শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
কৃষি বিষমুক্ত কৃষিতে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা জরুরি

বিষমুক্ত কৃষিতে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা জরুরি

 নিরাপদ ও বিষমুক্ত খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বা ইন্টিগ্রেটেড পেস্ট ম্যানেজমেন্ট (আইপিএম) প্রযুক্তির ব্যাপক সম্প্রসারণ জরুরি বলে মনে করছেন কৃষি গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণে গত কয়েক দশকে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বেড়েছে। নির্বিচারে ও মাত্রাতিরিক্ত বালাইনাশক ব্যবহারের ফলে ফসলে ক্ষতিকর রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ বা রেসিডিউ থেকে যাচ্ছে। একই সঙ্গে মাটি, পানি ও বায়ু দূষিত হওয়ার পাশাপাশি উপকারী পোকামাকড়, জলজ প্রাণী ও মাছসহ জীববৈচিত্র্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষতিকর পোকা ও রোগবালাই দমনে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি রাসায়নিক বালাইনাশক প্রয়োগ করলে অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফলের পরিবর্তে উল্টো ক্ষতি হতে পারে। অননুমোদিত ও ভুল মাত্রায় বালাইনাশক ব্যবহারে পোকামাকড়ের প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। কৃষকদের অনেকেই বালাইনাশকের সঠিক মাত্রা, প্রয়োগের সময় ও নিরাপদ ব্যবহারের নিয়ম সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না রাখায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএইউ) কীটতত্ত্ব বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান এবং বর্তমানে সিটি ইউনিভার্সিটির কৃষি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. খন্দকার শরিফুল ইসলাম বাসসকে বলেন, পোকা-মাকড় ও রোগবালাই দমনে বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক, ছত্রাকনাশক ও অন্যান্য বালাইনাশক নিয়মিত ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব রাসায়নিক ব্যবহারের পর ফসল ও খাদ্যদ্রব্যে এর অবশিষ্টাংশ থেকে যায়।

তিনি বলেন, বালাইনাশকের এই অবশিষ্টাংশ মানবস্বাস্থ্যের জন্য যেমন হুমকি তৈরি করছে, তেমনি পরিবেশের জন্যও ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে ফসলের মিত্রপোকা বা উপকারী পতঙ্গ ধ্বংস হয়ে প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্যও নষ্ট হচ্ছে।

অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম বলেন, বালাইনাশক শুধু ক্ষতিকর পোকামাকড়ই ধ্বংস করে না, পরিবেশের অন্যান্য প্রাণীর ওপরও এর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। ফসলে থেকে যাওয়া ক্ষতিকর রাসায়নিক মানুষের শরীরে প্রবেশ করে বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি করতে পারে। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে তাই সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে ক্ষতিকর পোকা দমনে কম পরিমাণ রাসায়নিক ব্যবহার করেই কার্যকর ফল পাওয়া যায়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক ওবায়দুর রহমান মন্ডল বাসস’কে বলেন, নিরাপদ ফসল উৎপাদন ও পরিবেশ রক্ষায় সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি। আইপিএমের মাধ্যমে পরিবেশকে দূষণমুক্ত রেখে প্রয়োজনে এক বা একাধিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে ফসলের ক্ষতিকর পোকা ও রোগবালাইকে অর্থনৈতিক ক্ষতির সীমার নিচে রাখা হয়।

তিনি বলেন, এ ব্যবস্থাপনায় উপকারী পোকামাকড় সংরক্ষণ, বালাই সহনশীল জাত ব্যবহার, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণ এবং সর্বশেষ ব্যবস্থা হিসেবে বালাইনাশকের সময়োচিত ও যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়।

বাংলাদেশ শাকসবজি, ফল ও পান ফসলের পোকামাকড় ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনায় জৈব বালাইনাশকভিত্তিক প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক কৃষিবিদ মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রাসায়নিকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আইপিএম পদ্ধতি অনুসরণ করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, আইপিএমের মূল লক্ষ্য হচ্ছে কম পরিমাণে বালাইনাশক ব্যবহার করে পোকামাকড় দমন করা এবং বায়োপেস্টিসাইড বা জৈব বালাইনাশক ও বায়োলজিক্যাল কন্ট্রোল বা জৈবিক নিয়ন্ত্রণের মতো পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (বালাইনাশক মান নিয়ন্ত্রণ) ও ‘নিরাপদ ফসল উৎপাদন ও পরিবেশ সুরক্ষার জন্য সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি’ বিষয়ক ফোকাল পার্সন কৃষিবিদ মো. মাজেদুর রহমান বলেন, নিরাপদ ফসল উৎপাদন ও পরিবেশ সুরক্ষায় আইপিএমভিত্তিক প্রকল্পের গুরুত্ব অনেক।

তিনি বলেন, গত প্রায় তিন বছরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে এ ধরনের প্রকল্পের ঘাটতি রয়েছে। ফলে মাঠ পর্যায়ে নিরাপদ ফসল উৎপাদনের কার্যক্রম এবং কৃষক ও কর্মকর্তাদের মধ্যে আইপিএম প্রযুক্তি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞানের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় এবং সরকারের নিরাপদ ফসল উৎপাদনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে দ্রুত প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাসায়নিক বালাইনাশকের বিকল্প হিসেবে দেশে বিভিন্ন যান্ত্রিক ও প্রযুক্তিভিত্তিক পদ্ধতি ইতোমধ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মধ্যে সেক্স ফেরোমোন ফাঁদ, হলুদ আঠালো ফাঁদ ও আলোর ফাঁদ উল্লেখযোগ্য। এসব পদ্ধতির মাধ্যমে রাসায়নিক প্রয়োগ ছাড়াই বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে।

ধানের ক্ষতিকর পোকা দমনে ‘পার্চিং’ বা পাখির বসার ব্যবস্থাও একটি কার্যকর পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে ধানখেতে বাঁশের আগা, কঞ্চি বা গাছের ডাল পুঁতে দেওয়া হয়। এসব জায়গায় পাখি বসে ক্ষতিকর পোকামাকড় ধরে খায়। বিশেষ করে মাজরা পোকা নিয়ন্ত্রণে এ পদ্ধতি কার্যকর বলে কৃষিবিদরা মনে করেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইপিএমের মাধ্যমে রাসায়নিক বালাইনাশকের ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি মাটি, পানি ও জলজ পরিবেশের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা সম্ভব। একই সঙ্গে ব্যাঙ, মাকড়সা ও অন্যান্য মিত্রপোকাসহ প্রকৃতির উপকারী জীবের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

তাদের মতে, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের জন্য শুধু কৃষকদের বালাইনাশক ব্যবহার কমানোর পরামর্শ দিলেই হবে না; কার্যকর বিকল্প প্রযুক্তিও তাদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এজন্য মাঠ পর্যায়ে কৃষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এবং নিয়মিত পরামর্শ কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, মাটির গুণাগুণ বজায় রাখা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের সমন্বিত লক্ষ্য অর্জনে আইপিএম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। রাসায়নিকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার প্রযুক্তি কৃষকের কাছে ব্যাপকভাবে পৌঁছে দিতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি গবেষক, কৃষিবিদ, সম্প্রসারণকর্মী ও কৃষকদের সমন্বিত কার্যক্রম জরুরি।

খুঁজুন