বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। মাতৃমৃত্যু হ্রাস, টিকাদান কর্মসূচির বিস্তৃতি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও প্রশংসিত। তবে এই সাফল্যের আড়ালে একটি মৌলিক কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে—স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় MBBS ও BDS ব্যতীত অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের যথাযথ স্বীকৃতি, ব্যবহার ও বিকাশের ঘাটতি। আধুনিক ও টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা কেবল চিকিৎসক ও দন্তচিকিৎসকদের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠতে পারে না। একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন বহুমুখী, সমন্বিত ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাভিত্তিক পেশাগত অংশগ্রহণ।
বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপিস্ট, অডিওলজিস্ট, অপটোমেট্রিস্ট, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট, সাইকোলজিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্ট, প্যাথলজিস্ট, নিউট্রিশনিস্ট, হেলথ টেকনোলজিস্ট, ডিপ্লোমা মেডিকেল প্রফেশনাল, বিকল্প চিকিৎসা ও আকুপাংচার বিশেষজ্ঞসহ বহু স্বাস্থ্য পেশাজীবী রয়েছেন। তাঁরা কেউই চিকিৎসকদের বিকল্প নন; বরং তাঁরা স্বাস্থ্যসেবার এমন সব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন, যা চিকিৎসকদের একার পক্ষে দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।
কেন এসব পেশার প্রয়োজন
বাংলাদেশে রোগের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। সংক্রামক রোগের পাশাপাশি ডায়াবেটিস, স্ট্রোক, হৃদ্রোগ, মাংসপেশি ও অস্থিসংক্রান্ত সমস্যা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, শিশুদের বিকাশজনিত জটিলতা এবং বয়সজনিত দৃষ্টি ও শ্রবণ প্রতিবন্ধকতা ক্রমেই বাড়ছে। এসব সমস্যার চিকিৎসা শুধু ওষুধ বা অস্ত্রোপচারে সীমাবদ্ধ নয়; এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, থেরাপি, কাউন্সেলিং ও জীবনধারাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
ফিজিওথেরাপিস্টরা স্ট্রোক-পরবর্তী পুনর্বাসন, অস্থি ও জয়েন্টের সমস্যা, স্পোর্টস ইনজুরি এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা ব্যবস্থাপনায় অপরিহার্য ভূমিকা রাখেন। তাঁদের অনুপস্থিতিতে রোগীরা দীর্ঘদিন অক্ষম অবস্থায় থেকে যান। অডিওলজিস্টরা শ্রবণ সমস্যার নির্ণয় ও ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে সময়মতো হস্তক্ষেপ না হলে সারা জীবনের যোগাযোগ সমস্যার সৃষ্টি হয়। স্পিচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্টরা কথা বলার সমস্যা, অটিজম, স্ট্রোক-পরবর্তী কথা ও গিলতে অসুবিধার মতো জটিলতায় কাজ করেন।
অপটোমেট্রিস্টরা প্রাথমিক চক্ষু পরিচর্যার মূল স্তম্ভ। বাংলাদেশে অশোধিত রিফ্র্যাকটিভ এরর এখনও দৃষ্টিহীনতার অন্যতম প্রধান কারণ। অপটোমেট্রিস্টরা সহজেই এই সমস্যার সমাধান করতে পারেন এবং একই সঙ্গে গুরুতর চোখের রোগ শনাক্ত করে সময়মতো চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করতে পারেন। সাইকোলজিস্টরা বিষণ্নতা, উদ্বেগ, ট্রমা ও শেখার সমস্যার মতো মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে কাজ করেন—যা এখনও সামাজিকভাবে অবহেলিত। নিউট্রিশনিস্টরা অপুষ্টি, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ ও মাতৃস্বাস্থ্যে খাদ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখেন।
মাইক্রোবায়োলজিস্ট ও প্যাথলজিস্টরা সঠিক রোগ নির্ণয়ের ভিত্তি। তাঁদের কাজের ওপর নির্ভর করে সঠিক চিকিৎসা, অ্যান্টিবায়োটিকের যৌক্তিক ব্যবহার এবং জনস্বাস্থ্য নজরদারি। হেলথ টেকনোলজিস্ট ও ডিপ্লোমা মেডিকেল প্রফেশনালরা ডায়াগনস্টিক, ইমেজিং, জরুরি সেবা ও অপারেশন থিয়েটার ব্যবস্থাপনায় হাসপাতালের কার্যক্রম সচল রাখেন। বিকল্প চিকিৎসা ও আকুপাংচার, যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের মাধ্যমে, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা ও কিছু রোগে সহায়ক হতে পারে।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় তাঁদের ভূমিকা
একটি সুসংগঠিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় প্রত্যেক পেশার কাজের ক্ষেত্র স্পষ্ট ও পরিপূরক। চিকিৎসক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা পরিকল্পনা করেন, ফিজিওথেরাপিস্ট পুনর্বাসন নিশ্চিত করেন, অপটোমেট্রিস্ট প্রাথমিক চোখের যত্ন দেন, সাইকোলজিস্ট মানসিক সহায়তা দেন এবং ল্যাব পেশাজীবীরা সঠিক রিপোর্ট প্রদান করেন। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন এই পেশাগুলোর কাজকে হুমকি বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখা হয়।
অনেকে বলেন, অর্থোপেডিক সার্জনরা ফিজিওথেরাপিস্টকে পছন্দ করেন না বা চক্ষু বিশেষজ্ঞরা অপটোমেট্রিস্টকে গ্রহণ করতে চান না। বাস্তবে এটি পেশাগত বিরোধ নয়; বরং ভূমিকা সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝি। একজন অর্থোপেডিক সার্জনের সফল অস্ত্রোপচারের জন্য দক্ষ ফিজিওথেরাপি অপরিহার্য, যেমন একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাজ সহজ হয় যখন প্রাথমিক স্তরে অপটোমেট্রিস্ট সঠিকভাবে রোগী বাছাই ও রেফার করেন।
স্বাস্থ্যসেবা কোনো একক ডিগ্রির একচেটিয়া ক্ষেত্র নয়। MBBS একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ডিগ্রি, কিন্তু এটি একা পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে পরিচালনা করতে পারে না। স্বাস্থ্যব্যবস্থার “অক্সিজেন” হলো সব স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সম্মিলিত ও সমন্বিত কাজ।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা
ইউরোপ ও আমেরিকায় ডেন্টিস্টরা চিকিৎসক নন, তবু তাঁদের পেশাগত স্বীকৃতি, স্বাধীনতা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা সুপ্রতিষ্ঠিত। একইভাবে অপটোমেট্রিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, সাইকোলজিস্ট ও অডিওলজিস্টরা আইনগত স্বীকৃতি ও নির্ধারিত কাজের ক্ষেত্র নিয়ে কাজ করেন। সেখানে চিকিৎসকরা নেতৃত্ব দেন, কিন্তু পুরো স্বাস্থ্যসেবা একা দখল করেন না।
বাংলাদেশে চিত্রটি ভিন্ন। ডেন্টিস্টরা তুলনামূলকভাবে স্বীকৃতি পেলেও অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবীরা এখনও নীতিগত অবহেলা, অস্পষ্ট আইন, সীমিত কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক অজ্ঞতার শিকার। প্রশ্ন থেকেই যায়—যদি ডেন্টিস্টদের গ্রহণ করা যায়, তবে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রশিক্ষিত অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের কেন নয়?
কীভাবে তাঁদের যথাযথভাবে ব্যবহার করা যায়
প্রথমত, নীতিগত স্বীকৃতি ও স্পষ্ট আইন প্রয়োজন, যাতে প্রত্যেক পেশার কাজের সীমা, লাইসেন্স ও ক্যারিয়ার কাঠামো নির্ধারিত হয়। দ্বিতীয়ত, সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিমভিত্তিক সেবা চালু করতে হবে। তৃতীয়ত, জনসচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে মানুষ জানে কোন সমস্যায় কোন পেশাজীবীর কাছে যেতে হবে। চতুর্থত, মানসম্মত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করে পেশাগুলোর প্রতি আস্থা গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কেবল চিকিৎসক ও দন্তচিকিৎসকদের ওপর নির্ভরশীল নয়। ফিজিওথেরাপিস্ট, অপটোমেট্রিস্ট, অডিওলজিস্ট, স্পিচ থেরাপিস্ট, সাইকোলজিস্ট, ল্যাব পেশাজীবীসহ সব স্বাস্থ্য কর্মীর সম্মিলিত অবদান ছাড়া একটি মানবিক, দক্ষ ও টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। প্রত্যেকে আলাদা আলাদা কাজ করেন, কিন্তু একসঙ্গে কাজ করলেই স্বাস্থ্যসেবার প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব।
ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক ও গবেষণা ফেলো
ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি (এম, এস,উ ), মালয়েশিয়া
বাংলাদেশে স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের বিকাশে প্রতিবন্ধকতা
বাংলাদেশে স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের বিকাশে প্রতিবন্ধকতা
বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। মাতৃমৃত্যু হ্রাস, টিকাদান কর্মসূচির বিস্তৃতি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও প্রশংসিত। তবে এই সাফল্যের আড়ালে একটি মৌলিক কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে—স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় MBBS ও BDS ব্যতীত অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের যথাযথ স্বীকৃতি, ব্যবহার ও বিকাশের ঘাটতি। আধুনিক ও টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা কেবল চিকিৎসক ও দন্তচিকিৎসকদের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠতে পারে না। একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন বহুমুখী, সমন্বিত ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাভিত্তিক পেশাগত অংশগ্রহণ।বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপিস্ট, অডিওলজিস্ট, অপটোমেট্রিস্ট, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট, সাইকোলজিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্ট, প্যাথলজিস্ট, নিউট্রিশনিস্ট, হেলথ টেকনোলজিস্ট, ডিপ্লোমা মেডিকেল প্রফেশনাল, বিকল্প চিকিৎসা ও আকুপাংচার বিশেষজ্ঞসহ বহু স্বাস্থ্য পেশাজীবী রয়েছেন। তাঁরা কেউই চিকিৎসকদের বিকল্প নন; বরং তাঁরা স্বাস্থ্যসেবার এমন সব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন, যা চিকিৎসকদের একার পক্ষে দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।কেন এসব পেশার প্রয়োজনবাংলাদেশে রোগের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। সংক্রামক রোগের পাশাপাশি ডায়াবেটিস, স্ট্রোক, হৃদ্রোগ, মাংসপেশি ও অস্থিসংক্রান্ত সমস্যা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, শিশুদের বিকাশজনিত জটিলতা এবং বয়সজনিত দৃষ্টি ও শ্রবণ প্রতিবন্ধকতা ক্রমেই বাড়ছে। এসব সমস্যার চিকিৎসা শুধু ওষুধ বা অস্ত্রোপচারে সীমাবদ্ধ নয়; এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, থেরাপি, কাউন্সেলিং ও জীবনধারাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।ফিজিওথেরাপিস্টরা স্ট্রোক-পরবর্তী পুনর্বাসন, অস্থি ও জয়েন্টের সমস্যা, স্পোর্টস ইনজুরি এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা ব্যবস্থাপনায় অপরিহার্য ভূমিকা রাখেন। তাঁদের অনুপস্থিতিতে রোগীরা দীর্ঘদিন অক্ষম অবস্থায় থেকে যান। অডিওলজিস্টরা শ্রবণ সমস্যার নির্ণয় ও ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে সময়মতো হস্তক্ষেপ না হলে সারা জীবনের যোগাযোগ সমস্যার সৃষ্টি হয়। স্পিচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্টরা কথা বলার সমস্যা, অটিজম, স্ট্রোক-পরবর্তী কথা ও গিলতে অসুবিধার মতো জটিলতায় কাজ করেন।অপটোমেট্রিস্টরা
প্রাথমিক চক্ষু পরিচর্যার মূল স্তম্ভ। বাংলাদেশে অশোধিত রিফ্র্যাকটিভ এরর এখনও দৃষ্টিহীনতার অন্যতম প্রধান কারণ। অপটোমেট্রিস্টরা সহজেই এই সমস্যার সমাধান করতে পারেন এবং একই সঙ্গে গুরুতর চোখের রোগ শনাক্ত করে সময়মতো চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করতে পারেন। সাইকোলজিস্টরা বিষণ্নতা, উদ্বেগ, ট্রমা ও শেখার সমস্যার মতো মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে কাজ করেন—যা এখনও সামাজিকভাবে অবহেলিত। নিউট্রিশনিস্টরা অপুষ্টি, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ ও মাতৃস্বাস্থ্যে খাদ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখেন।মাইক্রোবায়োলজিস্ট ও প্যাথলজিস্টরা সঠিক রোগ নির্ণয়ের ভিত্তি। তাঁদের কাজের ওপর নির্ভর করে সঠিক চিকিৎসা, অ্যান্টিবায়োটিকের যৌক্তিক ব্যবহার এবং জনস্বাস্থ্য নজরদারি। হেলথ টেকনোলজিস্ট ও ডিপ্লোমা মেডিকেল প্রফেশনালরা ডায়াগনস্টিক, ইমেজিং, জরুরি সেবা ও অপারেশন থিয়েটার ব্যবস্থাপনায় হাসপাতালের কার্যক্রম সচল রাখেন। বিকল্প চিকিৎসা ও আকুপাংচার, যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের মাধ্যমে, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা ও কিছু রোগে সহায়ক হতে পারে।