শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
সুফিবাদ রাসূলের সাথে অন্যায় ধামাচাপা দিতে নয়া ধর্মমত

রাসূলের সাথে অন্যায় ধামাচাপা দিতে নয়া ধর্মমত

মুসলমান হিসেবে আমরা জন্মমাত্র ঈমানের শর্তগুলো জানি। কেউ ঈমানের সাতটি শর্ত ভঙ্গ করলে তাকে মুসলমান বলা যাবে না। কিন্তু ইসলাম পরিত্যাগকারীরা ঈমানের মৌলিক সাতটি শর্তের সাথে আরো একটি শর্ত যোগ করে একটি নয়া ধর্ম বানিয়েছে। এ ধর্মের নাম ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত।’ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মূল আকিদা হলো সাহাবীদের প্রতি বিশেষ করে আবু বকর, উমর ও উসমানের খিলাফত নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না। তাদের সমালোচনা করা যাবে না। তাহলে ঈমান থাকবে না। সাহাবীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে কারো আপত্তি নেই। সাহাবী হলেই সাত খুন মাফ হতে পারে না। সাহাবীদের মুরতাদ হওয়ার দৃষ্টান্তও তো আছে। আর মুনাফিক যে ছিল তাতো না বললেও চলে। মুনাফিকদের সাহাবী হিসেবে দায়মুক্তি দেয়া নিয়ে মুসলিম সমাজে যত বিপত্তি। 

  রসূল (সা.) প্রচার করেছেন সাম্যের ধর্ম ইসলাম। তিনি তো শিয়া-সুন্নি নামে কোনো ধর্ম প্রচার করেননি? তাহলে কোথা থেকে এ বিভাজন তৈরি হলো? সুন্নি মুসলমানরা এ বিভাজন তৈরি করেছে। সুন্নিরা বিশ্বাস করে যে, রসূল (সা.) তার কোনো উত্তরসূরি নির্বাচন করেননি। হযরত আবু বকর হলেন জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং প্রথম ন্যায়নিষ্ঠ খলিফা। বিপরীত দিকে শিয়ারা বিশ্বাস করে যে, রসূল (সা.) গাদিরে খুমে হযরত আলীকে তার উত্তরাধিকারী মনোনীত করেছেন। আমরা যদি দুটি বিশ্বাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করি তাহলে দেখবো যে, শিয়াদের বিশ্বাস পুরোপুরি সত্য এবং রসূলের (সা.) সমকালীন বিশ্ব রাজনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। দুনিয়ার কোনো শাসক উত্তরাধিকারী নিয়োগ না করে পারেন না। তারই ধারাবাহিকতায় রসূল (সা.) উত্তরাধিকারী নিয়োগ করেছেন। কিন্তু অস্বীকার করলে সত্য কখনো মিথ্যা হয়ে যায় না। কাফেররা রসূলকে বিশ্বাস করতো না। তাই বলে কি রসূল (সা.) মিথ্যা হয়ে গিয়েছিলেন? বরং রসূলকে অস্বীকারকারীরা তৃণখÐের মতো ভেসে গেছে।

 আজো কেউ রসূলের বিধিবিধান এবং আদেশ-নিষেধ অমান্য করলে একইভাবে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। সুন্নি মুসলমানরা আল্লাহকে একমাত্র উপাস্য হিসেবে বিশ্বাস করে, আল্লাহর গুণাবলীতে বিশ্বাস করে, ফেরেশতায় বিশ্বাস করে, নবী-রসূলে বিশ্বাস করে, আসমানী কিতাবে বিশ্বাস করে, তকদীরে বিশ্বাস করে, আখিরাতে বিশ্বাস করে, কবর ও কিয়ামতে বিশ্বাস করে, হাশর ও হাউসে কাউসারে বিশ্বাস করে, শাফায়াত, মিজান, পুলসিরাত এবং জান্নাত ও জাহান্নামে বিশ্বাস করে। বিশ্বাস করে না কেবল আহলে বাইয়াতকে। রসূল (সা.) গাদিরে খুমে শুধু হযরত আলীকে তার উত্তরসূরি হিসেবে নির্বাচন করেছেন তাই নয়, তিনি উম্মতকে দিকনির্দেশনা দানে আহলে বাইয়াত বা তার রক্তজ বংশধরকে রেখে যাওয়ার কথাও বলেছেন। কিন্তু সুন্নি মুসলমানরা রসূলের এ আদেশ অমান্য করছে। তারা সাহাবী বিশেষ করে রসূল ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে অন্যায়ে জড়িত সাহাবীদের সমর্থন করছে। 

কুরআন এবং রসূলের সুন্নাহ হচ্ছে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মূল  আকিদা। তবে তারা আহলে বাইয়াতকে বাদ দেয়ার জন্য সুন্নাহ শব্দটি সংযোজন করেছে। তারা দাবি করছে যে,  রসূল বলে গেছেন, ‘আমি তোমাদের জন্য দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। একটি হলো আল্লাহর কুরআন এবং আরেকটি হলো আমার সুন্নাহ।’ এখানে আহলে বাইয়াত শব্দটিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সন্দেহ নেই, রসূল ‘সুন্নাহ’ শব্দটি উচ্চারণ করেছেন। আবার ‘আহলে বাইয়াত’ (আমার রক্তসম্পর্কীয় বংশধর) শব্দটিও উচ্চারণ করেছেন। কিন্তু বাংলায় প্রকাশিত বুখারী শরীফের সর্বশেষ সংস্করণে আহলে বাইয়াত বাদ দিয়ে সুন্নাহ শব্দটি সংযোজন করা হয়েছে। অথচ বুখারী শরীফের পঞ্চম খÐে শব্দটি ছিল। সেখানে এক পৃষ্ঠায় লেখা ছিল ‘আহলে বাইয়াত’ এবং অন্য পৃষ্ঠায় লেখা ছিল ‘কুরআন ও পরিজন।’

  আমরা কাকে অনুসরণ করবো এবং কাকে অনুসরণ করবো না, সূরা আল-আহযাবের ৩৩ নম্বর আয়াত পাঠ করলে স্পষ্ট হয়ে যায়। ‘আর আপনি আপনার পরিবারকে নামাজ আদায়ের আদেশ করুন।’ (সূরা ত্বহা, আয়াত-১৩২) আবু সাঈদ খুদরি থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রসূল (সা.) আট মাস ফজরের নামাজের সময় হযরত আলীর ঘরের দরজায় গিয়ে বলতেন: ‘নামাজের সময় হয়েছে। তোমাদের প্রতি আল্লাহ রহম করুন।’ তারপর তিনি এ আয়াত পাঠ করতেন: ‘হে নবী পরিবার! আল্লাহ কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পূর্ণরূপে পূত-পবিত্র রাখতে।’ (সূরা আল-আহযাব, আয়াত-৩৩)

  আহলে বাইয়াত কারা, এখানে তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে।  হযরত আলীর ঘরে তো রসূলের স্ত্রীগণ অবস্থান করতেন না। এই ঘর ছিল আহলে বাইয়াতের ঘর। এখানে বসবাস করতেন হযরত আলী, ফাতিমা, হাসান ও হোসেন। এ ঘরের বাসিন্দাদের প্রতি রসূল সালাম পাঠাতেন। অথচ আমরা তাদের বাদ দিয়ে এই ঘরের বাইরের লোকদের আনুগত্য ও অনুসরণ করে থাকি। কিন্তু ঘরের লোকদের কোনো খবর রাখি না। নিজেদের অজ্ঞতার কারণে এই ঘরের শত্রæদের দ্বীন ইসলামের অতি উচ্চস্তরে ঠাঁই দেয়া হচ্ছে।

  আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত বিশ্বাস করে যে, সাহাবীরা নিষ্পাপ। তাদের কোনো ভুল নেই। তাদের সব কার্যকলাপ ইজতেহাদ। ইজতেহাদী ভুল হলে এক সওয়াব এবং শুদ্ধ হলে দুই সওয়াব। হযরত আলীর বিরুদ্ধে সিফফিনে 

মুয়াবিয়ার যুদ্ধ এবং সিফফিন যুদ্ধে সাহাবী আম্মার ইবনে ইয়াসিরের মৃত্যুকে ইজতেহাদী ভুল হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। সারা দুনিয়া একমত যে, যুদ্ধ হলো সর্বোচ্চ মানের অপরাধ। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের অভিধানে যুদ্ধকে ইজতেহাদী ভুল হিসেবে গণ্য করা হয়। বুঝা যাচ্ছে যে, মুয়াবিয়াকে সব অপরাধের দায় থেকে নিষ্কৃতি দেয়ার জন্য ইজতেহাদ নামে একটি অস্ত্র আবিষ্কার করা হয়েছে। সাহাবীদের কথিত ইজতিহাদী ভুলে আমরা হারিয়েছি রসূলের নয়নের মণি ইমাম হাসান এবং ইমাম হোসেনকে। আরো হারিয়েছি হাজার হাজার মুসলিম বীরকে। সত্যি আমরা যেন এক মগের মুল্লুকে বসবাস করছি। যুদ্ধ এবং রক্তপাত ইজতিহাদী ভুল হয় কিভাবে? অথচ আমাদের আলেম-ওলামা ও মুফতিরা দিনরাত আমাদের তাই শোনাচ্ছেন।   

 আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত মুনাফিক এবং রসূলের হুকুম লংঘনকারীদের সাহাবী হিসেবে গণ্য করে এবং এ দলটি হচ্ছে রসূলের হুকুম লংঘনকারীদের রক্ষাকবচ। ইসলাম কখনো অন্যায়কারীদের ক্ষমা করে না। রসূলের সঙ্গে অন্যায় করলে তো প্রশ্নই উঠে না। রসূলের হুকুম লংঘনকারীদের স্বার্থে এবং তাদের রক্ষায় এ ধর্মমত গ্রহণ করা হয়েছে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের বেধে দেয়া শর্তের ব্যতিক্রম হলেই শিয়া রাফেজী। কি সাংঘাতিক কথা! আল্লাহ আমাদের মুসলমান পিতামাতার ঘরে মুসলমান পরিচয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। কিন্তু আবু বকর ও উমরের সমালোচনা করলে আমরা আর মুসলমান নই। আমরা রাফেজী। রাফেজী হিসেবে চিহ্নিত হওয়া মানে আমাদের হত্যা করলে জান্নাতে যাওয়া যাবে। এবার চিন্তা করুন কোথা থেকে আমরা কোথায় এলাম। আমাদের জন্ম হয়েছে মুসলমান হিসেবে। কিন্তু হয়ে গেলাম রাফেজী। বর্বররা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধর্ম ইসলামের জায়গায় কী অদ্ভুত ধর্ম চালু করেছে।

 ইসলাম বলছে, মুসলমান ছাড়া অন্য কোনো পরিচয় বহন করা যাবে না। মুসলিম পরিচয় ছাড়া অন্য কোনো পরিচয় ধারণ করলে অথবা দলে বা গোত্রে বিভক্ত হলে সরাসরি মুনাফিকদের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন: قُلْ يَـٰٓأَهْلَ ٱلْكِتَـٰبِ تَعَالَوْاْ إِلَىٰ كَلِمَةٍ سَوَآءِۭ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا ٱللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِۦ شَيْــًٔا وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِّن دُونِ ٱللَّهِ‌ۚ فَإِن تَوَلَّوْاْ فَقُولُواْ ٱشْهَدُواْ بِأَنَّا مُسْلِمُونَ
অর্থ: বলুন, হে আহলে কিতাবগণ, আমাদের ও আপনাদের মধ্যে একটি কথায় মতৈক্যে আসুন। আমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করব না এবং আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করব না। তার মধ্যে কিছুই নেই এবং আসুন আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে প্রভু হিসেবে গ্রহণ না করি। অতঃপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে বলুন, ‘সাক্ষী’ যে, আমরা মুসলমান (আত্মসমর্পণকারী)।
(উৎসঃ আল-কুরআন, স‚রা-আলে ইমরান, আয়াত-৬৪।) এই আয়াতে আল্লাহ তা’আলা স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, মুসলমান ছাড়া অন্য কোনো পরিচয় ধারণ করা যাবে না। আল্লাহ পাক আরও ইরশাদ করেছেন:
ان الذين فرقوا دينهم وكانوا شيعا لست منهم فى شنء انما أمرهم الى الله ثم ينبنهم بما كانوا يفعلون.--
অর্থ: নিশ্চয়ই যারা স্বীয় ধর্মকে খÐ বিখÐ করেছে এবং বহু দলে বিভক্ত হয়েছে তাদের সাথে আপনার (নবীজীর কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের বিষয়সমূহ (কর্ম) আল্লাহ তা‘য়ালার নিকট সমর্পিত (উত্থাপিত)। অতঃপর তিনি বলে দেবেন যা কিছু তারা করে থাকে। (উৎস: আল-কুরআন, সূরা-আনআম, আয়াত-১৫৯।)

   গাদিরে খুমে হযরত আলীকে মাওলা হিসেবে ঘোষণা দেয়ার পর অবতীর্ণ
সূরা মায়েদার তিন নম্বর আয়াতে বলা হয়, ‘আজ আমি তোমাদের ধর্মকে পূর্ণতা দিলাম। তোমাদের উপর আমার নিয়ামত পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে ইসলামকে (চির দিনের জন্য) মনোনীত করলাম।’ সূরা মায়েদার তিন নম্বর আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রোজ কিয়ামত পর্যন্ত আর কোনো ধর্মমত প্রচার করা যাবে না। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের প্রচার হচ্ছে সূরা মায়েদার তিন নম্বর আয়াতের পরিপন্থী। 

 আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত শুধু আহলে বাইয়াত নয়, হাদিস কিরতাসও মানে না। শুনতে চায় না। বছর দুয়েক আগে আলিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা আবদুর রশীদ মোহাম্মদপুরে এক অনুষ্ঠানে সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হাদিসে কিরতাস উল্লেখ করেছিলেন। এ হাদিস উল্লেখ করায় তাকে নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠে। তাকে ‘শিয়া’ আখ্যা দেয়া হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে তিনি প্রকাশ্যে তওবা করে ‘মুসলমান’ হন। মাওলানা আবদুর রশীদ শিয়াদের কিতাবের উদ্ধৃতি দিয়ে আলোচনা করলে তাকে দোষ দেয়া যেতো। কিন্তু তিনি বুখারী শরীফে জ্বল জ্বল করে দৃশ্যমান হাদিস উল্লেখ করেও বিপদে পড়েন। মাওলানা আবদুর রশীদের মতো হাজারো মাওলানা হাদিসে কিরতাস গোপন রাখার চেষ্টা করলেও সত্য তার আপন শক্তিকে প্রকাশিত হবে।

   রসূল (সা.) খুব শক্ত করে কুরআন ও আহলে বাইয়াতের মধ্যে গিঁট বেঁধে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, হাউসে কাউসারে আমার সঙ্গে মিলিত হওয়া নাগাদ তারা একে অন্য থেকে পৃথক হবে না। কিন্তু রসূলের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে হযরত আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.) এ গিঁট ভেঙ্গে ফেলেন এবং নেতা হিসেবে হযরত আলীর (রা.) মনোনয়ন ছুঁড়ে ফেলেন। হযরত আলীর (রা.) নেতৃত্ব অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে কার্যত ইসলামের মৃত্যুঘণ্টা বেজে যায়। সেদিন থেকে আমরা আতর গোলাপ দিয়ে ইসলামের লাশ বহন করছি।
 
 হযরত আলী সম্পর্কে যা কিছু বলা হবে সবগুলোকে কটাক্ষ করা হবে। বলবে, আপনি আলীকে নবী বানিয়ে ফেলেছেন। রসূল (সা.) হযরত আলীকে ভালোবাসার তাগিদ দিয়েছেন। বলেছেন, মুনাফিক ছাড়া কেউ আলীকে ঘৃণা করবে না এবং ঈমানদার ছাড়া কেউ আলীকে ভালোবাসবে না। রসূলের এ বাণী অনুযায়ী আমরা কি মুসলমান? হযরত আলীকে ঘৃণা করা এবং হযরত আলীর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা যেন আমাদের ঈমানী দায়িত্ব। আল্লাহ নবী ও ইমাম নিযুক্ত করেন। কেউ নিজেকে নবী বা ইমাম দাবি করতে পারে না। প্রাথমিকভাবে হযরত ইব্রাহিম (আ.) নবী ছিলেন। বহু ত্যাগ-তিতীক্ষার পর আল্লাহ তাকে ইমাম হিসেবে উন্নীত করেন। ইব্রাহিমের (আ.) দোয়ায় আল্লাহ রসূল (সা.) ও আহলে বাইয়াতকে ইমামত দান করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত: কতিপয় স্বার্থান্বেষী সাহাবী উম্মতের ঐকমত্যের নামে খিলাফত কায়েম করেন। 

