দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রকট আকার ধারণ করেছে শিক্ষক সংকট। প্রধান শিক্ষক ছাড়া চলছে দেশের অর্ধেকেরও বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
একই সঙ্গে সহকারী শিক্ষকের হাজার হাজার পদ খালি থাকায় অতিরিক্ত ক্লাসের চাপ, প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলানো এবং মানসম্মত পাঠদান বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মরত শিক্ষকেরা।
ফলে চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে প্রতিদিনের শ্রেণিকক্ষ কার্যক্রম এবং ঝুঁকির মুখে পড়ছে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা অর্জন।
অর্ধেকের বেশি স্কুলে প্রধান শিক্ষক নেই
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৬৫ হাজার ৫৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৬ হাজার ২৩৫টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনার মূল চালিকাশক্তি না থাকায় সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত হিসেবে প্রশাসনিক ও আর্থিক কাজ সামলাতে হচ্ছে। এতে করে তারা নিজেরাও শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না।
কুমিল্লা সদর উপজেলার উত্তর রসুলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘ এক দশক ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ খালি। সেখানে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ মঞ্জুরুল আলম জানান, ২২৫ জন শিক্ষার্থীকে পড়ানোর পাশাপাশি দাপ্তরিক কাজ সামলাতে গিয়ে পাঠদানে কাঙ্ক্ষিত মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
কর্মকর্তারা জানান, ২০১৩ সালের নিয়োগ বিধিমালার জ্যেষ্ঠতা-সংক্রান্ত বিধান চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালে রিট করার কারণে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ ও পদোন্নতি দীর্ঘ দিন আটকে ছিল। তবে গত বছরের ২ জুলাই আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বাতিল করায় এই আইনি জটিলতার অবসান ঘটেছে। শিগগিরই সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) চাহিদাপত্র পাঠিয়ে সরাসরি নিয়োগ ও পদোন্নতির প্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।
সহকারী শিক্ষক সংকট ও আঞ্চলিক বৈষম্য
সহকারী শিক্ষকের ঘাটতিও বহু স্কোলে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম স্তব্ধ করে দিয়েছে। জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম নাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঁচটি পদের বিপরীতে বর্তমানে মাত্র একজন শিক্ষক রয়েছেন। গত ১৫ জানুয়ারি থেকে আবদুল মোমিন নামের সেই শিক্ষক একা ৭০ জন শিক্ষার্থী ও দাপ্তরিক কাজ সামলাচ্ছেন।
গাজীপুরের কাপাসিয়ার সোনারুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও চারজন শিক্ষককে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রতিদিন প্রায় তিনটি ক্লাস বাতিল করতে হচ্ছে।
দেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিকে গড়ে ৬.২৯ জন শিক্ষক থাকলেও আঞ্চলিক বৈষম্য স্পষ্ট। চট্টগ্রামে গড় শিক্ষকসংখ্যা ৬.৬৫ জন ও ঢাকায় ৬.৫২ জন হলেও সিলেটে তা ৫.৫৯ এবং বরিশালে ৫.৮৯ জন।
সারা দেশে ১২ হাজার ৯৩৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চারজন বা তার কম শিক্ষক রয়েছেন। ১৩৩টি স্কুলে মাত্র ১ জন এবং ৬৩৩টি স্কুলে মাত্র ২ জন শিক্ষক দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে।
চাপের প্রভাব কোমলমতি শিশুদের পড়াশোনায়
শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষকস্বল্পতা ও ক্লাসের অতিরিক্ত চাপের সরাসরি প্রভাব পড়ছে কোমলমতি শিশুদের পড়াশোনায়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ‘জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন ২০২২’ অনুযায়ী, গণিতে ৩য় শ্রেণির ৬১% এবং ৫ম শ্রেণির ৭০% শিক্ষার্থী শ্রেণি-উপযোগী দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ এবং বাংলায় ৩য় শ্রেণির ৫১% এবং ৫ম শ্রেণির ৫০% শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বলেছেন, শিক্ষক সংকটের কারণে পিছিয়ে পড়া ও দুর্বল শিক্ষার্থীরা বাড়তি নজর পায় না, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। নিয়োগে আইনি বিলম্ব, যোগ্য শিক্ষকের অভাব এবং দুর্গম এলাকায় শিক্ষকদের অনাগ্রহ এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
সহকারী শিক্ষক সংকট প্রসঙ্গে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, বর্তমানে নতুন নিয়োগ পাওয়া প্রায় ১৪ হাজার শিক্ষক পুলিশি ভেরিফিকেশনের প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। ভেরিফিকেশন শেষে তাদের দুই মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণ শেষ করে আগামী দুই থেকে আড়াই মাসের মধ্যে তারা শ্রেণিকক্ষে যোগ দিলে সহকারী শিক্ষক সংকট অনেকটাই লাঘব হবে।
প্রাথমিকে শিক্ষক সংকট, ঝুঁকিতে দক্ষতা অর্জন
প্রাথমিকে শিক্ষক সংকট, ঝুঁকিতে দক্ষতা অর্জন
দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রকট আকার ধারণ করেছে শিক্ষক সংকট। প্রধান শিক্ষক ছাড়া চলছে দেশের অর্ধেকেরও বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়। একই সঙ্গে সহকারী শিক্ষকের হাজার হাজার পদ খালি থাকায় অতিরিক্ত ক্লাসের চাপ, প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলানো এবং মানসম্মত পাঠদান বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মরত শিক্ষকেরা। ফলে চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে প্রতিদিনের শ্রেণিকক্ষ কার্যক্রম এবং ঝুঁকির মুখে পড়ছে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা অর্জন। অর্ধেকের বেশি স্কুলে প্রধান শিক্ষক নেই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৬৫ হাজার ৫৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৬ হাজার ২৩৫টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনার মূল চালিকাশক্তি না থাকায় সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত হিসেবে প্রশাসনিক ও আর্থিক কাজ সামলাতে হচ্ছে। এতে করে তারা নিজেরাও শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না। কুমিল্লা সদর উপজেলার উত্তর রসুলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘ এক দশক ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ খালি। সেখানে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ মঞ্জুরুল আলম জানান, ২২৫ জন শিক্ষার্থীকে পড়ানোর পাশাপাশি দাপ্তরিক কাজ সামলাতে গিয়ে পাঠদানে কাঙ্ক্ষিত মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কর্মকর্তারা জানান, ২০১৩ সালের নিয়োগ বিধিমালার জ্যেষ্ঠতা-সংক্রান্ত
বিধান চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালে রিট করার কারণে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ ও পদোন্নতি দীর্ঘ দিন আটকে ছিল। তবে গত বছরের ২ জুলাই আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বাতিল করায় এই আইনি জটিলতার অবসান ঘটেছে। শিগগিরই সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) চাহিদাপত্র পাঠিয়ে সরাসরি নিয়োগ ও পদোন্নতির প্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। সহকারী শিক্ষক সংকট ও আঞ্চলিক বৈষম্য সহকারী শিক্ষকের ঘাটতিও বহু স্কোলে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম স্তব্ধ করে দিয়েছে। জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম নাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঁচটি পদের বিপরীতে বর্তমানে মাত্র একজন শিক্ষক রয়েছেন। গত ১৫ জানুয়ারি থেকে আবদুল মোমিন নামের সেই শিক্ষক একা ৭০ জন শিক্ষার্থী ও দাপ্তরিক কাজ সামলাচ্ছেন। গাজীপুরের কাপাসিয়ার সোনারুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও চারজন শিক্ষককে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রতিদিন প্রায় তিনটি ক্লাস বাতিল করতে হচ্ছে। দেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিকে গড়ে ৬.২৯ জন শিক্ষক থাকলেও আঞ্চলিক বৈষম্য স্পষ্ট। চট্টগ্রামে গড় শিক্ষকসংখ্যা ৬.৬৫ জন ও ঢাকায় ৬.৫২ জন হলেও সিলেটে তা ৫.৫৯ এবং বরিশালে ৫.৮৯ জন। সারা দেশে ১২ হাজার ৯৩৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চারজন বা তার কম শিক্ষক রয়েছেন। ১৩৩টি স্কুলে মাত্র
১ জন এবং ৬৩৩টি স্কুলে মাত্র ২ জন শিক্ষক দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। চাপের প্রভাব কোমলমতি শিশুদের পড়াশোনায় শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষকস্বল্পতা ও ক্লাসের অতিরিক্ত চাপের সরাসরি প্রভাব পড়ছে কোমলমতি শিশুদের পড়াশোনায়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ‘জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন ২০২২’ অনুযায়ী, গণিতে ৩য় শ্রেণির ৬১% এবং ৫ম শ্রেণির ৭০% শিক্ষার্থী শ্রেণি-উপযোগী দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ এবং বাংলায় ৩য় শ্রেণির ৫১% এবং ৫ম শ্রেণির ৫০% শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি। গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বলেছেন, শিক্ষক সংকটের কারণে পিছিয়ে পড়া ও দুর্বল শিক্ষার্থীরা বাড়তি নজর পায় না, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। নিয়োগে আইনি বিলম্ব, যোগ্য শিক্ষকের অভাব এবং দুর্গম এলাকায় শিক্ষকদের অনাগ্রহ এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। সহকারী শিক্ষক সংকট প্রসঙ্গে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, বর্তমানে নতুন নিয়োগ পাওয়া প্রায় ১৪ হাজার শিক্ষক পুলিশি ভেরিফিকেশনের প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। ভেরিফিকেশন শেষে তাদের দুই মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণ শেষ করে আগামী দুই থেকে আড়াই মাসের মধ্যে তারা শ্রেণিকক্ষে যোগ দিলে সহকারী শিক্ষক সংকট অনেকটাই লাঘব হবে।
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
রওশন টাওয়ার, (লিফট-৮) ১৫২/২/এ২ গ্রীণ রোড ,
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ ।
মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত