শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
সুফিবাদ মহা প্রলয়ের দিনে অবশিষ্ট থাকবে কেবল সেই এক অদ্বৈত সত্তা

মহা প্রলয়ের দিনে অবশিষ্ট থাকবে কেবল সেই এক অদ্বৈত সত্তা

যখন সব লয় হয়ে যাবে, তখন অবশিষ্ট থাকবে কেবল সেই এক অদ্বৈত সত্তা। আমরা যা শুনি তা শব্দ, আর যা অনুভব করি তা সত্য। নিজের ভেতরের সেই সত্যকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা চলুক নিরন্তর।

শব্দের ঘরে কে বারাম দেয়, নিঃশব্দে কে আছে সদাই, যেদিন হবে মহা প্রলয়,কে কারে করবে দমন,
গানের এই কলির ব্যাখ্যা।

১. শব্দের ঘরে কে বারাম দেয়?
এখানে 'শব্দ' বলতে মহাজাগতিক ধ্বনি বা সুফি পরিভাষায় 'কুন' (হও) ধ্বনিকে বোঝানো হয়েছে। সুফি মতে, সৃষ্টিজগত অস্তিত্বে আসার মূলে ছিল একটি শব্দ। মানুষের দেহে এই শব্দ হলো 'শ্বাস-প্রশ্বাস' বা 'জিকির'।

ব্যাখ্যা: 'বারাম দেওয়া' মানে বিচরণ করা বা অবস্থান করা। লালন প্রশ্ন করছেন, আমাদের এই দেহের ভেতরে যে নিরন্তর প্রাণের স্পন্দন বা শব্দের খেলা চলছে, তার চালিকাশক্তি কে? সুফি তত্ত্বে একে বলা হয় 'রূহ' বা পরমাত্মার নূর, যা দেহের ঘরে শব্দরূপী স্পন্দন তৈরি করে আমাদের জীবিত রাখে।

২. নিঃশব্দে কে আছে সদাই?
শব্দ যেখানে শেষ হয়, সেখানেই শুরু হয় পরম সত্যের অবস্থান। সুফি সাধনায় একে 'জাত' বা মহান আল্লাহর মূল সত্তা বলা হয়, যা আকার-নিরাকার এবং শব্দ-বর্ণের অতীত।

ব্যাখ্যা: মানুষ যখন ধ্যানের (মুরাকাবা) গভীরে যায়, তখন বাইরের সব শব্দ থেমে যায়। লালন বলছেন, দেহের সেই নিভৃত কোণে বা প্রাণের গভীরে একজন নিঃশব্দে বিরাজ করছেন। তিনি কোনো আওয়াজ করেন না, কিন্তু তাঁর অস্তিত্বেই সবকিছু টিকে আছে। এই 'নিঃশব্দ' সত্তাই হলো প্রকৃত 'মনুরায়' বা পরমাত্মা।

৩. যেদিন হবে মহা প্রলয়, কে কারে করবে দমন?
এখানে 'মহা প্রলয়' শব্দটির দুটি অর্থ হতে পারে: একটি মহাবিশ্বের ধ্বংস (কিয়ামত), অন্যটি মানুষের ব্যক্তিগত মৃত্যু (ফানা)।

ব্যাখ্যা: সুফি ভাবধারায় মৃত্যুকে দেখা হয় পরম মিলনের লগ্ন হিসেবে। লালন এখানে একটি গভীর রহস্যের কথা বলেছেন। যখন এই দেহ বা দৃশ্যমান জগত লয় হয়ে যাবে, তখন এই 'শব্দ' (প্রাণ) আর 'নিঃশব্দ' (পরমাত্মা) এক হয়ে যাবে। সুফি তত্ত্বে একে বলা হয় 'ফানা ফিল্লাহ'।

যখন সব মিশে একাকার হয়ে যাবে, তখন আলাদা করে 'দমন' করার মতো কেউ থাকবে না। অর্থাৎ, দ্বৈততা (আমি এবং তিনি) ঘুচে গিয়ে কেবল 'এক' বা অদ্বৈত সত্তাই অবশিষ্ট থাকবে।

সারকথা
লালন সাঁই এই গানের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন যে, আমাদের দেহের ভেতরেই সেই পরম সত্তার বসবাস। তিনি কখনও প্রাণের স্পন্দন হয়ে 'শব্দ' করেন, আবার কখনও মৌন হয়ে হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকেন। সাধনার মূল লক্ষ্য হলো—বেঁচে থাকতেই সেই 'নিঃশব্দ' সত্তার সাথে পরিচয় হওয়া, যাতে মৃত্যুরূপী মহা প্রলয়ে আত্মা তার মূল উৎসের সাথে নির্বিঘ্নে মিশে যেতে পারে।

সহজ কথায়, যিনি শব্দের স্রষ্টা, তিনিই নিঃশব্দের রূপকার; আর প্রলয় শেষে কেবল তিনিই অবশিষ্ট থাকেন। 

খুঁজুন