নামটা শুনলেই জিভে পানি এসে যায়—চিতল মাছের কোপ্তা।
এ খাবার আমার অতি অতি প্রিয়। তাই বলে প্রায়ই খাওয়া হয়, বিষয়টি এমন নয়। কালেভদ্রে খাওয়া হয়। যেদিন খাই, তারপর কয়েকদিন পর্যন্ত মনে থাকে। মনে মনে পরিকল্পনা করি—মাঝেমধ্যে খাওয়া হবে। শেষমেশ মনের অজান্তেই চিতল মাছের কোপ্তা কখন হারিয়ে যায়, টেরও পাই না। কখনো কখনো কয়েক বছরেও একবার খাওয়া হয় না।
একবার এমন পরিকল্পনা করে বছর পাঁচেক আগে চিতল মাছ কিনলাম। দিন যায়, রাত যায়, অতঃপর মাস যায়—চিতল মাছের কোপ্তা আর ডাইনিং টেবিলে আসে না।
গিন্নিকে জিজ্ঞেস করলাম,
—চিতল মাছের কী হলো?
উত্তরে জানালেন,
—কোপ্তা বানানোর মতো মহাযন্ত্রণায় যাওয়া যাবে না। মাছ কাজের মহিলাকে দিয়ে দিয়েছি।
এই “মহাযন্ত্রণা” আসলে কত বড় যন্ত্রণা, তা পরিমাপ করার জন্য কোনো একদিন ভোরে শান্তিনগর বাজার থেকে চিতল মাছ কিনে আনলাম। নিজ হাতে মাছ থেকে শুরু করে কোপ্তা বানিয়ে টেবিল পর্যন্ত নিয়ে গেলাম।
খাওয়ার স্বাদ অপূর্ব।
কিন্তু আমার শরীর ও পোশাকের অবস্থা—ঘামে যেন গোসল হয়ে গেছে!
গিন্নির সঙ্গে একমত হলাম—ইহা সত্যিই একটি মহাযন্ত্রণাময় কর্ম। রেসিপিটা বেশ ঝামেলাপূর্ণ ও সময়সাপেক্ষ। সবচেয়ে কঠিন অংশ—শিলপাটায় মাছ রেখে পোতা দিয়ে ধীরে ধীরে আঘাত করে মাছের মাংস বের করতে হয়।
এরপর থেকে মনে হলেও আর সাহস হয় না।
এবারের বিষয়টি অবশ্য ভিন্ন।
রমজানের ঈদের পরপরই কম্বোডিয়া খানকায় চিতল মাছের কোপ্তা খাওয়ার সুযোগ হয়েছিল।
দিন দশেক আগে ফেসবুকের কল্যাণে জানতে পারলাম, হাকিমাবাদ খানকার পুকুর থেকে প্রায় সাড়ে ৫ কেজি ওজনের একটি চিতল মাছ ধরা হয়েছে।
খবর পাওয়ার পর থেকেই বিকেলের নাস্তার পরিমাণ কমিয়ে দিয়ে রওনা দিলাম খানকায়।
বলতে পারেন, সেদিনের যাত্রা আত্মিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা চিতল মাছের কোপ্তার লোভেও!
কিন্তু নিশ্চিত তো নয়—আদৌ কোপ্তা রান্না হবে কি না!
