মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
শাহজালাল বিমানবন্দরে মিথ্যা ঘোষণায় আনা বিপুল পরিমাণের ল্যাপটপ ও ট্যাব জব্দ ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ অ্যাপে অভিযোগ: চসিকের উচ্ছেদ অভিযান ভাষা শিখে বিনা খরচে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের জাপানে চাকরির সুযোগ : মাহদী আমিন চট্টগ্রাম বন্দরে নিলাম-অযোগ্য ১২৬ কনটেইনার পণ্য ধ্বংস করা হচ্ছে জিম্বাবুয়ে টি-টোয়েন্টি দলে ফিরলেন ক্রিমার মহানবীর (সা.) আদর্শে হিংসা-বিদ্বেষ পরিহারের আহ্বান রাষ্ট্রপতির কিউট-বিএসপিএ স্পোর্টস কার্নিভাল ২০২৬ শুরু মহানবীর (সা.) আদর্শ অনুসরণে শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট খেলবে বাংলাদেশ : ডি ভিলিয়ার্স রদ্রিকে না পেলেও স্কোয়াড নিয়ে সন্তুষ্ট মরিনহো
অর্থ ও বাণিজ্য ৪ লবিস্টের পকেটে ৪ হাজার কোটি
এপিএম-লালদিয়া টার্মিনাল চুক্তি

৪ লবিস্টের পকেটে ৪ হাজার কোটি

চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল ডেনমার্কের কোম্পানি ‘এপিএম টার্মিনালস’কে দেওয়ার চুক্তির পেছনে বড় ধরনের দুর্নীতি ও কমিশন বাণিজ্যের তথ্য সামনে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, কোনো রকম দরকষাকষি ছাড়াই দেশের স্বার্থ বিকিয়ে চুক্তিটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। আর এর বিনিময়ে বিডার পরিচালক আশিক চৌধুরী এবং অন্তর্বর্তী সরকারের ড. ইউনুসের বিশেষ দূত লুতফে সিদ্দিকি, সাখাওয়াত হোসেন (সাবেক নৌ উপদেষ্টা) এবং রিয়ার এডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামান (চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান) বাংলাদেশি এই চারজন লবিস্ট কমিশন হিসেবে পকেটে পুরেছেন প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা।

সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে বন্দর প্রশাসন পর্যন্ত এই চার ব্যক্তির সিন্ডিকেট কীভাবে একটি বিদেশি কোম্পানির স্বার্থ রক্ষা করেছে, তা নিয়ে এখন তোলপাড় চলছে। বাণিজ্য নিউজের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই চুক্তিটি দ্রুত গতিতে অনুমোদন করিয়ে নেওয়ার পেছনে অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত ও প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা চার ব্যক্তির সরাসরি ভূমিকা চিহ্নিত করা গেছে:

১. লুতফে সিদ্দীকী (প্রধান উপদেষ্টার সাবেক বিশেষ দূত): চুক্তির পেছনে মূল পলিসি-লবিস্ট হিসেবে কাজ করার অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে। বিদেশি বিনিয়োগ টানার দোহাই দিয়ে সরকারি নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে চুক্তিটি দ্রুত পাস করিয়ে নিতে তিনি প্রধান অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেন।

 ২. আশিক চৌধুরী (বিডার চেয়ারম্যান): বিনিয়োগ বোর্ডের (বিডা) শীর্ষ পদে থেকে চুক্তিটির দরকষাকষির মূল পথ সুগম করেন। আন্তর্জাতিক সংস্থা আইএফসি (IFC) যেখানে দরকষাকষির জন্য অন্তত ৬২ দিন সময় চেয়েছিল, সেখানে আশিক চৌধুরীর হস্তক্ষেপে পুরো প্রক্রিয়া মাত্র ১৩ দিনে শেষ করা হয়।

 ৩. সাখাওয়াত হোসেন (সাবেক নৌ উপদেষ্টা): উপদেষ্টা পদে থাকাকালীন মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায় থেকে এই চুক্তির প্রশাসনিক ও নীতিগত অনুমোদন দেন। জাতীয় স্বার্থের তোয়াক্কা না করে তড়িঘড়ি বাস্তবায়নের পথ মসৃণ করার অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে।

 ৪. মনিরুজ্জামান (চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান): বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রধান হিসেবে চুক্তির খসড়া প্রণয়ন, গোপন এনডিএ (নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট) রক্ষা এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক ক্ষতি নিশ্চিত করে চুক্তিতে সই করার প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। প্রকল্পের ব্যয়ের হিসাব দেখলেই এই লুটপাটের প্রমাণ মেলে। সমান ক্ষমতার পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) তৈরি করতে সরকারের খরচ হয়েছিল মাত্র ১ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। অথচ লালদিয়া টার্মিনালের ব্যয় দেখানো হয়েছে ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা (৫৫০ মিলিয়ন ডলার)। পোর্ট এন্ড টার্মিনাল বিশেষজ্ঞদের মতে,চট্টগ্রামের বন্দরের লালদিয়ার চরে কন্টেইনার টার্মিনাল বানাতে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা লাগবে। তাহলে বাকি ৪ হাজার কোটি টাকা কোথায় যাবে? এই বিশাল অঙ্কটিই বিদেশি কোম্পানির মাধ্যমে দেশে-বিদেশে লবিস্ট ফি, ঘুষ এবং কমিশন হিসেবে ভাগাভাগি হয়ে সংশ্লিষ্টদের পকেটে গেছে ও ধাপে ধাপে যাবে বলে বাণিজ্য নিউজ এর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।

 চুক্তির ধারাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সব মিলিয়ে প্রায় ৪৮ বছরের জন্য এই চুক্তিটি করা হয়েছে। দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে দেশীয় আয় বিদেশে পাচারের একটি প্রাতিষ্ঠানিক পথ তৈরি করা হয়েছে এই চুক্তিতে। এই চুক্তিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (CPA পাবে প্রতি TEU (Twenty-foot Equivalent Unit) কনটেইনারে ২১ মার্কিন ডলার - প্রথম ৮ লাখ TEU পর্যন্ত: প্রতি TEU = ২১ ডলার ৮ লাখের বেশি হলে (৯ লাখ TEU পর্যন্ত): প্রতি TEU = ২৩ ডলার ৯ লাখ TEU অতিক্রম করার পর প্রতি TEU = ১০ ডলার। বার্ষিক হিসেবে বন্দরের আয় হবে মাত্র ১৬.৮ মিলিয়ন ডলার।

 এপিএম বিদেশে নিয়ে যাবে ৯০ মিলিয়ন ডলার প্রায় (১১৩ ডলার হিসেবে)। এছাড়া ট্যারিফ বাড়িয়ে তারা তাদের লাভ কয়েকগুণ করে ফেলতে পারে। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনালে প্রতি TEU কনটেইনারে বন্দর কর্তৃপক্ষের গ্রস রেভিনিউ ১৬২ মার্কিন ডলার। কিছু খরচ বাদ দিলে নিট প্রফিট হয় ১০৪ থেকে ১০৯ ডলার। গড়ে ১০৬ ডলার নিট আয় ধরলে এখানে বন্দরের বার্ষিক আয় হয় প্রায় ১৩৭.৮ মিলিয়ন ডলার। যেখানে লঅলদিয়া ও নিউমুরিংয়ের আয়ের পার্থক্য ১২১ মিলিয়ন ডলার প্রায়। অর্থাত বন্দরের আর্থিক লোকসান প্রায় ১২১ মিলিয়ন ডলার। লজিস্টিক্স ও বন্দর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২ থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেই এই টার্মিনাল নির্মান করতে পারতেন এবং তাদের সেই আর্থিক সক্ষমতাও রয়েছে।

 ৩ বছর বলা হলেও ৫ বছর সময় লাগলেও বছরে মাত্র ৫০০ কোটি টাকা খরচ হতো বন্দর কর্তৃপক্ষের। যেখানে বন্দরে এ চেলতি বছরেই নিট আয় হয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। যার ফলে বন্দরের বার্ষিক ১২৯ মিলিয়ন ডলার শুধু কন্টেইনার হ্যান্ডেলিং বাবদ আয় হতো (১৬২ ডলার হিসেবে)। কিন্তু এখন এই আয়ের প্রায় পুরোটাই নিয়ে যাবে বিদেশী এপিএম টার্মিনালস। চুক্তির ৩য় স্ল্যাব অনুযায়ী, কন্টেইনার হ্যান্ডলিং বছরে ৯ লাখ টিইইউস পার হলেই বন্দরকে দেওয়া হবে প্রতি কন্টেইনারে মাত্র ১০ ডলার নির্ধারণ করায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী ৫০ শতাংশের বেশি এবং বাংলাদেশে আগত জাহাজের ৭০ শতাংশ মায়ারস্ক লাইনের হওয়ায় এই টার্মিনাল চালু করার অল্পদিনের মধ্যে এতে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং স্বাভাবিকভাবেই ৯ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। ফলে প্রতি কন্টেইনারে থেকে যাওয়া বাকি অন্তত ১১৩ ডলার সরাসরি এপিএম টার্মিনালস ও তাদের স্থানীয় পার্টনারদের মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়ে যাবে।

 অথচ বর্তমানে এ সম্পূর্ণ আয় বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে থাকে। বিশ্বব্যাপী এ ধরনের ইজারা চুক্তি সাধারণত ১৫-২০ বছরের জন্য হলেও লালদিয়ার ক্ষেত্রে তা করা হয়েছে ৪৮ বছরের (৩ বছর তৈরি+ ৩০ বছর অপারেশন + ১৫ বছর এক্সটেনশন)। অপারেশনের মাত্র ৫ বছরে যেখানে কোম্পানির মূল বিনিয়োগ উঠে আসবে, সেখানে বাকি ৪০ বছর ধরে চট্টগ্রাম বন্দরের রাজস্ব লুট করার আইনি অধিকার তুলে দেওয়া হয়েছে এক বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে। এদিকে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, আওয়ামীলীগের শেখ পরিবারের লোক কিউএনএস লিমিটেডের মালিক নুরুল কাইয়ুম খানকে এই চুক্তির লোকাল পার্টনার বানিয়ে পুনর্বাসিত করা হয়েছে। যে লুটপাটকারীদের তাড়াতে দেশের মানুষ র-ক্ত দিল, সেই চোরদের সাথেই গোপন আঁতাত করে নীতি-নৈতিকতার বুলি দেওয়া লবিস্টরা নিজেরা পকেট ভারী করলেন। লালদিয়া চুক্তি কেবল একটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়, এটি দেশের বন্দর খাতকে পঙ্গু করে দেওয়ার এক পরিকল্পিত চক্রান্ত।

 সাবেক উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন, লুতফে সিদ্দীকী, আশিক চৌধুরী এবং বন্দর চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান—এই চারজনের সিন্ডিকেট দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের বাণিজ্যিক সার্বভৌমত্বকে বিকিয়ে দিয়ে নিজেদের আখের গুছিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, অবিলম্বেই এই চুক্তি বাতিল করে একটি স্বাধীন ফরেনসিক অডিটের আওতায় এই চারজনের আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখা অতীব প্রয়োজন।

খুঁজুন