মাজহারুল ইসলাম মাসুম, সিনিয়র সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক :
আধুনিক বাংলা
গদ্যের তৃতীয় পর্যায় অতিক্রম করছি আমরা। গদ্য সাহিত্যের প্রথম পর্যায়ে: ১৮০০ সাল
থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত; অর্থাৎ তখন ইংরেজ আমল। দ্বিতীয় পর্যায়: ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১
সাল পর্যন্ত; অর্থাৎ পাকিস্তান আমল। তৃতীয় পর্যায়: ১৯৭১ থেকে অদ্যাবধি। বাংলাদেশের
অভ্যুদয়ের পরবর্তী রাজনৈতিক চালচিত্র মানুষের অন্তস্থলে কতখানি প্রভাবিত করেছিল- সে
বিষয়টি হয়তো জানা সম্ভব হয়নি। কিন্তু একটি দেশের শিল্প-সাহিত্যকে বহিরাবয়বে নতুনভাবে
ভেঙে গড়ে দিয়ে ছিল- এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে। আমি বাংলা সাহিত্য বলতে আমার বাংলাদেশের
সাহিত্যকে বোঝাতে চাই। পশ্চিম বাংলার সাহিত্যকে প্রসঙ্গতঃ কারণে বাদ রাখছি।
বাংলাদেশ
নামক আলঙ্কিত ভূখণ্ডের সাহিত্যকেই আমরা বাংলাদেশি সাহিত্য হিসেবে বুঝে থাকি। তবে আমার
বিবেচনায় ভাষার শক্তি রাষ্ট্রশক্তি চেয়ে বেশি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের দেড় হাজার
বছরের যে শক্তি তা যে কোনো রাষ্ট্রশক্তির চেয়ে অভঙ্গুর। আমি বিশ্বাস করি, আমার প্রকৃত
স্বদেশ আমার মাতৃভাষা। আর সেদিক থেকে বিচার করলে সাহিত্য সব সময় অবিভাজ্য ও প্রবহমান।
বাংলাদেশের সাহিত্য বিচার ১৯৭১ সাল থেকে শুরু হয়নি। এর পেছনে আছে হাজার বছরের দীর্ঘ
যাত্রাপথ । যদিও চূড়ন্ত উৎস ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটি। আমাদের সুদীর্ঘ অতীত
এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ-এর মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করে দিতে ২১শে ফেব্রুয়ারির আগমন অবসম্ভাবি
ছিল। ইতিহাসের এই ধারাবাহিকতা মনে রেখে আমরা ‘শেখ হাসিনা ও বাঙালি মানসে বঙ্গবন্ধু’ প্রবন্ধ গ্রন্থটি আলোচনায়
অগ্রসর হতে চাই। আমাদের বিবেচ্য স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের আলোকে একটি
বিশ্লেষণধর্মী মূল্যায়ন উপস্থাপন করা।
সাহিত্যের ইতিহাস মূল্যায়ন করলে আমরা দেখতে পাই, কবিতার পরেই ‘গবেষণার
সাহিত্য’ সর্বাধিক সমৃদ্ধ শাখা। বাংলাদেশ রাষ্ট্র জন্মের অব্যহতি পরে
সমালোচনা সাহিত্য ও ‘গবেষণা প্রবন্ধ’ প্রচুর প্রণীত হয়েছে বলেই আজ আমাদের এ সম্পর্কে কথা বলা প্রয়োজন।
বাংলা ভাষার যে কোনো বিষয় নিয়ে- তা যত দুরূহ ও দুষ্প্রাপ্যই হোক না কেন; যেমন:
দর্শন, বিজ্ঞান, অর্থশাস্ত্র, গণিত, ন্যায়শাস্ত্র প্রভৃতি বিষয়ে নানা বিশ্লেষণাত্ম
গবেষণা আমাদের সাহিত্যে কম-বেশি প্রণীত হয়েছে। আমি এই নিবন্ধে সাহিত্য গবেষণা
প্রসঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করতে চাই। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, বাংলা ভাষায় লিখিত
প্রবন্ধগুলোতে বাংলা সাহিত্যের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত হয়নি। বর্তমান
আলোচনায় আমি রাজনৈতিক বিচারে মন্ময় প্রবন্ধকে- এর অন্তর্ভুক্ত করে বিশ্লেষণ করতে
চাই। এ কথা মনে রাখা দরকার যে, কোনো কোনো প্রবন্ধ ও গবেষণা পরস্পরের মধ্যে
প্রবিষ্ট হয়েছে। আবার, কোনো কোনো প্রাবন্ধিক ও গবেষক একই ব্যক্তি। তবে সবাইকে
একটি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, কথা সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েও ছোটগল্প ও উপন্যাস
যেমন দুটি স্বতন্ত্র্য মাধ্যম। তেমনি চিন্তামূলক রচনা হয়েও প্রবন্ধ ও গবেষণার
মধ্যে যোজন ফারাক।
বাংলাদেশের যখন জন্ম হলো ততদিনে আমাদের প্রধান কয়েকজন গবেষক
ইতঃমধ্যে গত হয়েছেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ,
আব্দুল গফুর সিদ্দিকী, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. মুহম্মদ আব্দুল হাই, মুনীর
চৌধুরী প্রমুখ। বাংলাদেশের জন্মের পর অনেকদিন বেঁচে ছিলেন মোঃ মনসুর উদ্দিন,
মুহম্মদ এনামুল হক, আবদুল কাদির প্রমুখ। তবে অধুনাকালে ওনারাও গত হয়েছেন। প্রবীণ
গবেষকদের মধ্যে আহমদ শরীফ, সৈয়দ আলী আহসান, আশরাফ সিদ্দিকী, কাজী দীন মুহম্মদ,
মোস্তফা নুরুল ইসলাম, আব্দুস সাত্তার, মাজহারুল ইসলাম, কাজী আব্দুল মান্নান,
মোহাম্মদ আবু তালিব প্রমুখ বরেণ্য গবেষক আমাদের গবেষণা সাহিত্যে দ্রুতি ছড়িয়েছেন।
এদের মধ্যে অকাল প্রয়াত হয়েছিলেন সুনীল মুখোপাধ্যায়।
বর্তমান সময়ের গবেষকদের মধ্যে আব্দুল হাফিজ, রফিকুল
ইসলাম, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান, আনিসুজ্জামান, বিশ্বজিৎ
ঘোষ, রফিকউল্লাহ খান প্রমুখ আমাদের প্রবন্ধ সাহিত্যে আলো ছড়াচ্ছেন। তবে, এঁদের
মধ্যে করোনা রোগে আক্রান্ত হয়ে সম্প্রতি গত হয়েছেন বাংলাদেশের শিক্ষক ও জাতীয়
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। বাংলাদেশ জন্মের পর বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা
প্রবন্ধ রচিত হয়েছে এবং তার উপর ভিত্তি করে এম ফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করা
হয়েছে। কিন্তু ডিগ্রি প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে লিখিত গবেষণা অভিসন্দর্ভগুলো কতটা কাজে
আসছে সে দিকটি আমাদের বিবেচ্য বিষয়।
লোকসাহিত্য নিয়ে গবেষণা করেছেন এমন কয়েকজন গবেষক হলেন: আবুল কালাম
মোহাম্মদ যাকারিয়া, আশরাফ সিদ্দিকী, মাজহারুল ইসলাম, আব্দুস সাত্তার, আব্দুল
হাফিজ, আনোয়ার করিম খন্দকার, রিয়াজুল হক, এস এম লুৎফর রহমান, তিতাশ চৌধুরী, আবুল
আহসান চৌধুরী প্রমুখ।
গবেষণা কর্মের অন্যতম বাহন হচ্ছে গদ্য। সাবলীল গদ্য এবং সঠিক
তথ্য-উপাত্ত সংযুক্ত করে প্রবন্ধকে আকর্ষণীয় করে তোলা যায়। গবেষণাকর্মকে পাঠকের
কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য গবেষণাধর্মী পত্র-পত্রিকা প্রকাশ অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা সাহিত্যের বিকাশে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। এর
মধ্যে সাহিত্য পত্রিকা, সাময়িকী পান্ডুলিপি, ভাষা ও সাহিত্যপত্র, বাংলা একাডেমি
পত্রিকা, নজরুল একাডেমি পত্রিকা, কালি ও কলম পত্রিকা, সমকাল পত্রিকা, কবিতাপত্র,
কণ্ঠস্বর পত্রিকা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।
আমাদের বাঙালি মানসে বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক গবেষণাকর্মটিকে
বিশ্লেষণপূর্বক মূল্যায়ন করে এ সম্পর্কে একটি নাতিদীর্ঘ আলোচনা উপস্থাপন করা।
গ্রন্থটির প্রণেতা খান চমন-ই-এলাহি নব্বইয়ের দশকের অন্যতম একজন কবি।
শুধু কবি বললে ভুল বলা হবে। তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, শিশু সাহিত্যিক,
সাংবাদিক, সংগঠক, গবেষক ও অ্যাডভোকেট। বিচিত্র বিষয় নিয়ে তিনি লেখালেখি
করছেন। তাঁর লেখায় তিনি অতীত আর বর্তমানকে একসূত্রে গেঁথেছেন। বাংলার সঠিক ইতিহাস
তিনি ভবিষ্যতের পাঠকের কাছে পৌঁছানোর জন্য বদ্ধপরিকর । পেশা আইন ব্যবসা হলেও
লেখালেখি এবং সাংবাদিকতার মাধ্যমে তিনি সমাজসেবা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান
রেখে চলেছেন। মানুষই একমাত্র সত্য। ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু
নাই, নহে কিছু মহীয়ান।’ এই সত্যকে তিনি হৃদয়ে ধারণ করে সামনে এগিয়ে যেতে চান। আমরা
লেখালেখিতেও তার প্রমাণ পাই। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে: ‘মুক্তিযুদ্ধে
লিখে রাখে নাম’, ‘মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাড়ি গোপালগঞ্জ’, ‘টঙ্গীপাড়া
থেকে সুধা সদন’, ‘ভূমিকন্যা’, ‘মেয়েটি বাংলাদেশ প্রজন্মের’, ‘বাংলাদেশের
মুক্তিযুদ্ধ ও হেমায়েত বাহিনী’, ‘মৃত্যুবার্ষিকীর আগে প্রথম শোকসভা,’ ‘অবরোধে
প্রণয়রাত,’ ‘বালিকার জবানবন্দি,’ ‘তিলোত্তমা,’ ‘মানবের জয়গান’, ‘প্রিয় কবি খান আজিজুল হক,’ ইত্যাদি। লেখকের জন্ম
বৃহত্তর ফরিদপুরের গোপালগঞ্জ জেলার গোপালপুরে। বাবা খান আজিজুল হক ও মাতা হালিমা
আজিজের জ্যেষ্ঠ সন্তান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার
সুযোগ পেয়েছেন। অর্জন করেছেন আইনসহ তিনটি বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েট তিনি।
“শেখ
হাসিনা ও বাঙালি মানসে বঙ্গবন্ধু” একটি ভিন্নধর্মী গ্রন্থ। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, যাঁর জন্ম না
হলে বাংলাদেশের জন্ম হতো না, সেই মহান ব্যক্তি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিবুর রহমানের জীবন ও কর্মের বিভিন্ন দিক এই গ্রন্থের প্রবন্ধগুলোতে তুলে ধরার
চেষ্টা করা হয়েছে। সেই সাথে স্থান পেয়েছে বঙ্গবন্ধুকন্যা, দেশরত্ন শেখ হাসিনার
