শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মতামত আন্তর্জাতিক কেলেঙ্কারির কেন্দ্রবিন্দুতে ওয়াশিংটন

আন্তর্জাতিক কেলেঙ্কারির কেন্দ্রবিন্দুতে ওয়াশিংটন

: 'ড্রপ সাইট নিউজ'-এর ঐতিহাসিক ফাঁস কাঁপিয়ে দিল বিশ্বরাজনীতি!

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মঞ্চে পরাশক্তিগুলোর নগ্ন হস্তক্ষেপ আর অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বের লড়াই নতুন কিছু নয়। কিন্তু এবার সামনে এসেছে এমন কিছু অকাট্য, দালিলিক প্রমাণ যা দীর্ঘদিনের লুকানো নোংরা সত্যকে উন্মোচন করে দিয়েছে, যার ঝাঁঝালো গন্ধ এখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। ২০২২ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে নাটকীয় অপসারণের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি ভূমিকা নিয়ে যে ফিসফাস ছিল, তা এখন 'সাইফার গেট' নামক এক আন্তর্জাতিক কেলেঙ্কারিতে পরিণত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম 'ড্রপ সাইট নিউজ' কর্তৃক প্রকাশিত অত্যন্ত গোপন কূটনৈতিক তারবার্তা বা 'সাইফার' কেবল একটি ডকুমেন্ট নয়, এটি ওয়াশিংটনের এক সুনির্দিষ্ট, চাপিয়ে দেওয়া এবং পরিকল্পিত 'রেজিম চেঞ্জ' বা সরকার পরিবর্তনের নির্লজ্জ ফর্মুলার জীবন্ত প্রমাণ!

এই নথির প্রকাশ মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর এতদিনের সমস্ত 'পবিত্র শপথ' ও ‘মিথ্যা সাফাইকে’ চুরমার করে দিয়েছে। সচেতন মহল তাকে এখন 'ডোনাল্ড লাই' (Donald Lie) বা মিথ্যাচারী ডোনাল্ড হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন, যা তার কূটনীতিক জীবনের সবচেয়ে বড় লজ্জা। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বার্তা হলো, রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন যে, দক্ষিণ এশিয়ায় ওয়াশিংটনের এই সরকার পরিবর্তনের ফর্মুলা কেবল পাকিস্তানেই সীমাবদ্ধ নয়, একই ছক ও ব্লু-প্রিন্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণেও নীরবে, নিভৃতে কাজ করে চলেছে, যা আমাদের দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য এক গভীর সতর্কবাণী।

২০২২ সালের ৭ মার্চ ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক দপ্তরে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। একদিকে ওয়াশিংটনে নিযুক্ত পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত আসাদ মজিদ খান এবং অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসনের প্রভাবশালী কর্মকর্তা ডোনাল্ড লু। এই বৈঠকের সারসংক্ষেপ সম্বলিত গোপন তারবার্তা, যার অফিশিয়াল কোড নাম “ক্যাবল আই-০৬৭৮”, এখন বিশ্ববাসীর সামনে উন্মুক্ত, এবং এর প্রতিটি শব্দ যেন ওয়াশিংটনের ক্ষমতার দম্ভের প্রতিচ্ছবি। এই নথিতে দেখা যায়, ডোনাল্ড লু কতটা ঔদ্ধত্যপূর্ণ এবং ঔপনিবেশিক মানসিকতায় পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে হুঙ্কার ছেড়েছিলেন: ইউক্রেন ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রাক্কালে ইমরান খানের মস্কো সফর এবং কোনো জোটে না গিয়ে পাকিস্তানের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করাকে মার্কিন প্রশাসন তাদের 'অহমিকায় আঘাত' হিসেবে দেখেছে। লু সরাসরি পাকিস্তানি দূতকে জানান, যদি পার্লামেন্টে বিরোধীদের আনা অনাস্থা প্রস্তাব সফল হয় এবং ইমরান খানকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়, তবেই কেবল আমেরিকার সমস্ত ক্ষোভ দূর হবে এবং পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক 'স্বাভাবিক' হবে! এর চেয়ে বড় শর্ত আর কী হতে পারে? এমনকি লু সতর্ক করেন, যদি ইমরান খান কোনোভাবে ক্ষমতায় টিকে যান, তবে পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে চরম অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক একাকীত্ব বা আইসোলেশনের শিকার হতে হবে! এক কথায়, হয় আমাদের কথা শোনো, নয়তো ধ্বংস হও—এই ছিল ওয়াশিংটনের ভয়ঙ্কর বার্তা।

ক্রিকেটের সবুজ মাঠ থেকে উঠে এসে পাকিস্তানের শাসনভার নেওয়া ইমরান খান একটি স্লোগান দিয়ে আসছিলেন — ”লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” (একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কারও সামনে মাথা নত করব না)। এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে তিনি যখন একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বাবলম্বী পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন, তখনই তিনি ওয়াশিংটনের মূল টার্গেটে পরিণত হন। তার ক্ষমতাচ্যুতির নেপথ্যে মূলত তিনটি 'অপরাধ' ছিল: মস্কো সফর ও ইউক্রেন যুদ্ধে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ, আফগানিস্তান পরবর্তী মার্কিন অভিযানের জন্য পাকিস্তানে সামরিক ঘাঁটি দিতে সরাসরি অস্বীকৃতি, এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC) নিয়ে অনড় অবস্থান, যা মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থী ছিল। বিশেষ করে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর আল-কায়েদা বা আইএসের ওপর নজরদারির জন্য পাকিস্তানে ড্রোন ও সামরিক ঘাঁটি চালুর মার্কিন আবদারকে ইমরান খান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে লাইভ ইন্টারভিউতে মাত্র দুই শব্দে নাকচ করে দিয়েছিলেন — “অ্যাবসোলিউটলি নট”! নিজের দেশের মাটিকে কোনো বিদেশি পরাশক্তির ভূরাজনৈতিক যুদ্ধের আখড়া বানাতে না দেওয়ার এই চরম সাহসিকতাই তাঁর পতন ডেকে আনে, যা স্বাধীনতাকামী দেশগুলোর জন্য এক করুণ দৃষ্টান্ত।

ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই ইমরান খান এবং তাঁর দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) এই সাইফার বা গোপন চিঠির কথা বলে দেশজুড়ে মার্কিন বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলে। তারা এটিকে সরাসরি একটি “বিদেশি ষড়যন্ত্র” হিসেবে অভিহিত করে। অথচ সেই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র নেড প্রাইস অত্যন্ত সুকৌশলে সাংবাদিকদের সামনে দাবি করেছিলেন, “ইমরান খানের এই সমস্ত অভিযোগের “কোনো সত্যতা নেই বা কোনো ভিত্তি নেই”। খোদ ডোনাল্ড লু মার্কিন কংগ্রেসে শুনানির মুখোমুখি হয়ে 'পবিত্র শপথ' নিয়ে দাবি করেছিলেন যে, তিনি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো হস্তক্ষেপ করেননি। আজ ২০২৬ সালের মে মাসে যখন 'ড্রপ সাইট নিউজ' আসল সরকারি নথিটিই ফাঁস করে দিল, তখন ডোনাল্ড লুর সেই সমস্ত বক্তব্য 'মিথ্যা সাফাই' হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে এবং তার কেরিয়ারে এক বিশাল কালো দাগ এঁকে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে এখন এটি প্রতিষ্ঠিত যে, ওয়াশিংটন অনুন্নত দেশগুলোর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার যে বুলি আওড়ায়, তার পেছনে লুকিয়ে থাকে কেবলই নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের নোংরা খেলা, যা গণতন্ত্রের নামে প্রহসন ছাড়া আর কিছু নয়।

২০২২ সালের ৯ এপ্রিল মধ্যরাতের এক নজিরবিহীন নাটকীয়তায় পাকিস্তানের পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে হেরে যান ইমরান খান। পাকিস্তানের ইতিহাসে তিনিই প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রী, যাকে এই প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এরপর তাঁর ওপর নেমে আসে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের স্টিমরোলার। তোশাখানা দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ফাঁস (সাইফার মামলা) এবং আদালত অবমাননাসহ শত শত মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয় তাঁকে। ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে ইমরান খান এবং তাঁর স্ত্রী বুশরা বিবিকে নাটকীয়ভাবে গ্রেপ্তার করে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দি করা হয়। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে পিটিআই-এর ঐতিহাসিক দলীয় প্রতীক ‘ক্রিকেট ব্যাট’ কেড়ে নেওয়া হয়, যাতে তারা নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে। এরপরও দলটির সমর্থিত প্রার্থীরা স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ে ব্যালটের মাধ্যমে নীরব বিপ্লব ঘটালেও, ফলাফল প্রকাশ এবং নির্বাচন কমিশনের গেজেট তৈরিতে ব্যাপক কারচুপির মাধ্যমে একটি পুতুল বা ছায়া সরকারকে ক্ষমতায় বসানো হয়, যার খেসারত আজ পুরো পাকিস্তানের জনগণ চরম অর্থনৈতিক মন্দা ও মুদ্রাস্ফীতির মাধ্যমে দিচ্ছে, যা তাদের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের ওপর এক গভীর ছায়া ফেলেছে।

পাকিস্তানের এই ‘সাইফার গেট’ কেলেঙ্কারি এবং ডোনাল্ড লুর এই গোপন তৎপরতা দক্ষিণ এশিয়ার আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল সতর্কবার্তা ও জ্বলন্ত উদাহরণ। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়নশীল ও ভূকৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সরকার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের একটি নির্দিষ্ট 'গ্লোবাল ফর্মুলা' বা ‘মাস্টার থিম’ রয়েছে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে যে ফর্মুলা প্রয়োগ করা হয়েছে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও হুবহু সেই একই ফর্মুলা ও সমীকরণ খুঁজে পাওয়া যায়। যখন কোনো দেশের সরকার মার্কিন ভূরাজনৈতিক অক্ষ বা কোয়াড (QUAD) এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে (IPS) পুরোপুরি শরিক হতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে এবং চীন বা রাশিয়ার সাথে ভারসাম্যমূলক অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখে, তখন ওয়াশিংটন অসন্তুষ্ট হয়। এরপর মানবাধিকার, শ্রম অধিকার বা ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনের দোহাই দিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা ভিসানীতির মতো অদৃশ্য চাপ সৃষ্টি করা হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় ডোনাল্ড লুর ঘন ঘন সফর এবং পর্দার আড়ালে সুশীল সমাজ, বিরোধী দল ও নীতিনির্ধারকদের সাথে বৈঠক করার ধরণটি পাকিস্তান ও বাংলাদেশ—উভয় দেশেই হুবহু মিলে যায়। অবশেষে, দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটকে পুঁজিপতি ও রাজনৈতিক বিরোধীদের মাধ্যমে উস্কে দিয়ে একটি কৃত্রিম অস্থিরতা তৈরি করা হয় এবং একপর্যায়ে সুকৌশলে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিবর্তন আনা হয়। এই ধাপগুলো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও ভয়ঙ্করভাবে মিলে যাচ্ছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করছে।

পাকিস্তানের মাটিতে ইমরান খানকে যেভাবে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির খেসারত দিতে হয়েছে, ঠিক একইভাবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মেলবন্ধন ঘটিয়ে একই ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হয়েছে বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। পাকিস্তানের সাইফার ফাঁস মূলত আমাদের চোখ খুলে দেয় যে, মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও পর্দার আড়ালে কীভাবে সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোর স্বাধীনতাকে খর্ব করার ছক কষা হয়। পাকিস্তানের আদিয়ালা কারাগারের চার দেওয়ালের বন্দি থেকেও ইমরান খানের তোলা অভিযোগ যেভাবে আজ বিশ্ব গণমাধ্যমে সত্য প্রমাণিত হলো, তা বিশ্বজুড়ে মজলুম ও স্বাধীনতাকামী রাষ্ট্রনেতাদের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা। অন্যদিকে, পরাশক্তিগুলোর এই গোপন ‘রেজিম চেঞ্জ’ ফর্মুলা থেকে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলো কীভাবে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে, সেটাই এখন মে ২০২৬-এর এই সময়ে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ, যা আগামী দিনের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করবে।

খুঁজুন