বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
৩০০ টাকার সেই টিকিট ব্ল্যাকে বিক্রি হচ্ছে ১,০০০ টাকায়! • সঞ্জীব চৌধুরীর প্রতিকৃতি সরিয়ে ফেলেছে সিটি করপোরেশন • ভেনিসে ‘ইসলামে নারী’: শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত • বনানী বিদ্যানিকেতনে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সচেতনতামূলক কর্মশালা • সিডনিতে বর্ণাঢ্য আয়োজনে ‘ মহালয়া ও মেলা ২০২৬’, • সরকারের ভেতরের প্রশাসনিক দুর্বলতা • আপনার সন্তান কম মেধাবী, নাকি পৃথিবীটাকেই ঝাপসা দেখছে? • নারায়ণগঞ্জে অবৈধ গ্যাস সংযোগের অভিযোগ, প্রশ্নের মুখে তিতাস কর্মকর্তা ও ঠিকাদাররা • রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র : ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটে বদলে যাবে • অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে "ট-র্চা-র সেল"!
জাতীয় শিশু পুষ্টিতে উদ্বেগ, শারীরিক বৃদ্ধিতে পিছিয়ে ২৪ শতাংশ

শিশু পুষ্টিতে উদ্বেগ, শারীরিক বৃদ্ধিতে পিছিয়ে ২৪ শতাংশ

তিন দশকে বাংলাদেশের শিশুদের পুষ্টি ও শারীরিক বৃদ্ধির সূচকে লক্ষণীয় অগ্রগতি হলেও এখনো উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ শিশু।

বর্তমানে দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় প্রতি চারজন শিশুর একজন (২৪ শতাংশ) তাদের বয়সের তুলনায় স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধিতে পিছিয়ে বা ‘খর্বাকৃতি’র শিকার।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫’-এর প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

সারা দেশে ২৩ হাজারেরও বেশি শিশুর ওপর পরিচালিত এ জরিপে দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টি, সামাজিক বৈষম্য ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার এক স্পষ্ট চিত্র উন্মোচিত হয়েছে।

তিন দশকের পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক অবস্থান

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, কোনো দেশে খর্বাকৃতির হার ২০ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে থাকলে তাকে ‘উচ্চ প্রকোপ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

অগ্রগতি: ১৯৯৭ সালে দেশে এই হার ছিল ৫৯.৬ শতাংশ। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ‘অত্যন্ত উচ্চ’ (৩০ শতাংশের বেশি) ক্যাটাগরি থেকে বের হয়ে আসে এবং ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২৪ শতাংশে।

বিশ্ব প্রেক্ষাপট: ইউনিসেফের ১৬৩টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৯তম। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে আফগানিস্তান (৪৪.৬%), পাকিস্তান (৩৭.৬%) ও ভারতের (৩৫.৫%) চেয়ে বাংলাদেশ ভালো অবস্থায় থাকলেও শ্রীলঙ্কা (১০.৫%), মালদ্বীপ (১৫.৩%) ও ভুটানের (১৭.৯%) চেয়ে বেশ পিছিয়ে রয়েছে।

অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক বৈষম্যের প্রভাব

জরিপের তথ্যানুযায়ী, শিশুদের এই শারীরিক বৃদ্ধির ঘাটতি শুধু অর্থনৈতিক স্থিতি নয়, ভৌগোলিক অবস্থানের ওপরও নির্ভর করছে। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের খর্বাকৃতির ঝুঁকি ধনী পরিবারের শিশুদের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। দরিদ্র পরিবারে এই হার ৩২.৩ শতাংশ, যেখানে বিত্তবান পরিবারে তা ১৬.১ শতাংশ। শহরের তুলনায় গ্রামের শিশুরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি, মেয়ে শিশুদের তুলনায় ছেলে শিশুদের মধ্যে এ সমস্যার প্রকোপ কিছুটা বেশি দেখা গেছে।

বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতে, খর্বাকৃতির মূল সূত্রপাত ঘটে শিশুর জন্মের আগেই। দেশের প্রায় অর্ধেক নারীর বিয়ে হয় ১৮ বছর বয়সের আগে, আর প্রতি চারজনের একজন কৈশোরেই গর্ভধারণ করেন। এক-তৃতীয়াংশ গর্ভবতী নারী প্রথম ত্রৈমাসিকের পর স্বাস্থ্যসেবা শুরু করেন এবং প্রায় ৫০ শতাংশ নারী ন্যূনতম চারটি স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুপারিশ মেনে চলেন না।

তাছাড়া ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের প্রতি তিনজনের দুইজন পুষ্টিকর খাদ্যের সুষম পুষ্টি তালিকা থেকে বঞ্চিত। অর্ধেকের বেশি শিশু প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং এক-তৃতীয়াংশ ফলমূল বা শাকসবজি না খেয়ে বেড়ে উঠছে।

বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ শহরে খেলার মাঠের সংকট ও পরিবেশদূষণ শারীরিক বৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে আরও ব্যাহত করছে।

সুদূরপ্রসারী ক্ষতি ও ভবিষ্যতের হুমকি

জীবনের প্রথম ১,০০০ দিনে পুষ্টির এই ঘাটতি শুধু শিশুর দৈহিক উচ্চতা কমায় না, বরং জীবনজুড়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় শিশুরা ঘন ঘন ডায়রিয়া ও তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়। মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হওয়ায় অর্ধেকের বেশি শিশু বয়স-উপযোগী প্রাথমিক গণনা ও পঠন দক্ষতায় পিছিয়ে পড়ে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শৈশবে খর্বাকৃতিতে ভোগা ব্যক্তিরা প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় গড়ে ২০ শতাংশ কম আয় করেন এবং তাদের দারিদ্র্যের চক্রে আটকে থাকার ঝুঁকি ৩০ শতাংশ বেশি থাকে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের অধ্যাপক তাজউদ্দীন সিকদারের মতে, এই সংকট নিরসনে পুষ্টি গবেষণা বাড়ানোর পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস নিয়ে ব্যাপক জাতীয় সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে শহরাঞ্চলে শিশুদের খেলার মাঠ ফিরিয়ে আনা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়ানো জরুরি।

খুঁজুন