স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় তাঁদের ভূমিকাএকটি সুসংগঠিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় প্রত্যেক পেশার কাজের ক্ষেত্র স্পষ্ট ও পরিপূরক। চিকিৎসক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা পরিকল্পনা করেন, ফিজিওথেরাপিস্ট পুনর্বাসন নিশ্চিত করেন, অপটোমেট্রিস্ট প্রাথমিক চোখের যত্ন দেন, সাইকোলজিস্ট মানসিক সহায়তা দেন এবং ল্যাব পেশাজীবীরা সঠিক রিপোর্ট প্রদান করেন। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন এই পেশাগুলোর কাজকে হুমকি বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখা হয়।অনেকে বলেন, অর্থোপেডিক সার্জনরা ফিজিওথেরাপিস্টকে পছন্দ করেন না বা চক্ষু বিশেষজ্ঞরা অপটোমেট্রিস্টকে গ্রহণ করতে চান না। বাস্তবে এটি পেশাগত বিরোধ নয়; বরং ভূমিকা সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝি। একজন অর্থোপেডিক সার্জনের সফল অস্ত্রোপচারের জন্য দক্ষ ফিজিওথেরাপি অপরিহার্য, যেমন একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাজ সহজ হয় যখন প্রাথমিক স্তরে অপটোমেট্রিস্ট সঠিকভাবে রোগী বাছাই ও রেফার করেন।স্বাস্থ্যসেবা কোনো একক ডিগ্রির একচেটিয়া ক্ষেত্র নয়। MBBS একটি
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ডিগ্রি, কিন্তু এটি একা পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে পরিচালনা করতে পারে না। স্বাস্থ্যব্যবস্থার “অক্সিজেন” হলো সব স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সম্মিলিত ও সমন্বিত কাজ।আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষাইউরোপ ও আমেরিকায় ডেন্টিস্টরা চিকিৎসক নন, তবু তাঁদের পেশাগত স্বীকৃতি, স্বাধীনতা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা সুপ্রতিষ্ঠিত। একইভাবে অপটোমেট্রিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, সাইকোলজিস্ট ও অডিওলজিস্টরা আইনগত স্বীকৃতি ও নির্ধারিত কাজের ক্ষেত্র নিয়ে কাজ করেন। সেখানে চিকিৎসকরা নেতৃত্ব দেন, কিন্তু পুরো স্বাস্থ্যসেবা একা দখল করেন না।বাংলাদেশে চিত্রটি ভিন্ন। ডেন্টিস্টরা তুলনামূলকভাবে স্বীকৃতি পেলেও অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবীরা এখনও নীতিগত অবহেলা, অস্পষ্ট আইন, সীমিত কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক অজ্ঞতার শিকার। প্রশ্ন থেকেই যায়—যদি ডেন্টিস্টদের গ্রহণ করা যায়, তবে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রশিক্ষিত অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের কেন নয়?কীভাবে তাঁদের যথাযথভাবে ব্যবহার করা যায়প্রথমত, নীতিগত স্বীকৃতি ও স্পষ্ট আইন প্রয়োজন, যাতে প্রত্যেক পেশার কাজের সীমা, লাইসেন্স ও ক্যারিয়ার কাঠামো নির্ধারিত হয়। দ্বিতীয়ত, সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিমভিত্তিক সেবা চালু করতে হবে। তৃতীয়ত, জনসচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে মানুষ জানে কোন সমস্যায় কোন পেশাজীবীর কাছে যেতে হবে। চতুর্থত, মানসম্মত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করে পেশাগুলোর প্রতি আস্থা গড়ে তুলতে হবে।বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কেবল চিকিৎসক ও দন্তচিকিৎসকদের ওপর নির্ভরশীল নয়। ফিজিওথেরাপিস্ট, অপটোমেট্রিস্ট, অডিওলজিস্ট, স্পিচ থেরাপিস্ট, সাইকোলজিস্ট, ল্যাব পেশাজীবীসহ সব স্বাস্থ্য কর্মীর সম্মিলিত অবদান ছাড়া একটি মানবিক, দক্ষ ও টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। প্রত্যেকে আলাদা আলাদা কাজ করেন, কিন্তু একসঙ্গে কাজ করলেই স্বাস্থ্যসেবার প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব।ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান সহকারী অধ্যাপক ও গবেষণা ফেলো ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি (এম, এস,উ ), মালয়েশিয়া
সুফী মাজহারুল ইসলাম মাসুম
[email protected] | ০১৭১১৬৬০৫৫৭
১৫২/২, এ-২ গ্রীন রোড, রওশন টাওয়ার (লিফটের-৫),
পান্থপথ সিগন্যাল, ঢাকা-১২০৫ । মোবাইলঃ ০১৭১৭৪৩৬১৩৯
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত