শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
সুফিবাদ সাধনার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জন

সাধনার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জন

মাজহারুল ইসলাম মাসুম, সিনিয়র সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক :

মানুষ প্রধানতঃ দুটি আত্মার অধিকারী। একটি জীবাত্মা বা নফস যা মানব সৃষ্টির চার উপাদান আগুন, পানি, মাটি ও বায়ুর সমন্বয়ে সৃষ্ট এবং অপরটি পরমাত্মা বা রূহ যা মহান আল্লাহ্ হযরত আদম (আঃ)-এর মাঝে তাঁর রূহ থেকে ফুঁকে দিয়েছেন। আমরা সবাই হযরত আদম (আঃ)-এর সন্তান হিসেবে আমাদের মাঝেও রূহ বিদ্যমান। জীবাত্মা অত্যন্ত শক্তিশালী। এই জীবাত্মাই মহান আল্লাহ্ তায়ালার সত্তা রূহ্কে ধারণ করেছে। আর রূহই হচ্ছে মানুষের কাছে আল্লাহ্ পাকের আমানত। জীবাত্মা মূলত সচ্ছ ও পরিশুদ্ধ। কিন্তু এর কিছু শত্রু আছে যেগুলো নফসকে আক্রান্ত করে। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য এই ষড় রিপু নফসকে কলুষিত করে। যেমন জীবানুমুক্ত পানি পান করে জীবের জীবন রক্ষা পায়। যদি পানিতে বিষ মিশ্রিত হয় তখন পানি হয় বিষাক্ত। আর এই বিষাক্ত পানি পান করলে জীবের প্রাণনাশ হয়। তেমনি পরিশুদ্ধ জীবাত্মা যখন ষড়রিপু দ্বারা আক্রান্ত হয় তখন তা কলুষিত হয়ে যায় এবং দুনিয়ার লোভ আর ভোগ বিলাসে মত্ত হয়ে পাপাচারে লিপ্ত হয়ে পড়ে। অশান্তি সৃষ্টি হয় ব্যক্তি জীবন থেকে সামাজিক ও রাষ্ট্রিয় জীবন পর্যন্ত। কলুষিত নফস ধারী ব্যক্তি শান্তি ও ন্যায়ের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে অশান্তির পথে ধাবিত হয়। কাজেই জীবাত্মা যাতে ষড়রিপু দ্বারা আক্রান্ত হতে না পারে সেজন্যই আত্মশুদ্ধি লাভ করা প্রয়োজন। পরিশুদ্ধ জীবাত্মা হলো বাহন আর রূহ সোয়ারী। এই দুয়ে মিলে আত্মিক জগত ভ্রমণ করতে পারে এবং আত্মিক জগতের সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়। তাহলে প্রশ্ন জাগে, কি করে ষড়রিপুর আক্রমণ প্রতিরোধ করে জীবাত্মাকে পরিশুদ্ধ রাখা যায়। জীবাত্মাকে নফস নামেও অভিহিত করা হয়। হযরত রাসূল (সঃ) বলেছেন, “নফসের সাথে যুদ্ধ করাই প্রকৃত জেহাদতিনি আরো বলেন, “যে নিজকে (নিজের নফসকে) চিনতে পেরেছে, সে তার প্রভুকে চিনতে পেরেছেতাহলে আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে, হযরত রাসূলে পাক (সঃ)-এর শিক্ষা পদ্ধতি কি ছিল? তিনি কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না। সুদীর্ঘ ১৫ বছর হেরা পর্বতের নির্জন গুহায় ধ্যান সাধনা তথা মোরাকাবা করেছেন। মক্কা থেকে ৩ মাইল দূরে যে হেরা পর্বতের গুহা প্রায় পৌণে দুইশবছর পরও ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে, যেখানে উঠতে রাসূল (সঃ) প্রেমিকদের আজো হিমসিম খেতে হয়, সেই নির্জন মরু পাহাড়ের গুহায় তিনি যৌবনের ১৫ টি বছর ধ্যান সাধনায় কাটিয়েছেন। এই ধ্যান সাধনার বিদ্যার মাধ্যমেই তিনি তাঁর প্রভুর সন্ধান পেয়ে পবিত্র বাণী প্রাপ্ত হয়েছেন। পরবর্তীতে তিনি তাঁর অনুসারী তথা মুসলিমদেরকে সেই ধ্যান সাধনার বিদ্যাই শিক্ষা দিয়েছেন। আর ওই বিদ্যায় বিদ্বান হয়ে নিজেদের জীবাত্মা তথা নফসকে পরিশুদ্ধ করে (আত্মশুদ্ধি লাভ করে) মহান আল্লাহ্ ও হযরত রাসূল (সঃ)-এর প্রেমে দেওয়ানা হয়ে গিয়েছেন। সাহাবায়ে কেরাম কাফেরদের শত অত্যচার-নির্যাতন সহ্য করেছেন হাসিমুখে। তাঁরা নিজেদের ধন-সম্পদ, আত্মিয়-স্বজনের মায়া পরিত্যাগ করে রাসূল (সঃ)-এর প্রেমে জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে তাঁর সাথে মদিনায় হিযরত করেছেন। অসংখ্য সাহাবায়ে কেরাম রাসূল (সঃ)-এর নির্দেশে কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করে হাসিমুখে শহীদের মর্যাদা লাভ করেছেন। আমরা সেই সে জাতি, উম্মতে মোহাম্মদী, মোহাম্মদী ইসলামের অনুসারী। পরম সৌভাগ্য যে, আল্লাহ্ পাক আমাদেরকে দয়া করে উম্মতে মোহাম্মদীর মর্যাদা দান করেছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, যে শিক্ষায় নিজের জীবাত্মা বা নফসকে পরিশুদ্ধ করা যায়, যে শিক্ষায় আত্মশুদ্ধি লাভ করা যায়, সেই মোহাম্মদী ইসলামের শিক্ষা, ধ্যান সাধনার শিক্ষা, মোরাকাবার শিক্ষা আমরা হারিয়ে ফেলেছি। ফলে নফসের খায়েসে, শয়তানের ধোঁকায় পড়ে দুনিয়া লোভী হয়ে পাপাচারের মাধ্যমে যেমন নিজেদেরকে (জীবাত্মা বা নফসকে) কলুষিত করে অশান্তিতে ভুগছি, তেমনি আমাদের এমন কার্যাদিতে সমাজেও অশান্তি বাড়ছে। ধর্ম পালন করেও ধর্মের প্রকৃত স্বাদ বা ফল আমরা ভোগ করতে পারছিনা।

হযরত রাসূল (সঃ)-এর যুগে তাঁর কাছ থেকে সাহাবায়েকেরাম ধ্যান সাধনার বিদ্যার মাধ্যমে আত্মিক পরিশুদ্ধতা অর্জন করে ধর্ম পালন করতঃ শান্তির পধে চলার ক্ষমতা অর্জন করেছেন। এমনকি তাঁরা আত্মিক জগতের সাথে যোগাযোগ করতেও সক্ষম হয়েছেন। তাঁরা ছিলেন উজ্জল নক্ষত্র। আর তাঁরা তা করতে পেরেছেন, হযরত রাসূল (সঃ)-কে অনুকরণ ও অণুসরণ করে। পবিত্র হাদিসে হযরত রাসূল(সঃ) বলেছেন, “শরীয়ত আমার বাক্য(কথা), তরীকত আমার কাজ, হাকীকত আমার অবস্থা এবং মারেফাত আমার নিগুঢ় রহস্য।হযরত রাসূল (সঃ) তাঁর অনুসারীগণকে শরীয়ত, তরীকত, হাকীকত ও মারেফাতের বিদ্যা শিক্ষা দিয়েছেন। শরীয়ত যেমন দেহ পরিষ্কার করে তেমনি মারেফাত আত্মিক পরিশুদ্ধতা অর্জনে সহায়তা করে। হযরত রাসূল (সঃ)-এর ওফাত লাভের পর চার খলিফার যুগ পর্যন্ত হযরত রাসূল (সঃ)-এর মৌলিক শিক্ষা চালু ছিল। এজন্য ওই যুগকে ইসলামের স্বর্ণ যুগ বলা হতো। পরবর্তীতে বিশেষ করে কারবালা যুদ্ধের পর দুরাচার এজিদ ক্ষমতায় আসার পর থেকে ইসলাম হয়ে পড়ে শুধু শরীয়ত সর্বস্ব। বেলায়েতের যুগে যাঁরা এজিদের বিরুদ্ধাচরণ করেছেন, এজিদকে সমর্থন করেননি, তাঁরা ছিলেন মোহাম্মদী ইসলামের প্রকৃত ধারক ও বাহক। আর তাঁদের মাধ্যমেই দুনিয়াতে টিকে আছে প্রকৃত মোহাম্মদী ইসলামের শিক্ষা-এলমে শরীয়ত ও এলমে মারেফাত যা মানুষের বাহ্যিক ও আত্মিক পরিশুদ্ধতা আনয়ন করে। বেলায়েতের যুগে অসংখ্য অলী-আল্লাহ্, মোর্শেদ তথা পথপ্রদর্শক জগতে আগমন করেছেন, যাঁরা হযরত রাসূল (সঃ)-এর শিক্ষায় মানুষকে শিক্ষিত করেছেন। যাঁরা শরীয়ত, তরীকত, হাকীকত ও মারেফতের বিদ্যা শিক্ষা লাভ করে ধর্ম পালন করেছেন তাঁরাই সফলকাম হয়েছেন।

খুঁজুন