শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মতামত Allied Health Science কোর্স বদলে দিবে চিকিৎসা শিক্ষার মান

Allied Health Science কোর্স বদলে দিবে চিকিৎসা শিক্ষার মান

বাংলাদেশে চিকিৎসা শিক্ষার মান ও জনবল সংকট আজ এক জটিল বাস্তবতা। দেশে বর্তমানে শতাধিক বেসরকারি মেডিকেল কলেজ এমবিবিএস (MBBS) কোর্স পরিচালনা করছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকগুলোই আধুনিক ভবন, দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো, এবং সুসজ্জিত ক্লাসরুম প্রদর্শন করে থাকে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, একাডেমিক মান, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, ও আর্থিক টেকসই কাঠামোতে রয়েছে গভীর ঘাটতি। অধিকাংশ বেসরকারি মেডিকেল কলেজই তাদের আসন পূর্ণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, যার ফলে কলেজগুলোর আর্থিক সংকট দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন বন্ধ থাকা, রোগীসেবা ব্যাহত হওয়া, এবং গবেষণামূলক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ার মতো ঘটনা এখন আর নতুন নয়।

অন্যদিকে, যদি এসব বেসরকারি মেডিকেল কলেজ এমবিবিএস কোর্সের পাশাপাশি Allied Health Science শাখার বিভিন্ন কোর্স যেমন—Bachelor of Optometry, Physiotherapy, Medical Laboratory Science, Radiography, Medical Technology, Forensic Medicine, Nursing, Occupational Therapy, Speech and Hearing Science, Dental Technology ইত্যাদি কোর্স চালু করত, তাহলে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে যেত।

প্রথমত, এসব কোর্স চালু করলে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই দক্ষ ও মানসম্পন্ন জনবল তৈরি করতে পারত। একদিকে যেমন চিকিৎসকদের সহযোগী কর্মী তৈরি হতো, অন্যদিকে শিক্ষার্থীরাও পেত বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও দ্রুত কর্মসংস্থানের সুযোগ। দ্বিতীয়ত, এই কোর্সগুলো চালু হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় বাড়ত বহুগুণে। বর্তমানে দেশের বাইরে থেকে Allied Health Science বিষয়ে পড়তে প্রতিবছর হাজারো শিক্ষার্থী ভারত, নেপাল, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশে চলে যাচ্ছে। ফলে বিদেশে চলে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। অথচ এই কোর্সগুলো দেশে চালু হলে, সেই অর্থ দেশের মধ্যেই থেকে যেত, এবং বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠত।

তৃতীয়ত, Allied Health Science পেশাজীবীরা আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ। একজন চিকিৎসক যতই দক্ষ হোন না কেন, তার নির্ভুল রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় প্রয়োজন প্রশিক্ষিত টেকনোলজিস্ট, অপটোমেট্রিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, নার্স, ও ল্যাব সায়েন্টিস্টদের। এদের অভাবে দেশের হাসপাতালগুলোতে সেবা ব্যাহত হচ্ছে, এবং রোগী সেবার মানও আশানুরূপ নয়। যদি প্রতিটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ নিজস্ব Allied Health Science বিভাগ পরিচালনা করত, তাহলে দেশের হাসপাতালগুলোতে দক্ষ জনবলের ঘাটতি অনেকটাই পূরণ হতো।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের কিছু তথাকথিত “নামী-দামী” Allied Health Science প্রতিষ্ঠান কেবল বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কাজ করছে। তারা বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি সংস্থার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহযোগিতায় ভাড়াকৃত ভবনে কোর্স চালু করছে,  সরকারি কিছু কর্মকর্তাকে “ম্যানেজ” করে অনুমোদন আদায় করছে। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, রেজিস্ট্রার বা কলেজ পরিদর্শকও এ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হয়ে যাচ্ছেন। এর ফলে শিক্ষা বাণিজ্য এক অনিয়ন্ত্রিত শিল্পে পরিণত হয়েছে—যেখানে নীতি, মান বা শিক্ষার উদ্দেশ্যের চেয়ে অর্থই মুখ্য। হাসপাতালগুলোর সঙ্গে নামমাত্র চুক্তি করে সার্টিফিকেটভিত্তিক শিক্ষার ব্যবসা চালাচ্ছে। শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে না মানসম্মত ল্যাব, পর্যাপ্ত ক্লিনিক্যাল ট্রেনিং, কিংবা উপযুক্ত শিক্ষক-পরামর্শকের দিকনির্দেশনা। অথচ এই ব্যর্থতাই প্রমাণ করে—যদি প্রকৃত মেডিকেল কলেজগুলো নিজেদের সুযোগ-সুবিধা ও হাসপাতালভিত্তিক অবকাঠামো Allied Health Science শিক্ষায় ব্যবহার করত, তবে শিক্ষার মান অনেক উন্নত হতো।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে যেমন যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা বা সিঙ্গাপুরে Allied Health Science কোর্সগুলো চিকিৎসা শিক্ষার অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত। এসব দেশে চিকিৎসা শিক্ষার সঙ্গে প্যারামেডিক ও Allied Health শিক্ষাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়, ফলে সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় চিকিৎসক ও সহায়ক কর্মীরা একসঙ্গে কাজ করে। বাংলাদেশেও সেই মডেল অনুসরণ করার সময় এসেছে।

এছাড়া, বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো যদি এই কোর্সগুলো আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী পরিচালনা করতে পারে, তবে বিদেশি শিক্ষার্থীদেরও আকর্ষণ করা সম্ভব। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেই এখন Allied Health Science শিক্ষার গন্তব্য হতে পারে বাংলাদেশ, যদি যথাযথ নীতিমালা, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, ও ক্লিনিক্যাল সুবিধা নিশ্চিত করা যায়। এতে কেবল শিক্ষার মান বাড়বে না, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ও বৃদ্ধি পাবে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশে চিকিৎসা শিক্ষার বর্তমান আর্থিক ও মানগত সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোকে এমবিবিএস কোর্সের পাশাপাশি Allied Health Science শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। এটি শুধু একটি বিকল্প আয় উৎস নয়, বরং এটি হবে টেকসই মানবসম্পদ উন্নয়নের পথ। সরকারি নীতিনির্ধারকদেরও এ বিষয়ে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যাতে দেশীয় মেডিকেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন Allied Health Science প্রোগ্রাম পরিচালনা করতে পারে।

যদি এখনই উদ্যোগ নেওয়া যায়, তবে বাংলাদেশ অচিরেই দক্ষিণ এশিয়ার এক অন্যতম “Medical and Allied Health Education Hub” হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে—যেখানে চিকিৎসা শিক্ষার সঙ্গে মানবসেবা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন একসূত্রে গাঁথা থাকবে।

ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক ও গবেষণা ফেলো
ফ্যাকাল্টি অব হেলথ অ্যান্ড লাইফ সায়েন্সেস
ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি, মালয়েশিয়া

খুঁজুন