাবী বলেন) অতঃপর তিনি একটি তাজা ডাল নিয়ে তা দু’খন্ডে ভেঙ্গে ফেললেন। অতঃপর সে দু’ খন্ডের প্রতিটি এক এক কবরে পুঁতে দিলেন। অতঃপর বললেনঃ আশা করা যায় যে এ দু’টি শুকিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত তাদের উভয়ের ‘আযাব হালকা করা হবে।
 (বুখারী শরীফ হাদিস নম্বর১৩৭৮)

এই হাদীস থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, নবী আমার কেমন অদৃশ্যের সংবাদদাতা ছিলেন, কবরের ভিতরে আযাব হচ্ছে আর নবী আমার বাইরে থেকে বলে দিচ্ছেন। শুধু আযাব বলছেন বরং কি কারণে হচ্ছে সেটাও বলে দিচ্ছেন এবং কি করলে আযাব দূরীভূত হবে সেটাও করলেন সুবাহানাল্লাহ!
عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم نَعَى زَيْدًا وَجَعْفَرًا وَابْنَ رَوَاحَةَ لِلنَّاسِ قَبْلَ أَنْ يَأْتِيَهُمْ خَبَرُهُمْ فَقَالَ أَخَذَ الرَّايَةَ زَيْدٌ فَأُصِيْبَ ثُمَّ أَخَذَ جَعْفَرٌ فَأُصِيْبَ ثُمَّ أَخَذَ ابْنُ رَوَاحَةَ فَأُصِيْبَ وَعَيْنَاهُ تَذْرِفَانِ حَتَّى أَخَذَ الرَّايَةَ سَيْفٌ مِنْ سُيُوْفِ اللهِ حَتَّى فَتَحَ اللهُ عَلَيْهِمْ.
অনুবাদ: হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত যে, মুসলিমদের নিকট খবর এসে পৌঁছার পূর্বেই নবী স্বল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে যায়দ, জা‘ফার ও ইবনু রাওয়াহা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম দের (শাহাদাতের) কথা জানিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, যায়দ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) পতাকা হাতে এগিয়ে গেলে তাঁকে শহীদ করা হয়। অতঃপর জা‘ফার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) পতাকা হতে এগিয়ে গেলে তাঁকেও শহীদ করা হয়। অতঃপর ইবনু রাওয়াহা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) পতাকা হাতে নিলে তাঁকেও শহীদ করা হল। এ সময়ে তাঁর দু’চোখ থেকে অশ্রু ঝরছিল। (তিনি বললেন) শেষে আল্লাহর তলোয়ারদের মধ্য হতে আল্লাহর এক তলোয়ার (খালিদ বিন ওয়ালীদ রাদিয়াল্লাহু আনহু) পতাকা ধারণ করল। ফলে আল্লাহ তাদের বিরুদ্ধে বিজয় দান করলেন। (বুখারী শরীফ হাদিস নম্বর ৪২৬২)

 প্রিয় পাঠক লক্ষ করুন যে, নবী আমার কেমন অদৃশ্যের সংবাদদাতা ছিলেন, যুদ্ধ হচ্ছে শাম দেশে আর সেই যুদ্ধের ঘটনা নবী আমার মদীনায় বসে বলে দিচ্ছেন সুবাহানাল্লাহ!
عَنْ طَارِقِ بْنِ شِهَابٍ قَالَ سَمِعْتُ عُمَرَ يَقُوْلُ قَامَ فِيْنَا النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم مَقَامًا فَأَخْبَرَنَا عَنْ بَدْءِ الْخَلْقِ حَتَّى دَخَلَ أَهْلُ الْجَنَّةِ مَنَازِلَهُمْ وَأَهْلُ النَّارِ مَنَازِلَهُمْ حَفِظَ ذَلِكَ مَنْ حَفِظَهُ وَنَسِيَهُ مَنْ نَسِيَهُ
 অনুবাদ:তারিক ইবনু শিহাব (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘উমার (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে বলতে শুনেছি, একদা নবী স্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মধ্যে দাঁড়ালেন। অতঃপর তিনি আমাদের সৃষ্টির সূচনা সম্পর্কে জ্ঞাত করলেন। অবশেষে তিনি জান্নাতবাসী ও জাহান্নামবাসীর নিজ নিজ নির্দিষ্ট স্থানে প্রবেশ করার কথাও উল্লেখ করলেন। যে ব্যক্তি এ কথাটি স্মরণ রাখতে পেরেছে, সে স্মরণ রেখেছে আর যে ভুলে যাবার সে ভুলে গেছে। (বুখারী শরীফ হাদিস নম্বর ৩১৯২)
এই হাদিস থেকেও দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে নবী আমার এটাও জানেন যে পৃথিবী সূচনা কিভাবে ও কবে হয়েছে এবং এটাও জানেন যে কে কে জান্নাতে যাবে আর কে কে জাহান্নামে যাবে।
ঈলমে গায়েব সম্পর্কে সূক্ষ্ম আলোচনা

প্রিয় পাঠক উপরের দলীল সমূহ থেকে আপনারা বুঝতে পারলেন যে নবী ও রসূল গণকে আল্লাহ গায়েবের জ্ঞান দিয়েছেন কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও এটাই সত্য যে বর্তমানে কিছু নামধারী আহলে হাদীস নামক ফিরকাদের উৎপত্তি ঘটেছে যারা কিছু আয়াত কে উপস্থাপন করে মানুষকে বোঝাতে চায় যে দেখো আল্লাহ নিজে কুরআন মাজীদে বলেছেন যে ,আল্লাহ ছাড়া কেউ গায়েব জানেনা। তখন সাধারণ মানুষরা বিভ্রান্তির শিকার হয়ে যায়। আমি অধম শুধু একটি কথা বলবো সেটি মনে রাখলে ইন শা আল্লাহ কেউ আপনাকে বিভ্রান্ত করতে পারবেনা। সব সময় স্মরণে রাখবেন যে যে সমস্ত আয়াত থেকে এটা বোঝা যাবে যে আল্লাহ ছাড়া কেউ গায়েব জানেনা তো সেই গায়েব বলতে সত্তাগত গায়েব (অর্থাৎ কারও জানিয়ে না দেওয়াতেই নিজে থেকে জানা)_কে বোঝানো হয়েছে আর আমরা নবীদের জন্য যে গায়েবের কথা বলি সেটা হলো প্রদত্ত গায়েব অর্থাৎ আল্লার জানিয়ে দেওয়াতে জেনে যাওয়া। সুতরাং উভয় ধরনের আয়াতের মধ্যে কোনরকমের সংঘর্ষ নেই।

খুঁজুন