শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মতামত আমাদের মফস্বল সাংবাদিকতা ও কিছু কথা

আমাদের মফস্বল সাংবাদিকতা ও কিছু কথা

শরীফ আহমেদ সুমন, সংবাদকর্মী :

একটা সময় সাংবাদিকতার প্রতি প্রবল আগ্রহ কাজ করতো। আজ আমার ইংরেজি পত্রিকার নবায়নকৃত কার্ড হাতে পেয়ে সে আগের উচ্ছ্বাস কাজ করছেনা। প্রথম যেদিন জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় আমার লোকালিটির বাজারে পিরানহা মাছ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়, সেদিন রাত ১২ টা বাজার অপেক্ষা করছিলাম, কখন অনলাইনে দেখবো আমার নিজের করা প্রতিবেদন! সেদিনের সে উচ্ছ্বাস আজ আর পাইনা। সাংবাদিকতাকে কিছু মানুষ আজ এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে সাধারণ মানুষের অনেকে হাস্যরস করেও বলে ফেলে "সাং'ঘাতিক"। নিজের পেশার প্রতি এমন শব্দ আসলে আমার যেমনি কাম্য নয়, বোধকরি কারোরই কাম্য নয়। তবে মফস্বলে সাংবাদিকতার সাথে সংশ্লিষ্ট থেকে সত্যি নিজের ভিতরেও এক ধরণের হীনমন্যতা কাজ করে এখন। 

আসুন কিছু বিষয় জেনে নেয়া যাক:

মফস্বলে সাংবাদিকতা একটু বেশীই চ্যালেঞ্জিং। কেনোনা উপজেলায় একজন প্রতিনিধি থাকে। একই প্রতিনিধি তার উপজেলার উন্নয়ন, অবক্ষয় সব কিছুর প্রতিবেদন করতে হয়। স্টাফ রিপোর্টারদের মতো কাজ ভাগ করা থাকেনা। এখন স্পট নিউজের বাইরে গিয়ে অনুসন্ধানী কোনো প্রতিবেদন করতে গেলে দেখা যায় সেটা কোনো ব্যক্তি বা গোত্রের বা কোনো দলের বিপক্ষে যেতে পারে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আসলে একজন মফস্বল সাংবাদিক বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে নিজের এলাকার কারও বিপক্ষে সংবাদ প্রকাশ করে কতোটা নিরাপদ। কারণ তার বাড়ি যেমনি চেনা তেমনি তারি আদি-অন্ত সবই স্থানীয়দের চেনা ও জানা। তবু বৃত্তের বাইরে গিয়ে যদি কেউ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করেও সেখানে তা  অনেক চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়। তবে সবার প্রতি অনুরোধ থাকবে যদি কোনো সাংবাদিকের প্রতিবেদন আজ আপনার বিপক্ষে যায় তা  মেনে নিতে শিখুন। কারণ আজ আপনার ক্ষমতা থাকলেও কাল আপনি মজলুম হতে পারেন, তখন এই সাংবাদিক যেনো আবার আপনার পক্ষে কোনো ক্ষমতার বিপক্ষে লিখতে পারে সে পথটুকু খোলা রাখুন। 

এবার আসা যাক অপসাংবাদিকতার বিষয়ে - 

মফস্বলে সাংবাদিকতা অনেকটাই সম্মানী নির্ভর। যাদের সংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রকাশ করা হয় তাদের সম্মানী ছাড়া আসলে মফস্বল সাংবাদিকের সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোনো আয় নেই। উপজেলা পর্যায়ে বিজ্ঞাপন খুবই কম। তাই বিজ্ঞাপনের কমিশনের উপর নির্ভর করারও কোনো উপায় নেই। তাই মফস্বলে সাংবাদিকতায় আসতে হলে এটাকে কেবল প্যাশন থেকেই নেয়া যেতে পারে, আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে নয়। ইদানিং কেউ কেউ এটাকে আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে নিতে গিয়েই বাঁধছে যতো বিপত্তি। আমি ব্যক্তিগত ভাবে এক সাংবাদিকের সাম্প্রতিক ঘটনা আজ শেয়ার করছি, এটা সাংবাদিকতা নাকি অপসাংবাদিকতা তা  ভেবে নেয়াটুকু পাঠকের উপর ছেড়ে দিলাম। 

সম্প্রতি এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সকাল সোয়া নয়টায় এক সাংবাদিক আসেন। তিনি এসে দেখেন একজন শিক্ষক আসতে ১৫ মিনিট সময় বেশি নিয়েছেন। তাতে তিনি প্রশ্ন করেন এবং সেই শিক্ষক তাকে জানান তার ছোট বাচ্চা অসুস্থ তাই তিনি তাকে ডাক্তার দেখিয়ে আসতে একটু সময় লেগেছে। যাই হোক সেই সাংবাদিক মহোদয় যদি দায়িত্বে অবহেলা প্রত্যক্ষ করে থাকেন তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করতে পারতেন। তিনি সেটা না করে তিনি উপস্থিত শিক্ষকবৃন্দকে বলেছেন "আমি শিক্ষা অফিসারকে বলে আপনাদের শোকজ করবো"। কথা হলো সাংবাদিকের কাজ কি শোকজ করানো নাকি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করা। তিনি তা করেননি। তিনি ২ দিন অপেক্ষা করেছেন শিক্ষকদের কেউ তার সাথে যোগাযোগ করেন কিনা। আর বোধকরি যোগাযোগের মানে পাঠকগণ অবগত আছেন। পরবর্তীতে শিক্ষা অফিস সেই স্কুলের শিক্ষকদের ডেকে পাঠান। এবং ২ হাজার টাকা সেই সাংবাদিক মহোদয়কে ঠান্ডা পানীয় পান করে ঠান্ডা হওয়ার জন্য প্রদান করার মাধ্যমে তাকে ঠান্ডা করা হয়। এমন কিছু ঘটনার কারণে আজ সাংবাদিকতার মতো মহান পেশাটি কলু'ষিত। আমরা নিজেদের সীমারেখা ভুলে গেছি। আর ভার্চুয়ালিটির এই সময়ে এসে কিছু ফেসবুক পেইজ খুলে এমন সাংবাদিকতা আরও সহজ হয়ে গেছে। কারণ এখানে কিছু লিখতে বলতে সম্পাদক পর্যায়ের কোনো সেন্সরশিপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়না, শুধু স্ক্যা'ন্ডাল চাই। এদের অনেকে আবার নানান সময়ে নানান রাজনীতিক কিংবা প্রভাবশালী মহলের সাথে অন্তরঙ্গ ছবি প্রকাশ করে এলাকায় নিজেকে বড় সাংবাদিক হিসেবে জাহির করে এলাকার খাস জমি, ভূমি অফিসে খারিজের সুপারিশ নামের দালালি, থানায় লবিং করার দালালী করে রাতারাতি ভাগ্যের পরিবর্তন করছেন। এমন কিছুর সংখ্যা কম হলেও মানুষের মনে এগুলো দাগ কেটে থাকে বলেই হয়তো আমাদের আজকাল মানুষ হাস্যরসের ছলে সাং'ঘাতিক বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। 

সর্বোপরি সংবাদ মাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। এটাকে কলুষিত না করে এর যথার্থ প্রয়োগের মাধ্যমে জনগণের কল্যাণে সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা হিসেবে অনন্তকাল বেঁচে থাক এই প্রত্যাশা করি। আর কাউকে এমন ঠান্ডা না খাইয়ে সাধারণের পর্যায় থেকে ২ টাকার অফসেট কাগজে আমরাও জবাব দিতে শিখি।

খুঁজুন