বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর জীবনই মানবতার কল্যাণ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.), প্রধানমন্ত্রীর বাণী গণমাধ্যমকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার আহ্বান জহির উদ্দিন স্বপনের চাঁপাইনবাবগঞ্জে পাটের আঁশ ছাড়িয়ে বাড়তি আয় করছেন নারীরা দ্য লাভ অব প্রফেট মুহাম্মদ (দ.)’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনার শাহজালাল বিমানবন্দরে মিথ্যা ঘোষণায় আনা বিপুল পরিমাণের ল্যাপটপ ও ট্যাব জব্দ ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ অ্যাপে অভিযোগ: চসিকের উচ্ছেদ অভিযান ভাষা শিখে বিনা খরচে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের জাপানে চাকরির সুযোগ : মাহদী আমিন চট্টগ্রাম বন্দরে নিলাম-অযোগ্য ১২৬ কনটেইনার পণ্য ধ্বংস করা হচ্ছে জিম্বাবুয়ে টি-টোয়েন্টি দলে ফিরলেন ক্রিমার
পর্যটন চীনের গুয়াংজুতে সাহাবা সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর স্মৃতির সন্ধানে

চীনের গুয়াংজুতে সাহাবা সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর স্মৃতির সন্ধানে

"জ্ঞান অর্জনের জন্য সুদূর চীনেও যেতে হলেও যাও"—প্রিয় নবী (সা.)-এর নামে বহুল প্রচলিত এই বাণী আমাকে ছোটবেলা থেকেই চীনের প্রতি আকৃষ্ট করেছে।
পরে যখন জানতে পারি, চীনের গুয়াংজু শহরে সাহাবা সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর নামে একটি ঐতিহাসিক স্মৃতিস্থান ও মাজার কমপ্লেক্স রয়েছে, তখন সেখানে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
আমার ধারণা ছিল, মুসলিম জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম হওয়ায় হয়তো এটি কোনো পুরোনো অলিগলির কোণে অবস্থিত হবে—যেমন পুরান ঢাকার বাবুবাজারের পাশে হযরত বাহার শাহ (রহ.) কিংবা গুলিস্তানের গোলাপ শাহ (রহ.)-এর মাজার।
কিন্তু ২০১৪ সালে প্রথমবার গুয়াংজু গিয়ে আমি সত্যিই বিস্মিত হলাম। এটি কোনো অবহেলিত স্থান নয়; বরং ব্যস্ত নগরীর অত্যন্ত মূল্যবান এলাকায় প্রায় ২০ বিঘা জায়গা জুড়ে গড়ে ওঠা এক দৃষ্টিনন্দন উদ্যান। প্রাচীন বৃক্ষ, বাঁশঝাড়, বাহারি ফুল, শোভাময় বৃক্ষ, পাথরের পথ এবং অপূর্ব নীরবতা পুরো পরিবেশকে এক অনন্য প্রশান্তি দিয়েছে।
ঐতিহাসিক বর্ণনায় জানা যায়, মহানবী (সা.)-এর ওফাতের পর বিপুল সংখ্যক সাহাবি ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন।
বিদায় হজে সাহাবিদের সংখ্যা ছিল এক লক্ষেরও বেশি, আর মদিনার জান্নাতুল বাকিতে সমাহিত সাহাবিদের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। এ থেকেই বোঝা যায়, অসংখ্য সাহাবি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলামের বাণী পৌঁছে দিতে গিয়ে সেখানেই ইন্তেকাল করেন।
কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনা ও স্থানীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী, সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) বা তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি হিজরতের দাওয়াতি কাফেলা সিল্ক রোডের পথে চীনের উদ্দেশ্যে যাত্রাকালে বর্তমান বাংলাদেশের লালমনিরহাট অঞ্চলে অবস্থান করেছিলেন এবং সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণের বর্ণনাও প্রচলিত রয়েছে।
যা বাংলাদেশের প্রথম মসজিদ হিসেবে খ্যাত। তবে এ বিষয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
সাহাবা সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) ছিলেন নবীজির মামা ও বেহেস্তের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ জন সুভাগ্যবানদের মধ্যে একজন।
পরবর্তীকালে আরও বহুবার এই পবিত্র স্থানে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের এপ্রিলে আমার পরম শ্রদ্ধেয় আধ্যাত্মিক শিক্ষক হযরত মোহাম্মদ শামীম আখতার-এর সঙ্গে ১৭ সদস্যের একটি দলের অংশ হিসেবে আবারও জিয়ারত করি। এ সফরটি ছিল আমার পূর্ববর্তী সব সফরের চেয়ে অনেক বেশি আধ্যাত্মিক ও হৃদয়স্পর্শী।
স্থানীয় মুসলিম ঐতিহ্য অনুযায়ী যেখানে সা'দ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রা.) ও তাঁর সঙ্গীরা বসবাস করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়, সেই স্থানও দেখার সুযোগ হয়। সেখানে অবস্থিত ঐতিহাসিক হুয়াইশেং মসজিদে মাগরিবের নামাজ আদায় ও মোরাকাবা করার সৌভাগ্য হয়।
মসজিদের প্রায় ৩৬ মিটার উঁচু বিখ্যাত 'গুয়াংটা' মিনারটি অতীতে সমুদ্রযাত্রীদের জন্য বাতিঘর হিসেবেও ব্যবহৃত হতো বলে ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখ রয়েছে। সেই মুহূর্তের অনুভূতি আজও হৃদয়ে অম্লান।
জুম্মার নামাজকে কেন্দ্র করে প্রতি শুক্রবার স্থানীয় ও বিদেশি মুসলিম ভাইদের এক মিলনমেলা হয়, যা অনেকটা ঈদের মতো পরিবেশ সৃষ্টি করে। শত শত কিলোমিটার দূর থেকেও মানুষ জুম্মার নামাজ আদায় ও প্রিয়জনদের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে একত্রিত হন। সেদিন সেখানে বিভিন্ন দেশের দেশীয় খাবারেরও আয়োজন থাকে।
২০১৪ সালের উজবেকিস্তানী কাবাব ও রুটির স্বাদ এখনো ভুলতে পারিনি।
বিদায় হজে মহানবী (সা.) ঘোষণা করেছিলেন:
"তোমাদের মধ্যে যারা উপস্থিত আছে, তারা যেন অনুপস্থিতদের কাছে আমার বাণী পৌঁছে দেয়।"
সাহাবায়ে কেরাম এই মহান দায়িত্ব নিজেদের জীবন দিয়ে পালন করেছিলেন। তাঁদের দাওয়াত, আত্মত্যাগ ও উত্তম চরিত্রের মাধ্যমেই ইসলাম পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।
পরবর্তীকালে ভারতীয় উপমহাদেশেও খাজা মইনুদ্দিন চিশতী (রহ.), শাহজালাল (রহ.), শাহপরান (রহ.), খান জাহান আলী (রহ.), শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.), বাবা আদম শহীদ (রহ.), আমানত শাহ (রহ.)-সহ অসংখ্য ওলি-আউলিয়ার দাওয়াতি প্রচেষ্টায় ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটে।
আজও সেই ধারাবাহিকতা থেমে নেই। আমার পরম শ্রদ্ধেয় আধ্যাত্মিক শিক্ষক হযরত মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ (রহ.) কম্বোডিয়ায় হিজরত করে দাওয়াতি কাজকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর কর্মধারা এবং তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরি হযরত মোহাম্মদ শামীম আখতারের প্রচেষ্টায়, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ শতাধিক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছেন। সেখানে দুটি মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং নতুন মুসলিমদের নিয়ে গড়ে উঠেছে একটি ইসলামী গ্রাম—কমপঙ মদিনা (মদিনা গ্রাম)।
আজ আমরা জীবিকার সন্ধানে পৃথিবীর নানা দেশে ছড়িয়ে পড়ছি, স্থায়ীভাবে বসবাসও করছি। যদি আমাদের এই প্রবাসজীবন হিজরতের নিয়ত, দাওয়াতি চেতনা এবং ইসলামের সৌন্দর্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যয়ে পরিচালিত হয়, তবে আমাদের ব্যবসা, চাকরি কিংবা পেশা—সবই ইবাদতের রূপ নিতে পারে।
কুরআনে আল্লাহ তাআলা হিজরতকারীদের জন্য ক্ষমা, প্রশস্ত রিজিক এবং জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন (দেখুন: সূরা আন-নিসা ৪:১০০; সূরা আল-আনফাল ৮:৭৪)।
সাহাবায়ে কেরাম ও ওলি-আউলিয়ারা সমুদ্র, মরুভূমি ও দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছে ইসলামের সৌন্দর্য পৌঁছে দিয়েছিলেন। তাঁদের সেই ত্যাগের ফলেই আমরা অনেকেই জন্মসূত্রে মুসলিম হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছি।
আজ আমাদের হাতে রয়েছে বিমান, ইন্টারনেট এবং সীমাহীন যোগাযোগের সুযোগ।
আসুন, আমরা এই নিয়ামতগুলোকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য ব্যবহার করি। সমগ্র মানবজাতিই আদম (আ.)-এর সন্তান; তাই সবাই আমাদের আপনজন। তাঁদের কল্যাণ কামনা করা, ভালোবাসা এবং প্রজ্ঞা, উত্তম চরিত্র ও সুন্দর আচরণের মাধ্যমে ইসলামের পরিশুদ্ধ সৌন্দর্যের প্রতি আহ্বান জানানো আমাদের সবার দায়িত্ব।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হিজরত করা ও তাঁর প্রিয় নবীজির পুণ্য অনুসারী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।

খুঁজুন