শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
সুফিবাদ সুফিবাদ বা সুফী দর্শন একটি ইসলামি আধ্যাত্মিক দর্শন

সুফিবাদ বা সুফী দর্শন একটি ইসলামি আধ্যাত্মিক দর্শন

সুফি তথা সুফিজমের উৎপত্তি নিয়ে রয়েছে একাধিক মত। সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে ‘সুফ’ তথা ছাগল বা ভেড়ার লোম থেকে সুফি নামটি এসেছে । কেউ কেউ বলেন ‘সাফি’ অর্থাৎ ময়লা পরিষ্কারক থেকে সুফি কথাটি এসেছে। আরবি ‘সাফা’ (পবিত্র) শব্দ থেকে সুফি শব্দটির উৎপত্তি বলে গণ্য করা হয়ে থাকে। বস্তুত: অন্তরের ময়লাকে পরিষ্কার করার লক্ষ্যেই সুফিরা নিজেদের নিয়োজিত রাখেন।
সুফিবাদ (সুফীবাদ বা সুফী দর্শন ) একটি ইসলামি আধ্যাত্মিক দর্শন। আত্মা সম্পর্কিত আলোচনা এর মুখ্য বিষয়। আত্মার পরিশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনই হলো এই দর্শনের মর্মকথা। পরম সত্তা মহান আল্লাহ কে জানার এবং আকাঙ্খা মানুষের চিরন্তন। স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে আধ্যাতিক ধ্যান ও জ্ঞানের মাধ্যামে জানার প্রচেষ্টাকে সূফী দর্শন বা সূফীবাদ বলা হয়। হযরত ইমাম গাজ্জালী(রঃ) মতে, " মন্দ সবকিছু থেকে আত্মাকে প্রবিত্র করে সর্বদা আল্লাহর আরাধনায় নিমজ্জিত থাকা এবং সম্পূর্ন রূপে আল্লাহতে নিমগ্ন হওয়ার নামই সূফী বাদ। আত্মার পবিত্রতার মাধ্যমে ফানাফিল্লাহ (আল্লাহর সঙ্গে অবস্থান করা) এবং ফানাফিল্লাহর মাধ্যমে বাকাবিল্লাহ (আল্লাহর সঙ্গে স্থায়িভাবে বিলীন হয়ে যাওয়া) লাভ করা যায়। যেহেতু আল্লাহ নিরাকার, তাই তাঁর মধ্যে ফানা হওয়ার জন্য নিরাকার শক্তির প্রতি প্রেমই একমাত্র মাধ্যম। মহব্বতের মাধ্যমে নিজের অস্তিত্বকে বিলীন করে দিয়ে আল্লাহর অস্তিত্বে লীন হয়ে যাওয়া। যাকে মনছুর হাল্লাজ (র.) পরিণত করেছিলেন ‘ফানা ফিল্লা’তে।
যে মতবাদ ধর্মের গতানুগতিকতাকে প্রশ্রয় না দিয়ে হৃদয়ের উপলব্ধি দিয়ে বিচার করে, সেটাই সুফিবাদ। হজরত জুনাইদ বোগদাদি (র.)। সুফিবাদকে তিনি অভিহিত করেছেন ‘নিজের অজ্ঞতার উপলব্ধি’ বলে। অজ্ঞতা বলতে বলে হচ্ছে বিশালত্ব, তথা আল্লাহকে জানার ও তাঁকে চেনার ব্যাপারে অজ্ঞতা। কীভাবে তাঁকে চেনা যাবে? ভক্তি দিয়ে, প্রেম দিয়ে। এই প্রেমের অন্য নামই তো সুফিবাদ। আর এই প্রেমের সাধকরাই সুফি সাধক।
অনেকে নবী পাক (স.)’র মাধ্যমে সুফিজমের প্রারম্ভ বলতে চেয়েছেন। এর পক্ষে যৌক্তিকতা হল নবী পাক (স.) নবুওয়্যাত প্রাপ্তির আগে পবিত্র কাবার প্রায় ৫ কি.মি. দূরত্বে গারে হেরায় আল্লাহ পাকের ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। এখানেই পবিত্র কুরআনের প্রথম শব্দ "ইকরা" নাযিল হয়। এক মতে হযরত হাসান আল বসরী (রহ.) সর্বপ্রথম সুফি বলে গণ্য করেন।
অবশ্য আরেক মত হচ্ছে পবিত্রআসহাব-ই-সুফফা অর্থাৎ বারান্দার এ সাহাবাগণের আদর্শই সুফিরা গ্রহণ করেছিলেন এবং সূফফা থেকে সুফি শব্দটি নেয়া হয়েছে। রাসুল(সাঃ) মদিনায় হিজরতের পরে মসজিদে নববীর বারান্দায় একটা ছাউনির নিচে সাহাবাদের জন্য ধ্যান বা মোরাকাবার ব্যবস্থা করেছিলেন। এখানে বসে হজ্ব ও ওমরায় আসা নবীর আশেকরা কুরআন পাঠ, নফল নামাজ, ধ্যান বা মোরাকাবা, দরুদ ও মিলাদ শরীফ পড়ে থাকেন। ছাউনি শব্দটা থেকেই এসেছে সুফি শব্দটা। তাঁরা সেখানে থাকতেন সংসার তথা যাবতীয় কিছু ত্যাগ করে। তাঁরা লোমের কম্বল এবং পোশাক ব্যবহার করতেন । নিচে থাকতেন। ছাউনি শব্দটা থেকেই এসেছে সুফি শব্দটা। তাঁরা সেখানে থাকতেন সংসার তথা যাবতীয় কিছু ত্যাগ করে। তাঁরা লোমের কম্বল এবং পোশাক ব্যবহার করতেন । ওই সাহাবিগণ ব্যবসা-বাণিজ্য-চাষাবাদ কিছু করতেন না, এমনকি থাকতেন না পরিবারের সাথেও। মক্কা - মদিনা অথবা যেখানেরই অধিবাসী হোন না কেন- যারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রেমে নিবেদিত ও সমর্পিত হয়েছিলেন তাঁরাই এসে থাকতেন ওই তিনদিক খোলা ছাউনির তলায়। পুরো দলের মধ্যে হয়ত দু-চারজন কাঠ কাটতে গেলেন, বিক্রি করে সবার জন্য দু-চার টুকরা করে রুটির জোগান দেবেন- বাকিরা ওই ছাউনিতেই। রাসূলের গোলামিতে। তাঁর পায়ের তলায়। দিন নেই, রাত নেই। গ্রীষ্ম-শীত-ধূলিঝড় নেই। তাঁদের না আছে এক টুকরা বাড়তি কাপড়, না একটা বাক্স-পেঁটরা। দাঁড়াতে পারেন না, অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান- এই এঁরাই আবার কী করে যেন রাতের পর রাত পার করে দেন সালাতে। দয়ার সাগর রাসূল (সাঃ) তাঁদের ছাড়া খাবেন না। বসবেন না। উঠবেন না। এই আসহাবে সুফফারা দিনের পর দিন রোজা রেখে রাতের পর রাত কুরআন তিলাওয়াত ও আধ্যাত্ম্যসাধনায় এমন মগ্ন ছিলেন, যে ইসলামের ব্যবহারিক প্রকৃত রূপ হিসাবে তাঁদের দেখেই মানুষ দলে দলে শামিল হত। এসে পড়ত তাদের পান্ডিত্য দেখে, মোহ- বরজনের আজব মোহ দেখে। এভাবে যারা করেছেন, তারাই শুধু সুফী নন। ইসলামের পূরো রীতিটা যেই অনুসরণ করেন, শেষতক তিনিই সুফী।
রাসূল সাল্লাল্লাহ্’র সময়কালের অনেক আগে আসহাবে ক্বাহাফ বা গুহাবাসী ধ্যানীদের কথা তুলে আল্লাহ্ সূরা কাহাফে বলছেন, হে প্রিয়, আপনিতো দেখেছেন ওই গুহাবাসীদের কোন দিক দিয়ে সূয্য উঠে আসত আর ছায়া পড়ত কত লম্বা...
একই কাহিনি আমরা পাই তূর পাহাড়ে। সুফিদের মতে, আমাদের দৃশ্যমান জগৎ অবাস্তব, একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই বাস্তব।

খুঁজুন