রিজিক সুপ্রসন্ন হলো।
রাতের খাবারে চিতল মাছের কোপ্তা পেলাম। সেই সঙ্গে বোনাস হিসেবে পেলাম চিতল মাছের পেটির রান্নার একটি টুকরাও। তাও আবার টুকরার সাইজটা বেশ বড়।
তারপর থেকে চিতল মাছের কোপ্তা যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাথায় চলে এলো।
খানকায় মাঝে মাঝে খাবারের পর অল্প করে টক দই ও একটি করে মিষ্টি দেওয়া হয়। আমার ঠান্ডার সমস্যা থাকার কারণে আমি আমার অংশের টক দই ও মিষ্টি আমার সতীর্থ মতিন ভাইকে দিয়ে দিই—তবে শর্তসাপেক্ষে।
শর্ত হলো, কোথাও একসঙ্গে খেতে বসে যদি চিতল মাছের কোপ্তা থাকে, তাহলে তাঁর ভাগের অংশ থেকে আমাকে কিঞ্চিৎ হলেও দিতে হবে।
ইতোমধ্যে দুই-তিন দিন টক দই-মিষ্টি দিয়ে ফেলেছি। প্রতিবারই শর্তের কথা মনে করিয়ে দিয়েছি, আর দুজনেই হেসেছি।
আজ সকাল সাড়ে দশটার দিকে আমার দূরসম্পর্কের মামাশ্বশুর মহসিন সাহেব ফোন দিলেন। তাঁর অফিস নতুন জায়গায় শিফট হচ্ছে। আজই উদ্বোধন। দুপুরে দোয়া করতে হবে, সঙ্গে খাওয়ার আমন্ত্রণও।
অফিস বিখ্যাত কস্তুরী রেস্টুরেন্টের পাশের একটি বহুতল ভবনে।
যথাসময়ের আগেই হাজির হলাম।
মামা তাঁর বিভিন্ন বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিতে লাগলেন। যেভাবে পরিচয় করিয়ে দিলেন, তাতে একসময় মনে হলো—আমিই যেন আমাকে চিনি না!
সেই এক অন্যরকম আব্দুল মান্নান সাহেব—গুণে, জ্ঞানে, ধনে অনন্য!
লজ্জায় লাল হয়ে যাই।
দোয়া পর্ব শেষে মামা অতিথিদের দলবল নিয়ে কস্তুরী রেস্টুরেন্টে বসলেন।
মামা চিতল মাছের পেটি ও অন্যান্য খাবার অর্ডার করতে লাগলেন। আর আমার মাথায় তখন বিখ্যাত কস্তুরী রেস্টুরেন্টের চিতল মাছের কোপ্তা বারবার নক করছে।
লজ্জায় বলতে পারছি না।
মামা মেনুর সংখ্যা বাড়াচ্ছেন, কিন্তু কোপ্তা বলছেন না।
আমার বারবার মন চাচ্ছে—কাঙ্ক্ষিত কোপ্তাটাও মেনুতে যুক্ত করি।
নিজেকে সংবরণ করে অপেক্ষা করতে থাকলাম।
দেখি কী ঘটে।
আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে হঠাৎ মামার মনের ভেতরেও চিতল মাছের কোপ্তা জাগ্রত হলো!
মামা সবার জন্য কোপ্তা অর্ডার করলেন।
আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জ্ঞাপন করে কোপ্তা আসার অপেক্ষায় থাকলাম।
সবাইকে একটি করে কোপ্তা দেওয়া হলো। দেখা গেল, একটি কোপ্তা অতিরিক্ত।
মামা সেটি আমাকে দিতে চাইলেন।
আমি বিনয়ের সঙ্গে অন্যদের অফার করলাম।
সবাই একমত—
এটা জামাইয়ের প্রাপ্য।
কোপ্তাটি আমার ভাগেই এলো।
তখন মনে পড়ল মতিন ভাইকে দেওয়া সেই টক দই আর মিষ্টির কথা।
কোনো বিনিয়োগই বৃথা যায় না।
আমার দুই দিনের টক দই ও মিষ্টির বিনিয়োগ আল্লাহ তাআলা খুব তাড়াতাড়িই ফেরত দিয়েছেন!
আলহামদুলিল্লাহ।
শুকরিয়া অগণিতবার সেই সুমহান আল্লাহর প্রতি, যিনি কখনো কখনো আমাদের ছোট ছোট আকাঙ্ক্ষাকেও সুন্দরভাবে প্রাপ্তিতে রূপ দেন।
চিতল মাছের কোপ্তা
চিতল মাছের কোপ্তা
নামটা শুনলেই জিভে পানি এসে যায়—চিতল মাছের কোপ্তা। এ খাবার আমার অতি অতি প্রিয়। তাই বলে প্রায়ই খাওয়া হয়, বিষয়টি এমন নয়। কালেভদ্রে খাওয়া হয়। যেদিন খাই, তারপর কয়েকদিন পর্যন্ত মনে থাকে। মনে মনে পরিকল্পনা করি—মাঝেমধ্যে খাওয়া হবে। শেষমেশ মনের অজান্তেই চিতল মাছের কোপ্তা কখন হারিয়ে যায়, টেরও পাই না। কখনো কখনো কয়েক বছরেও একবার খাওয়া হয় না। একবার এমন পরিকল্পনা করে বছর পাঁচেক আগে চিতল মাছ কিনলাম। দিন যায়, রাত যায়, অতঃপর মাস যায়—চিতল মাছের কোপ্তা আর ডাইনিং টেবিলে আসে না। গিন্নিকে জিজ্ঞেস করলাম,—চিতল মাছের কী হলো?উত্তরে জানালেন, —কোপ্তা বানানোর মতো মহাযন্ত্রণায় যাওয়া যাবে না। মাছ কাজের মহিলাকে দিয়ে দিয়েছি। এই “মহাযন্ত্রণা” আসলে কত বড় যন্ত্রণা, তা পরিমাপ করার জন্য কোনো একদিন ভোরে শান্তিনগর বাজার থেকে চিতল মাছ কিনে আনলাম। নিজ হাতে মাছ থেকে শুরু করে কোপ্তা বানিয়ে টেবিল পর্যন্ত নিয়ে গেলাম। খাওয়ার স্বাদ অপূর্ব। কিন্তু আমার শরীর ও পোশাকের অবস্থা—ঘামে যেন গোসল হয়ে গেছে! গিন্নির সঙ্গে একমত হলাম—ইহা সত্যিই একটি মহাযন্ত্রণাময় কর্ম। রেসিপিটা বেশ ঝামেলাপূর্ণ ও সময়সাপেক্ষ। সবচেয়ে কঠিন অংশ—শিলপাটায় মাছ রেখে পোতা দিয়ে ধীরে ধীরে আঘাত করে মাছের মাংস বের করতে হয়। এরপর থেকে মনে হলেও আর সাহস হয় না। এবারের বিষয়টি অবশ্য ভিন্ন।রমজানের ঈদের পরপরই কম্বোডিয়া খানকায় চিতল মাছের কোপ্তা খাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। দিন দশেক আগে ফেসবুকের
কল্যাণে জানতে পারলাম, হাকিমাবাদ খানকার পুকুর থেকে প্রায় সাড়ে ৫ কেজি ওজনের একটি চিতল মাছ ধরা হয়েছে। খবর পাওয়ার পর থেকেই বিকেলের নাস্তার পরিমাণ কমিয়ে দিয়ে রওনা দিলাম খানকায়। বলতে পারেন, সেদিনের যাত্রা আত্মিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা চিতল মাছের কোপ্তার লোভেও! কিন্তু নিশ্চিত তো নয়—আদৌ কোপ্তা রান্না হবে কি না! রিজিক সুপ্রসন্ন হলো। রাতের খাবারে চিতল মাছের কোপ্তা পেলাম। সেই সঙ্গে বোনাস হিসেবে পেলাম চিতল মাছের পেটির রান্নার একটি টুকরাও। তাও আবার টুকরার সাইজটা বেশ বড়। তারপর থেকে চিতল মাছের কোপ্তা যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাথায় চলে এলো। খানকায় মাঝে মাঝে খাবারের পর অল্প করে টক দই ও একটি করে মিষ্টি দেওয়া হয়। আমার ঠান্ডার সমস্যা থাকার কারণে