ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’ আজ আর শুধুমাত্র একটি প্রতিষ্ঠান নয় সিআইএ’র প্রেসক্রিপশনে বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মাফিয়াতে পরিণত হয়েছে। এটি আজ দেশব্যাপী মার্কিন ডিপস্টেট’র অন্যতম প্রধান থিঙ্ক ট্যাঙ্ক হিসাবে রুশ ও ভারতের প্রভাব বলয়ের বাইরে মার্কিন প্রভাব বলয় তৈরির আঁতুড়ঘর। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ আলোকিত মানুষ গড়ার আড়ালে আসলে বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও গণপাঠাগার ধ্বংসের প্রধান কাণ্ডারি। ‘মানুষ তার স্বপ্নের চেয়েও বড়’ স্লোগান নিয়ে সবচেয়ে বড় জাতীয় হিপোক্রেটে পরিণত প্রতিষ্ঠানের নাম ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’। আদতে তা ‘বিশ্ব বাটপার কেন্দ্র’।
পঁচাত্তর পরবর্তী প্রেক্ষাপটে সিআইএ’র প্রেসক্রিপশনে রুশ ও ভারতের প্রভাব বলয় ধ্বংস করে দেশে মার্কিনপন্থি নয়া একটি মতলববাজ গোষ্ঠী তৈরির উদ্দেশ্যে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা ও দেশবিরোধী সকল ষড়যন্ত্রের ন্যারেটিভ তৈরির মানবসম্পদ গড়ার কারিগর হিসাবে আবির্ভূত হবার আদ্যোপান্ত তুলে ধরবো এই নিবন্ধে।
১৯৭৮ সালের জুন মাসের ১৭ তারিখে ঢাকা কলেজের শিক্ষক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে তৎকালীন সিঙ্গার বাংলাদেশের ঢাকার অফিসে লাঞ্চের নিমন্ত্রণ করেন সিঙ্গারের বাংলাদেশের উপ-মহাব্যবস্থাপক মজিবুল হক দুলু, ওই লাঞ্চে উপস্থিত ছিলেন মজিবুল হক দুলুর গ্লোবাল ফান্ডে কর্মরত ফরাসী স্ত্রী এবং মার্কিন দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা। মজিবুল হক দুলু আমাকে (নিবন্ধের লেখককে) নিজে বলেছিলেন সেদিনের ঘটনা। সেই লাঞ্চের সময়েই সিদ্ধান্ত হয় কিছু কালচারাল মুভমেন্ট করার জন্য মার্কিন দূতাবাস অর্থ সহযোগিতা দেবে। আর সেই লক্ষেই ওই বছরের জুন মাসের ২৯ তারিখে মজিবুল হক দুলুর বাসাতে ডিনারে আমন্ত্রিত হন তৎকালীন সিআইএ’র ঢাকার স্টেশন প্রধান ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড ফিলিপ চেরী এবং আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। সেই ডিনারেই সিদ্ধান্ত হয় রুশ ও ভারতের প্রভাব বলয় খর্ব করার জন্য বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনের ব্যাপক সংস্কার দরকার। আর এই ক্ষেত্রে দেশের তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে জনপ্রিয় ঢাকা কলেজের পাকিস্তানপন্থি শিক্ষক ও সাহিত্যসেবী আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ পারফেক্ট ব্যক্তি।
ফিলিপ চেরীর সঙ্গে সেই ডিনারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রথমে পাঠচক্রের মাধ্যমে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালানো হয়। সেই লক্ষ্যে ১৯৭৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর ঢাকা কলেজের পেছনে শিক্ষা সম্প্রসারণ কেন্দ্রের (এখনকার নায়েম) মিলনায়তনে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের উদ্যোগে শুরু হলো একটি পাঠচক্র। যার সদস্য সংখ্যা ছিলো মাত্র পনেরো, সবাই আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ছাত্র। এভাবেই শুরু হয় বাঙালি জাতির শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ধ্বংসের উদ্দেশ্যে সিআইএ’র দীর্ঘমেয়াদী সফট মিশন।
এর দুই বছর পর এই পাঠচক্রের আশাতীত সাফল্য দেখে সিআইএ’র পরিকল্পনায় দেশব্যাপী শত শত পাঠচক্রের মাধ্যমে দেশের কিশোর তরুণদের মার্কিন বলয়ে জড়িয়ে ফেলার মহাপরিকল্পনার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলত বই পড়ার পাশাপাশি নানামুখী সাংস্কৃতিক কর্মসূচির ভেতর দিয়ে তাদের উৎকর্ষ আর পরিশীলনের মুখোশের আড়ালে চলতে থাকে দেশের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও গণপাঠাগারকে ধ্বংস করার জন্য দীর্ঘমেয়াদী মহাপরিকল্পনা!
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সূচনা হয় ১৯৭৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর এবং এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় ১৯৮০ সালের ৬ মার্চ। মজিবুল হক দুলু ও তার ফরাসী স্ত্রীর মাধ্যমে ঘুমন্ত অর্থায়ন করতে থাকে সিআইএ। আর প্রকাশ্য অর্থায়নে বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় থাকলেও এর পেছনে চলতে থাকে দেশবিরোধী মহাপরিকল্পনা।
ঠিক একই সময়ে সিআইএ আর আইএসআই’র যৌথ সহযোগিতায় মঈদুল হাসানদের ‘পরমা’ প্রকল্পও চলতে থাকে। ‘পরমা’ প্রকল্পের লক্ষ্য ছিলো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি। যার প্রথম এবং একমাত্র দৃশ্যমান পণ্য হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নির্ভর বিকৃত বই মঈদুল হাসান রচিত ‘মূলধারা ৭১’। পরমা প্রকল্প আশানুরূপ সাফল্য দেখাতে না পারলেও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’ দূরারোগ্য ক্যান্সারের মতো বিঁধে যায় বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে।
সেই ১৯৭৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর থেকে আজ পর্যন্ত একটা বিশাল মতলববাজ দেশবিরোধী ক্ষমতাবান শ্রেণি গড়ে তোলে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, বিশেষ করে আমলাদের মধ্যে মারাত্মক প্রভাব বলয় তৈরি করতে সক্ষম হন তিনি, যারা তার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সরাসরি সুবিধাভোগী এবং পাঠচক্রের মাধ্যমে গড়ে ওঠা অ্যালামনাই। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন তহবিল পেতে তার অনুরাগী এই আমলা শ্রেণির ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। আর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সুবিধাভোগী এই আমলা শ্রেণির হাত ধরেই ফুলে-ফেঁপে ওঠে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের অর্থের ভাণ্ডার। হাজার কোটি টাকার বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলার পেছনে আছে দেশের গণপাঠাগার খাতকে ধ্বংস করার করুণ-কঠিন আখ্যান। যা চেয়েছিলো মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। সরকারিভাবে গড়ে ওঠা বিশাল সংখ্যক এই গণপাঠাগারের ধ্বংসের মাধ্যমেই বাঙলা সাহিত্যে রুশ ও ভারতের প্রভাব বলয় ধীরে ধীরে খর্ব হতে শুরু করে। তার থেকেও ভয়াবহ হচ্ছে, একশ্রেণির ধর্মবাদী-মৌলবাদী আঁতেল সাহিত্যসেবীর জন্ম।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মাধ্যমে পাঠক তৈরির থেকেও বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন এক শ্রেণির ভণ্ড মতলববাজ সুশীল তৈরি করার পেছনে। আর সেই সঙ্গে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদের পাহাড় গড়াও মনযোগ দিয়েছেন। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রধান দৃশ্যমান অর্থদাতাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ প্রদান করা হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে। কার্যত এসব অর্থের আশি শতাংশ ব্যয় হয় বিলাসবহুল ভবন তৈরি, জমি ক্রয়, রক্ষণাবেক্ষণ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার পেছনে। পাঠক তৈরির অর্থের ব্যবহার কোথায় কীভাবে হয় তাও আমরা একটু জেনে নেবো আরও বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় আর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে জানা যায়, পাঠক তৈরির প্রকল্পের জন্য সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যম থেকে পাওয়া বিপুল অর্থ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ঢাকায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বিশাল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কার্যালয়ের পরিচালনা ব্যয়, চিহ্নিত মতলববাজ লেখক শ্রেণির পেছনে ব্যয় এবং পরামর্শক বাবদ খাতে ব্যয় করেছেন। কিন্তু তিনি এই বিপুল অর্থ ঢাকার বাইরের অন্যান্য জেলায় পাঠক তৈরির খাতে খরচ করেননি।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ঢাকা ভিত্তিক কিছু কার্যক্রম দেখে, রাজধানীর উচ্চবিত্ত ও সুশীলদের কাছে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এবং বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বিশাল কিছু। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশের মানুষের করের টাকা ব্যয় হয় বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের বিলাসবহুল পরিচালনা ব্যয় ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার পেছনে। এটা রীতিমত তুঘলকি কাণ্ড। অথচ এমনটাই বিগত ৪৬ বছর ধরে করে আসছেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র।
অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রতি বছর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাওয়া প্রায় ৫০ কোটি টাকা যদি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রকে না দিয়ে জেলা পর্যায়ের পাঠাগারগুলোর মধ্যে এই অর্থ বণ্টন করা হতো, তাহলে সারা দেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার বাস্তব পরিবর্তন দেখা যেত। এই অর্থ জেলাগুলোর গণপাঠাগারসমূহে বিতরণ করা হলে সকল জেলার গণপাঠাগারগুলো প্রান্তিক পর্যায়ের সকল স্কুল-কলেজে পৌঁছাতে অনেক সহজেই পারতো। এতে করে পাঠক তৈরি হতো বেশি, অর্থের ব্যয় হতো অনেক কম, আর দীর্ঘমেয়াদে ফলাফল পাওয়া যেত ধারণার চেয়েও অনেক বেশি।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বাটপারির মূলে আছে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কয়েকটি জেলা শহরকেন্দ্রিক কার্যক্রম, আর কিছু বাস ও পিকআপে বই নিয়ে ‘ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি’র মিডিয়া ভেলকি। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আড়ালে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের মনোপলি ব্যবসা ভাঙার দরকার ছিলো সবচেয়ে বেশি, এই প্রকল্পের খাতে ব্যয় হওয়া অর্থের বিকেন্দ্রীকরণও করা দরকার ছিলো জাতির বৃহত্তর স্বার্থে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র প্রতি বছর নিয়মিত সরকারি সহযোগিতা ও প্রকল্পের বাইরেও দেশের সকল ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সিএসআর খাত থেকে শত শত কোটি টাকার অর্থ সযোগিতা পেয়ে থাকে। সেসব অর্থের আশি শতাংশের ব্যবহার হয় নিজেদের ও কিছু নিষিদ্ধ ঘোষিত মৌলবাদী সংগঠনের ন্যারেটিভ তৈরির প্রয়োজনে। অথচ এসব অর্থদাতারা জানেই না তাদের দেওয়া অর্থের ব্যবহার কোথায় হচ্ছে। অডিট রিপোর্টেও থাকে চাতুরি।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের এসব অপকর্মের সহযোগি হচ্ছে তারই শিক্ষার্থী ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের অ্যালামনাই সাবেক এবং বর্তমান কিছু প্রভাবশালী আমলা আর সিআইএ প্রেসক্রাইভড্ সুশীল সমাজের একটি শক্তিশালী বলয়। এই দুই মহাপরাক্রমশালী অংশের তদবিরে ফুলে-ফেঁপে ওঠে আবুদল্লাহ আবু সায়ীদ ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভাণ্ডার। কিন্তু অনালোকিতই থেকে যায় আলোকিত মানুষ তৈরির কথিত প্রকল্প।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এবং বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র কিন্তু বিশ্ব বাটপার ডক্টর ইউনূসের থেকেও বেশি ক্ষতিকর, ডক্টর ইউনূস বিগত দেড় বছরে যাদের নিয়ে বাংলাদেশ ধ্বংস করেছে, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তাদের তৈরি করেছে দীর্ঘ ৪৬ বছর ধরে। একটি দেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রভাব বলয়ের দখল যারা নিতে পারে ন্যারেটিভ তাদের দখলেই থাকে। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ দীর্ঘ সময় ধরে সেই কাজটিই নিপুণ মস্তিষ্কে করে চলেছে। প্রথমে ধ্বংস করেছে দেশের গণপাঠাগার খাত, তারপর ধ্বংস করেছে দেশের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও দেশকে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড সেই সিআইএর’র স্টেশন প্রধান ফিলিপ চেরীর পুঁতে যাওয়া বীজ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র এখন দূরারোগ্য ক্যান্সার হয়ে গিলে খেয়েছে বাংলাদেশকে।
বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি ধ্বংসের হাত থেকে উত্তরণের জন্য এক তরুণ শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল হাত দিয়েছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে অন্দরের অর্থের জোগান বন্ধ করতে। এরপর এলো দুই হাজার চব্বিশের জুলাই-আগস্টে পাক-মার্কিন বলয়ের জঙ্গি ঝড়, সবকিছু লণ্ড-ভণ্ড করে দেশটাকে ধ্বংস করে দেওয়ার ষোলোকলা পূর্ণ হলো, এসব ধ্বংস ও অনাচারের পেছনের নাটেরগুরু কিন্তু এই আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এবং তার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। ভবিষ্যতের জন্য আমাদের সতর্ক হতে হবে এসব মতলবাজ শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মাফিয়াদের বিরুদ্ধে। এই বাংলাদেশ যেমন আমাদের সবার, এই বাংলাদেশকে পাক-মার্কিন মৌলবাদী ভণ্ড আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ’সহ অন্যান্য মতলবাজদের হাত থেকে রক্ষা করার দায়িত্বও আমাদের।
পঁচাত্তর পরবর্তী প্রেক্ষাপটে সিআইএ’র প্রেসক্রিপশনে রুশ ও ভারতের প্রভাব বলয় ধ্বংস করে দেশে মার্কিনপন্থি নয়া একটি মতলববাজ গোষ্ঠী তৈরির উদ্দেশ্যে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা ও দেশবিরোধী সকল ষড়যন্ত্রের ন্যারেটিভ তৈরির মানবসম্পদ গড়ার কারিগর হিসাবে আবির্ভূত হবার আদ্যোপান্ত তুলে ধরবো এই নিবন্ধে।
১৯৭৮ সালের জুন মাসের ১৭ তারিখে ঢাকা কলেজের শিক্ষক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে তৎকালীন সিঙ্গার বাংলাদেশের ঢাকার অফিসে লাঞ্চের নিমন্ত্রণ করেন সিঙ্গারের বাংলাদেশের উপ-মহাব্যবস্থাপক মজিবুল হক দুলু, ওই লাঞ্চে উপস্থিত ছিলেন মজিবুল হক দুলুর গ্লোবাল ফান্ডে কর্মরত ফরাসী স্ত্রী এবং মার্কিন দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা। মজিবুল হক দুলু আমাকে (নিবন্ধের লেখককে) নিজে বলেছিলেন সেদিনের ঘটনা। সেই লাঞ্চের সময়েই সিদ্ধান্ত হয় কিছু কালচারাল মুভমেন্ট করার জন্য মার্কিন দূতাবাস অর্থ সহযোগিতা দেবে। আর সেই লক্ষেই ওই বছরের জুন মাসের ২৯ তারিখে মজিবুল হক দুলুর বাসাতে ডিনারে আমন্ত্রিত হন তৎকালীন সিআইএ’র ঢাকার স্টেশন প্রধান ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড ফিলিপ চেরী এবং আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। সেই ডিনারেই সিদ্ধান্ত হয় রুশ ও ভারতের প্রভাব বলয় খর্ব করার জন্য বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনের ব্যাপক সংস্কার দরকার। আর এই ক্ষেত্রে দেশের তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে জনপ্রিয় ঢাকা কলেজের পাকিস্তানপন্থি শিক্ষক ও সাহিত্যসেবী আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ পারফেক্ট ব্যক্তি।
ফিলিপ চেরীর সঙ্গে সেই ডিনারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রথমে পাঠচক্রের মাধ্যমে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালানো হয়। সেই লক্ষ্যে ১৯৭৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর ঢাকা কলেজের পেছনে শিক্ষা সম্প্রসারণ কেন্দ্রের (এখনকার নায়েম) মিলনায়তনে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের উদ্যোগে শুরু হলো একটি পাঠচক্র। যার সদস্য সংখ্যা ছিলো মাত্র পনেরো, সবাই আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ছাত্র। এভাবেই শুরু হয় বাঙালি জাতির শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ধ্বংসের উদ্দেশ্যে সিআইএ’র দীর্ঘমেয়াদী সফট মিশন।
এর দুই বছর পর এই পাঠচক্রের আশাতীত সাফল্য দেখে সিআইএ’র পরিকল্পনায় দেশব্যাপী শত শত পাঠচক্রের মাধ্যমে দেশের কিশোর তরুণদের মার্কিন বলয়ে জড়িয়ে ফেলার মহাপরিকল্পনার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলত বই পড়ার পাশাপাশি নানামুখী সাংস্কৃতিক কর্মসূচির ভেতর দিয়ে তাদের উৎকর্ষ আর পরিশীলনের মুখোশের আড়ালে চলতে থাকে দেশের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও গণপাঠাগারকে ধ্বংস করার জন্য দীর্ঘমেয়াদী মহাপরিকল্পনা!
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সূচনা হয় ১৯৭৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর এবং এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় ১৯৮০ সালের ৬ মার্চ। মজিবুল হক দুলু ও তার ফরাসী স্ত্রীর মাধ্যমে ঘুমন্ত অর্থায়ন করতে থাকে সিআইএ। আর প্রকাশ্য অর্থায়নে বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় থাকলেও এর পেছনে চলতে থাকে দেশবিরোধী মহাপরিকল্পনা।
ঠিক একই সময়ে সিআইএ আর আইএসআই’র যৌথ সহযোগিতায় মঈদুল হাসানদের ‘পরমা’ প্রকল্পও চলতে থাকে। ‘পরমা’ প্রকল্পের লক্ষ্য ছিলো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি। যার প্রথম এবং একমাত্র দৃশ্যমান পণ্য হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নির্ভর বিকৃত বই মঈদুল হাসান রচিত ‘মূলধারা ৭১’। পরমা প্রকল্প আশানুরূপ সাফল্য দেখাতে না পারলেও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’ দূরারোগ্য ক্যান্সারের মতো বিঁধে যায় বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে।
সেই ১৯৭৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর থেকে আজ পর্যন্ত একটা বিশাল মতলববাজ দেশবিরোধী ক্ষমতাবান শ্রেণি গড়ে তোলে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, বিশেষ করে আমলাদের মধ্যে মারাত্মক প্রভাব বলয় তৈরি করতে সক্ষম হন তিনি, যারা তার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সরাসরি সুবিধাভোগী এবং পাঠচক্রের মাধ্যমে গড়ে ওঠা অ্যালামনাই। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন তহবিল পেতে তার অনুরাগী এই আমলা শ্রেণির ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। আর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সুবিধাভোগী এই আমলা শ্রেণির হাত ধরেই ফুলে-ফেঁপে ওঠে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের অর্থের ভাণ্ডার। হাজার কোটি টাকার বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলার পেছনে আছে দেশের গণপাঠাগার খাতকে ধ্বংস করার করুণ-কঠিন আখ্যান। যা চেয়েছিলো মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। সরকারিভাবে গড়ে ওঠা বিশাল সংখ্যক এই গণপাঠাগারের ধ্বংসের মাধ্যমেই বাঙলা সাহিত্যে রুশ ও ভারতের প্রভাব বলয় ধীরে ধীরে খর্ব হতে শুরু করে। তার থেকেও ভয়াবহ হচ্ছে, একশ্রেণির ধর্মবাদী-মৌলবাদী আঁতেল সাহিত্যসেবীর জন্ম।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মাধ্যমে পাঠক তৈরির থেকেও বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন এক শ্রেণির ভণ্ড মতলববাজ সুশীল তৈরি করার পেছনে। আর সেই সঙ্গে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদের পাহাড় গড়াও মনযোগ দিয়েছেন। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রধান দৃশ্যমান অর্থদাতাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ প্রদান করা হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে। কার্যত এসব অর্থের আশি শতাংশ ব্যয় হয় বিলাসবহুল ভবন তৈরি, জমি ক্রয়, রক্ষণাবেক্ষণ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার পেছনে। পাঠক তৈরির অর্থের ব্যবহার কোথায় কীভাবে হয় তাও আমরা একটু জেনে নেবো আরও বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় আর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে জানা যায়, পাঠক তৈরির প্রকল্পের জন্য সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যম থেকে পাওয়া বিপুল অর্থ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ঢাকায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বিশাল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কার্যালয়ের পরিচালনা ব্যয়, চিহ্নিত মতলববাজ লেখক শ্রেণির পেছনে ব্যয় এবং পরামর্শক বাবদ খাতে ব্যয় করেছেন। কিন্তু তিনি এই বিপুল অর্থ ঢাকার বাইরের অন্যান্য জেলায় পাঠক তৈরির খাতে খরচ করেননি।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ঢাকা ভিত্তিক কিছু কার্যক্রম দেখে, রাজধানীর উচ্চবিত্ত ও সুশীলদের কাছে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এবং বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বিশাল কিছু। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশের মানুষের করের টাকা ব্যয় হয় বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের বিলাসবহুল পরিচালনা ব্যয় ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার পেছনে। এটা রীতিমত তুঘলকি কাণ্ড। অথচ এমনটাই বিগত ৪৬ বছর ধরে করে আসছেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র।
অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রতি বছর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাওয়া প্রায় ৫০ কোটি টাকা যদি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রকে না দিয়ে জেলা পর্যায়ের পাঠাগারগুলোর মধ্যে এই অর্থ বণ্টন করা হতো, তাহলে সারা দেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার বাস্তব পরিবর্তন দেখা যেত। এই অর্থ জেলাগুলোর গণপাঠাগারসমূহে বিতরণ করা হলে সকল জেলার গণপাঠাগারগুলো প্রান্তিক পর্যায়ের সকল স্কুল-কলেজে পৌঁছাতে অনেক সহজেই পারতো। এতে করে পাঠক তৈরি হতো বেশি, অর্থের ব্যয় হতো অনেক কম, আর দীর্ঘমেয়াদে ফলাফল পাওয়া যেত ধারণার চেয়েও অনেক বেশি।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বাটপারির মূলে আছে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কয়েকটি জেলা শহরকেন্দ্রিক কার্যক্রম, আর কিছু বাস ও পিকআপে বই নিয়ে ‘ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি’র মিডিয়া ভেলকি। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আড়ালে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের মনোপলি ব্যবসা ভাঙার দরকার ছিলো সবচেয়ে বেশি, এই প্রকল্পের খাতে ব্যয় হওয়া অর্থের বিকেন্দ্রীকরণও করা দরকার ছিলো জাতির বৃহত্তর স্বার্থে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র প্রতি বছর নিয়মিত সরকারি সহযোগিতা ও প্রকল্পের বাইরেও দেশের সকল ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সিএসআর খাত থেকে শত শত কোটি টাকার অর্থ সযোগিতা পেয়ে থাকে। সেসব অর্থের আশি শতাংশের ব্যবহার হয় নিজেদের ও কিছু নিষিদ্ধ ঘোষিত মৌলবাদী সংগঠনের ন্যারেটিভ তৈরির প্রয়োজনে। অথচ এসব অর্থদাতারা জানেই না তাদের দেওয়া অর্থের ব্যবহার কোথায় হচ্ছে। অডিট রিপোর্টেও থাকে চাতুরি।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের এসব অপকর্মের সহযোগি হচ্ছে তারই শিক্ষার্থী ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের অ্যালামনাই সাবেক এবং বর্তমান কিছু প্রভাবশালী আমলা আর সিআইএ প্রেসক্রাইভড্ সুশীল সমাজের একটি শক্তিশালী বলয়। এই দুই মহাপরাক্রমশালী অংশের তদবিরে ফুলে-ফেঁপে ওঠে আবুদল্লাহ আবু সায়ীদ ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভাণ্ডার। কিন্তু অনালোকিতই থেকে যায় আলোকিত মানুষ তৈরির কথিত প্রকল্প।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এবং বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র কিন্তু বিশ্ব বাটপার ডক্টর ইউনূসের থেকেও বেশি ক্ষতিকর, ডক্টর ইউনূস বিগত দেড় বছরে যাদের নিয়ে বাংলাদেশ ধ্বংস করেছে, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তাদের তৈরি করেছে দীর্ঘ ৪৬ বছর ধরে। একটি দেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রভাব বলয়ের দখল যারা নিতে পারে ন্যারেটিভ তাদের দখলেই থাকে। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ দীর্ঘ সময় ধরে সেই কাজটিই নিপুণ মস্তিষ্কে করে চলেছে। প্রথমে ধ্বংস করেছে দেশের গণপাঠাগার খাত, তারপর ধ্বংস করেছে দেশের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও দেশকে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড সেই সিআইএর’র স্টেশন প্রধান ফিলিপ চেরীর পুঁতে যাওয়া বীজ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র এখন দূরারোগ্য ক্যান্সার হয়ে গিলে খেয়েছে বাংলাদেশকে।
বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি ধ্বংসের হাত থেকে উত্তরণের জন্য এক তরুণ শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল হাত দিয়েছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে অন্দরের অর্থের জোগান বন্ধ করতে। এরপর এলো দুই হাজার চব্বিশের জুলাই-আগস্টে পাক-মার্কিন বলয়ের জঙ্গি ঝড়, সবকিছু লণ্ড-ভণ্ড করে দেশটাকে ধ্বংস করে দেওয়ার ষোলোকলা পূর্ণ হলো, এসব ধ্বংস ও অনাচারের পেছনের নাটেরগুরু কিন্তু এই আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এবং তার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। ভবিষ্যতের জন্য আমাদের সতর্ক হতে হবে এসব মতলবাজ শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মাফিয়াদের বিরুদ্ধে। এই বাংলাদেশ যেমন আমাদের সবার, এই বাংলাদেশকে পাক-মার্কিন মৌলবাদী ভণ্ড আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ’সহ অন্যান্য মতলবাজদের হাত থেকে রক্ষা করার দায়িত্বও আমাদের।