  নামধারী সুন্নিরা যুক্তি দেয়, রসূল (সা.) হযরত আলীকে খিলাফত দিয়ে থাকলে তিনি পরবর্তী তিন খলিফার আনুগত্য স্বীকার করলেন কেন? কথায় যুক্তি আছে। এখন প্রশ্ন হলো হযরত আলী তিন খলিফার আনুগত্য স্বীকার করে নেয়ার পরও হযরত আলীর বিরুদ্ধে তথাকথিত মুসলমানরা তিনটি যুদ্ধ করলো কেন? আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত দাবি করছে, ইহুদি আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাহ নাকি শিয়া ধর্ম প্রচার করেছেন। তর্কের খাতিরে মেনে নেয়া যাক। ইহুদি আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাহর অনুসারী শিয়ারা হযরত আলীকে রসূলের উত্তরাধিকারী হিসেবে বিনা প্রশ্নে স্বীকৃতি দিচ্ছে। অন্যদিকে, রসূলের (সা.) একক উম্মতের দাবিদার কথিত সুন্নিরা হযরত আলীকে রসূলের উত্তরাধিকারী হিসেবে অস্বীকার করছে কেন? হিসাব তো মিলে না। রসূলের একক ও বিশুদ্ধ উম্মত হিসেবে দাবি করবেন।

 কিন্তু রসূলের মৌলিক সিদ্ধান্ত অমান্য করবেন তাতো হতে পারে না? আর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত যাকে ইহুদি বলছে সেই কথিত ইহুদিরা রসূলের সবগুলো মৌলিক সিদ্ধান্ত মান্য করে। আমাদের সামনে এসব প্রশ্নের পরিষ্কার জবাব থাকা দরকার। অগণিত সুন্নি জনতার আবেগ,অনুভূতি, দর্শন ও চিন্তাধারা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গাদিরে খুমে হযরত আলীকে উত্তরাধিকারী নিয়োগে রসূলের (সা.) মৌলিক সিদ্ধান্তের প্রতি বিশ্বাসী এবং আহলে বাইয়াতের প্রতি মহব্বত পোষণকারীরা শিয়া-রাফেজী বা কাফের হিসেবে গণ্য এবং আবু বকর ও উমরের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণকারীরা ‘মুসলমান।’ আমাদের সমাজে সাহাবী বিদ্বেষ নামে একটি পরিভাষা খুব চালু। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যারা মদিনার জান্নাতুল বাকিতে ১০ হাজার সাহাবীর কবর গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং অসংখ্য সাহাবীকে হত্যা করেছে তাদের কেউ সাহাবী বিদ্বেষী বলে না। শিয়ারা এ ঘৃণ্য কাজ করলে তাদের অস্তিত্ব পৃথিবীতে থাকতো কিনা সন্দেহ।

   আমরা আল্লাহতে বিশ্বাস করি, সর্বশেষ নবীতে বিশ্বাস করি, কুরআনে বিশ্বাস করি, আখেরাতে বিশ্বাস করি, তকদিরে বিশ্বাস করি, ফেরেশতায় বিশ্বাস করি, কিয়ামতে বিশ্বাস করি। কিন্তু আমাদের এসব মৌলিক বিশ্বাসে কিছু যায় আসে না। আমাদের এসব বিশ্বাস অচল। আমাদেরকে আবু বকর ও উমরের প্রতি ঈমান রাখতে হবে। বিশ্বাস করতে হবে যে, আবু বকর মানব জাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠ সন্তান, তিনি জীবিত অবস্থায় জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছিলেন, তিনি জান্নাতে পুরুষদের সরদার। দুনিয়ার সব মানুষের নেকী এক পাল্লায় তোলা হলে এবং আরেক পাল্লায় আবু বকরের নেকী তোলা হলে আবু বকরের নেকী বেশি হবে। তিনি সাহাবী। তার সমালোচনা করা যাবে না। তিনি আকাশের নক্ষত্রতুল্য। তার সমালোচনা করলে ঈমান চলে যাবে। 

 কিন্তু আমাদের পক্ষে তো ইসলামকে পরিবর্তন করার এ আয়োজন মেনে নেয়া সম্ভব নয়। ইতিহাসবিদরা ইতিহাস নিয়ে কাজ করেন। ইতিহাস চর্চা করেন। ইতিহাসে যার যার অবস্থান তুলে ধরেন। ইতিহাসবিদরা শুধু ইতিহাস চর্চা করেন তাই নয়, তাদের অনেকে মুসলমান। রস‚লের (সা.) সাথে তাদের সম্পর্ক আত্মার। রস‚লকে ভালোবেসে আমরা বড় হয়েছি। রস‚লের সুখ-দুঃখ আমাদের আলোড়িত করে। আমাদের কষ্ট দেয়। রস‚লের শত্রæকে আমরা আমাদের শত্রæ বলে মনে করি। রসূলের বন্ধুকে আমরা আমাদের বন্ধু বলে মনে করি। আমরা তো রসূলের প্রতি আমাদের দায়িত্ব পরিত্যাগ করে আবু বকর ও উমরের পক্ষ নিতে পারি না। ইতিহাসের পৃষ্ঠা উল্টালে আবু বকরের অবদান চোখে পড়ে। আবার রসূলের সাথে আবু বকরের গুরুতর অন্যায়ও চোখে পড়ে। 

   এখন সচেতন মানুষ হিসেবে আমাদের করণীয় কি? আমাদের করণীয় কি আবু বকরের অন্যায়কে সমর্থন দেয়া? আমরা কিভাবে বলবো যে, আবু বকর রসূলের লাশ জমিনের উপর রেখে রসূলের অনুমোদন ছাড়া খিলাফত গ্রহণে সাকিফা হাউসে গিয়ে উত্তম কাজ করেছেন? আমরা কিভাবে বলবো যে, আবু বকর রসূলের কলিজার টুকরো কন্যা হযরত ফাতিমার ফাদাকের জমি বাজেয়াপ্ত করে ভালো কাজ করেছেন? আবু বকর হযরত ফাতিমার কাছে সাক্ষী চেয়েছিলেন। কুরআনে যাদের সততার সাক্ষ্য দেয়া হয়েছে, তাদের কাছে কি সাক্ষী চাওয়া যায়? যাচাই বাছাই করার প্রয়োজন দেখা দিলে আগে আবু বকরের শ্রæত হাদিস যাচাই করা প্রয়োজন ছিল। অন্তত চার জন সাক্ষ্য দিলে একটি হাদিসকে বিশ্বাসে আনা যায়। আবু বকরের শ্রæত হাদিসের তো কোনো সাক্ষী ছিল না। সাক্ষী ছিলেন শুধু তিনি নিজে। নিজের শ্রæত হাদিসের জোরে তিনি কি হযরত ফাতিমাকে তলব করতে পারেন? বিচারে প্রতিষ্ঠিত রীতি হচ্ছে কেউ রাষ্ট্রের কাছে বিচার দাবি করলে শাসক অভিযুক্তকে তলব করতে পারেন। কিন্তু ফাদাকের জমি নিয়ে তো কেউ আবু বকরের কাছে অভিযোগ করেনি? তিনি নিজেই ছিলেন অভিযোগকারী। আবার রায়ও দিয়েছেন তিনি নিজে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন নজির কি আছে যে, অভিযোগকারী বিচারে রায় দিতে পারেন? আবু বকর এ অন্যায় করেছেন। আমরা কিভাবে বলবো যে, ফাদাকের জমি নিয়ে বিরোধে আবু বকর হযরত ফাতিমার বিরুদ্ধে রায় দিয়ে সঠিক কাজ করেছেন? রসূলের পরিবারের প্রতি আবু বকরের শত্রæতা স্পষ্ট বুঝা যায়। রসূল আবু বকর ও উমরকে বলকা অভিযানে যোগদানের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা অভিযানে যোগদান করেননি। তাহলে আমরা কিভাবে বলতে পারি যে, রসূলের হুকুম অমান্য করে তারা প্রশংসনীয় কাজ করেছেন? 