আমি আমার অংশের টক দই ও মিষ্টি আমার সতীর্থ মতিন ভাইকে দিয়ে দিই—তবে শর্তসাপেক্ষে। শর্ত হলো, কোথাও একসঙ্গে খেতে বসে যদি চিতল মাছের কোপ্তা থাকে, তাহলে তাঁর ভাগের অংশ থেকে আমাকে কিঞ্চিৎ হলেও দিতে হবে। ইতোমধ্যে দুই-তিন দিন টক দই-মিষ্টি দিয়ে ফেলেছি। প্রতিবারই শর্তের কথা মনে করিয়ে দিয়েছি, আর দুজনেই হেসেছি। আজ সকাল সাড়ে দশটার দিকে আমার দূরসম্পর্কের মামাশ্বশুর মহসিন সাহেব ফোন দিলেন। তাঁর অফিস নতুন জায়গায় শিফট হচ্ছে। আজই উদ্বোধন। দুপুরে দোয়া করতে হবে, সঙ্গে খাওয়ার আমন্ত্রণও। অফিস বিখ্যাত কস্তুরী রেস্টুরেন্টের পাশের একটি বহুতল ভবনে। যথাসময়ের আগেই হাজির হলাম। মামা তাঁর বিভিন্ন বন্ধুবান্ধবের
সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিতে লাগলেন। যেভাবে পরিচয় করিয়ে দিলেন, তাতে একসময় মনে হলো—আমিই যেন আমাকে চিনি না! সেই এক অন্যরকম আব্দুল মান্নান সাহেব—গুণে, জ্ঞানে, ধনে অনন্য!লজ্জায় লাল হয়ে যাই। দোয়া পর্ব শেষে মামা অতিথিদের দলবল নিয়ে কস্তুরী রেস্টুরেন্টে বসলেন। মামা চিতল মাছের পেটি ও অন্যান্য খাবার অর্ডার করতে লাগলেন। আর আমার মাথায় তখন বিখ্যাত কস্তুরী রেস্টুরেন্টের চিতল মাছের কোপ্তা বারবার নক করছে। লজ্জায় বলতে পারছি না। মামা মেনুর সংখ্যা বাড়াচ্ছেন, কিন্তু কোপ্তা বলছেন না। আমার বারবার মন চাচ্ছে—কাঙ্ক্ষিত কোপ্তাটাও মেনুতে যুক্ত করি।নিজেকে সংবরণ করে অপেক্ষা করতে থাকলাম। দেখি কী ঘটে। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে হঠাৎ মামার মনের ভেতরেও চিতল মাছের কোপ্তা জাগ্রত হলো!মামা সবার জন্য কোপ্তা অর্ডার করলেন। আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জ্ঞাপন করে কোপ্তা আসার অপেক্ষায় থাকলাম।সবাইকে একটি করে কোপ্তা দেওয়া হলো। দেখা গেল, একটি কোপ্তা অতিরিক্ত।মামা সেটি আমাকে দিতে চাইলেন। আমি বিনয়ের সঙ্গে অন্যদের অফার করলাম। সবাই একমত—এটা জামাইয়ের প্রাপ্য।কোপ্তাটি আমার ভাগেই এলো। তখন মনে পড়ল মতিন ভাইকে দেওয়া সেই টক দই আর মিষ্টির কথা।কোনো বিনিয়োগই বৃথা যায় না। আমার দুই দিনের টক দই ও মিষ্টির বিনিয়োগ আল্লাহ তাআলা খুব তাড়াতাড়িই ফেরত দিয়েছেন!আলহামদুলিল্লাহ। শুকরিয়া অগণিতবার সেই সুমহান আল্লাহর প্রতি, যিনি কখনো কখনো আমাদের ছোট ছোট আকাঙ্ক্ষাকেও সুন্দরভাবে প্রাপ্তিতে রূপ দেন।
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
রওশন টাওয়ার, (লিফট-৮) ১৫২/২/এ২ গ্রীণ রোড ,
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ ।
মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত