শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
Journalists
শিরোনাম
মতামত বাংলাদেশপন্থী রাজনৈতিক অবস্থায় এগোতে পারেনি

বাংলাদেশপন্থী রাজনৈতিক অবস্থায় এগোতে পারেনি

বাংলাদেশের রাজনীতি একটি বৃহৎ পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে l স্বাধীনতার পর পঞ্চাশ বছরের বেশি অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ। এই দীর্ঘ সময়ে একাধিক রাজনৈতিক ধারার আবির্ভাব, বিবর্তন ও বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে এগিয়েছে দেশ। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর দেখা যাচ্ছে, ‘বাংলাদেশপন্থি’ রাজনীতির যে বহুমাত্রিক বিকাশ হওয়ার কথা ছিল, তা প্রত্যাশিত অবস্থায় এগোতে পারেনি। এর পেছনে একটি মৌলিক কারণ হলো আওয়ামী লীগের তৈরি করা এক ধরনের সাংস্কৃতিক বয়ান, যা মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকারকে একচেটিয়া করে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্বের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে।

বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের এই বয়ান শুধু একটি দলীয় প্রচার নয়, বরং রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক মূলধারার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যারা বিকল্পধারা গড়ে তুলতে চান, তারা মূলত আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক একচ্ছত্রতার প্রাচীরের সামনে এসে দাঁড়াতে বাধ্য হন। আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক বয়ানে মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, বাংলা ভাষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, বাঙালি জাতীয়তাবাদ- সবকিছুকে দলীয় ব্যাখ্যার ভেতর আবদ্ধ করা হয়েছে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে আওয়ামী লীগ শুধু রাজনৈতিক সংগ্রামের সাফল্য নয়, বরং নিজেদের চূড়ান্ত অর্জন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। তারা চেষ্টা করেছে বোঝাতে যে, মুক্তিযুদ্ধ মানেই আওয়ামী লীগ, আর আওয়ামী লীগ মানেই বাংলাদেশ। ফলে অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তি যদি মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্যকে নিজেদের অবস্থান থেকে ব্যাখ্যা করতে চায়, তবে সেটি দলীয় প্রচারযন্ত্রে সহজেই ‘বিকৃত ইতিহাস’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। এই একচোখা বয়ানে মুক্তিযুদ্ধের অন্যমত অংশীদারদের ইতিহাসও সব মুছে দেওয়া হয়েছে। ‘চেতনার’ নামে একরৈখিকতা চাপিয়ে দিয়ে একটি বর্ণিল ও বহুমাত্রিক রাজনীতিকে সংকুচিত করে ফেলা হয়েছে।

রাজনীতিতে সংস্কৃতির ব্যবহার নতুন নয়। কিন্তু আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে এটি প্রায় একটি নান্দনিক শাসনযন্ত্রে পরিণত হয়েছে। কবিতা, গান, নাটক, সিনেমা- সব মাধ্যমেই ‘জাতি’ ও ‘চেতনা’ কেবল আওয়ামী সংস্কৃতির ব্যাখ্যায় আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। জাতীয় দিবসগুলোতে স্বাধীনতা মানে শুধু শেখ মজিবুর রহমানের ভাষণ, একুশ মানে শুধু আওয়ামী ইতিহাস এবং বিজয় মানে কেবল ‘একটি দলের বিজয়’- এমন মঞ্চনির্ভর পাঠ সামাজিক চেতনায় গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছে। এর ফলে একটি অদৃশ্য সাংস্কৃতিক বয়ান গড়ে উঠেছে, যেখানে ভিন্নমত, বিকল্প ইতিহাস, দ্বিধামূলক প্রশ্ন সবই রাষ্ট্রদ্রোহ বা দেশবিরোধিতার নামান্তর।

আর এই বয়ান তৈরির প্রক্রিয়া খুব কৌশলী। পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে সাহিত্য উৎসব, টেলিভিশন নাটক থেকে সিনেমা, জাতীয় দিবস থেকে সরকারি পুরস্কার- সবকিছুতে আওয়ামী লীগের বয়ানকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি হিসেবে হাজির করা হয়েছে।

এই একচেটিয়া সাংস্কৃতিক বয়ান কার্যত বিকল্প রাজনীতির জায়গা সংকুচিত করে ফেলেছে। কোনো রাজনৈতিক দল বা বুদ্ধিজীবী যদি আওয়ামী লীগের সংস্কৃতির বাইরে গিয়ে নিজেদের ‘বাংলাদেশপন্থি’ অবস্থান দাঁড় করাতে চায়, তবে সঙ্গে সঙ্গেই তাদের বিরুদ্ধে দেশবিরোধী, পাকিস্তানপন্থি বা সাম্প্রদায়িক তকমা ব্যবহার করা হয়।

এমনকি বিএনপি বা বামপন্থিদের ক্ষেত্রেও একই কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে। বিএনপিকে পাকিস্তানপন্থি এবং বামদের ‘অকার্যকর প্রগতিশীলতা’র অভিযোগে কোণঠাসা করা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশপন্থি রাজনীতির বহুমাত্রিকতা হারিয়ে গেছে। আর যারা সত্যিই বিকল্প রাজনীতির বয়ান দাঁড় করাতে চেয়েছেন, তারা রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর বাইরে থেকে খুব একটা জায়গা পাননি।

আর প্রগতিশীল শক্তি, বিশেষ করে বামপন্থিরা অনেক সময় নিজেদের অবস্থানকে আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক বয়ানের ভেতরে দাঁড় করিয়েছেন। তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ বা ভাষা আন্দোলনের বিকল্প কোনো বয়ান ছিল না, কিংবা থাকলেও তা জনমানসে প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। এর ফলে আওয়ামী লীগের বয়ানই একমাত্র ‘বাংলাদেশপন্থি’ বয়ান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে তারা সক্ষম হয়েছে। এর আরেকটি দিক হলো নাগরিক সমাজ। বিশ্ববিদ্যালয়, সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গন এবং মিডিয়া জগতে আওয়ামী সাংস্কৃতিক বয়ান এতটাই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে যে, ভিন্নকণ্ঠ প্রকাশ পেলেই তা সন্দেহের চোখে দেখা হয়। মুহূর্তেই তাকে বিভিন্ন ট্যাগের মাধ্যমে সাইড করে রাখার চেষ্টা করা হয়। ফলে স্বাধীন চিন্তার জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে।

দীর্ঘ সময় ধরে এই সাংস্কৃতিক একচ্ছত্রতা জাতীয় রাজনীতিকে একমুখী করে তুলেছে। রাজনীতিতে মতাদর্শিক বিতর্ক ও বহুমাত্রিক বিকাশের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম এত বছর বাংলাদেশপন্থি রাজনীতির বিকল্প বয়ান তৈরির সুযোগ পায়নি। তাদের বিশ্বাস করানো হয়েছে যে, আওয়ামী লীগকে সমর্থন করা মানে বাংলাদেশকে সমর্থন করা, আর ভিন্নমত প্রকাশ করা মানে রাষ্ট্র ও জাতিকে অস্বীকার করা। এর ফলে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন রাজনীতি জন্ম নিয়েছে। রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতির জায়গা দখল করেছে দলীয় সংস্কৃতি। আর একসময় যে সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ ছিল, তা ক্রমে রূপ নিয়েছে একদলীয় আধিপত্যে।

বাংলাদেশপন্থি রাজনীতির জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো সাংস্কৃতিক মুক্তি। এই মুক্তি মানে কেবল অপশাসনের আধিপত্য থেকে বেরিয়ে আসা নয়, বরং জাতীয় পরিচয় ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বহুমাত্রিকভাবে পুনঃপাঠ করা। মুক্তিযুদ্ধকে একচেটিয়া দলীয় সম্পদ বানিয়ে রাখলে তা ইতিহাসের প্রতি অবিচার হয়, কারণ মুক্তিযুদ্ধ ছিল গোটা জাতির সংগ্রাম। তাই মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের পরিচয়কে একচেটিয়া দলীয় বয়ানের বাইরে নিয়ে গিয়ে তা নাগরিকের, সমাজের এবং রাষ্ট্রের অভিন্ন সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে।

ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে বহুমাত্রিকভাবে উপস্থাপন করার মানে হলো- ভিন্নমত, ভিন্ন রাজনৈতিক ধারা, এমনকি ভিন্ন ব্যাখ্যাও যেন বাংলাদেশপন্থি চর্চার ভেতরে জায়গা পায়। উদাহরণস্বরূপ, মুক্তিযুদ্ধে যারা রাজনৈতিক দলের বাইরে থেকেও অংশ নিয়েছিলেন, তাদের অবদানকে যথাযথভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। সংস্কৃতির ক্ষেত্রে গ্রামীণ সমাজ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, এমনকি ভিন্নধর্মী সাহিত্য-শিল্পকেও জাতীয় বয়ানের ভেতরে আনতে হবে। এতে রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি কেবল একটি দলের প্রচারমাধ্যম হয়ে থাকবে না, বরং একটি বহুত্ববাদী জাতীয় ঐতিহ্যে পরিণত হবে।

এটি করা গেলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন চিন্তার জায়গা তৈরি হবে। তরুণ প্রজন্ম তখন বুঝতে পারবে, বাংলাদেশকে ভালোবাসার একমাত্র পথ আওয়ামী লীগের সমর্থন নয়। বরং ভিন্নমত, ভিন্ন বয়ান, নতুন রাজনৈতিক কল্পনা- এসবও বাংলাদেশপন্থি হতে পারে। তরুণদের কাছে দেশপ্রেম তখন আর কেবল দলীয় আনুগত্যের সমার্থক হবে না, বরং গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, বৈচিত্র্য ও মুক্তচিন্তার সমন্বিত চর্চা হয়ে উঠবে। এই বহুমাত্রিক দেশপ্রেমই ভবিষ্যতে নতুন আন্দোলন, নতুন রাজনৈতিক শক্তি এবং আরও পরিপূর্ণ গণতন্ত্রের জন্ম দিতে পারে।

আওয়ামী লীগের ‘কালচারাল বয়ান’ শুধু সাংস্কৃতিক আধিপত্য নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারও। এর ভেতরে বাংলাদেশপন্থি রাজনীতিকে দলীয় করে ফেলার প্রবণতা কাজ করে। ফলে জাতীয় রাজনীতি তার বৈচিত্র্য হারায়। অতএব, বাংলাদেশপন্থি রাজনীতির ভবিষ্যৎ বিকাশের জন্য এই সাংস্কৃতিক একচেটিয়াকরণ ভাঙা জরুরি। বহুমাত্রিক ইতিহাস, অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতি এবং মুক্তচিন্তার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। না হলে ‘বাংলাদেশপন্থি রাজনীতি’ কেবল স্লোগান হয়ে থাকবে, জাতির মুক্তি ও গণতান্ত্রিক বিকাশের শক্তি হয়ে উঠতে পারবে না।

খুঁজুন