জীবন ও আদর্শ। আসলে গ্রন্থটি একজন লেখকের নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে
বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সমাজ, মানুষের জীবন কাঠামো, দেশ ও বৈশ্বিক রাজনীতিকে
আলোকপাত করা হয়েছে। ইতিহাসের ক্ষয়ে যাওয়া পৃষ্ঠা থেকে লেখক যেন সঠিক তথ্য আমাদের
সামনে তুলে আনার চেষ্টা করেছেন।
গ্রন্থটিতে স্থান পেয়েছে
ব্রিটিশ শাসনের পরে পাকিস্তান পর্বে দেশের মানুষের পরাধীনতার শৃংখল এবং সেখান থেকে
উত্তরণের প্রচেষ্টা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী রাজনৈতিক ভাবনা, ভাষা আন্দোলন এবং
পরবর্তী রাজনীতি, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামো এবং বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা আন্দোলনের
মাধ্যমে দেশকে স্বাধিকার আন্দোলনের দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা প্রভৃতি। সেই
সাথে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিবৈশিষ্ট্য, জেল-জুলুম, অত্যাচার সহ্য করে সোনার বাংলা
বিনির্মাণে পথে অগ্রসর হওয়ার সম্পর্কে বইটি পড়ে আমরা জানতে পারব। বাংলাদেশ
অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। বাংলাদেশ ছাড়াও দেশের বাইরে পৃথিবীর বিভিন্ন
দেশে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ বাস করে। যারা বাংলাদেশকে ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত, একটি
উন্নত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছেন। আমরা যাদেরকে বলি
রেমিটেন্স যোদ্ধা বা প্রবাসী বাঙালি।
১৯৭১ সালের নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগের
বিনিময়ে আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন সার্বভৌম-বাংলাদেশ। দেশের সম্মান, মর্যাদা এর
স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার।লেখক খান চমন-ই- এলাহি
বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে প্রতিটি প্রবন্ধ রচনা করেছেন। গ্রন্থটি উৎসর্গ
করেছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান, বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার আদর্শে অনুপ্রাণিত সকল সৈনিক এবং দেশরত্ন শেখ
হাসিনার প্রতি। এখানে গ্রন্থাকারের মানসজাত প্রবণতা লক্ষ্য করার মতো । ২০৮ পৃষ্ঠার
এই বইটিতে লেখক তেরোটি প্রবন্ধ, পরিশিষ্ট এবং তথ্যসূত্র সংযোজন করে আগামীদিনের
গবেষকদের জন্য মূল্যবান করে তুলেছেন। প্রবন্ধগুলো বাংলাদেশ, দেশের মানুষ, সংগ্রাম
এবং ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পথ চলা, তাঁর জীবনের নানা দিক
নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
“অসমাপ্ত
আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা, আমার দেখা নয়া চীন: নিজেকে ও বিশ্বকে জানার
মাধ্যম” শীর্ষক প্রবন্ধে বঙ্গবন্ধুর লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের
রোজনামচা, আমার দেখা নয়া চীন প্রভৃতি গ্রন্থের মূল্যায়নধর্মী বিশ্লেষণ আমাদেরকে
নতুন এক বিস্ময়ে নিয়ে যায়। শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগ্রহণ করেছিলেন গোপালগঞ্জের
টুঙ্গিপাড়ায়। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ। নানা শখ করে তাঁর নাম রেখেছিলেন শেখ মুজিবুর
রহমান। যদিও তাঁর ডাকনাম ছিল ‘খোকা’। তখন কে জানত এই খোকাই একদিন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ববন্ধুতে
পরিণত হবেন। যাঁর জন্য এই দেশ, তিনি আমাদের সবার প্রিয় বঙ্গবন্ধু। তাঁর হৃদয়ে
সর্বদা খেলা করত দেশের মঙ্গল। তিনি বাঙালি ও বাংলাদেশ দেশের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ
সন্তান। অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যতের বাঙালির মধ্যে তিনি স্মরণীয়-বরণীয়। তাঁর তুলনা
করা চলে না। দেশের শোষিত, বঞ্চিত, মেহনতি মানুষের কল্যাণে তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র্য।
তিনি বাঙালির চেতনায় আলোর মশাল জ্বালিয়ে ছিলেন। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত
কেবল একটি কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হয়েছে লক্ষ কণ্ঠস্বরে। বাংলাদেশের স্থপতি জাতির
পিতা মুজিবুর রহমানের তিনটি গ্রন্থ নিয়ে লেখকের তথ্যসমৃদ্ধ বিশ্লেষণ- যা ইতিহাস
গবেষণার ক্ষেত্রে এক মূল্যবান সংযোজন।
“শেখ
হাসিনার দর্শন ও গ্রন্থে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু” শীর্ষক প্রবন্ধে লেখক
দেখাতে চেয়েছেন জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে মাননীয়
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবিক মূল্যবোধ ও দর্শনের মাধ্যমে কীভাবে দেশকে সামনের
দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। দেশকে উন্নত ও আধুনিকীকরণে শেখ হাসিনার ভূমিকা
সুদূরপ্রসারি। দেশের মানুষের অধিকার রক্ষায় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা নিরন্তর
কাজ করে যাচ্ছেন। বিভিন্ন সময়ে তাঁর এই কাজগুলোকে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। শেখ
হাসিনার ভাষণ এবং তাঁর মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে। শেখ
হাসিনার গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে: ‘বাংলাদেশে স্বৈরাতন্ত্রের
জন্ম’, ‘ওরা টোকাই কেন,’ ‘দারিদ্র দূরীকরণ কিছু চিন্তা-ভাবনা’, ‘বিপন্ন
গণতন্ত্র লাঞ্ছিত মানবতা’, ‘বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নয়ন’, ‘সবুজের
মাঠ পেরিয়ে’, ‘সহে না মানবতার অবমানন ‘, ‘সাদাকালো’,
‘পিপল এন্ড ডেমোক্রেসি’, ‘আমরা
জনগণের কথা বলতে এসেছি’, ‘ডেভলপমেন্ট অফ দ্য মেসেজ’, ‘সামরিকতন্ত্র
বনাম গণতন্ত্র’, ‘বাংলা আমার আমি বাংলার’, ও ‘বাংলাদেশের
জাতীয় সংসদে শেখ মুজিবুর রহমান’, প্রভৃতি গ্রন্থ। এসব গ্রন্থে তিনি দেশের মানুষ, মানুষের
দুঃখ-দুর্দশা চিহ্নিত করার পাশাপাশি, কীভাবে তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক,
রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়- সে বিষয় নিয়ে আলোকপাত করেছেন।
পাশাপাশি পিতা বঙ্গবন্ধুর
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, মানবিক গুণাবলি এবং তার জীবন ও কর্ম তুলে ধরেছেন। প্রসঙ্গত
উল্লেখ্য যে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে
বাংলাদেশের যে জঘন্য একনায়কতন্ত্র শাসনব্যবস্থা কায়েম করা হয়েছিল। শেখ হাসিনা
সেই জায়গা থেকে বাঙালিকে মুক্ত করে বাংলাদেশকে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক
রাষ্ট্রে পরিণত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
লেখক “জয় বাংলা কীভাবে আমাদের হলো” শীর্ষক প্রবন্ধে ‘জয়
বাংলা’ শ্লোগানটির আদ্যান্ত ব্যাখ্যা করেছেন। আমাদের বাঙালির পরিচয় সাথে
নিবিড়ভাবে জড়িত রয়েছে ‘জয় বাংলা’ শব্দদ্বয়। ‘জয় বাংলা’ একটি চেতনার নাম। বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় স্মারক। এই
শব্দদ্বয় একদিনে সৃষ্টি হয়নি। ১৯২৪ সালে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম
তাঁর ‘পূর্ণ অভিনন্দন’ শীর্ষক গীতিকবিতায় প্রথম ‘জয় বাংলা’
কথাটি উল্লেখ করেছেন। ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানটি বিপ্লবের হাত ধরে এসেছে। পরাধীনতার বিরুদ্ধে মানবতার
মুক্তির পথ ও স্বাধীনতার পক্ষে এই শব্দটি ব্যবহৃত হতো। ‘জয়
বাংলা’ মূলত বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের কণ্ঠস্বর। এই শ্লোগানের মাধ্যমে
বাঙালি মুক্তিকামী মানুষকে আলাদা করা হতো। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি দখলদার
হানাদার বাহিনী যখন ইসলামের নামে এদেশের মানুষের উপর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ শুরু
করেছিল- তখন ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানের মাধ্যমেই পাকিস্তানি আদর্শ এবং বাঙালি আদর্শকে আলাদা করা
হয়েছে। ‘জয় বাংলা’ তাই কেবল একটি শ্লোগানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বাঙালি জাতির
মুক্তির স্বর। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু ‘জয়
বাংলা’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। ২৭শে মার্চ, ১৯৭১ মেজর জিয়াউর রহমান
বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠকালে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে ‘জয়
বাংলা’ শব্দটি পুনরায় ব্যবহার করেন। ‘জয় বাংলা’
বাংলার মেহনতি মানুষের মুখের বুলি। পৃথিবীর কোনো ভাষা থেকে ধার করে আনা শব্দ নয়।
নিজ বাসভূমে থেকে আরোহিত, হৃদয়ে থেকে উচ্চারিত এক গৌরব শ্লোক।
বাঙালি মানসে বঙ্গবন্ধু
বাঙালি মানসে বঙ্গবন্ধু
মাজহারুল ইসলাম মাসুম, সিনিয়র সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক :আধুনিক বাংলা গদ্যের তৃতীয় পর্যায় অতিক্রম করছি আমরা। গদ্য সাহিত্যের প্রথম পর্যায়ে: ১৮০০ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত; অর্থাৎ তখন ইংরেজ আমল। দ্বিতীয় পর্যায়: ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত; অর্থাৎ পাকিস্তান আমল। তৃতীয় পর্যায়: ১৯৭১ থেকে অদ্যাবধি। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরবর্তী রাজনৈতিক চালচিত্র মানুষের অন্তস্থলে কতখানি প্রভাবিত করেছিল- সে বিষয়টি হয়তো জানা সম্ভব হয়নি। কিন্তু একটি দেশের শিল্প-সাহিত্যকে বহিরাবয়বে নতুনভাবে ভেঙে গড়ে দিয়ে ছিল- এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে। আমি বাংলা সাহিত্য বলতে আমার বাংলাদেশের সাহিত্যকে বোঝাতে চাই। পশ্চিম বাংলার সাহিত্যকে প্রসঙ্গতঃ কারণে বাদ রাখছি। বাংলাদেশ নামক আলঙ্কিত ভূখণ্ডের সাহিত্যকেই আমরা বাংলাদেশি সাহিত্য হিসেবে বুঝে থাকি। তবে আমার বিবেচনায় ভাষার শক্তি রাষ্ট্রশক্তি চেয়ে বেশি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের দেড় হাজার বছরের যে শক্তি তা যে কোনো রাষ্ট্রশক্তির চেয়ে অভঙ্গুর। আমি বিশ্বাস করি, আমার প্রকৃত স্বদেশ আমার মাতৃভাষা। আর সেদিক থেকে বিচার করলে সাহিত্য সব সময় অবিভাজ্য ও প্রবহমান। বাংলাদেশের সাহিত্য বিচার ১৯৭১ সাল থেকে শুরু হয়নি। এর পেছনে আছে হাজার বছরের দীর্ঘ যাত্রাপথ । যদিও চূড়ন্ত উৎস ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটি। আমাদের সুদীর্ঘ অতীত এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ-এর মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করে দিতে ২১শে ফেব্রুয়ারির আগমন অবসম্ভাবি ছিল। ইতিহাসের এই ধারাবাহিকতা মনে রেখে আমরা ‘শেখ হাসিনা ও বাঙালি মানসে বঙ্গবন্ধু’ প্রবন্ধ গ্রন্থটি আলোচনায় অগ্রসর হতে চাই। আমাদের বিবেচ্য স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের আলোকে একটি বিশ্লেষণধর্মী মূল্যায়ন উপস্থাপন করা। সাহিত্যের ইতিহাস মূল্যায়ন করলে আমরা দেখতে পাই, কবিতার পরেই ‘গবেষণার সাহিত্য’ সর্বাধিক সমৃদ্ধ শাখা। বাংলাদেশ রাষ্ট্র জন্মের অব্যহতি পরে সমালোচনা সাহিত্য ও ‘গবেষণা প্রবন্ধ’ প্রচুর প্রণীত হয়েছে বলেই আজ আমাদের এ সম্পর্কে কথা বলা প্রয়োজন। বাংলা ভাষার যে কোনো বিষয় নিয়ে- তা যত দুরূহ ও দুষ্প্রাপ্যই হোক না কেন; যেমন: দর্শন, বিজ্ঞান, অর্থশাস্ত্র, গণিত, ন্যায়শাস্ত্র প্রভৃতি বিষয়ে নানা বিশ্লেষণাত্ম গবেষণা আমাদের সাহিত্যে কম-বেশি প্রণীত হয়েছে। আমি এই নিবন্ধে সাহিত্য গবেষণা প্রসঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করতে চাই। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, বাংলা ভাষায় লিখিত প্রবন্ধগুলোতে বাংলা সাহিত্যের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত হয়নি। বর্তমান আলোচনায় আমি রাজনৈতিক বিচারে মন্ময় প্রবন্ধকে- এর অন্তর্ভুক্ত করে বিশ্লেষণ করতে চাই। এ কথা মনে রাখা দরকার যে, কোনো কোনো প্রবন্ধ ও গবেষণা পরস্পরের মধ্যে প্রবিষ্ট হয়েছে। আবার, কোনো কোনো প্রাবন্ধিক ও গবেষক একই ব্যক্তি। তবে সবাইকে একটি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, কথা সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েও ছোটগল্প ও উপন্যাস যেমন দুটি স্বতন্ত্র্য মাধ্যম। তেমনি চিন্তামূলক রচনা হয়েও প্রবন্ধ ও গবেষণার মধ্যে যোজন ফারাক। বাংলাদেশের যখন জন্ম হলো ততদিনে আমাদের প্রধান কয়েকজন গবেষক ইতঃমধ্যে গত হয়েছেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, আব্দুল গফুর সিদ্দিকী, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. মুহম্মদ আব্দুল হাই, মুনীর চৌধুরী প্রমুখ। বাংলাদেশের জন্মের পর অনেকদিন বেঁচে ছিলেন মোঃ মনসুর উদ্দিন, মুহম্মদ এনামুল হক, আবদুল কাদির প্রমুখ। তবে অধুনাকালে ওনারাও গত হয়েছেন। প্রবীণ গবেষকদের মধ্যে আহমদ শরীফ, সৈয়দ আলী আহসান, আশরাফ সিদ্দিকী, কাজী দীন মুহম্মদ, মোস্তফা নুরুল ইসলাম, আব্দুস সাত্তার, মাজহারুল ইসলাম, কাজী আব্দুল মান্নান, মোহাম্মদ আবু তালিব প্রমুখ বরেণ্য গবেষক আমাদের গবেষণা সাহিত্যে দ্রুতি ছড়িয়েছেন। এদের মধ্যে অকাল প্রয়াত হয়েছিলেন সুনীল মুখোপাধ্যায়।বর্তমান সময়ের গবেষকদের মধ্যে আব্দুল হাফিজ, রফিকুল ইসলাম, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান, আনিসুজ্জামান, বিশ্বজিৎ ঘোষ, রফিকউল্লাহ খান প্রমুখ আমাদের প্রবন্ধ সাহিত্যে আলো ছড়াচ্ছেন। তবে, এঁদের মধ্যে করোনা রোগে আক্রান্ত হয়ে সম্প্রতি গত হয়েছেন বাংলাদেশের শিক্ষক ও জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। বাংলাদেশ জন্মের পর বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা প্রবন্ধ রচিত হয়েছে এবং তার উপর ভিত্তি করে এম ফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু ডিগ্রি প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে লিখিত গবেষণা অভিসন্দর্ভগুলো কতটা কাজে আসছে সে দিকটি আমাদের বিবেচ্য বিষয়। লোকসাহিত্য নিয়ে গবেষণা করেছেন এমন কয়েকজন গবেষক হলেন: আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া, আশরাফ সিদ্দিকী, মাজহারুল ইসলাম, আব্দুস সাত্তার, আব্দুল হাফিজ, আনোয়ার করিম খন্দকার, রিয়াজুল হক, এস এম লুৎফর রহমান,
তিতাশ চৌধুরী, আবুল আহসান চৌধুরী প্রমুখ।গবেষণা কর্মের অন্যতম বাহন হচ্ছে গদ্য। সাবলীল গদ্য এবং সঠিক তথ্য-উপাত্ত সংযুক্ত করে প্রবন্ধকে আকর্ষণীয় করে তোলা যায়। গবেষণাকর্মকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য গবেষণাধর্মী পত্র-পত্রিকা প্রকাশ অতীব গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা সাহিত্যের বিকাশে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে সাহিত্য পত্রিকা, সাময়িকী পান্ডুলিপি, ভাষা ও সাহিত্যপত্র, বাংলা একাডেমি পত্রিকা, নজরুল একাডেমি পত্রিকা, কালি ও কলম পত্রিকা, সমকাল পত্রিকা, কবিতাপত্র, কণ্ঠস্বর পত্রিকা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। আমাদের বাঙালি মানসে বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক গবেষণাকর্মটিকে বিশ্লেষণপূর্বক মূল্যায়ন করে এ সম্পর্কে একটি নাতিদীর্ঘ আলোচনা উপস্থাপন করা। গ্রন্থটির প্রণেতা খান চমন-ই-এলাহি নব্বইয়ের দশকের অন্যতম একজন কবি। শুধু কবি বললে ভুল বলা হবে। তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, শিশু সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সংগঠক, গবেষক ও অ্যাডভোকেট। বিচিত্র বিষয় নিয়ে তিনি লেখালেখি করছেন। তাঁর লেখায় তিনি অতীত আর বর্তমানকে একসূত্রে গেঁথেছেন। বাংলার সঠিক ইতিহাস তিনি ভবিষ্যতের পাঠকের কাছে পৌঁছানোর জন্য বদ্ধপরিকর । পেশা আইন ব্যবসা হলেও লেখালেখি এবং সাংবাদিকতার মাধ্যমে তিনি সমাজসেবা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। মানুষই একমাত্র সত্য। ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।’ এই সত্যকে তিনি হৃদয়ে ধারণ করে সামনে এগিয়ে যেতে চান। আমরা লেখালেখিতেও তার প্রমাণ পাই। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে: ‘মুক্তিযুদ্ধে লিখে রাখে নাম’, ‘মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাড়ি গোপালগঞ্জ’, ‘টঙ্গীপাড়া থেকে সুধা সদন’, ‘ভূমিকন্যা’, ‘মেয়েটি বাংলাদেশ প্রজন্মের’, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও হেমায়েত বাহিনী’, ‘মৃত্যুবার্ষিকীর আগে প্রথম শোকসভা,’ ‘অবরোধে প্রণয়রাত,’ ‘বালিকার জবানবন্দি,’ ‘তিলোত্তমা,’ ‘মানবের জয়গান’, ‘প্রিয় কবি খান আজিজুল হক,’ ইত্যাদি। লেখকের জন্ম বৃহত্তর ফরিদপুরের গোপালগঞ্জ জেলার গোপালপুরে। বাবা খান আজিজুল হক ও মাতা হালিমা আজিজের জ্যেষ্ঠ সন্তান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। অর্জন করেছেন আইনসহ তিনটি বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েট তিনি। “শেখ হাসিনা ও বাঙালি মানসে বঙ্গবন্ধু” একটি ভিন্নধর্মী গ্রন্থ। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, যাঁর জন্ম না হলে বাংলাদেশের জন্ম হতো না, সেই মহান ব্যক্তি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও কর্মের বিভিন্ন দিক এই গ্রন্থের প্রবন্ধগুলোতে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। সেই সাথে স্থান পেয়েছে বঙ্গবন্ধুকন্যা, দেশরত্ন শেখ হাসিনার জীবন ও আদর্শ। আসলে গ্রন্থটি একজন লেখকের নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সমাজ, মানুষের জীবন কাঠামো, দেশ ও বৈশ্বিক রাজনীতিকে আলোকপাত করা হয়েছে। ইতিহাসের ক্ষয়ে যাওয়া পৃষ্ঠা থেকে লেখক যেন সঠিক তথ্য আমাদের সামনে তুলে আনার চেষ্টা করেছেন। গ্রন্থটিতে স্থান পেয়েছে ব্রিটিশ শাসনের পরে পাকিস্তান পর্বে দেশের মানুষের পরাধীনতার শৃংখল এবং সেখান থেকে উত্তরণের প্রচেষ্টা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী রাজনৈতিক ভাবনা, ভাষা আন্দোলন এবং পরবর্তী রাজনীতি, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামো এবং বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা আন্দোলনের মাধ্যমে দেশকে স্বাধিকার আন্দোলনের দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা প্রভৃতি। সেই সাথে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিবৈশিষ্ট্য, জেল-জুলুম, অত্যাচার সহ্য করে সোনার বাংলা বিনির্মাণে পথে অগ্রসর হওয়ার সম্পর্কে বইটি পড়ে আমরা জানতে পারব। বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। বাংলাদেশ ছাড়াও দেশের বাইরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ বাস করে। যারা বাংলাদেশকে ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত, একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছেন। আমরা যাদেরকে বলি রেমিটেন্স যোদ্ধা বা প্রবাসী বাঙালি।১৯৭১ সালের নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন সার্বভৌম-বাংলাদেশ। দেশের সম্মান, মর্যাদা এর স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার।লেখক খান চমন-ই- এলাহি বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে প্রতিটি প্রবন্ধ রচনা করেছেন। গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান, বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার আদর্শে অনুপ্রাণিত সকল সৈনিক এবং দেশরত্ন শেখ হাসিনার প্রতি। এখানে গ্রন্থাকারের মানসজাত প্রবণতা লক্ষ্য করার মতো । ২০৮ পৃষ্ঠার এই বইটিতে লেখক তেরোটি প্রবন্ধ, পরিশিষ্ট এবং তথ্যসূত্র সংযোজন করে আগামীদিনের গবেষকদের জন্য মূল্যবান করে তুলেছেন। প্রবন্ধগুলো বাংলাদেশ, দেশের মানুষ, সংগ্রাম এবং ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পথ চলা, তাঁর জীবনের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। “অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা, আমার দেখা নয়া চীন: নিজেকে ও বিশ্বকে জানার মাধ্যম” শীর্ষক প্রবন্ধে
বঙ্গবন্ধুর লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা, আমার দেখা নয়া চীন প্রভৃতি গ্রন্থের মূল্যায়নধর্মী বিশ্লেষণ আমাদেরকে নতুন এক বিস্ময়ে নিয়ে যায়। শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগ্রহণ করেছিলেন গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ। নানা শখ করে তাঁর নাম রেখেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। যদিও তাঁর ডাকনাম ছিল ‘খোকা’। তখন কে জানত এই খোকাই একদিন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ববন্ধুতে পরিণত হবেন। যাঁর জন্য এই দেশ, তিনি আমাদের সবার প্রিয় বঙ্গবন্ধু। তাঁর হৃদয়ে সর্বদা খেলা করত দেশের মঙ্গল। তিনি বাঙালি ও বাংলাদেশ দেশের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সন্তান। অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যতের বাঙালির মধ্যে তিনি স্মরণীয়-বরণীয়। তাঁর তুলনা করা চলে না। দেশের শোষিত, বঞ্চিত, মেহনতি মানুষের কল্যাণে তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র্য। তিনি বাঙালির চেতনায় আলোর মশাল জ্বালিয়ে ছিলেন। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত কেবল একটি কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হয়েছে লক্ষ কণ্ঠস্বরে। বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা মুজিবুর রহমানের তিনটি গ্রন্থ নিয়ে লেখকের তথ্যসমৃদ্ধ বিশ্লেষণ- যা ইতিহাস গবেষণার ক্ষেত্রে এক মূল্যবান সংযোজন। “শেখ হাসিনার দর্শন ও গ্রন্থে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু” শীর্ষক প্রবন্ধে লেখক দেখাতে চেয়েছেন জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবিক মূল্যবোধ ও দর্শনের মাধ্যমে কীভাবে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। দেশকে উন্নত ও আধুনিকীকরণে শেখ হাসিনার ভূমিকা সুদূরপ্রসারি। দেশের মানুষের অধিকার রক্ষায় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন। বিভিন্ন সময়ে তাঁর এই কাজগুলোকে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। শেখ হাসিনার ভাষণ এবং তাঁর মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে। শেখ হাসিনার গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে: ‘বাংলাদেশে স্বৈরাতন্ত্রের জন্ম’, ‘ওরা টোকাই কেন,’ ‘দারিদ্র দূরীকরণ কিছু চিন্তা-ভাবনা’, ‘বিপন্ন গণতন্ত্র লাঞ্ছিত মানবতা’, ‘বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নয়ন’, ‘সবুজের মাঠ পেরিয়ে’, ‘সহে না মানবতার অবমানন ‘, ‘সাদাকালো’, ‘পিপল এন্ড ডেমোক্রেসি’, ‘আমরা জনগণের কথা বলতে এসেছি’, ‘ডেভলপমেন্ট অফ দ্য মেসেজ’, ‘সামরিকতন্ত্র বনাম গণতন্ত্র’, ‘বাংলা আমার আমি বাংলার’, ও ‘বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে শেখ মুজিবুর রহমান’, প্রভৃতি গ্রন্থ। এসব গ্রন্থে তিনি দেশের মানুষ, মানুষের দুঃখ-দুর্দশা চিহ্নিত করার পাশাপাশি, কীভাবে তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়- সে বিষয় নিয়ে আলোকপাত করেছেন। পাশাপাশি পিতা বঙ্গবন্ধুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, মানবিক গুণাবলি এবং তার জীবন ও কর্ম তুলে ধরেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশের যে জঘন্য একনায়কতন্ত্র শাসনব্যবস্থা কায়েম করা হয়েছিল। শেখ হাসিনা সেই জায়গা থেকে বাঙালিকে মুক্ত করে বাংলাদেশকে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। লেখক “জয় বাংলা কীভাবে আমাদের হলো” শীর্ষক প্রবন্ধে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানটির আদ্যান্ত ব্যাখ্যা করেছেন। আমাদের বাঙালির পরিচয় সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত রয়েছে ‘জয় বাংলা’ শব্দদ্বয়। ‘জয় বাংলা’ একটি চেতনার নাম। বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় স্মারক। এই শব্দদ্বয় একদিনে সৃষ্টি হয়নি। ১৯২৪ সালে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘পূর্ণ অভিনন্দন’ শীর্ষক গীতিকবিতায় প্রথম ‘জয় বাংলা’ কথাটি উল্লেখ করেছেন। ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানটি বিপ্লবের হাত ধরে এসেছে। পরাধীনতার বিরুদ্ধে মানবতার মুক্তির পথ ও স্বাধীনতার পক্ষে এই শব্দটি ব্যবহৃত হতো। ‘জয় বাংলা’ মূলত বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের কণ্ঠস্বর। এই শ্লোগানের মাধ্যমে বাঙালি মুক্তিকামী মানুষকে আলাদা করা হতো। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি দখলদার হানাদার বাহিনী যখন ইসলামের নামে এদেশের মানুষের উপর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছিল- তখন ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানের মাধ্যমেই পাকিস্তানি আদর্শ এবং বাঙালি আদর্শকে আলাদা করা হয়েছে। ‘জয় বাংলা’ তাই কেবল একটি শ্লোগানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বাঙালি জাতির মুক্তির স্বর। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু ‘জয় বাংলা’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। ২৭শে মার্চ, ১৯৭১ মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠকালে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে ‘জয় বাংলা’ শব্দটি পুনরায় ব্যবহার করেন। ‘জয় বাংলা’ বাংলার মেহনতি মানুষের মুখের বুলি। পৃথিবীর কোনো ভাষা থেকে ধার করে আনা শব্দ নয়। নিজ বাসভূমে থেকে আরোহিত, হৃদয়ে থেকে উচ্চারিত এক গৌরব শ্লোক।
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
১৫২/২, এ-২ গ্রীন রোড, রওশন টাওয়ার (লিফটের-৫),
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ । মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত