মাজহারুল ইসলাম মাসুম, সিনিয়র সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক :
হযরত বাবা ভান্ডারী
(রঃ) হচ্ছেন মাইজভান্ডার দরবার শরীফের দ্বিতীয় মহান ওলী। তিনি ১২৭০ সালের ২৭শে
আশ্বিন (মোতাবেক ১০ই অক্টোবর ১৮৬৫ইং এবং ১২ই জামাদিউসসানী ১২৭০ হিজরী) সোমবার ভোর
বেলা চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি থানার অন্তর্গত মাইজভান্ডার গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর পিতার নাম সৈয়দ আবদুল করিম শাহ সাহেব এবং মাতার নাম সৈয়দা মুশাররফজান বেগম
সাহেবা। তিনি হযরত গাউছুল আজম শাহ সুফী সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডার (রঃ)- এর আপন
ভাতষ্পুত্র। তাঁর জন্মের অব্যবহিত পর নবজাত শিশু অবস্থায় তাঁকে দেখে তাঁর
আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীগণ আনন্দে পুলকিত হয়ে মন্তব্য করেছিল, “এ
শিশু মানব নয়, বরং একজন সম্মানিত ফেরেশতা। আমরা এরূপ সুন্দর ছেলে কখনও দেখিনি।
নিশ্চই ইনি কালে একজন উচ্চ মর্যাদার ওলী হবেন” হযরত বাবা ভান্ডারী
(রঃ)-এর শিক্ষা জীবন শুরু হয় তাঁর বাড়ীর আঙ্গিনায় সে সময়ে বিদ্যমান একটি ফোরকানীয়া
মাদ্রাসায়। ফোরকানীয়া মাদ্রাসাটির শিক্ষক ছিলেন একজন অভিজ্ঞ আলেম ও ধর্ম পরায়ণ
লোক। মাদ্রাসা শিক্ষক হযরত বাবা ভান্ডারী (রঃ)-এর পিতাকে একদিন ডেকে বললেন, “আপনার
এ শিশু সন্তানকে পাঠ আরম্ভ করে দিন, কালে ইনি একজন আদর্শ পুরুষ হবেন এবং তাঁর
প্রেমের স্পর্শে এসে মাটির মানুষ সোনায় পরিণত হবে।
দুনিয়াব্যাপী তাঁর
নামের ডঙ্কা বাজবে” শিক্ষকের মন্তব্য শুনে বাবা ভান্ডারী (কঃ)-এর পিতা মুগ্ধ হয়ে যান
এবং তিনি বাবা ভান্ডারী (কঃ)-কে প্রথম পাঠদান করার জন্য হযরত গাউছুল আজম শাহ সুফী
সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (কঃ) সমীপে নিয়ে যান। হযরত আকদাছ (কঃ) বাবা
ভান্ডারী (কঃ) কে শিক্ষার্থীর বেশে দেখে মৃদু হাসলেন এবং বললেন “তুমি
কালামুল্লাহ পড়বে? আচ্ছা পড় দেখি” অতপর হযরত আকদাছ (কঃ) পবিত্র কোরআন মজিদ থেকে কিছু আয়াত পাঠ করেন
এবং মিলাদ শরীফ পড়ে খোদার দরবারে ভান্ডারী (কঃ)-এর জন্য মুনাজাত করেন। হযরত আকদাছ
(কঃ)-এর অনুমোদন পেয়ে হযরত বাবা ভান্ডারী (কঃ) উক্ত ফোরকানীয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে
যান এবং পড়াশুনা শুরু করে দেন। মাদ্রাসায় ভর্তি হলে কি হবে? হযরত বাবা ভান্ডারী
(কঃ) এর ঝোঁক ছিল সর্বদা হযরত আকদাছ (কঃ)-এর সান্নিধ্য লাভের প্রতি। তিনি প্রায়শঃ
হযরত আকদাছ (কঃ)-এর সান্নিধ্যে থাকতে ভালবাসতেন। যদি কখনও তা সম্ভব না হতো তবে
একাকী ধ্যানমগ্ন থাকতেন। । তিনি মাঠে গরু চরাতেন। গরু চরানোর মধ্যে তাঁর একটি
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছিল। তিনি গরুকে বলতেন “দেখ!
ফসল নষ্ট করিস না” গরু দিব্যি বাধ্যগত দাসের মত তাঁর কথা মান্য করত। গরুর জমির আলের
উভয় পার্শ্বের ঘাস খেয়ে উদর পূর্ণ করত, কিন্তু ফসলের ক্ষতি করত না।
ছোটবেলা থেকেই তিনি
নামাজ, রোজা ও কোরআন পাঠে নিজেকে সদাসর্বদা নিয়োজিত রাখতেন।
তিনি প্রতিনিয়ত
তাহাজজুদ নামাজও আদায় করতেন। লেখাপড়ায় তিনি ছিলেন মাদ্রাসার সেরা ছাত্র। মোহছেনীয়অ
মাদ্রাসায় পড়ার সময় তিনি জায়গীর (লজিং) থাকতেন। জায়গীর থাকাকালে শেষ রাতে
চট্টগ্রাম “বহদ্দার মসজিদ” এ সাদা কাপড় পরিহিত সুফিগণের জামাতে তাঁকে বহুবার ইমামতি করতে
দেখা গেছে বলে প্রতক্ষদর্শীরা বর্ণনা করেছেন।
হযরত বাবা ভান্ডারী
(কঃ) যখন ২৩ বৎসর বয়সে পদার্পণ করেন তখন থেকে তিনি সংসার জীবনের প্রতি নিরাসক্ত
হয়ে পড়েন। সংসারের দিকে তার মনোযোগ আকর্ষন করার জন্য তাঁর পিতামাতা ফটিকছড়ি থানার
সুয়াবিল গ্রাম নিবাসী সৈয়দ কমর চাঁদ শাহ (রঃ)-এর বংশধর আলহাজ্ব সৈয়দ আশরাফ আলী
আল-হাছনী সাহেবের প্রথমা কন্যা মোছাম্মৎ জেবুন্নেছা বেগমের সাথে তাঁকে এ সময়ে
বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করান। কিন্তু বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন।
এক অভিনব ব্যাপার ঘটল তাঁর ২৫ বৎসর বয়সে পদার্পণ করার পর। এ সময় তিনি জমাতে উলার
ফাইনাল পরীক্ষার্থী। পরীক্ষা দিতে যাবার পূর্বে হযরত আকদাছ (কঃ)-এর অনুমতি জন্য
তিনি দরবার শরীফে এলেন। কিন্তু বেশ কয়েকদিন অতিবাহিত হবার পরও হযরত আকদাছ (কঃ)-এর
সাথে কথা বলার তাঁর সুযোগ হল না; অথচ হযরত আকদাছ (কঃ)-এর অনুমতি ছাড়া তিনি পরীক্ষা
দিতে কিছুতেই যাবেন না। অগত্যা পরীক্ষার তারিখ ঘনিয়ে আস, তখন সকলের চাপে পড়ে তিনি
সৈয়দ মোহাম্মদ হাসেম (তাৎর ভ্রাতা) এবং হযরত আকদাছ (কঃ)-এর পুত্র সৈয়দ ফজলুল হক
সাহেবকে সাথে নিয়ে হযরত আকদাছ (কঃ) এর অনুমতির নিতে যান। হযরত আকদাছ (তঃ) তখন
দরবার শরীফের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত কাটাখালী নামক খালের তীরে সরিষা ক্ষেতের ধারে
তাঁর অনুগত শিষ্যদের উপবিষ্ট ছিলেন।
হযরত বাবা ভান্ডারী (কঃ) মস্তক নত করে দাঁড়িয়ে
আছেন। হযরত আকদাছ (কঃ) অপলক নেত্রে হযরত বাবা ভান্ডারী (কঃ)-এর দিকে চেয়ে রইলেন
এবং জজবা হালে অনেক কিছু বললেন। হযরত আকদাছ (কঃ)-এর জজবা অবস্থায় উচ্চারিত এ সকল
কথার মর্মার্থ সাধারণের বোধগম্য হলনা। কিছুক্ষন পর আকদাছ (কঃ) স্বাভাবিক অবস্থায়
ফিরে এলেন এবং বললেন “তোমার পরীক্ষা হয়ে গেছে, বাছা। আমি তোমাকে নাজিরহাটস্থ আশরাফ আলী
খলিফার দোকানে খেয়ে মসজিদে থাকতে বলি” কিন্তু এতে সৈয়দ
মোহাম্মদ হাসেম ছাহেব পরিতৃপ্ত হলেন না। তিনি হযরত আকদাছ (কঃ) কে বললেন, তাঁর
(হযরত বাবা ভান্ডারী) যে পরীক্ষা হযরত আকদাছ (কঃ), তাঁকে শহরে যেতে হবে”
এতে হযরত আকদাছ বললেন “যাও! তুমি ও ফয়জুল হক মিঞা আমার হুজরার তাকের উপর হতে পীরানে পীরের
হরিণী আবাটি (চৌগা) শীঘ্রই নিয়ে আস”। তারা তাঁর আদেশ মত
তাই করলেন। হযরত আকদাছ (কঃ) উক্ত হরিনী আবাটি (এক প্রকার জুব্বা) নিজে পরিধান
করলেন। কিছুক্ষন পর তিনি উহা খুলে হযরত বাবা ভান্ডারী গায়ে পরিয়ে দিলেন এবং শহরে
যাবার অনুমতি দিলেন। বলাবাহুল্য, এটি ঐতিহাসিক ঘটনা। কারণ এর মাধ্যমে তিনি তাঁর
ফয়েজ রহমত বাবা ভান্ডারী (কঃ) কে বর্ষণ করলেন এবং মহান ওলীর সনদ প্রদান করলেন।
এভাবে যিনি মহান ও অনন্ত পরীক্ষায় পাশ করলেন, তাঁর সীমিত পার্থিব পরীক্ষায় পাশের
প্রয়োজন ফুরিয়ে গেল। তিনি পরীক্ষার হলে জমাতে উলা ফাইনাল পরীক্ষা দিতে গেলেন। কোন
মতে দু’দিন পরীক্ষা দিলেন। পরীক্ষার তৃতীয় দিনে আধ্যাত্মিক আগনের দহনে
তিনি আর স্থির থাকতে পারলেন না। কাগজ কলম সব ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে জজবা হালে অনেক
দুর্বোধ্য কথা বললে এবং গজল গাওয়া শুরু করলেন। শিক্ষক ও হলের সকল পরীক্ষার্থীগণ
হতভম্ব হয়ে গেলো। এরূপ একজন নামীদামী ছাত্র পরীক্ষা দেবেনা এ কেমনতর কথা। শিক্ষক ও
সহপাঠিগণ তাঁকে অনেক বুঝালেন। কিন্তু কোন কাজ হল না। দুনিয়া তাঁর কাছে তখন অতি
তুচ্ছ, অতি নগণ্য।
তিনি শুধু তকন অন্তরে তাঁর প্রমাস্পদকেই দেখছেন। প্রেমাস্পকেই
উদ্দেশ্য করে তিনি বলতে থাকলেন, “এসেছেন আপনি? এসেছেন? আপনি কষ্ট স্বীকার করে কেন এসেছেন? আমি মাথায়
ভর দিয়ে হেঁটে আপনার খেদমতে হাজির হতাম” এরূপ বলতে বলতে তিনি
অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। তাঁর পরীক্ষা পর্ব এখানেই শেষ হয়। তারপর তাঁকে পরীক্ষা হল থেকে
জায়গীর বাড়ী এবং জায়গীর বাড়ী থেকে দরবার শরীফে নিয়ে আসা হয়। এ ঘটনার সাথে হযরত
আকদাছ (কঃ)-এর আধ্যাত্মিক যোগসূত্র অপূর্ব। হযরত বাবা ভান্ডারী যখন পরীক্ষার তৃতীয়
দিনে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করে উক্তরূপ ঘটনা করছিলেন, তখন হযরত আকদাছ (কঃ) হযরত
বাবা ভান্ডারী (রঃ)-এর জোষ্ঠ্য ভ্রাতা সৈয়দ গোলাম ছোবহান সাহেবকে ডেকে বললেন, “মিঞা,
আমি হ্জ্বে যেতে চাই। আমার সারাটা বাগান খুঁজেও একটি গোলাপ ফুল পেলাম না”।
হজ্বে যাবার অর্থ পরলোক গনের ইঙ্গিত বুঝতে পেরে হযরত গোলাম ছোবহান সাহেব কেঁদে
ফেললেন এবং বললেন, “হুজুর, আপনার খাদের গোলামুর রহমান সাহেব (রঃ) শহরে আছেন। তাকে
আপনার খেদমতে হাজির করব কি? হযরত আকদাছ (কঃ) বললেন, “তাঁকে
বাড়িতে আনলে ভাল হয়।
সৈয়দ গোলামুর রহমান বাবাজান কেবলা রহঃ জীবনী দর্পণ
সৈয়দ গোলামুর রহমান বাবাজান কেবলা রহঃ জীবনী দর্পণ
