শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মতামত ‘বাংলা টেসলা’ মান নিয়ন্ত্রণ কোনোটিই নেই

‘বাংলা টেসলা’ মান নিয়ন্ত্রণ কোনোটিই নেই

বাংলাদেশের সড়কব্যবস্থা যখন অতিরিক্ত যাত্রীচাপ, পরিবহন সংকট ও জ্বালানির ব্যয়ের চাপে নুয়ে পড়েছে, তখন বিকল্প হিসেবে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে দেশীয়ভাবে রূপান্তরিত ইলেকট্রিক যান- যাকে অনেকে রসিকতার ছলে ‘বাংলা টেসলা’ নামে ডাকেন। নামটি যতই আকর্ষণীয় হোক, বাস্তবে এসব যানবাহন আজ দেশের রাস্তায় এক নতুন ধরনের বিপর্যয়ের নাম। সস্তা, সহজলভ্য এবং চালাতে কম খরচ হলেও এগুলোর কাঠামো, নকশা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিংবা ন্যূনতম মান নিয়ন্ত্রণ কোনোটিই নেই। ফলে এগুলো যাত্রী ও পথচারীর জন্য একেবারে চলন্ত মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছোট ছোট গ্যারেজে কোনো প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ছাড়াই এসব যান তৈরি হয়। দুর্বল বডি, নিম্নমানের ব্যাটারি, সঠিক তারের সংযোগহীনতা, অস্থির ভারসাম্য- এ সবই নিয়মিত দেখা যায়। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, প্রথমে কম গতির জন্য নির্মিত এই যানগুলো পরে ‘টিউনিং’-এর নামে উচ্চগতিতে রূপান্তর করা হয়। কিন্তু সেই গতির চাপ সহ্য করার সামর্থ্য নেই এর ব্রেক বা স্টিয়ারিং সিস্টেমের। সামান্য অতিরিক্ত গতি তুললেই যানটি কাঁপতে থাকে, হঠাৎ ব্রেক করলে সামনে গড়িয়ে যায়, আর সামান্য বাঁক নিলেই উল্টে যাওয়ার ঝুঁঁকি তৈরি হয়। টায়ার বিস্ফোরণ তো নিয়মিতই ঘটে।

এরপর আছে চালকদের অদক্ষতার সমস্যা। অধিকাংশ চালকই নাবালক, অপ্রশিক্ষিত ও লাইসেন্সবিহীন। সড়ক আইন, ট্রাফিক সিগন্যাল বা নিরাপদ চালনার মৌলিক জ্ঞান ছাড়াই তারা রাস্তায় নেমে পড়ে। দ্রুত গতি তোলা, হঠাৎ লেন পরিবর্তন, বেপরোয়া ওভারটেকিং- এসবই তাদের চালনার বৈশিষ্ট্য। ফলে দুর্ঘটনার মাত্রা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। যাত্রীদের ঝুঁঁকিও কোনো অংশে কম নয়। সিটবেল্ট নেই, শক্ত কাঠামো নেই, যথাযথ হেডলাইট বা সাইড মিররও অনেক সময় অনুপস্থিত। সামান্য সংঘর্ষেই সামনের অংশ ভেঙে যায়, যাত্রীরা ছিটকে পড়ে, আর প্রাণহানির আশঙ্কা বেড়ে যায় বহুগুণ। অতিরিক্ত যাত্রী তোলার কারণে গাড়ির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে উল্টে যাওয়ার ঘটনাও অহরহ দেখা যায়। সবচেয়ে বড় সংকট হলো- এই যানবাহনগুলোর ওপর কার্যকর কোনো আইনগত নিয়ন্ত্রণ নেই। 

রেজিস্ট্রেশন নেই, লাইসেন্স নেই, মান নিয়ন্ত্রণ নেই; এমনকি সড়ক পরিবহন আইনেও এ ধরনের যানবাহনের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বিধান নেই। ফলে দুর্ঘটনা ঘটলে দায় নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এটি শুধু জননিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, বরং একটি অনিয়ন্ত্রিত সড়কব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে- এটি সত্য। কিন্তু নিরাপদ সড়ক ছাড়া কোনো উন্নয়নই টেকসই নয়। সস্তার পরিবহন মানুষের প্রয়োজন মেটাতে পারে, কিন্তু মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে কোনো যানবাহন জনপ্রিয় হওয়ার অধিকার রাখে না। তাই এখনই প্রয়োজন কঠোর আইন প্রণয়ন, সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা চালু, চালকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি। রাষ্ট্র যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়, তবে এ ধরনের অনিরাপদ ইলেকট্রিক যান রাস্তায় মানুষের জন্য ‘বাংলা টেসলা’ নয়, বরং নিয়ন্ত্রণহীন ছোট ছোট মৃত্যুফাঁদ হয়েই থাকবে।

খুঁজুন