ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরপরই রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, নতুন সরকার তাঁকে না চাইলে তিনি সরে দাঁড়াবেন। তাই পদত্যাগের সিদ্ধান্তের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে সেটিকে ঘিরে তৈরি হওয়া ঘটনাপ্রবাহ এবং এর সময় নির্বাচন।
প্রশ্ন হলো, সবকিছু এত তড়িঘড়ি করার প্রয়োজন পড়ল কেন? নির্বাচনের পাঁচ মাস পর থাইল্যান্ডে অবস্থানরত স্পিকারকে মাত্র দুই দিন আগে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পেছনে কি শুধু আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন ছিল, নাকি আরও বড় কোনো রাজনৈতিক সময়সূচি কাজ করছিল? কয়েক দিন ধরেই এ নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল। এরপর যেভাবে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হলো, তাতে স্বাভাবিকভাবেই একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এটি কি কেবল একটি পদত্যাগ, নাকি সুচারুভাবে সাজানো একটি রাজনৈতিক মঞ্চ?
আরেকটি বিষয় এবার ভিন্নভাবে সামনে এসেছে। রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে কিছু গণমাধ্যমকেও যেন এক ধরনের ‘মিডিয়া ট্রায়াল’-এর অংশ হতে দেখা গেছে। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ যখন অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল, তখন তাঁকে ঘিরে এত ব্যাপক প্রচার, চাপ ও নাটকীয় আবহ তৈরির প্রয়োজন কেন পড়ল? এটি কি শুধুই একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে ঘিরে জনমত তৈরির চেষ্টা ছিল, নাকি এর আড়ালে আরও বড় কোনো রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের প্রস্তুতি চলছিল? সময়ই হয়তো এর উত্তর দেবে।
এদিকে রাষ্ট্রপতির পদে বহাল থাকা নিয়েও নানা ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। তবে বাস্তবতা হলো, তিনি যদি ২০২৪ সালের আগস্ট পরবর্তী চাপের মুখে পদত্যাগ করতেন, তাহলে একটি সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরির ঝুঁকি তৈরি হতে পারত। বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের মূল্যায়ন তাই একপাক্ষিক হওয়া উচিত নয়। গত দেড় বছরে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, বিভিন্ন বক্তব্য ও সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। অনেকেই মনে করেন, তিনি আরও দৃঢ় ভূমিকা নিতে পারতেন। আবার এটাও অস্বীকার করা কঠিন যে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সৃষ্ট সাংবিধানিক সংকটের মুহূর্তে রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। অবশ্য একই সময়ে সংবিধানবিরোধী অধ্যাদেশগুলো ঠেকাতে তিনি সফল হননি, কিন্তু অনেকের মতে সংবিধানকে পুরোপুরি অকার্যকর বা 'ডাস্টবিনে' পরিণত হওয়ার হাত থেকেও অন্তত রক্ষা করেছিলেন। তাঁর ভূমিকার চূড়ান্ত মূল্যায়ন ইতিহাসই করবে।
আমার বিশ্বাস, দীর্ঘমেয়াদে কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য সংঘাতের পথ নয়, আইনি ও গণতান্ত্রিক পথই টেকসই সমাধান। আওয়ামী লীগ সভাপতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি ঘোষণা অনুযায়ী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আইনের মুখোমুখি হন এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিজের অবস্থান তুলে ধরেন, সেটিই হবে সবচেয়ে ইতিবাচক ও গণতান্ত্রিক পথ। এতে ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান ও আইনের শাসনের প্রতি আস্থা আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে অসাংবিধানিক বা বিকল্প ক্ষমতার কাঠামো তৈরির যে কোনো প্রচেষ্টা দুর্বল হয়ে পড়বে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা অন্য যে কোনো রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার শেষ পর্যন্ত জনগণের। সেই সিদ্ধান্ত ব্যালটের মাধ্যমেই হওয়া উচিত।
একইভাবে ভবিষ্যতের যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, তাদের দায়িত্ব হবে রাজনৈতিক সহাবস্থানের পরিবেশ নিশ্চিত করা। প্রতিপক্ষকে নির্মূল নয়, বরং আইনের কাঠামোর মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সুযোগ নিশ্চিত করাই গণতন্ত্রের প্রকৃত চর্চা।
প্রতিহিংসার রাজনীতি শেষ পর্যন্ত কাউকেই বিজয়ী করে না। নেতৃত্বের ভুল অতীতেও ছিল, ভবিষ্যতেও হতে পারে। কিন্তু সেই ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়াই সবচেয়ে জরুরি। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের চাওয়া খুব বেশি নয়—নিরাপদ জীবন, দুবেলা খাবারের নিশ্চয়তা, আইনের শাসন এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ। অসহিষ্ণুতা, মব রাজনীতি ও সংঘাত নয়; সহনশীলতা, শক্তিশালী সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিই পারে বাংলাদেশকে একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর স্বাভাবিকভাবেই আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—পরবর্তী টার্গেট কি সেনাপ্রধান? নাকি এটিও কেবল রাজনৈতিক জল্পনা? সময়ই এর উত্তর দেবে।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নতুন কোনো ঘটনা নয়
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নতুন কোনো ঘটনা নয়
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরপরই রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, নতুন সরকার তাঁকে না চাইলে তিনি সরে দাঁড়াবেন। তাই পদত্যাগের সিদ্ধান্তের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে সেটিকে ঘিরে তৈরি হওয়া ঘটনাপ্রবাহ এবং এর সময় নির্বাচন। প্রশ্ন হলো, সবকিছু এত তড়িঘড়ি করার প্রয়োজন পড়ল কেন? নির্বাচনের পাঁচ মাস পর থাইল্যান্ডে অবস্থানরত স্পিকারকে মাত্র দুই দিন আগে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পেছনে কি শুধু আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন ছিল, নাকি আরও বড় কোনো রাজনৈতিক সময়সূচি কাজ করছিল? কয়েক দিন ধরেই এ নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল। এরপর যেভাবে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হলো, তাতে স্বাভাবিকভাবেই একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এটি কি কেবল একটি পদত্যাগ, নাকি সুচারুভাবে সাজানো একটি রাজনৈতিক মঞ্চ? আরেকটি বিষয় এবার ভিন্নভাবে সামনে এসেছে। রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে কিছু গণমাধ্যমকেও যেন এক ধরনের ‘মিডিয়া ট্রায়াল’-এর অংশ হতে দেখা গেছে। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ যখন অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল, তখন তাঁকে ঘিরে এত ব্যাপক প্রচার, চাপ ও নাটকীয় আবহ তৈরির প্রয়োজন কেন পড়ল? এটি কি শুধুই একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে ঘিরে জনমত তৈরির চেষ্টা ছিল, নাকি এর আড়ালে আরও বড় কোনো রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের প্রস্তুতি চলছিল?
সময়ই হয়তো এর উত্তর দেবে। এদিকে রাষ্ট্রপতির পদে বহাল থাকা নিয়েও নানা ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। তবে বাস্তবতা হলো, তিনি যদি ২০২৪ সালের আগস্ট পরবর্তী চাপের মুখে পদত্যাগ করতেন, তাহলে একটি সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরির ঝুঁকি তৈরি হতে পারত। বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের মূল্যায়ন তাই একপাক্ষিক হওয়া উচিত নয়। গত দেড় বছরে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, বিভিন্ন বক্তব্য ও সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। অনেকেই মনে করেন, তিনি আরও দৃঢ় ভূমিকা নিতে পারতেন। আবার এটাও অস্বীকার করা কঠিন যে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সৃষ্ট সাংবিধানিক সংকটের মুহূর্তে রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। অবশ্য একই সময়ে সংবিধানবিরোধী অধ্যাদেশগুলো ঠেকাতে তিনি সফল হননি, কিন্তু অনেকের মতে সংবিধানকে পুরোপুরি অকার্যকর বা 'ডাস্টবিনে' পরিণত হওয়ার হাত থেকেও অন্তত রক্ষা করেছিলেন। তাঁর ভূমিকার চূড়ান্ত মূল্যায়ন ইতিহাসই করবে। আমার বিশ্বাস, দীর্ঘমেয়াদে কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য সংঘাতের পথ নয়, আইনি ও গণতান্ত্রিক পথই টেকসই সমাধান। আওয়ামী লীগ সভাপতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি ঘোষণা অনুযায়ী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আইনের মুখোমুখি হন এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিজের অবস্থান তুলে ধরেন, সেটিই হবে সবচেয়ে ইতিবাচক ও গণতান্ত্রিক পথ। এতে ব্যক্তি
নয়, প্রতিষ্ঠান ও আইনের শাসনের প্রতি আস্থা আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে অসাংবিধানিক বা বিকল্প ক্ষমতার কাঠামো তৈরির যে কোনো প্রচেষ্টা দুর্বল হয়ে পড়বে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা অন্য যে কোনো রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার শেষ পর্যন্ত জনগণের। সেই সিদ্ধান্ত ব্যালটের মাধ্যমেই হওয়া উচিত। একইভাবে ভবিষ্যতের যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, তাদের দায়িত্ব হবে রাজনৈতিক সহাবস্থানের পরিবেশ নিশ্চিত করা। প্রতিপক্ষকে নির্মূল নয়, বরং আইনের কাঠামোর মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সুযোগ নিশ্চিত করাই গণতন্ত্রের প্রকৃত চর্চা। প্রতিহিংসার রাজনীতি শেষ পর্যন্ত কাউকেই বিজয়ী করে না। নেতৃত্বের ভুল অতীতেও ছিল, ভবিষ্যতেও হতে পারে। কিন্তু সেই ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়াই সবচেয়ে জরুরি। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের চাওয়া খুব বেশি নয়—নিরাপদ জীবন, দুবেলা খাবারের নিশ্চয়তা, আইনের শাসন এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ। অসহিষ্ণুতা, মব রাজনীতি ও সংঘাত নয়; সহনশীলতা, শক্তিশালী সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিই পারে বাংলাদেশকে একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর স্বাভাবিকভাবেই আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—পরবর্তী টার্গেট কি সেনাপ্রধান? নাকি এটিও কেবল রাজনৈতিক জল্পনা? সময়ই এর উত্তর দেবে।
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
রওশন টাওয়ার, (লিফট-৮) ১৫২/২/এ২ গ্রীণ রোড ,
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ ।
মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত