মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
শাহজালাল বিমানবন্দরে মিথ্যা ঘোষণায় আনা বিপুল পরিমাণের ল্যাপটপ ও ট্যাব জব্দ ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ অ্যাপে অভিযোগ: চসিকের উচ্ছেদ অভিযান ভাষা শিখে বিনা খরচে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের জাপানে চাকরির সুযোগ : মাহদী আমিন চট্টগ্রাম বন্দরে নিলাম-অযোগ্য ১২৬ কনটেইনার পণ্য ধ্বংস করা হচ্ছে জিম্বাবুয়ে টি-টোয়েন্টি দলে ফিরলেন ক্রিমার মহানবীর (সা.) আদর্শে হিংসা-বিদ্বেষ পরিহারের আহ্বান রাষ্ট্রপতির কিউট-বিএসপিএ স্পোর্টস কার্নিভাল ২০২৬ শুরু মহানবীর (সা.) আদর্শ অনুসরণে শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট খেলবে বাংলাদেশ : ডি ভিলিয়ার্স রদ্রিকে না পেলেও স্কোয়াড নিয়ে সন্তুষ্ট মরিনহো
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা উন্নয়নশীল দেশের বাস্তবতায় দেশীয় ভ্যাকসিন উৎপাদনের এখনই সময়
বাংলাদেশের টিকা নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সার্বভৌমত্ব

উন্নয়নশীল দেশের বাস্তবতায় দেশীয় ভ্যাকসিন উৎপাদনের এখনই সময়

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এবং মানবসম্পদে বিনিয়োগের ফলে দেশটি আন্তর্জাতিকভাবে একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি অর্জনের পথে এগিয়েছে। কিন্তু উন্নয়নের এই সাফল্যের সঙ্গে একটি নতুন বাস্তবতাও সামনে এসেছে। যে আন্তর্জাতিক সহায়তা, অনুদান এবং ভর্তুকির ওপর দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিবিশেষ করে টিকাদান কর্মসূচিআংশিকভাবে নির্ভরশীল ছিল, তা ভবিষ্যতে ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে। এটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, কারণ দাতা সংস্থাগুলো সাধারণত তাদের সীমিত সম্পদ সবচেয়ে দরিদ্র সংকটাপন্ন দেশগুলোর দিকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে স্থানান্তর করে।

বাংলাদেশের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি বিশ্বের অন্যতম সফল কর্মসূচি হিসেবে পরিচিত। এই কর্মসূচির মাধ্যমে কোটি কোটি শিশুকে জীবনরক্ষাকারী টিকা দেওয়া হয়েছে এবং হাম, পোলিও, ডিপথেরিয়া, টিটেনাসসহ বহু সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আন্তর্জাতিক অংশীদার, যেমন Gavi, UNICEF, WHO এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা এই সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণযদি ভবিষ্যতে এই সহায়তা কমে যায়, তবে বাংলাদেশের টিকা নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে?

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে হাম (Measles)-এর প্রাদুর্ভাব আবারও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো জরুরি ভিত্তিতে গণটিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে যে অধিকাংশ আক্রান্ত শিশু হয় কখনো টিকা পায়নি, নয়তো নির্ধারিত সব ডোজ সম্পন্ন করেনি। কারণে প্রতিরোধযোগ্য রোগ আবারও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।

একটি শিশুর মৃত্যু পুরো জাতির জন্য বেদনাদায়ক। প্রতিটি মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে টিকা শুধু একটি স্বাস্থ্যসেবা নয়এটি জীবন রক্ষার অন্যতম কার্যকর উপায়। যদিও কোনো নির্দিষ্ট শিশুর মৃত্যুর কারণ নিশ্চিতভাবে নির্ধারণের জন্য চিকিৎসাগত মূল্যায়ন প্রয়োজন, তবুও এটি সত্য যে সময়মতো নিরাপদ কার্যকর টিকার প্রাপ্যতা এবং উচ্চ টিকাকভারেজ থাকলে হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে আক্রান্ত হওয়া এবং মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে প্রয়োজনীয় টিকার ঘাটতির কারণে কোনো শিশুই ঝুঁকির মুখে না পড়ে।

এই বাস্তবতা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত শিক্ষা পাওয়া যায়বাংলাদেশকে এখনই ভ্যাকসিন উৎপাদনে স্বনির্ভর হওয়ার পরিকল্পনা নিতে হবে।

বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিকভাবে সফল। দেশের বহু ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন উৎপাদন ব্যবস্থা পরিচালনা করছে। এই শক্তিশালী শিল্পভিত্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশেই আধুনিক ভ্যাকসিন উৎপাদন শুরু করা সম্ভব। প্রয়োজন কেবল দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকার, গবেষণায় বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব।

আজও দেশের অধিকাংশ টিকা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যাহত হলে, বৈশ্বিক মহামারি দেখা দিলে অথবা আন্তর্জাতিক ভর্তুকি কমে গেলে টিকা সংগ্রহ ব্যয়বহুল অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। কোভিড-১৯ মহামারি আমাদের শিখিয়েছে যে স্বাস্থ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা একটি বড় ঝুঁকি।

সরকারের উচিত একটি জাতীয় ভ্যাকসিন নিরাপত্তা নীতি (National Vaccine Security Policy) প্রণয়ন করা। এই নীতির লক্ষ্য হবে আগামী ১০১৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় অধিকাংশ টিকা দেশেই উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন। একই সঙ্গে একটি জাতীয় ভ্যাকসিন গবেষণা উদ্ভাবন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা উচিত, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো যৌথভাবে কাজ করবে।

দেশীয় টিকা উৎপাদনের আরেকটি বড় সুবিধা হলো সহজলভ্যতা। সরকারি কর্মসূচির পাশাপাশি, যেসব পরিবার আর্থিকভাবে সক্ষম, তারা চাইলে নিবন্ধিত ফার্মেসি বা হাসপাতালের মাধ্যমে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অনুমোদিত টিকা কিনে নিতে পারবেন। এতে সরকারি কর্মসূচির ওপর চাপ কমবে এবং শিশুদের সময়মতো টিকা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে। অবশ্যই এই ব্যবস্থা শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ মাননিয়ন্ত্রণের আওতায় পরিচালিত হতে হবে, যাতে কোনো নিম্নমানের বা অননুমোদিত টিকা বাজারে প্রবেশ করতে না পারে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও এটি লাভজনক। প্রতিবছর বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে টিকা আমদানি করতে হয়। দেশীয় উৎপাদন সেই ব্যয় কমাবে, উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, গবেষণা উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করবে এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ভ্যাকসিন রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

তবে শুধু কারখানা নির্মাণ করলেই হবে না। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষণাগার, বায়োসেফটি সুবিধা, দক্ষ বিজ্ঞানী, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা এবং বিশ্বমানের গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের ওষুধ প্রশাসনকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে, যাতে দেশীয় উৎপাদিত টিকার প্রতি জনগণের আস্থা তৈরি হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও গ্রহণযোগ্যতা অর্জিত হয়।

স্বাস্থ্য নিরাপত্তাকে আর কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের একটি কৌশলগত বিষয়। তাই অর্থ মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, বিজ্ঞান প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বেসরকারি শিল্পখাতকে একসঙ্গে নিয়ে একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। আমরা চাইলে উন্নয়নশীল দেশের নতুন বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নয়, বরং আত্মনির্ভরতার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে পারি। বিদেশি সহায়তা ভবিষ্যতেও থাকবে, কিন্তু একটি সার্বভৌম আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজের জনগণের জন্য জীবনরক্ষাকারী টিকা নিজস্ব সক্ষমতায় উৎপাদন করা।

আজ যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, সেটিই আগামী প্রজন্মের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নির্ধারণ করবে। এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে হবে, যেখানে কোনো শিশু টিকার অভাব, সরবরাহ সংকট বা বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তার কারণে প্রতিরোধযোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে জীবন হারাবে না। স্বাস্থ্য সার্বভৌমত্বের ভিত্তি হলো বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা, আর সেই সক্ষমতার অন্যতম স্তম্ভ হতে হবে বাংলাদেশের নিজস্ব ভ্যাকসিন গবেষণা উৎপাদন ব্যবস্থা।

. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক রিসার্চ ফেলো, ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি (এমএসইউ), মালয়েশিয়া।
ভিশন সায়েন্টিস্ট জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক। স্বাস্থ্য, শিক্ষা জননীতি বিষয়ক বিভিন্ন জাতীয় আন্তর্জাতিক জার্নাল এবং গণমাধ্যমে নিয়মিত লেখালেখি করেন।

খুঁজুন