  হযরত উমর রসূলকে অছিয়তনামা লিখতে বাধা দিয়েছেন। তিনি রসূলের অনুমোদন ছাড়া হযরত আবু বকরকে খলিফা হিসেবে বরণ করেছেন। তাকে খোলাফায়ে রাশেদীনের জনক হিসেবে গণ্য করা হয়। রসূলের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ওহীর দরজা বন্ধ হয়ে যায় এবং কুরআনের কোনো সূরা বা আয়াত মানসুখ করার সুযোগও চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু হযরত উমর মুতা বিয়ে সংক্রান্ত সূরা নিসার ২৪ নম্বর আয়াতের কার্যকারিতা রহিত করেন। সাহাবী নন, দুনিয়ার সব মানুষ মিলেও কুরআনের একটি শব্দও পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে না। অসম্ভব হলেও হযরত উমর কুরআনের উল্লেখিত আয়াতের ব্যবহার বাতিল করে দিয়েছেন। তিনি ২০ রাকআত তারাবীহ নামাজ চালু করেছেন। আজান পরিবর্তন করেছেন। রসূলের ইন্তেকালের পর ব্যাপকভাবে ইসলামে পরিবর্তন আনা হয়। বুখারী শরীফের ৫০৫ নম্বর হাদিস তার প্রমাণ। এ হাদিসে বলা হয়: ‘আমর ইবনে যুরারা (রহ.) .... যুহরী (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি দামেশকে আনাস ইবনে মালিকের (রা.) নিকট উপস্থিত হলাম, তিনি তখন কাঁদছিলেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর যুগে যা কিছু পেয়েছি তার মধ্যে কেবলমাত্র নামাজ ছাড়া আর কিছুই বহাল নেই। কিন্তু নামাজকেও নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। বকর (রহ.) বলেন, আমার কাছে মুহাম্মাদ ইবনে বকর বুরসানী (র.) উসমান ইবনে আবু রাওওয়াদ (র.) সূত্রে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।
كتاب مواقيت الصلاة
باب تَضْيِيعِ الصَّلاَةِ عَنْ وَقْتِهَا
৫৩০ - حَدَّثَنَا عَمْرُو بْنُ زُرَارَةَ، قَالَ: أَخْبَرَنَا عَبْدُ الوَاحِدِ بْنُ وَاصِلٍ أَبُو عُبَيْدَةَ الحَدَّادُ، عَنْ عُثْمَانَ بْنِ أَبِي رَوَّادٍ، أَخِي عَبْدِ العَزِيزِ بْنِ أَبِي رَوَّادٍ، قَالَ: سَمِعْتُ الزُّهْرِيَّ، يَقُولُ: دَخَلْتُ عَلَى أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ بِدِمَشْقَ وَهُوَ يَبْكِي، فَقُلْتُ: مَا يُبْكِيكَ؟ فَقَالَ: ্রلاَ أَعْرِفُ شَيْئًا مِمَّا أَدْرَكْتُ إِلَّا هَذِهِ الصَّلاَةَ وَهَذِهِ الصَّلاَةُ قَدْ ضُيِّعَتْগ্ধ وَقَالَ بَكْرُ بْنُ خَلَفٍ: حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَكْرٍ البُرْسَانِيُّ، أَخْبَرَنَا عُثْمَانُ بْنُ أَبِي رَوَّادٍ نَحْوَهُ
 ইসলামকে এভাবে পরিবর্তনের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা নিজের বিবেকের কাছে কি উত্তর দেব? বরং রাফেজী হওয়া ভালো। কোনো মতেই আমাদের পক্ষে আবু বকর ও উমরের পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। তাহলে রসূলের প্রতি অন্যায় করা হবে। সারা দুনিয়া আমাদের বিপক্ষে গেলেও আমরা রসূলের বিপক্ষে যেতে পারি না। 
(লেখাটি আমার ‘আহলে বাইয়াত’ থেকে নেয়া।) 

খুঁজুন