সামাজিক মাধ্যম বর্তমানে হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অপরিহার্য অংশ। অনেকেরই দিনের বড় একটি অংশ কাটে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রলিং করে। সোশ্যাল মিডিয়া হলো এমন একটি প্ল্যাটফর্ম যেখানে মানুষ একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের পাশাপাশি নিজস্ব ছবি, ভিডিও ও মতামত তুলে ধরার সুযোগ রাখে। সকালে ঘুম থেকে উঠে রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত আমরা কোনো না কোনোভাবে সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে যুবক-যুবতীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ দিন দিন ঝুঁকে পড়ছে সোশ্যাল মিডিয়ার দিকে, ডুবে যাচ্ছে যান্ত্রিকতার গভীরতায়। নিজের অজান্তেই ব্যয় করছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ক্রমেই বেড়ে চলেছে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর সংখ্যা। কেউ সময় কাটাতে আবার কেউ প্রয়োজনের খাতিরে সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে যেমনÑ ফেসবুক, টুইটার, টিকটক, লিঙ্কডইন কিংবা ইনস্টাগ্রামে বিচরণ করেন। বর্তমানে বিশ্বে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৪.৭০ বিলিয়ন, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৫৯ শতাংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর মধ্যে ফেসবুকের জনপ্রিয়তা এখন আকাশছোঁয়া। বিশ্বে প্রায় ২.৯৩ বিলিয়ন মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করেন। ফেসবুকের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে ফেসবুক, টুইটার, টিকটক, লিঙ্কডইন, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপসহ অন্য অ্যাপগুলো ব্যবহারকারীর সংখ্যা।
বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের প্রাদুর্ভাব বেশি লক্ষ করা যায়। সাধারণত ১৬-২৪ ও ১৮-২৯ বছর বয়সীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় সবচেয়ে বেশি আসক্ত ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। তারা দিনের বেশির ভাগ সময়ই সোশ্যাল মিডিয়ার পেছনে ব্যয় করেন। যার ফলে তারা নিজেদের অজান্তেই হারিয়ে যাচ্ছেন ভার্চুয়াল জগতে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে সমাজ থেকে। ২০১৮ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা গড়ে ১৪৪ মিনিট সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যয় করে থাকেন। অথচ গবেষকরা বলেছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় দৈনিক ৩০ মিনিট ব্যয় মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সর্বোত্তম।
অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ফলে নষ্ট হয় সময়, তৈরি হয় বিষণ্নতা, মানুষ ডুবে যায় হতাশার সাগরে। তাছাড়া নানারকম ভ্রান্ত ধারণা, গোপনীয়তা লঙ্ঘন, গুজবের ফলে সৃষ্টি হচ্ছে নিত্যনতুন অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। মানুষের মধ্যে বাড়ছে আতঙ্ক। মানুষ ভুগছে নিরাপত্তাহীনতায়। যার ফলে যেমন একাকিত্বের সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি বেড়েই চলেছে নানা ধরনের অপরাধ। ইন্টারনেটে অনেক অশ্লীল প্রচারণায় মানুষের নৈতিক চরিত্রের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী প্রায় ১০ শতাংশ কিশোর-কিশোরী সোশ্যাল মিডিয়ায় সাইবার বুলিং হওয়ায় অভিযোগ করেন। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের বিপথগামী হওয়ার আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে। ঢাকার সাইবার ক্রাইম ডিভিশনের মতে, ১৪-২২ বছর বয়সীদের মধ্যে ৮০% ভুক্তভোগী নারী।
অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ফলে প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে মানুষের মধ্যে মানসিক চাপ। নিজের পোস্ট করা জিনিসটা অন্যদের কাছে কতটুকু সাড়া ফেলল, কতজন কমেন্ট করল কিংবা লাইক দিল; মনের মাঝে এই কৌতূহল কাজ করে সারাক্ষণ। অনেক সময় নেতিবাচক মন্তব্যের ফলে কমে যায় আত্মবিশ্বাস। দেখা দেয় উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা। নিজের অজান্তেই সৃষ্টি হয় মানসিক চাপ, তৈরি হয় এক ধরনের অস্থিরতা। কমে যায় ব্রেইনের কার্যক্ষমতা। আমেরিকান জার্নাল অব প্রিভেনটিভ মেডিসিন-এর প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী দিনে পাঁচ ঘণ্টার বেশি যারা বিভিন্ন সাইটগুলোতে সময় কাটান, তাদের ২.৮ শতাংশ বেশি সম্ভাবনা থাকে অন্তত ছয় মাসের মধ্যে মানসিক অবসাদে ভোগার।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রায় ১০-১৩% কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে প্রবলেম্যাটিক সোশ্যাল-মিডিয়া ব্যবহার দেখা যায়। যার মধ্যে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের হার বেশি। ২০১৭ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৪৩ ভাগ আমেরিকান ক্রমাগত সোশ্যাল মিডিয়ায় আবিষ্ট থাকেন। যাদের মাঝে ২০ ভাগ মানুষের মানসিক অবসাদের উৎস হচ্ছে এই সোশ্যাল মিডিয়া। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত স্ক্রলিংয়ের ফলে ডিপ্রেশন ও আত্মহত্যার হার ২-৩ গুণ বেড়ে যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ধরনের আসক্তিকে ড্রাগ বা অ্যালকোহলের সঙ্গে তুলনা করা হয়। কারণ উভয় ক্ষেত্রেই মানুষের মস্তিষ্কে ডোপামিনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। ফলে ক্রমেই বাড়তে থাকে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতি মানুষের আসক্তি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রায় ১০-১৩% কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে প্রবলেম্যাটিক সোশ্যাল-মিডিয়া ব্যবহার দেখা যায়। যার মধ্যে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের হার বেশি। ২০১৭ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৪৩ ভাগ আমেরিকান ক্রমাগত সোশ্যাল মিডিয়ায় আবিষ্ট থাকেন। যাদের মাঝে ২০ ভাগ মানুষের মানসিক অবসাদের উৎস হচ্ছে এই সোশ্যাল মিডিয়া। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত স্ক্রলিংয়ের ফলে ডিপ্রেশন ও আত্মহত্যার হার ২-৩ গুণ বেড়ে যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ধরনের আসক্তিকে ড্রাগ বা অ্যালকোহলের সঙ্গে তুলনা করা হয়। কারণ উভয় ক্ষেত্রেই মানুষের মস্তিষ্কে ডোপামিনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। ফলে ক্রমেই বাড়তে থাকে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতি মানুষের আসক্তি।
প্রযুক্তির উৎকর্ষে আমরা অনেক উন্নতির পথে যাত্রা শুরু করলেও অবক্ষয় হচ্ছে নৈতিকতার। তাই যান্ত্রিকতার সাগরে না ডুবে সবার উচিত সোচ্চার হওয়া। নয়তো মারাত্মক ব্যাধির মতো এটিও এক ভয়াবহ অবস্থায় রূপ ধারণ করবে। তাই প্রযুক্তির এই উৎকর্ষকে লাগাতে হবে মানুষের কাজে। মানুষের হতে হবে এর নিয়ন্ত্রক। নৈতিকতার চর্চা ও বিকাশ হতে হবে সবার মূল মন্ত্র। তবেই এর অভিশাপের রেশ কাটিয়ে আমরা ফিরে যেতে পারব স্বাভাবিক জীবনে।
তাওবা আক্তার সারিকা : শিক্ষার্থী, ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজ, ঢাকা