মাজহারুল ইসলাম মাসুম, সিনিয়র সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক : হযরত বাবা ভান্ডারী (রঃ) হচ্ছেন মাইজভান্ডার দরবার শরীফের দ্বিতীয় মহান ওলী। তিনি ১২৭০ সালের ২৭শে আশ্বিন (মোতাবেক ১০ই অক্টোবর ১৮৬৫ইং এবং ১২ই জামাদিউসসানী ১২৭০ হিজরী) সোমবার ভোর বেলা চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি থানার অন্তর্গত মাইজভান্ডার গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সৈয়দ আবদুল করিম শাহ সাহেব এবং মাতার নাম সৈয়দা মুশাররফজান বেগম সাহেবা। তিনি হযরত গাউছুল আজম শাহ সুফী সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডার (রঃ)- এর আপন ভাতষ্পুত্র। তাঁর জন্মের অব্যবহিত পর নবজাত শিশু অবস্থায় তাঁকে দেখে তাঁর আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীগণ আনন্দে পুলকিত হয়ে মন্তব্য করেছিল, “এ শিশু মানব নয়, বরং একজন সম্মানিত ফেরেশতা। আমরা এরূপ সুন্দর ছেলে কখনও দেখিনি। নিশ্চই ইনি কালে একজন উচ্চ মর্যাদার ওলী হবেন” হযরত বাবা ভান্ডারী (রঃ)-এর শিক্ষা জীবন শুরু হয় তাঁর বাড়ীর আঙ্গিনায় সে সময়ে বিদ্যমান একটি ফোরকানীয়া মাদ্রাসায়। ফোরকানীয়া মাদ্রাসাটির শিক্ষক ছিলেন একজন অভিজ্ঞ আলেম ও ধর্ম পরায়ণ লোক। মাদ্রাসা শিক্ষক হযরত বাবা ভান্ডারী (রঃ)-এর পিতাকে একদিন ডেকে বললেন, “আপনার এ শিশু সন্তানকে পাঠ আরম্ভ করে দিন, কালে ইনি একজন আদর্শ পুরুষ হবেন এবং তাঁর প্রেমের স্পর্শে এসে মাটির মানুষ সোনায় পরিণত হবে।দুনিয়াব্যাপী তাঁর নামের ডঙ্কা বাজবে” শিক্ষকের মন্তব্য শুনে বাবা ভান্ডারী (কঃ)-এর পিতা মুগ্ধ হয়ে যান এবং তিনি বাবা ভান্ডারী (কঃ)-কে প্রথম পাঠদান করার জন্য হযরত গাউছুল আজম শাহ সুফী সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (কঃ) সমীপে নিয়ে যান। হযরত আকদাছ (কঃ) বাবা ভান্ডারী (কঃ) কে শিক্ষার্থীর বেশে দেখে মৃদু হাসলেন এবং বললেন “তুমি কালামুল্লাহ পড়বে? আচ্ছা পড় দেখি” অতপর হযরত আকদাছ (কঃ) পবিত্র কোরআন মজিদ থেকে কিছু আয়াত পাঠ করেন এবং মিলাদ শরীফ পড়ে খোদার দরবারে ভান্ডারী (কঃ)-এর জন্য মুনাজাত করেন। হযরত আকদাছ (কঃ)-এর অনুমোদন পেয়ে হযরত বাবা ভান্ডারী (কঃ) উক্ত ফোরকানীয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে যান এবং পড়াশুনা শুরু করে দেন। মাদ্রাসায় ভর্তি হলে কি হবে? হযরত বাবা ভান্ডারী (কঃ) এর ঝোঁক ছিল সর্বদা হযরত আকদাছ (কঃ)-এর সান্নিধ্য লাভের প্রতি। তিনি প্রায়শঃ হযরত আকদাছ (কঃ)-এর সান্নিধ্যে থাকতে ভালবাসতেন। যদি কখনও তা সম্ভব না হতো তবে একাকী ধ্যানমগ্ন থাকতেন। । তিনি মাঠে গরু চরাতেন। গরু চরানোর মধ্যে তাঁর একটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছিল। তিনি গরুকে বলতেন “দেখ! ফসল নষ্ট করিস না” গরু দিব্যি বাধ্যগত দাসের মত তাঁর কথা মান্য করত। গরুর জমির
আলের উভয় পার্শ্বের ঘাস খেয়ে উদর পূর্ণ করত, কিন্তু ফসলের ক্ষতি করত না।ছোটবেলা থেকেই তিনি নামাজ, রোজা ও কোরআন পাঠে নিজেকে সদাসর্বদা নিয়োজিত রাখতেন।তিনি প্রতিনিয়ত তাহাজজুদ নামাজও আদায় করতেন। লেখাপড়ায় তিনি ছিলেন মাদ্রাসার সেরা ছাত্র। মোহছেনীয়অ মাদ্রাসায় পড়ার সময় তিনি জায়গীর (লজিং) থাকতেন। জায়গীর থাকাকালে শেষ রাতে চট্টগ্রাম “বহদ্দার মসজিদ” এ সাদা কাপড় পরিহিত সুফিগণের জামাতে তাঁকে বহুবার ইমামতি করতে দেখা গেছে বলে প্রতক্ষদর্শীরা বর্ণনা করেছেন। হযরত বাবা ভান্ডারী (কঃ) যখন ২৩ বৎসর বয়সে পদার্পণ করেন তখন থেকে তিনি সংসার জীবনের প্রতি নিরাসক্ত হয়ে পড়েন। সংসারের দিকে তার মনোযোগ আকর্ষন করার জন্য তাঁর পিতামাতা ফটিকছড়ি থানার সুয়াবিল গ্রাম নিবাসী সৈয়দ কমর চাঁদ শাহ (রঃ)-এর বংশধর আলহাজ্ব সৈয়দ আশরাফ আলী আল-হাছনী সাহেবের প্রথমা কন্যা মোছাম্মৎ জেবুন্নেছা বেগমের সাথে তাঁকে এ সময়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করান। কিন্তু বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। এক অভিনব ব্যাপার ঘটল তাঁর ২৫ বৎসর বয়সে পদার্পণ করার পর। এ সময় তিনি জমাতে উলার ফাইনাল পরীক্ষার্থী। পরীক্ষা দিতে যাবার পূর্বে হযরত আকদাছ (কঃ)-এর অনুমতি জন্য তিনি দরবার শরীফে এলেন। কিন্তু বেশ কয়েকদিন অতিবাহিত হবার পরও হযরত আকদাছ (কঃ)-এর সাথে কথা বলার তাঁর সুযোগ হল না; অথচ হযরত আকদাছ (কঃ)-এর অনুমতি ছাড়া তিনি পরীক্ষা দিতে কিছুতেই যাবেন না। অগত্যা পরীক্ষার তারিখ ঘনিয়ে আস, তখন সকলের চাপে পড়ে তিনি সৈয়দ মোহাম্মদ হাসেম (তাৎর ভ্রাতা) এবং হযরত আকদাছ (কঃ)-এর পুত্র সৈয়দ ফজলুল হক সাহেবকে সাথে নিয়ে হযরত আকদাছ (কঃ) এর অনুমতির নিতে যান। হযরত আকদাছ (তঃ) তখন দরবার শরীফের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত কাটাখালী নামক খালের তীরে সরিষা ক্ষেতের ধারে তাঁর অনুগত শিষ্যদের উপবিষ্ট ছিলেন। হযরত বাবা ভান্ডারী (কঃ) মস্তক নত করে দাঁড়িয়ে আছেন। হযরত আকদাছ (কঃ) অপলক নেত্রে হযরত বাবা ভান্ডারী (কঃ)-এর দিকে চেয়ে রইলেন এবং জজবা হালে অনেক কিছু বললেন। হযরত আকদাছ (কঃ)-এর জজবা অবস্থায় উচ্চারিত এ সকল কথার মর্মার্থ সাধারণের বোধগম্য হলনা। কিছুক্ষন পর আকদাছ (কঃ) স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলেন এবং বললেন “তোমার পরীক্ষা হয়ে গেছে, বাছা। আমি তোমাকে নাজিরহাটস্থ আশরাফ আলী খলিফার দোকানে খেয়ে মসজিদে থাকতে বলি” কিন্তু এতে সৈয়দ মোহাম্মদ হাসেম ছাহেব পরিতৃপ্ত হলেন না। তিনি হযরত আকদাছ (কঃ) কে বললেন, তাঁর (হযরত বাবা ভান্ডারী) যে পরীক্ষা হযরত আকদাছ (কঃ), তাঁকে শহরে যেতে হবে” এতে হযরত আকদাছ বললেন
“যাও! তুমি ও ফয়জুল হক মিঞা আমার হুজরার তাকের উপর হতে পীরানে পীরের হরিণী আবাটি (চৌগা) শীঘ্রই নিয়ে আস”। তারা তাঁর আদেশ মত তাই করলেন। হযরত আকদাছ (কঃ) উক্ত হরিনী আবাটি (এক প্রকার জুব্বা) নিজে পরিধান করলেন। কিছুক্ষন পর তিনি উহা খুলে হযরত বাবা ভান্ডারী গায়ে পরিয়ে দিলেন এবং শহরে যাবার অনুমতি দিলেন। বলাবাহুল্য, এটি ঐতিহাসিক ঘটনা। কারণ এর মাধ্যমে তিনি তাঁর ফয়েজ রহমত বাবা ভান্ডারী (কঃ) কে বর্ষণ করলেন এবং মহান ওলীর সনদ প্রদান করলেন। এভাবে যিনি মহান ও অনন্ত পরীক্ষায় পাশ করলেন, তাঁর সীমিত পার্থিব পরীক্ষায় পাশের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেল। তিনি পরীক্ষার হলে জমাতে উলা ফাইনাল পরীক্ষা দিতে গেলেন। কোন মতে দু’দিন পরীক্ষা দিলেন। পরীক্ষার তৃতীয় দিনে আধ্যাত্মিক আগনের দহনে তিনি আর স্থির থাকতে পারলেন না। কাগজ কলম সব ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে জজবা হালে অনেক দুর্বোধ্য কথা বললে এবং গজল গাওয়া শুরু করলেন। শিক্ষক ও হলের সকল পরীক্ষার্থীগণ হতভম্ব হয়ে গেলো। এরূপ একজন নামীদামী ছাত্র পরীক্ষা দেবেনা এ কেমনতর কথা। শিক্ষক ও সহপাঠিগণ তাঁকে অনেক বুঝালেন। কিন্তু কোন কাজ হল না। দুনিয়া তাঁর কাছে তখন অতি তুচ্ছ, অতি নগণ্য। তিনি শুধু তকন অন্তরে তাঁর প্রমাস্পদকেই দেখছেন। প্রেমাস্পকেই উদ্দেশ্য করে তিনি বলতে থাকলেন, “এসেছেন আপনি? এসেছেন? আপনি কষ্ট স্বীকার করে কেন এসেছেন? আমি মাথায় ভর দিয়ে হেঁটে আপনার খেদমতে হাজির হতাম” এরূপ বলতে বলতে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। তাঁর পরীক্ষা পর্ব এখানেই শেষ হয়। তারপর তাঁকে পরীক্ষা হল থেকে জায়গীর বাড়ী এবং জায়গীর বাড়ী থেকে দরবার শরীফে নিয়ে আসা হয়। এ ঘটনার সাথে হযরত আকদাছ (কঃ)-এর আধ্যাত্মিক যোগসূত্র অপূর্ব। হযরত বাবা ভান্ডারী যখন পরীক্ষার তৃতীয় দিনে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করে উক্তরূপ ঘটনা করছিলেন, তখন হযরত আকদাছ (কঃ) হযরত বাবা ভান্ডারী (রঃ)-এর জোষ্ঠ্য ভ্রাতা সৈয়দ গোলাম ছোবহান সাহেবকে ডেকে বললেন, “মিঞা, আমি হ্জ্বে যেতে চাই। আমার সারাটা বাগান খুঁজেও একটি গোলাপ ফুল পেলাম না”। হজ্বে যাবার অর্থ পরলোক গনের ইঙ্গিত বুঝতে পেরে হযরত গোলাম ছোবহান সাহেব কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, “হুজুর, আপনার খাদের গোলামুর রহমান সাহেব (রঃ) শহরে আছেন। তাকে আপনার খেদমতে হাজির করব কি? হযরত আকদাছ (কঃ) বললেন, “তাঁকে বাড়িতে আনলে ভাল হয়।
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
১৫২/২, এ-২ গ্রীন রোড, রওশন টাওয়ার (লিফটের-৫),
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ । মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত