শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
সুফিবাদ সূফীবাদের দৃষ্টিতে শরীয়ত ও ত্বরীক্বতের মধ্যে সম্পর্ক কি

সূফীবাদের দৃষ্টিতে শরীয়ত ও ত্বরীক্বতের মধ্যে সম্পর্ক কি

মাজহারুল ইসলাম মাসুম, সিনিয়র সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক :

সূফীগণ সব সময় শরীয়ত ও ত্বরীক্বতকে ওতপ্রোতভাবে জড়িত মনে করেন।এই দাবির সমর্থনে কয়েকটি প্রমাণ পেশ করছি। "মিরকাত শরহে মিশকাতের" ১ম খণ্ড ২৫৬ পৃষ্ঠায় আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী রহমাতুল্লাহি তা'য়ালা আলাইহি লিখেন- ইমাম মালেক ইবনে আনাছ রাদ্বিয়াল্লাহু তা'য়ালা আনহু বলেন-


من تفقه ولم يتصوف فقد تفسق ومن تصوف ولم يتفقه فقد

تزندق ومن جمع بينهما فقد تحقق


উচ্চারণঃ মান তাজাক্কাহা ওয়ালাম ইয়াতা মাউওয়াফ ফাক্বাদ তাফাচ্ছাক্বা ওয়া মান তাসাউওয়াফা ওফা লাম ইয়াতা ফাক্বক্বাহ ফাক্বাদ তাযানদাক্বা ওয়া মান জামাআ বাইনাহুমা ফাক্বাদ তাহাক্ব ক্বাক্বা।


অর্থাৎ, যে ব্যক্তি ফিকহ অর্জন করেছে তবে তাসাউফের দীক্ষায় দীক্ষিত হয়নি,সে ফাসেক।আর যে ব্যক্তি তাসাউফ অর্জন করেছে ঠিক,কিন্তু ফিকহের প্রতি উদাসীন্য প্রদর্শন করেছে,সে জিনদিক বা ধর্মহীন হয়ে গেছে।পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি উভয়টাকে একত্র করতে পেরেছে,সে প্রকৃত সত্য পেয়েছে।


আর "রিসালাতুল কুশাইরিয়্যাহ এর ৪৩ পৃষ্ঠায় ইমাম আবুল কাশেম আল-কুশাইরী লিখেন-


 كل شريعة غير مؤيدة بالحقيقة غير مقبول وكل حقيقة غير مقيدة

لشريعة فغير يحصول


উচ্চারণঃ কুল্লু শরীয়াতিন গাইরু মুআই-য়াদাতিন বিল হাক্বীক্বাতি গাইরু মাকবূলিন ওয়া কুল্লু হাক্বীক্বাতিন গাইরু মুক্বাইয়াদাতিন লি শারীয়াতিন ফাগাইরু- মাহসূলিন।


অর্থাৎ, যে শরীয়তকে ত্বরীক্বত সমর্থন করেনা, তা অগ্রহণযোগ্য। আর ত্বরীক্বত অর্থাৎ, যে যদি শরীয়ত কর্তৃক সংরক্ষিত না হয়,তাহলে ত্বরীক্বত অনর্জিতই থেকে যায়।


"মিরকাত শরহে মিশকাত” গ্রন্থে আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী রহমাতুল্লাহি তা'য়ালা আলাইহি লিখেন, শায়খ আবু তালেব মক্কী "কুয়্যাতুল কুলুব" কিতাবে শরীয়ত ও ত্বরীক্বত প্রসঙ্গে লিখেন- 


هما علمان اصليان لا يستغنى احد هما عن الآخر بمنزلة الاسلام والايمان مرتبط كل منهما بالآخر كالجسم والقلب لا ينفك احد

عن صاحبه


উচ্চারণঃ হুমা ইলমানি আসলিয়ানি লা-ইয়াস তাগনী- আহাদুহুমা আনিল আখিরি বি-মানযিলা তিল ইসলামি ওয়াল ঈমানি মুরাত তাবাতুন কুললু মিনহুমা বিল- আখিরি কাল জিসমি ওয়াল ক্বলবি লা-ইয়ান ফিকু আহাদুন আন সাহিবিহি।


অর্থাৎ, এই দুইটি এমন এলেম যার একটি অন্যের থেকে অমুখাপেক্ষী হতে পারে না যেমন ঈমান ও ইসলাম গভীরভাবে সম্পর্কিত।অথবা যেমন শরীর আর আত্মা, একটা আরেকটা হতে কখনো আলাদা হতে পারে না।


ইমাম গাযযালী রহমাতুল্লাহি তা'য়ালা আলাইহি তো এ বিষয়ে 'আল-মুনকিয মিনাদ দালালাহ' নামে একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থও রচনা করেছেন।তিনি তাঁর বিশ্ব বিখ্যাত গ্রন্থ ইহয়াউ উলুমুদ্বীন' এ 'সূফীদের কর্মপন্থা বিশুদ্ধ হওয়ার প্রমাণ' নামে এক অধ্যায়ে এই দাবির সমর্থন করেছেন।


শরীয়ত ও ত্বরীক্বত পরস্পর অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত হওয়া এবং সূফীদের পন্থা বিশুদ্ধ হওয়ার প্রমাণ পেশ করার পর ইমাম গাযযালী রহমাতুল্লাহি তা'য়ালা আলাইহি 'ইহয়াউ উলুমুদ দ্বীন' ৩য় খণ্ড ২০-২১ পৃষ্ঠায় লিখেন-


لو جمع كل ما ورد فيه من الآيات والاخبار والآثار مخرج عن الحصر


উচ্চারণঃ লাও জামায়া কুললু মা উরিদা ফিহি মিনাল আয়াতি ওয়াল আখবারি ওয়াল আছারি লিখুরুজি আনিল হাছারি।


অর্থাৎ, যদি এ বিষয়ে আয়াত,হাদীস,এবং সাহাবাদের আছারকে একত্র করা যায়,তাহলে তার সিলসিলা অগণিত হয়ে যাবে।


শাইখুল ইসলাম যাকারিয়া আনসারী রহমাতুল্লাহি তা'য়ালা আলাইহি বলেন,


الشريعة ظاهر الحقيقة والحقيقة باطن الشريعة وهما متلازمتان لا

يتم احدهما الا الآخر


উচ্চারণঃ আশশারীয়াতু জাহিরুল হাক্বীক্বাতি ওয়াল হাক্বীক্বাতু বাতিনুশ-শরীয়াতি ওয়া হুমা মুতালা যিমাতানি লা-ইয়াতিমমু আহাদুহুমা ইল্লাল আখির।


অর্থাৎ, শরীয়ত হলো ত্বরীক্বতের বাহ্যিক রূপ।আর ত্বরীক্বত হলো শরীয়তের অভ্যন্তরীণ রূপ।এদের একটি অপরটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।একটি আরেকটি ছাড়া কখনো পরিপূর্ণ হতে পারে না। (শরহর রিসালাতুল কুশাইরিয়্যাহ ৪৩ পৃষ্ঠা) শাইখুল ইসলাম আল্লামা প্রফেসর ড. তাহের আল কাদেরী হাফেজাহুল্লাহ 'হাকীকতে তাসাউফ' কিভাবে ঈকাযুল হিমম ১ খণ্ড ৮ পৃষ্ঠার বরাত দিয়ে লিখেন- শাইখ যারদাক রহমাতুল্লাহি তা'য়ালা আলাইহি বলেন,


النسبة التصوف من الدين نسبة الروح من الجسد


উচ্চারণঃ লি নিসবাতিত তাসাউওয়াফি মিনাদ দ্বীনি নিসবাতুর রুহি মিনাল জাসাদি।


অর্থাৎ, শরীরে রূহের যে স্থান,ধর্মে তাসাউফের সেই স্থান।বিশ্ব বিখ্যাত ফতওয়ায়ে শামী ৩য় খণ্ড ৩০৩ পৃষ্ঠা আল্লামা শামী রহমাতুল্লাহি তা'য়ালা লিখেন-


 الطريقة والشريعة متلازمتان لان الطريق الى الله لها ظاهرها

وباطنها فظاهرها الشريعة والطريقة وباطنها الحقيقة


উচ্চারণঃ আত্ ত্বরীক্বাতু ওয়াশ শারীয়াতু মুতালা যিমাতানি লি আন্নাত ত্বরীক্বা ইলাল্লাহি লাহা জাহিরুহা ওয়া বাতিনুহা ফাজাহিরুহা আশ শারীয়াতু ওয়াত ত্বারীক্বাতু ওয়া বাতিনুহা আল হাক্বীক্বাতু।


অর্থাৎ, শরীয়ত ও ত্বরীক্বত পরস্পর অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত,কারণ আল্লাহর পক্ষ থেকে রাস্তার একটি বহিরঙ্গ আছে,আরেকটি অন্তরঙ্গ রয়েছে।বহিরঙ্গ হলো শরীয়ত ও ত্বরীক্বত এবং অন্তরঙ্গ হলো হাকীকত।


আল্লাহ তা'য়ালা "সূরা আনকাবুত" এর ৬৯ নং আয়াতে ইরশাদ করেন-


وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِيْنَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا


উচ্চারণঃ ওয়াল্লাজীনা জাহাদূ ফীনা লা-নাহদিয়ান্নাহুম সুবুলানা।


অর্থাৎ- যারা আমার সন্তুষ্টির পথে সাধনায় আত্মনিয়োগ করে,আমি অবশ্যই তাঁদেরকে আমার পথে পরিচালিত করব।


সুতরাং বুঝা গেলো,শরীয়ত হলো সাধনা করা।পথ প্রাপ্তি ও প্রত্যক্ষ দর্শন হলো ত্বরীক্বত।অন্য ভাষায়, বাহ্যিক রূপের অন্তর্লোকীয় পথ প্রদর্শন হলো ত্বরীক্বত। তাই সাধনা না করলে প্রত্যক্ষ দর্শন কিভাবে হবে! শরীয়ত ছেড়ে দেয়া হলে ত্বরীক্বত অর্জিত হওয়ায় কোনো অর্থই হয় না,কারণ উভয়টা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

[email protected] 

খুঁজুন