মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
বরিশাল বিভাগে বছরে উৎপাদন ১ লাখ ৮ হাজার ৬৬৬ মেট্রিক টন সুপারি চুয়াডাঙ্গায় অনিয়মের দায়ে ৩ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে গোলাবারুদের ঘাটতি দেখা দিয়েছে পুতিনকে লেখা চিঠিতে রাশিয়ার প্রতি ‘অটুট সমর্থন’ কিমের নগর স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে নতুনভাবে ঢেলে সাজাচ্ছে সরকার সিলেটে শাহজালাল ও শাহপরানের মাজার জিয়ারত রাষ্ট্রপতির দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব মানবতাবিরোধী অপরাধ: ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ আসামির মৃত্যুদণ্ড টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারে পাইলট প্রকল্প, জনমনে আশার সঞ্চার
দেশের খবর বরিশাল বিভাগে বছরে উৎপাদন ১ লাখ ৮ হাজার ৬৬৬ মেট্রিক টন সুপারি

বরিশাল বিভাগে বছরে উৎপাদন ১ লাখ ৮ হাজার ৬৬৬ মেট্রিক টন সুপারি

উর্বর মাটি ও অনুকূল আবহাওয়ায় উৎপাদিত সুপারি বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোর অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল। দেশের দক্ষিণাঞ্চালের গ্রামীণ অর্থনীতির একটি বড় চালিকাশক্তি এ সুপারি। বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর, বরগুনা, ভোলা এবং ঝালকাঠি জেলায় প্রচুর পরিমাণে সুপারি উৎপাদিত হয়। 

বরিশাল বিভাগের গ্রামীণ জনপদের বাড়ির আঙিনা, বসতভিটা কিংবা গ্রামের রাস্তার দুই পাশে সারি সারি সুপারি গাছ। বিভাগের প্রায় প্রতিটা জেলায় গ্রামীণ জনপদে সুপারি বাগানের এ মনোরম দৃশ্য যেন বাংলার চিরচেনা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। 

একসময় পারিবারিক চাহিদা মেটাতেই বাড়ির আঙিনায় সুপারি গাছ লাগানো হতো। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেই সুপারি এখন অনেক পরিবারের বাড়তি আয়ের অন্যতম উৎসে পরিনত হয়েছে। শুধু বসতভিটা নয়, বাণিজ্যিকভাবেও বাড়ছে সুপারি চাষ। ফলে বরিশাল অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসল হিসেবে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে সুপারি।

কৃষি বিভাগের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের উৎপাদন তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগের ৬ জেলায় মোট ২২ হাজার ৮৪৬ হেক্টর জমিতে সুপারি আবাদ হয়েছে। এসব জমি থেকে উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ৬৬৬ দশমিক ২ মেট্রিক টন সুপারি।

উৎপাদনে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ভোলা জেলা। সেখানে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে সুপারি আবাদ হয়েছে। আর এ থেকে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৬৮ হাজার মেট্রিক টন। বিভাগের মোট উৎপাদনের বড় একটি অংশই আসছে এ জেলা থেকে।

এর পরে রয়েছে পিরোজপুর। এ জেলায় ৪ হাজার ৫৭৯ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১৭ হাজার ৭১ মেট্রিক টন সুপারি। পটুয়াখালীতে ১ হাজার ৫৪৮ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে ১৫ হাজার ৩৩৯ মেট্রিক টন। বরগুনায় ৮১০ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৬৭০ মেট্রিক টন।

ঝালকাঠিতে ৪৮১ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৮ হাজার ৬৬৬ মেট্রিক টন এবং বরিশাল জেলায় ১ হাজার ৫৪৪ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭২০ মেট্রিক টন সুপারি।

বসতভিটা থেকে বাজার—বদলে যাচ্ছে সুপারির অর্থনীতি:

বরিশালের গ্রামাঞ্চলে সুপারি চাষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—এর জন্য সবসময় আলাদা কৃষিজমির প্রয়োজন হয় না। বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড়, বসতভিটার ফাঁকা জায়গা কিংবা জমির আইলজুড়েও গড়ে ওঠে সুপারি বাগান। ফলে বাড়তি জমি ব্যবহার না করেই অনেক পরিবার দীর্ঘমেয়াদে এ গাছ থেকে বেশ ভালো আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন।

কৃষক জব্বার বাসসকে বাসসকে বলেন, ‘আমাদের বসতভিটায় যে পরিমাণ সুপারি উৎপাদন হয়, তা দিয়ে পারিবারিক চাহিদা মেটানোর পরও কিছু সুপারি বিক্রি করি। এ টাকা ছেলে-মেয়ের পড়ালোখার খরচসহ সংসারের বিভিন্ন কাজে ব্যয় হয়।’

লাহারহাট এলাকার শহবদুল ইসলাম ও দপদপিয়া এলাকার সাদ্দাম হোসেন বলেন, বর্তমানে সুপারির বাজার ভালো। উৎপাদিত সুপারি বিক্রি করে তারা বাড়তি আয় করছেন। নিজেদের পরিবারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত সুপারি বাজারে বিক্রি করেন তারা।

কৃষকের পাশাপাশি লাভবান অন্যরাও:

সুপারি উৎপাদনকে ঘিরে শুধু কৃষকরাই নন, স্থানীয় ব্যবসায়ী, পাইকার, আড়তদার, শ্রমিক ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরাও যুক্ত। মৌসুমে বিভিন্ন গ্রাম থেকে সুপারি সংগ্রহ করে ব্যবসায়ীরা তা স্থানীয় হাট-বাজার ও আড়তে নিয়ে যান। পরে সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এসব সুপারি সরবরাহ করা হয়।

ফলে একটি সুপারি গাছ শুধু একটি পরিবারের আয়ের উৎস নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে একটি বড় সরবরাহব্যবস্থাও। উৎপাদন, সংগ্রহ, পরিবহন, বেচাকেনা—প্রতিটি ধাপেই তৈরি হচ্ছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।

চাহিদা থাকায় চাষে বাড়ছে আগ্রহ:

কৃষকদের মতে, সারা বছর সুপারির চাহিদা থাকায় এটি তুলনামূলক লাভজনক ফসল। বিশেষ করে বরিশাল অঞ্চলের আবহাওয়া ও মাটি সুপারি চাষের জন্য বেশ উপযোগী। তাই অনুকূল আবহাওয়ায় এ ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

তবে রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, উন্নত জাতের চারা সরবরাহ, আধুনিক পরিচর্যা, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে আরও সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি কৃষক যেন উৎপাদিত সুপারির ন্যায্যমূল্য পান, সেদিকেও নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে তার অভিমত ব্যক্ত করেন।

কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, পরিকল্পিতভাবে চাষ সম্প্রসারণ, উন্নত জাতের চারা সরবরাহ, কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে পারলে বরিশাল বিভাগে সুপারি উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে উৎপাদন-পরবর্তী ক্ষতি কমবে এবং কৃষকরাও পেতে পারেন ভালো দাম।

বর্তমান উৎপাদনের পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, বরিশাল বিভাগে সুপারি এখন আর কেবল বসতভিটার ঐতিহ্যবাহী গাছ নয়। ২২ হাজার ৮৪৬ হেক্টর জমিতে ১ লাখ ৮ হাজার ৬৬৬ মেট্রিক টনের বেশি উৎপাদন এ অঞ্চলে সুপারির ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক গুরুত্বেরই প্রমাণ। পরিকল্পিত উদ্যোগ ও কৃষকবান্ধব বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে সুপারি হয়ে উঠতে পারে বরিশাল বিভাগের অন্যতম শক্তিশালী অর্থকরী ফসল।

বরিশাল বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বাসসকে বলেন, ‘বরিশাল বিভাগের মাটি ও আবহাওয়া সুপারি চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। বসতভিটা ও বাণিজ্যিকভাবে সুপারি চাষের কারণে এ অঞ্চলে এর উৎপাদন ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব দু’টিই বাড়ছে। 

তিনি বলেন, উন্নত জাতের চারা, সঠিক পরিচর্যা, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি উৎপাদিত সুপারি সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে এ ফসল গ্রামীণ অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।’

খুঁজুন