আমরা কয়টা মিথ্যাচারের প্রতিবাদ করবো? একটি-দুটি হলে সামলানো যেতো। কিন্তু প্রতি পদে পদে মিথ্যাচার। খোদ রসূল (সা:) ও রসূলের পরিবার সম্পর্কে জঘন্য মিথ্যাচার করা হচ্ছে। রসূলের চাচা ও অভিভাবক হযরত আবু তালিব হলেন তেমনি একটি মিথ্যাচারের শিকার। ইমাম হোসেনের খুনি ইয়াজিদকে 'রাজিয়াল্লাহু তায়লা আনহু' এবং জান্নাতী হিসেবে সার্টিফিকেট দেয়া হলেও রসূলের প্রিয় পিতামাতা ও চাচা আবু তালিবকে 'কাফের' এবং 'জাহান্নামী' হিসেবে গণ্য করা হয়। তার চেয়ে দু:খজনক ও লজ্জার বিষয় আর কী হতে পারে?
আমাদের কথিত ইসলামী বক্তারা রসিয়ে রসিয়ে ওয়াজে বলেন, হযরত আবু তালিব নাকি কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। রসূল মৃত্যুর সময় তাকে কালেমা পাঠ করতে বলেছিলেন। আবু তালিব নাকি কালেমা পাঠ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তারা জানেন না যে, হযরত আবু তালিব মুসলমান ছিলেন এবং মুসলমান হিসেবে মৃত্যুবরণ করেন।
হযরত আলীর প্রতি সীমাহীন ঘৃণা ছড়িয়ে দিতে বলা হয় যে, তার পিতা হযরত আবু তালিব কাফের অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন। আবু তালিব নিজে মুসলমান হয়েছিলেন তাই নয়, তার স্ত্রী ফাতিমা বিনতে আসাদও ছিলেন মুসলমান৷ হযরত ফাতিমা বিনতে আসাদ মদিনায় হিযরত করেছিলেন। তিনি ছিলেন রসূলের মহিলা সাহাবী। প্রমাণ হিসেবে বলা যায় যে, হযরত আবু তালিব মুসলমান না হলে হযরত ফাতিমা বিনতে আসাদের সাথে তার বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যেতো যেমনটি হয়েছিল হযরত আবু বকরের ক্ষেত্রে। ইসলাম গ্রহণ না করায় হযরত আবু বকর তার প্রথম স্ত্রী কুতাইলাকে তালাক দেন। অতএব আমরা নি:সন্দেহে বলতে পারি যে, রসূলের মহিলা সাহাবী ফাতিমা বিনতে আসাদের স্বামী আবু তালিব ছিলেন মুসলমান।
মুয়াবিয়া ছিলেন হযরত আলীর ঘোরতর শত্রু। মুয়াবিয়া হযরত আলী ও তার পরিবারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অভিশম্পাত করার জন্য খুৎবা চালু করেছিলেন। কিন্তু এ খুৎবায় কখনো হযরত আবু তালিবকে কাফের হিসেবে অভিশম্পাত করা হয়নি। হযরত আলীর পিতা আবু তালিব কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে অন্য কেউ ছেড়ে কথা বললেও মুয়াবিয়া ছেড়ে দেয়ার পাত্র ছিলেন না। এ যুক্তিতে প্রমাণ হয়ে যায় যে, হযরত আবু তালিব মুসলমান ছিলেন। আরো প্রমাণ চান? হযরত আবু তালিবের আরেক নাম ছিল 'ইমরান।' পবিত্র কুরআনের সুরা আল-ইমরান রসূলের চাচা আবু তালিব ওরফে ইমরানের সৌজন্যে নাজিল হয়।
রসূলের (সা:) দাদা আবদুল মোত্তালিব একটি প্রতিনিধিদলের প্রধান হিসেবে আবিসিনিয়া সফরকালে সে দেশের রাজা সাইফ ইবনে ইয়াজান তাকে সুসংবাদ দেন যে, তার নাতি হবেন একজন নবী এবং তার নাম হবে মুহাম্মদ। পরবর্তীতে আবদুল মোত্তালিব বিশ্বনবীর (সা:) বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা দিয়ে বলেছিলেন, আমার এক অতি প্রিয় সন্তান ছিল। এক মহিমান্বিত রমণীর সাথে তার বিয়ে দিলাম যার নাম আমেনা বিনতে ওয়াহাব ইবনে আব্দে মান্নাফ ইবনে জোহরা। সেই রমণী একটি মাত্র পুত্র সন্তানের জন্ম দেয় যার নাম রেখেছি মুহাম্মদ। কিছুদিন পর তার পিতামাতা ইন্তেকাল করলে আমি ও তার চাচা আবু তালিব তার দেখাশোনার দায়িত্ব নেই।(সূত্র:সিরায়ে হালাবি)।
আবু তালিব ছিলেন একজন বিশিষ্ট কবি। তার কবিতায় প্রমাণ পাওয়া যায় যে, তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। একটি কাসিদায় তিনি লিখেছিলেন, সম্মানিত লোকদের জানা উচিত যে, মুহাম্মদ মুসা ও ঈসা ইবনে মারিয়ামের মতো একজন নবী।
তারপরও বলতে হবে যে, হযরত আবু তালিব কাফের ছিলেন? আমাদের একথাও মনে রাখতে হবে যে, রসূলের হাশেমীয় বংশ এক আল্লাহতে বিশ্বাস করতো এবং মদ্যপান থেকে বিরত থাকতো। কিন্তু এ বাস্তবতা সত্ত্বেও আমাদের জনপ্রিয় ইসলামী বক্তা মিজানুর রহমান আজহারী তার এক ওয়াজে বলেছেন, হযরত আলী নাকি মাতাল অবস্থায় টাল হয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে সুরা পাঠে ভুল করেছিলেন।
মিজানুর রহমান আজহারীর দৃষ্টিতে হযরত আলী যেন ছিলেন আমাদের সমাজের কোনো লম্পট মদ্যপায়ীর মতো। তিনি হয়তো একথা ভুলে গিয়েছিলেন যে, পবিত্র কাবা শরীফে জন্মগ্রহণকারী হযরত আলী ছিলেন জন্মগতভাবে পবিত্র। আমরা রসূলের হাশেমীয় বংশকে উমাইয়াদের শত্রুতাপূর্ণ দৃষ্টিভংগি দিয়ে দেখছি। এজন্য আমরা হযরত আবু তালিবকে কাফের এবং আবু তালিবের পুত্র হযরত আলীকে মদ্যপায়ী হিসেবে সাব্যস্থ করছি।
মিজানুর রহমান আজহারীর দৃষ্টিতে হযরত আলী যেন ছিলেন আমাদের সমাজের কোনো লম্পট মদ্যপায়ীর মতো। তিনি হয়তো একথা ভুলে গিয়েছিলেন যে, পবিত্র কাবা শরীফে জন্মগ্রহণকারী হযরত আলী ছিলেন জন্মগতভাবে পবিত্র। আমরা রসূলের হাশেমীয় বংশকে উমাইয়াদের শত্রুতাপূর্ণ দৃষ্টিভংগি দিয়ে দেখছি। এজন্য আমরা হযরত আবু তালিবকে কাফের এবং আবু তালিবের পুত্র হযরত আলীকে মদ্যপায়ী হিসেবে সাব্যস্থ করছি।