বাংলাদেশ এক আশ্চর্য দেশ। এখানে স্বপ্ন বিক্রি হয় কেজি দরে, ডিগ্রি পাওয়া যায় কিস্তিতে, আর হাসপাতাল ছাড়াই তৈরি হয় “ডাক্তার, নার্স, অপ্টোমেট্রিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, রেডিওগ্রাফার, ডেন্টাল টেকনোলজিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, পাবলিক হেলথ প্রফেশনাল ”—যদিও তাদের হাতে স্টেথোস্কোপ থাকে, কিন্তু রোগীর নাড়ি ধরার অভ্যাস নেই। এখানে ক্লিনিক না থাকলেও “ক্লিনিক্যাল ট্রেনিং” হয়, রোগী না থাকলেও “কেস হিস্ট্রি” লেখা হয়, আর বাস্তবতা না থাকলেও “ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড” বলে সাইনবোর্ড ঝুলে থাকে।
এই দেশেই এখন নতুন এক শিক্ষা-শিল্পের জন্ম হয়েছে—সনদ-কারখানা। যেখানে ছাত্র ভর্তি হয় স্বপ্ন নিয়ে, আর বের হয় সার্টিফিকেট নিয়ে; মাঝখানে কী শেখে, তা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই।
এ যেন সেই চিরচেনা গল্প—“তোলা দুধে পোলা বাঁচানো”। দুধ নেই, গরু নেই, কিন্তু হাঁড়ি আছে, চুলা আছে, গল্প আছে—আর আছে আশ্বাস। শিশুকে বলা হচ্ছে, “এই যে, দুধ আসতেছে, একটু অপেক্ষা কর।” কিন্তু দুধ আর আসে না। তবুও গল্প চলে, আশ্বাস চলে, আর শিশুটি ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যায়।
বাংলাদেশের অনেক বেসরকারি স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখন ঠিক এই কাজটাই করছে—তারা দুধ ছাড়াই দুধ খাওয়ানোর অভিনয় করছে।
সাইন বোর্ডে হাসপাতাল, বাস্তবে ফাঁকা ঘর , আপনি যদি কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে যান, দেখবেন—চমৎকার ভবন, ঝকঝকে রিসেপশন, দেয়ালে বিদেশি ছবির পোস্টার, আর বড় বড় অক্ষরে লেখা—“College of Health Science”, “Institute of Clinical Excellence”, “International Medical Academy”। শুনলেই মনে হবে, ভেতরে ঢুকলেই হয়তো নিউইয়র্ক বা লন্ডনের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান!
কিন্তু একটু ভেতরে যান।
হাসপাতাল কোথায়?
ক্লিনিক কোথায়?
রোগী কোথায়?
নীরবতা।
একটা ছোট চেম্বার, দুইটা বেড, তিনটা পুরোনো যন্ত্র—এই দিয়েই নাকি “Clinical Training”! রোগী না থাকলে কী হয়? সমস্যা নেই—ছাত্ররা একে অপরের ওপর প্র্যাকটিস করবে, না হলে বই থেকে কেস বানাবে। লগবুক পূরণ হবে, পরীক্ষা হবে, সবাই পাশ করবে—কারণ ব্যর্থ হলে প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট হবে!
এ যেন মঞ্চে নাটক চলছে—সবাই চরিত্রে আছে, কিন্তু গল্পটা মিথ্যা।
ডিগ্রি: এখন একধরনের পণ্য একসময় ডিগ্রি ছিল অর্জনের বিষয়। এখন অনেক জায়গায় তা হয়ে গেছে লেনদেনের বস্তু। আপনি টাকা দিন, সময় দিন—ডিগ্রি পাবেন। মাঝে মাঝে ক্লাস করবেন, মাঝে মাঝে সেমিনারে ছবি তুলবেন, আর শেষে গাউন পরে convocation-এ হাসিমুখে সার্টিফিকেট নেবেন।
কিন্তু একটা প্রশ্ন—এই ডিগ্রি কি আপনার হাতকে দক্ষ করেছে? আপনার চোখকে clinical judgment শিখিয়েছে? আপনি কি রোগী দেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন?
না পারলেও সমস্যা নেই—কারণ আপনার কাছে কাগজ আছে। আর এই দেশে অনেক সময় কাগজই সত্য, বাস্তবতা নয়।
রোগী: সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগার, অথচ অনুপস্থিত
স্বাস্থ্যশিক্ষার মূল শব্দটা হলো—রোগী।
রোগী নেই মানে শিক্ষা নেই।
কিন্তু আজকের বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে—অনেক প্রতিষ্ঠান রোগী ছাড়া “healthcare professional” তৈরি করছে। এটা এমন, যেন সাঁতার শেখানো হচ্ছে পানিতে না নামিয়ে, কিংবা ড্রাইভিং শেখানো হচ্ছে গাড়ি ছাড়া।
ছাত্ররা বই পড়ে, স্লাইড দেখে, ইউটিউব দেখে—আর পরীক্ষায় লিখে দেয়, “I examined the patient…”। কিন্তু সেই patient কে? কোথায়? কবে?
সবই কাগজে।
সবই কল্পনায়।
তোলা দুধের গল্প: প্রতারণার রূপক গ্রামে একটা গল্প আছে—এক মা তার সন্তানকে বাঁচাতে দুধের ব্যবস্থা করতে পারছে না। তখন সে হাঁড়িতে পানি গরম করে, নাড়াচাড়া করে, আর বলে—“এই যে, দুধ আসতেছে…”। শিশুটি বিশ্বাস করে, অপেক্ষা করে, কিন্তু দুধ আর আসে না।
আজকের অনেক প্রতিষ্ঠান ঠিক এই মায়ের মতো—তারা জানে, তাদের কাছে “দুধ” নেই—মানে hospital নেই, patient নেই, clinical exposure নেই। তবুও তারা ছাত্রদের বলে—“তোমরা international standard training পাচ্ছো… একটু ধৈর্য ধরো…”
চার বছর পরে ছাত্র বুঝতে পারে—সে আসলে “তোলা দুধ” খেয়েছে।
তার ডিগ্রি আছে, কিন্তু দক্ষতা নেই।
তার স্বপ্ন আছে, কিন্তু পথ নেই।
সমাজে এর ফলাফল: নীরব বিপর্যয় এই শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—এর প্রভাব তৎক্ষণাৎ চোখে পড়ে না, কিন্তু ধীরে ধীরে ভয়াবহ আকার নেয়।
একজন অদক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী যখন রোগীর সামনে দাঁড়ায়, তখন সে শুধু নিজের অযোগ্যতাই প্রকাশ করে না—সে রোগীর জীবনকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। ভুল diagnosis, ভুল management, unnecessary referral, delayed treatment—সবকিছু মিলিয়ে এটি এক নীরব বিপর্যয়।
আর তখন সমাজ বলে—“ডিগ্রি এত, কাজ এত খারাপ কেন?” উত্তরটা সহজ—কারণ ডিগ্রি ছিল, কিন্তু শিক্ষা ছিলনা।
সত্যিকারের প্রতিষ্ঠান বনাম ভানকরা প্রতিষ্ঠান সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান খারাপ—এটা বলা অন্যায় হবে। অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, যারা সত্যিকারের হাসপাতাল বানিয়েছে, ক্লিনিক চালায়, রোগী দেখে, ছাত্রদের হাতে-কলমে শেখায়।কিন্তু সমস্যাটা হলো—এই ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কারণ নিম্নমানের প্রতিষ্ঠানগুলো বাজার দখল করছে কম খরচে, বেশি প্রতিশ্রুতি দিয়ে।এটা যেন বাজারে নকল ওষুধ আসার মতো—দাম কম, চাহিদা বেশি, কিন্তু ক্ষতি ভয়ংকর।
তাহলে কী করা উচিত?
সমাধান খুব জটিল না, কিন্তু সাহসী হতে হবে।
১. নিজস্ব হাসপাতাল বা পূর্ণাঙ্গ ক্লিনিক ছাড়া কোনো professional bachelor’s degree বা allied health course চালানো যাবে না।
২. বিদ্যমান নিম্নমানের কোর্সগুলো ধাপে ধাপে বন্ধ বা পুনর্গঠন করতে হবে।
৩. কঠোর accreditation, নিয়মিত audit, surprise inspection চালু করতে হবে।
৪. শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে হবে—যেন তারা ভর্তি হওয়ার আগে প্রশ্ন করে।
২. বিদ্যমান নিম্নমানের কোর্সগুলো ধাপে ধাপে বন্ধ বা পুনর্গঠন করতে হবে।
৩. কঠোর accreditation, নিয়মিত audit, surprise inspection চালু করতে হবে।
৪. শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে হবে—যেন তারা ভর্তি হওয়ার আগে প্রশ্ন করে।
শেষকথা: আমরা কী বানাতে চাই?
· আমরা কি certificate বানাতে চাই, নাকি professional?
· আমরা কি brochure বানাতে চাই, নাকি healthcare system গড়তে চাই?
· আমরা কি স্বপ্ন বিক্রি করতে চাই, নাকি ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে চাই?
· যদি উত্তরটা সত্যিকারের উন্নয়ন হয়, তবে আমাদের এই “তোলা দুধের সংস্কৃতি” বন্ধ করতেই হবে।
কারণ বাস্তবতা খুব নির্মম—
তোলাদুধে পোলাবাঁচেনা।
আর মিথ্যা শিক্ষায় পেশা টেকেনা।
তোলাদুধে পোলাবাঁচেনা।
আর মিথ্যা শিক্ষায় পেশা টেকেনা।